- 78
- 0
অংক দাদুর অদ্ভুত মেশিন
বিট্টু আমায় বললো, কাউকে বলবি না কিন্তু, ছুটির পর তোকে আমার দাদুর কাছে নিয়ে যাবো।
বিট্টুর দাদু এক সময় আমাদের স্কুলে অংক করাতেন। তবে অংক মাস্টারশাইদের মতো মোটেই তিনি রাগী নয়। আমি এক সময় তার কাছে পড়তে যেতাম। ভাত খেতে খেতে অংকের ফর্মুলা আওড়ায়, এতটাই মশগুল থাকে অংকের মধ্যে।
তবে দাদু বলে, অংক তো বড় সোজা। আসল মজার জিনিস যদি দেখতে চাও, তাহলে বিজ্ঞান পড়ো। বিজ্ঞানের কোন শুরু নেই, শেষও নেই।
-তাহলে দাদু তুমি বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করোনি কেন?
-অংকে বেশি নাম্বার ছিল তাই... বিজ্ঞানেও ছিল, তবে ওই যে তিন নম্বর কম।
মোটে তিন নম্বর কম পাওয়ার জন্য বিজ্ঞান ছেড়ে অংক নিয়ে দাদু পড়েছে। আমার কাচুমাচু মুখ দেখে দাদু বলল, পড়াশোনা কি শুধু ডিগ্রি দিয়ে হয়?
অবসর নেওয়ার পর ঘরেই একটা ছোটখাটো সাইন্স ল্যাবরেটরি বানিয়ে রেখেছে দাদু। মাঝেমধ্যেই অবাক করা সব জিনিস বানায়। এই তো সেদিন একটা জিনিস বানাল, যেটা প্রেস করলেই সমস্ত পুরনো স্মৃতি এক ঝটকায় মনে পড়ে যাবে।
যেমন, অনেক দিনের পুরনো কোন পড়া মনে পড়ছে না, ওই টুপির মতন জিনিসটা মাথায় পরে, যদি একটি বোতাম টিপি, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সে জিনিসটা মনে পড়ে যাবে।
দাদু জিনিসটার নাম দিয়েছেন "মেমোরি মেশিন"।
সেই মেশিনটার কথা এখনও কেউ জানে না। দাদু আমাকে বলেছিল কাউকে না বলতে। তোমাদের গোপনে বলে রাখছি, তোমরা আবার কাউকে বলে দিও না যেন!
আজ বিট্টু যখন ডাকছে, নিশ্চয়ই কোনো না কোনো নতুন জিনিস আবার আবিষ্কার করা হয়েছে। আমি গেলাম।
দাদু আমাকে দেখে খিক খিক করে হাসল, "এই যে খোকা বাবু এসে গেছো? বসো।"
আমার নাম ধরে কেন দাদু ডাকল না, আমি বুঝতে পেরেছি, নিশ্চয়ই নাম ভুলে গেছে আমার। এমনটা অনেক সময় হয়, দাদু লোকজনের নাম ভুলে যায়। একবার স্কুল থেকে বাড়ি আসার সময় রিক্সায় উঠে আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে আসছিল। নেহাত অঙ্ক দাদুর খ্যাতি আছে এলাকাতে, তাই রিক্সাওয়ালা কাকু ওনাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়েছে।
বাড়ি আসার আগে, দোকান থেকে কিছু জিনিস আনতে বলেছিল দিদা, সেটা বেমালুম ভুলেই গেছিল দাদু। দাদু বলে, মানুষের খাওয়া-দাওয়ার চাহিদা কমানোর জন্য, কিছু একটা বানাতে হবে। এদেশে যা খিদের খিদে!
আমি বললাম, কি বানাবে?
একটা বড়ি বানাবো।
আমার প্রফেসর শঙ্কুর গল্পের সেই ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবারক বড়ি-টির কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু ওটা তো গল্প ছিল। সত্যি সত্যি এমন হয় নাকি?
দাদু বললেন, কেন হবে না? তুমি জানো, আজ থেকে বিশ বছর আগে, চিন্তাই করা যেত না। যে লেখালেখির সুবিধার জন্য বিজ্ঞান এত উন্নতি করবে!
সত্যিই তাই, এখন বিজ্ঞান আমাদের ছোটদের জন্য খুব সহজে অনেক তথ্য তাড়াতাড়ি সামনে এনে দেয়। তবে অনেকসময় সেসব তথ্যে অনেক ভুল থাকে। সেটা নিয়েও দাদু ভাবছে, নতুন কিছু আপডেট করা যায় কিনা!
আজ দাদু একটা নতুন জিনিস আবিষ্কার করেছে, একটা গোল মতন চেম্বার ট্রান্সপারেন্ট কাচ দিয়ে ঘেরা। ভেতরে দু-তিনটি চেয়ার রাখা। আমাকে আর বিট্টু-কে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে দাদু বললেন, রেডি তো?
কিসের জন্য রেডি, সেটা জিজ্ঞেস করার আগেই বিট্টু আমাকে চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর কানে একটা হেডফোন মতন জিনিস পরিয়ে দিল।
দাদু বোতাম টিপতেই চোখের সামনে সব যেন অন্ধকার। ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেছে। আমরা দুজন কোথায় যেন উড়ে চলেছি। উড়তে উড়তে এত উঁচুতে চলে গেছি, যে পায়ের নিচে পৃথিবী-টা টেনিস বলের মতন মনে হচ্ছে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছি আমরা।
হঠাৎ করে একটা জায়গায় এসে পড়লাম। জায়গাটা আমার বড্ড চেনা। সেখানে ঠিক আমাদের মতোই দুটি ছেলে। আমাদের মতো মানে, পুরোপুরি আমাদের মতো। দেখতে, বয়স—সবই আমাদের মতো। আর পাড়া-টাও যেন ঠিক আমাদের মতোই।
আমরা চারজন একসাথে কথা বলে উঠলাম—
যা দেখছি, সত্যি?
চারটে মানুষ যদি একসাথে কথা বলে, যেভাবে একটা ইকো হয়, ঠিক সেরকম হচ্ছে।
তারপর বুদ্ধি করে আমি চুপ করে রইলাম। বিট্টু-কে ইশারা করলাম কথা বলার জন্য। কিন্তু বিট্টু কথা বলতেই, ওর মতো দেখতে অবিকল সেই ছেলেটিও, কথা বলে উঠল। মুখ দিয়ে কথা বলা যাবে না। এদের সাথে ইশারায় কথা বলতে হবে। কিন্তু তাও উপায় নেই। আমরা যা ইশারা করছি, ওরা একই রকম ইশারা করছে, যেন আমরা আয়না দেখছি।
ভারী মজার লাগলো বিষয়টা। আমরা চারজনে একসাথে বলে উঠলাম, আমরা এখন থেকে বন্ধু। মাঝেমাঝে এসে খেলা করব।
আমরা কোন গ্যালাক্সির কোন গ্রহে আছি জানি না। তবে শুনেছি, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও যদি মানুষ থাকে, তারা আমাদের মতো একই রকম। সেই জন্যই মাঝেমাঝে মনে হয়, এই ঘটনাটা আমাদের সাথে আগেও ঘটেছে। এটাকে 'দেজা-ভু' বলে।
আমরা চারজন একসাথে খেলছি, দৌড়চ্ছি, ঘুরে বেড়াচ্ছি। ১০ মিনিট মনে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা সারা জীবন মনে থাকবে।
যখন ফিরে এলাম, দেখি আমরা দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছি। ট্রান্সপারেন্ট চেম্বার থেকে আমাদের বার করে দাদু ঘরে রাখা দুটো চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছেন। চোখ মেলে তাকিয়ে দাদুকে দেখে, একটা প্রশ্ন মাথায় জাগল—স্বপ্ন দেখছিলাম নাকি সত্যিই কিছু ঘটেছিল আমাদের সাথে? যদি ঘটেই থাকে তাহলে কারা কাদের কাছে গিয়েছিল? ওরা আমাদের কাছে নাকি আমরা ওদের কাছে?
0 Comments.