- 28
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
বিট্টু কি করবে? সে অবাক হয়েছে, এইভাবে একটা পরিত্যক্ত ঘরে নিজেকে একা পেয়ে…
তারপর… ১১তম পর্বে…
সকালে অনেক দেরিতে চোখ খুলতেই বিট্টু দেখে একটা পরিত্যক্ত ঘরে একটি কাঠের পাটাতনে খড়ের বিছানায় সে শুয়ে আছে। অবাক হয়ে গেল বিট্টু। মাথাটা এখনও ধরে আছে। খিদেয় পেটের ভেতর ইঁদুর ডন বৈঠক করছে! পাটাতন থেকে উঠে পড়ল বিট্টু, দেখল একটা পুরনো টালির চালের ঘরের মধ্যে আছে। ঘরের চারিদিকে আবর্জনার স্তুপ। নানা জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। ভীষণ খিদে পেয়েছে। গতরাতে ট্রেন ওঠার পর ঘোতনকাকার দেওয়া জল পান করে হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল, তারপর ঘুমিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ঘরে সে কিভাবে এল? ঘোতনকাকাই বা কোথায় গেল? বিট্টুর মনে নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। তারপর সে ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু বাইরে থেকে দরজা বন্ধ।
“ঘোতন কাকা, কোথায় গেলে? আমাকে এই ঘরে আটকে রেখেছ কেন? দরজা খোলো। আমার খুব খিদে পাচ্ছে গো।
না, কোনো লাভ হল না। চুপচাপ ঘরের মধ্যে বসে থাকল। হরিদাদুর কথা ভাবতে লাগল। হরিদাদু ওকে বলেছেন,
“বিপদের সময় মাথা সবসময় ঠাণ্ডা রাখবে বিট্টু আর মায়ের কথা স্মরণ করবে”
বিট্টু তাই করল। মনের মধ্যে সে যথেষ্ট সাহস পেল। হরিদাদুর জাহাজে করে কত জায়গায় ঘুরেছে। কত তার অভিজ্ঞতা। সেখানে তিনি নানা বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন। সব বিপদ কাটিয়ে তিনি সারা দুনিয়া ঘুরেছেন। বিট্টুরও খুব ইচ্ছা করছে, হরিদাদুর মত সেও একদিন সারা দুনিয়া ঘুরবে। তবে এখনকার ইচ্ছা অনুযায়ী ঘোতনকাকুর সাথে ওর গ্রাম ঘুরে দেখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সে কোথায়? বিট্টু আবার দরজার কাছে গিয়ে চেল্লাতে লাগল,
“তুমি কোথায় ঘোতনকাকা? আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে। তারপর আমরা গ্রাম ঘুরে দেখব”
বিফলে গেল তার চেল্লানো। আবার সে ঘরের পাটাতনে চুপ করে বসে রইল। প্রায় ঘন্টা দেড়েক পর দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল ঘোতন। বিট্টু ওকে দেখেই,
“ঘোতন কাকা, তুমি আমাকে ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছ কেন? আমার খুব খিদে পেয়েছে”
“এই শোন, এটা তোর বাড়ি না। বেশি চিৎকার করলে গলার টুঁটি চেপে ধরব। আমি তোর কাকা নই। আমি একজন ছেলেধরা। তোকে কিডন্যাপ করেছি। গতকাল ট্রেনে ওঠার পর তোকে জল দেওয়ার সময় ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে এখানে এনেছি, বুঝলি। তোর বাড়ির ঠিকানা, বাবার মোবাইল নাম্বারটা দে”
“ঘোতনকাকা, তুমি খুব বোকা। আমি নিজে থেকেই তোমার সাথে ঘুরবো বলে চলে এলাম। আমাকে অজ্ঞান করার কি দরকার ছিল। তাছাড়া আমি আর বাড়ি যাব না”
“চোপ। একদম চোপ। তোকে রেখে আমার লাভ কি? তোকে আটকে রেখে তোর বাবার কাছ থেকে অনেক টাকা নেব”
বিট্টু খুব হাসতে লাগল,
“আমার বাবা তোমাকে টাকা দেবেই না। আমি বাড়ি থেকে চলে এসেছি, বাবা খুশিই হবে”
“একদম বাজে কথা বলবি না। ভালোয় ভালোয় সব কিছু দিয়ে দে”
“কিন্তু আমার খুব খিদে পেয়েছে। আগে খেতে দাও। গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখাও। তারপর সব বলব। তোমাকে যখন পেয়েছি তখন সবকিছু ঘুরে দেখব। জানো, আমি বাড়ি থেকে কোথাও যেতে পারি না। বিশেষ করে আমার মা মারা যাবার পর আমি ঘরবন্দী”
ঘোতন বুঝল, স্মার্ট বিট্টুকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। ওকে হাত করে নিতে পারলে অনেক লাভ হবে, অনেক টাকা পাওয়া যাবে। অগত্যা ওর কথা শুনে চলাই ভালো। ঘোতন কিছু কচুরী আর জিলিপি নিয়ে এসেছিল। বিট্টুকে ফ্রেস হয়ে খেয়ে নিতে বলল,
“খেয়ে নে আগে, তারপর গ্রাম ঘুরতে যাব, কেমন”
“বাহ, আমার প্রিয় ঘোতনকাকা”
বিট্টু, ঘোতনকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে চুমু খেয়ে নিল। ঘোতন বিট্টুর এমন ব্যবহারে কেমন যেন বিহ্বল হয়ে পড়ল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“তোর তো দেখছি খুব সাহস। তোর আমাকে ভয় করছে না। আমি একটা ছেলেধরা”
“ভয় করব কেন গো? তুমি কি ডাইনোসর?”
“সেটা আবার কি?”
“এবাবা, তুমি ডাইনোসর কি? সেটাই জানোনা। কি বোকা গো তুমি! আরে টিভিতে আমি ডাইনোসরের সিনেমা দেখেছি। একটা বিরাট বড় জন্তু। সে মানুষকে পেলেই চিবিয়ে খায়। অবশ্য সব ডাইনোসর এক নয়। কিছু বিশাল ডাইনোসর শাকসব্জি খায়। বোনের ফল মূল খায়। সেগুলো খুবই শান্ত”
ঘোতন বিট্টুর কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না। ওর কথায় কান দিলে হবে না। বরং ওর সাথে ভালোভাবে কথা বলে ওর বাবার মোবাইল নাম্বার নিতে হবে। যদি বিট্টুকে কিডন্যাপ করে অনেক টাকা পাওয়া যায় তাহলেই কেল্লাফতে।
“ঠিক আছে আমি তোকে আমাদের গ্রাম ঘুরে দেখাব। আগে ভালো করে খাওয়া-দাওয়া কর”
বিট্টু, ঘোতনের সাথে বেরিয়ে পড়ল। প্রথমেই একটা বিশাল বড় পুকুরের সামনে আসতেই বিট্টু চিৎকার করে বলল,
“কি বিশাল দিঘি গো ঘোতনকাকা। এমন বড় দিঘি আমি কখনো দেখিনি”
পুকুরের চারপাশে কত নারকেল গাছ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যের রক্তিম আলো পুকুরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। পুকুরের মধ্যে অসংখ্য ছোট বড় মাছ দেখে বিট্টু দারুণ মজা পেল। সে বলে উঠল,
“আরিব্বাস। কত মাছ গো ঘোতনকাকা! দারুণ লাগছে। মাছগুলো কি সুন্দর খেলা করছে। আমাকে মাছ ধরা শেখাবে?”
“ঠিক আছে, পরে না হয় মাছ ধরা শেখাব। এখন আমার সাথে চল, পুকুরের সামনে বসে থাকলে চলবে?”
সবুজ ধানের ক্ষেত, সরিষার ক্ষেত, কত গাছগাছালির সারি দেখে ছোট্ট বিট্টুর মন আনন্দে নেচে উঠল। বিট্টু, ঘোতনের সাথে সবকিছু মুগ্ধ হয়ে দেখছে। গ্রামের ছেলেরা একটা সবুজ ক্ষেতে ঘুড়ি, লাটাই নিয়ে দৌড়চ্ছে। খানিকবাদে আকাশ জুড়ে নানা রঙের ঘুড়ির বাহার। তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে। কোনও ঘুড়ি কেটে গেলেই ছেলেগুলোর ‘ভোকাট্টা’ চিৎকারে নাচতে নাচতে কি উল্লাস! সেই দেখে বিট্টুর এই ছেলেগুলোর সঙ্গী হতে খুব ইচ্ছা হল। সাথে সাথেই ঘোতনের কাছে বায়না করল,
“আমাকেও ওদের মত করে ঘুড়ি ওড়ানো শিখিয়ে দাও। তাও এক্ষুণি শেখাতে হবে”
“তুই কি বোকা? তোকে কিভাবে শেখাব আমি। আমি নিজেই ঘুড়ি ওড়াতে জানিনা। এসব উদ্ভট বায়না একদম করিস না বিট্টু”
“আমি জানিনা, আমি এক্ষুণি ঘুড়ি ওড়াব। নাহলে খুব চিৎকার করব”
বিট্টুর নাছোড়বান্দা মনোভবে ঘোতন খুব বিরক্ত বোধ করল, কিন্তু বিট্টুকে মোটেই কাছছাড়া করলে চলবে না। সেই হল আসল ট্রাম্পকার্ড। ওর কাছ থেকে মোবাইল নং পেলেই ঘোতন ওর কাজকর্ম আরম্ভ করবে। কাজেই বিট্টুকে খুশী করার জন্য ঘোতন কাছেই একটা দোকান থেকে ঘুড়ি, লাটাই কিনে এনে বিট্টুর হাতে ধরিয়ে দিল। বিট্টু আনন্দ সহকারে ঘুড়ি ওড়াবার জন্য উপস্থিত ছেলেদের দলে মিশে গেল। সে ঘুড়ি ওড়াতে জানেনা। পুনরায় ঘোতনের কাছে এসে আবদার করল,
“আমার সাথে ঘুড়ি ওড়াবে এস”
“তুই বড্ড জ্বালাতন করছিস। আবার আমাকে এসবের মধ্যে কেন জড়াচ্ছিস? আমি ঘুড়ি ওড়াতে পারব না”
“ওসব কথা শুনব না। তুমি ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যবস্থা করো। আমি ছেলেগুলোর সাথে কথা বলে আসছি”
ঘোতন মহা বিপদে পড়ল। বিট্টু, ছেলেগুলোর সাথে দৌড়তে লাগল। কেটে যাওয়া ঘুড়ির পেছন পেছন দৌড়তে লাগল দেখে ঘোতনও ওর পেছন পেছন দৌড়তে লাগল। ঘোতন ভয় পাচ্ছে, বিট্টু যদি পড়ে যায়,
“মহাপাজি তো ছেলেটা। যদি ছুটতে গিয়ে পড়ে যায়। চোট-আঘাত লাগলেই বিপদে পড়ে যাবে। ছেলেটার কোনও ক্ষতি হয়ে গেলে ওর বাবার কাছ থেকে টাকা হাতানো মুশকিল হয়ে যাবে”
বিট্টুর উদ্দেশ্যে ঘোতন বলল,
“বিট্টু ওদের পেছনে ছুটিস না। পড়ে গেলে মুশকিল হয়ে যাবে”
বিট্টুর পেছনে ছুটতে গিয়ে ঘোতন নিজেই পড়ে গেল। পড়ে গিয়েই সে বলল,
“ও মাগো, আমার হাড়গুলো ঝনঝনিয়ে উঠল। এই হতচ্ছাড়া বিট্টু, থাম বলছি”
“কেন ডিস্টার্ব করছ? আমি ঘুড়ি ওড়াব”
“অনেক ঘুড়ি উড়িয়েছিস … এবার চল”
ঘোতন, বিট্টুর হাত ধরে সেখান থেকে টেনে নিয়ে গেল…
--------------------------
বিট্টুর জন্য কি অপেক্ষা করছে? পড়ুন পরের ১২তম পর্বে…
0 Comments.