Sat 06 June 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ গল্পে মেরী খাতুন

maro news
হৈচৈ গল্পে মেরী খাতুন

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য

আল্লাহ বা ভগবান কি জাত জানিনা। আজ আমার গর্বের ভারত হিন্দু-মুসলিম, হিন্দু-মুসলিম বলে চিৎকার করে রক্তপাত ঘটাচ্ছে। আজও জগতের বিভিন্ন মন্দিরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ বসে আছেন, কিন্তু তাঁর দেখা পান না। সেই রুপ মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষও মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছেন,কিন্তু তাঁর দেখা পান না। এযুগে অচ্ছুৎ সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের স্কুলে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হয়। কলেজেও---উচ্চশিক্ষার আসরেও অবহেলিত ও লাঞ্ছিত হয়  পদে পদে। মুসলিম নারীদের হিজাবকেও অপমানিত ও লাঞ্ছিত করা হয়।হায় ভারত! একদিন তোমার দেশেই ঋষি উচ্চারণ করেছিলেন নাকি----সারা বিশ্ববাসী অমৃতের সন্তান? মানুষ জাতি-ধর্মনির্বিশেষে নাকি একই ঋষি মনুর অপত্য? তোমারই দেশের কবি নাকি বলেছিলেন,  "সবার উপরে মানুষ সত্য, স্রষ্টা আছে বা নাই।"----

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও আজও কি আমরা জাতপাতের লড়াই থামাতে পেরেছি। আজও চারিদিকে আগুন জ্বলছে, কত না রক্ত ঝরছে। 


  ভারতবর্ষের আদর্শ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। বিবিধের মাঝে মিলন ভারতবর্ষের লক্ষ্য হলেও আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে অন্ধ ধর্ম-বিশ্বাস। ভেদবুদ্ধি ছিন্ন ভিন্ন করছে ভারত আত্মাকে। দেশ একটি ভূখন্ড যার নির্দিষ্ট ভৌগলিক ও রাজনৈতিক সীমারেখা সার্বভৌম শক্তি দ্বারা সুরক্ষিত। নানা ভাষা,নানা মত, নানা পরিধানের মানুষ সেখানে বাস করে। সংগীতের আসরে যেমন নানা বাদ্যের ধ্বনি ধ্বনিত হলেও একটিই মধুর সুরমূর্ছনা শ্রুত হয়, কোনো একটিমাত্র বাজনার সুর প্রাধান্য পায় না। যেমন ফুলের মালা গাঁধা হলে সমস্ত ফুলের সমন্বয়ে মালার একক সৌন্দর্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তেমনি দেশের মধ্যে নানা বর্ণ, ধর্ম, ভাষার অস্তিত্ব থাকতেই পারে সেখানে কোনো বিচ্ছিন্ন একক শক্তির মূল্য নেই। কিন্তু উগ্র-জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের নামে যেভাবে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদের অশুভশক্তি দেশের কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করছে তা থেকেই জন্ম নিচ্ছে সন্ত্রাসবাদ। এ দেশ বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধন।

ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়----"যখন ঈশ্বরে ভক্তি এবং সর্বলোকে প্রীতি এক তখন বলা যাইতে পারে যে ঈশ্বরে ভক্তি ভিন্ন,  দেশপ্রীতি সর্বাপেক্ষা গুরতর ধর্ম্ম। 


  বৈদিকযুগ থেকে ভারতের মাটিতে সংহতি বিরাজমান। শুধু ব্রহ্মজ্ঞানেই নয়, ভারতবর্ষকে দেবনির্মিত দেশ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভারতের ঐক্যভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আমির খসরু, আবুল ফজল, জয়নুল আবেদিন, নজরুল ইসলাম প্রমুখের বাণীতে। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও চেতনায় প্রকাশিত হয়েছে ভারতের জাতীয় সংহতি। এবং এক জাতি এক প্রাণ-----এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ভারতবাসী তখন স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। 


স্বাধীনতার পর প্রথম দিকে সমস্যাগুলো ছিল রাজনৈতিক, আর আজ রাজনীতির সঙ্গে এসে মিলল ধর্ম, জাত-পাত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ইত্যাদি নানা বিষয়। রাজনীতি ও ধর্মীয় উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে রক্তের বন্যায় দেশ তাতে ভিজে যাচ্ছে। দৈনিক কত প্রাণ যে অকালে ঝরে যাচ্ছে, তা কল্পনাও করা যায় না। এমনকি একটি পরিবারের সবাইকে হত্যা করেও রক্ত-তৃষ্ণা মিটছে না। শধু ধর্মের জিগির তুলে ঘন্টায় ঘন্টায় কত নরহত্যা। ঠিক তখনই দেশজুড়ে প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় প্রতিটি বস্তুর আকাশ-ছোঁয়া দাম। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। বেকারত্বের সমস্যা মারাত্মক হয়ে উঠেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানির চেয়ে রপ্তানিতে মন্দ। রাজনৈতিক উন্মাদনা শিল্পসমৃদ্ধির পথে বড় অন্তরায়। এ দেশে এ সবই আজ দুষ্টব্রণের মতো অবস্থান করছে। বেকারত্ব যে-জন্য এখানকার দীর্ঘস্থানীয় সমস্যা। রাজনৈতিক নেতারা শ্রমিকদের Charter of Demand সম্বন্ধে অবহিত করেন কিন্তু Charter of Duty সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করেন না। শিল্পক্ষেত্রে তাই কাজ যত হয়,তার চেয়ে বেশি হয় শ্লোগান----"আমাদের দাবি মানতে হবে।" তারপর শিল্পসংস্থা বন্ধ। নেতারা উধাও। শ্রমিকরা মরে অনাহারে। 


 কিন্তু ভারতে বর্তমান শাসনতান্ত্রিক বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের ধর্ম ভাবনাকে, সেই ধর্মাশ্রয়ীদের জামাই আদরে রাখা হচ্ছে। বলা হচ্ছে,সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতেই বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়কে তোষণ করা। সংখ্যা লঘুর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সংখ্যাগুরুর স্বার্থ ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। কালক্রমে ভারতে এই সংখ্যালঘুরাই সংখ্যাগুরুকে কোণঠাসা করছে। ঘরে-বাইরে বিপদকে ঘনিয়ে তুলছে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে রামজন্মভূমি-বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত সমস্যা, যা ভারতের রাজনৈতিক আকাশকে করে তুলছে মেঘাবৃত, ব্যাক্তিজীবনকে করে তুলছে উত্তাল, সমাজজীবনকে বিচ্ছিন্নতাবাদের পথে দিচ্ছে ঠেলে। এসবের পেছনে আছে অশিক্ষা, নিরক্ষর,সংকীর্ণ বুদ্ধি। কবীর, নানক, রামকৃষ্ণ, মুহম্মদের বাণী আজ বিস্মৃত। ঋষির বাণীও আজ অবহেলিত। আজ ভাবতে বিস্ময় জাগে,এই ভারতই কি একদা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে একই 'অমৃতের সন্তান' বলে ভেবেছিল? এই ভারতের আধুনিক উদারমনস্ক সন্ন্যাসীই কি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বমানবকে আহ্বান করেছিল---"My dear sister and brother" বলে? 


ধর্মের জিগির তুলে মৌলবাদীদের সংকীর্ণ মানসিকতা দেশ জুড়ে দক্ষযজ্ঞ শুরু করেছে। সভ্যতার তীর্থভূমি আজ নরবলিতে রক্তাক্ত। দেশের সর্বত্র আজ পরমতসহিষ্ণুতার অভাব। হিন্দু-হিন্দু করে চিৎকার করে কোনও ধর্মকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। ধর্ম মানে সিয়া নয়, সুন্নি নয়,ব্রাহ্মণ নয়, শূদ্র নয়, রোমান ক্যাথলিক বা প্রোটেস্টান নয়,ধর্মকে ধর্মের জন্যই আচরণ করতে হবে, যা স্মরণাতীত কাল থেকে ভারতের ঋষিরা আমাদের শিখিয়েছিলেন। ধর্ম যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত অহংকার এবং স্বার্থবাসনার শত্রু, ধর্ম সেখানে মানুষে মানুষে প্রীতিবন্ধনের শ্রেষ্ঠ যোগসূত্র, ধর্ম সেখানে সত্য ও ন্যায়ের আদর্শ। এই মহৎ মানবিক সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের দীক্ষাই দিয়ে গেছেন বুদ্ধ,খ্রিষ্ট,চৈতন্য,মহম্মদ প্রভৃতি সাধক ও মহাপুরুষেরা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য সর্বত্রই স্বার্থ সন্ধানী পুরোহিততন্ত্র ধর্মকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে কুসংস্কারের আবরণে। 


ভারতের মানুষকে বর্তমানে যে শিক্ষা দেওয়া চলছে, সে শিক্ষা মূলত ছিন্নমস্তা শিক্ষা। এতে কিন্তু জাতির অপমৃত্যু অনিবার্য। মনে হয় এ দেশে গোষ্ঠী-ধর্ম-চালিত বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অবসান ঘটালে সমস্যার সমাধান অনেকটা সহজ হবে। বিশেষ কোনও ধর্মমতাদর্শ শিক্ষা না দিয়ে সর্বধর্ম সমন্বিত 

সকল ধর্মগুরুর জীবনী সম্বলিত একটি বিশেষ নিরপেক্ষ পাঠক্রম সারা দেশে সব ছাত্র-ছাত্রীদের সমানভাবে বাধ্যতামূলক পাঠ্য বিষয় হিসেবে পড়ানোর ব্যবস্থা করা দরকার। এর ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা কিশোর বয়স থেকেই জানতে পারবে সব ধর্মের সব ধর্মগুরুদের ও তাঁদের দেওয়া শিক্ষার কথা। মন থেকে সংস্কার যাবে মুছে। বড়ো হবার পর সে ধারনা করতে পারবে সর্ব ধর্মই সেই একই কেন্দ্রের দিকে চলছে। সব ধর্মের মূল নীতিগুলিই এক। তখন মানুষে মানুষে ধর্মের নির্মোক ত্যাগ করে এক অনুভূতির পতাকাতলে সম্মিলিত হতে পারবে। তাই আজকের দাঙ্গা-বিধ্বস্ত ভারতবর্ষের মানুষের কাছে মহামানবের বাণী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register