Tue 09 June 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ গল্পে সুদীপ্ত পারিয়াল

maro news
হৈচৈ গল্পে সুদীপ্ত পারিয়াল

সাবুমাসি 

সাবিত্রী বিকেল বেলার দিকটা বারান্দায় এসে বসে। আগে যখন পায়ে জোর ছিল তখন রাস্তায় বের হতো। এখন তেমন ভরসা পায় না। কবি মানুষ ছিলেন ওর স্বামী। সারাদিন কবিতার জগত নিয়েই থাকতেন। এই কবিতাই হল তার মৃত্যুর কারণ। 


একদিন সকালবেলায় প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন, যেমনটা প্রতিদিনই যেতেন বন্ধুদের সাথে। প্রায় প্রত্যেকই অবসরপ্রাপ্ত। ওর স্বামী সুনীল কবিতার মতন জীবন যাপন করতেন। কেউ বলবে না মানুষটা মাস্টারমশাই ছিলেন। 

সবার সাথে কথা বলতেন তিনি, তিনি যে এভাবে অকালে চলে যাবেন সেটা কেউ ভাবতেই পারেননি। বরং সাবিত্রী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। অস্টিওআর্থারাইটিসে হাটু দুটো প্রায় অবশ। 

যাইহোক, এভাবেই আনমনে হাঁটতে হাঁটতে রেলে কাটা পড়ে সে। সে কথা আর মনে করতে চায় না সাবিত্রী। কিন্তু মনে পড়ে যায়। 


ওদের বাড়ির কাছাকাছি একটি কলেজ। রোজই তাই অনেক কলেজের ছেলে-মেয়েরা যাতায়াত করে এই রাস্তা দিয়ে। এই সবে বোধ হয় কোন ব্যাচের ছুটি হয়েছে। অবশ্য আজকাল নাকি কলেজের ছুটির কোন ঠিকঠাক থাকে না। একটি ছেলেকে দেখল অবিকল ওর নিজের ছেলের মতন দেখতে।  ভুল দেখছে নিশ্চয়ই। কি করে সম্ভব? ওর একমাত্র ছেলে অনিরুদ্ধ থাইল্যান্ডে থাকে। অনেকবার মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছে। কিন্তু হাঁটুর ব্যাথায় কাবু সাবিত্রী নিজের ঘরের বাইরে বেরোয় না আর অত দূরে যাওয়া তো দূরের কথা! 


ছেলেটি একবার এসে দাঁড়ালো সাবিত্রী সামনে, বলল, আচ্ছা এটা সুনীল মাস্টারমশের বাড়ি? 

- হ্যাঁ বাবা! 

- আপনি সাবু মাসি তাই না?

ওকে এই নামে কে ডাকতে পারে এমনটাই ভাবছিল অবাক হয়ে, ছেলেটি বলল, মনে থাকার কথা নয়। তখন এই শাওন চার-পাঁচ বছরের ছিল। কিন্তু ১০ বছরের অব্দি আপনাদের বাড়িতে প্রতিদিন যাতায়াত করতাম। 

- ও তাই নাকি? কোথায় থাকো তুমি বাবা?

- এখন বাউরিয়া চলে গেছি। আগে তো এখানেই থাকতাম। 

ছেলেটির বয়স আন্দাজে এখন ১৮-১৯ তাহলে ১০ বছর বয়সে শেষ এসেছিল মানে খুব বেশিদিন আগে নয়। ভুলে যাওয়ার তো কথা নয়।

সাবিত্রী ওকে ঘরে আসতে বলে। শাওন কিন্তু কিন্তু করছিল , সাবিত্রী বলল, মাস্টারমশাই নেই বলে কি মাসির বাড়িতে আসতে নেই? 

ছেলেটি এসে বসলো বারান্দায়। সাবিত্রী বলল, দাঁড়াও তোমার জন্য চা করি আনি।

- না না আমি চা খাই না। 

- ও এখনও বুঝি চা ধরা হয়নি! 

- আপনি এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন এমনি একটু বসে গল্প করি। 

- তুমি কি তখন মাসিকে আপনি করে ডাকতে? 

ও হাসলো।

অনেকদিন পর যেন কোন নিকট আত্মীয়কে কাছে পেয়ে সাবিত্রীরও প্রাণটা খুশিতে ভরে উঠল। এরপর থেকে প্রায়ই ছেলেটি যাতায়াত করে। 


পরদিন ওর জন্য আলুর চপ করে রেখেছিল সাবিত্রী। আরেকদিন নাড়ু বানিয়ে রেখেছে। আগে ছেলে আসলে এসব হতো। আর সুনীলবাবু খেতে ভালোবাসতেন তাই উনি যখন বেঁচে ছিলেন তখন রান্নাবান্না চলত নানান। কিন্তু এখন একার জন্য কে এতো রান্না করবে? কাজের মেয়েটা থাকাকালীনই সমস্ত রান্নাবান্না হয়ে যায়! 


কিন্তু শাওন ওর জীবনে যেন ঝড় নিয়ে এসেছে। সত্যিকারের এখন আবার প্রাণ খুলে হাসে সাবিত্রী।

ছেলেটারও বড় দুঃখের জীবন। এখান থেকে চলে যাওয়ার পরই নতুন বাড়িতেই নাকি তার মা মারা গেছে। 

বাবা আবার বিয়ে করেছে। একটি ভাই আছে কিন্তু তাদের সাথে খুব একটা বনি-বনা নেই শাওনের।

সাবিত্রী বলে, তাতে কি হয়েছে তোমার মাসি তো আছে? যখন যেটা খেতে ইচ্ছে করবে মাসিকে বলবে! বল তো বাবু, তুই কি খেতে ভালবাসিস?

সাবিত্রির হঠাৎ এই আন্তরিক তুই সম্বোধনে, যেন প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। শাওন তার মাকে ঠিক মনে করতে পারে না। তার দশ বছরের স্মৃতিতে মা এখন একটা ঝাপসা মুখ। ওর শোয়ার ঘরের দেওয়ালে যে ছবিটা রয়েছে সেখানে মায়ের ছবিটা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নতুন অ্যালবাম থেকে যে একটা ছবি বার করে বানাবে তারও উপায় নেই। সবকিছু আছে বাবার কাছে। আর বাবার সাথে ওর প্রায় কথা বলা বন্ধ।

ও বলে, তোমার কাছে আসলে আমার আর বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না মাসি। 

- আহা আমার সোনা! মাসির কাছে থাকতে কি আপত্তি? যদি বাবার ঘরে না থাকতে ইচ্ছা করে মায়ের ছবিটা নিয়ে আমার কাছে চলে আসবি। তোর দাদা তো আর এ জন্মে মুখো হবে বলে মনে হচ্ছে না। 

অনিরুদ্ধর কথা বলা হচ্ছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। শাওন আসার পর ছেলের দূরে থাকার দুঃখটাও যেন একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে। ছেলে ফোন করার কথা ভুলে যায়। আজকাল যখন ছেলে ফোন করে তখন মা ইচ্ছে করে ফোনটা ধরে না। আর ধরলেও বলে, পরে কথা বলছি। এখন আমি শাওনের জন্য রান্না করছি। 

শাওনের কথা ছেলেকে বলা হয়েছে। ছেলেটাকে মনে আছে অনিরুদ্ধর। বাবা খুব ভালোবাসতো তাকে। বলত ও নাকি বাবার ছোট ছেলে। 

এই কটা দিনের মায়াতেই ছেলেটা যেন কেমন আপন হয়ে গেছে সাবিত্রীর। এই স্বার্থপর দুনিয়াতে  এমন একা মানুষগুলোর পাশে যারা এসে দাঁড়ায় তারাই হলো প্রকৃত নির্ভরতা। 

সেদিন প্রচন্ড ঠান্ডা লেগেছে ছেলেটার। বাড়িতে গেছে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে। কিছুতেই ছাড়বে না সাবিত্রী। কিন্তু ও বলে, বাড়িতে গিয়ে মায়ের ফটোটা না দেখলে ওর নাকি ঘুম আসে না। 


তারপর দুটো দিন ছেলেটা এলো না। সাবিত্রী অপেক্ষা করে বসে থাকে এই বুঝি ও আসবে? ফোন করলে ফোন বন্ধ আছে। ছেলেটা জ্বর বাঁধিয়ে বসে রইলো না তো!

সাবিত্রীর মনের মধ্যে একটা চরম উৎকণ্ঠা কাজ করতে শুরু করেছে। এতদিন ছেলেটা তো কলেজ কামাই করে না। ওর বাবা কি ওকে আটকে রেখেছে নাকি অন্য কোথাও কাজে লাগিয়ে দিয়েছে? মাঝেমধ্যেই বাবার নাকি কাজে লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দিত।

তখনই সাবিত্রী বলতো, তোর বাবা না পড়া আমি তোকে পড়াবো। তোর মাসি এখনো বেঁচে আছে। সাবিত্রী এক সপ্তাহর মাথায় বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে, তোর হাঁটুর যে অবস্থা ট্রেনে ওঠা একপ্রকার অসম্ভব। কিন্তু তা সত্বেও কষ্ট করে করে গেল স্টেশন অব্দি। খুব কষ্ট করে ট্রেনে উঠতে হলো। কিছু অল্পবয়সী ছেলেরা ছিল তারা সাহায্য করল। কিন্তু উঠে তো পড়লো, বাউরিয়ায় গিয়ে এবার যাবে কোথায়? ট্রেন থেকে নামতেও সেই ছেলেগুলো সাহায্য করলো। তারপর একটু একটু করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওভার ব্রিজ পেরোতে শুরু করলো সাবিত্রী। যেন হাঁটু দুটো তার এক্ষুনি খুলে পড়ে যাবে। টোটোয় উঠে বলল বড় শিব তলা চলো। 

মনে হল ভাগ্যিস ঠিকানাটা জানা ছিল। মনের মতন একটা দুশ্চিন্তা কাজ করছে। ছেলেটার ভালো-মন্দ কিছু...

না না, ভালো আছে নিশ্চয়ই।

বড় শিব তলায় নেবে আবার জল ঠেঙিয়ে যেতে হল খানিকটা। শাওনের বাবার নাম তপন বিশ্বাস। ওনার সাথেই দেখা হল বাড়িতে ঢুকে, আপনার বড় ছেলে কই? 

- কেন বলুন তো? কে আপনি?

-আমি ওর মাসি ওকে নিয়ে যেতে এসেছি। এখন থেকেও আমার সাথেই থাকবে।

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register