Tue 26 May 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ গল্পে গৌতম সমাজদার

maro news
হৈচৈ গল্পে গৌতম সমাজদার

ডিম

হুগলী জেলার পোলবার একটি আদিবাসী গ্রাম। প্রান্তিক কৃষকদের বাস। এরা প্রকৃতপক্ষে নেই রাজ্যের বাসিন্দা। জল বলতে অনেক দূরের নলকূপের জল। বেশীরভাগ সময়েই তা অকেজো থাকে। ঘর বলে কিছু নেই। পাতার ছাউনি দেওয়া ঝুপড়ি। দুইবেলা খাবার জোটে না, দারিদ্র্য জমাট বাঁধা। শিশুদের জন্য নেই সেরকম কোন বিদ্যালয়। এরা বাবা-মাকে কৃষিকাজসহ বিভিন্ন কাজে মূলতঃ সাহায্য করে। কিন্তু সম্প্রতি একটি বাঁধানো দাওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা হয়েছে, যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়। ইদানিং সেখানে গ্রামের লোকেরাই সন্তানদের স্বার্থে টিন দিয়ে ঘিরে গোটা ছয়েক ঘর তৈরী করেছে। শিক্ষকরা অনেক কষ্টে এই দরিদ্র গ্রামে ছাত্রছাত্রীদের জন্য মিড ডে মিলের ব্যবস্থা করেছে এই ভেবে যে অন্ততঃ শিশুগুলো দুপুরে পেট ভরে খেতে পারবে।আর শিশুরাও খাবারের জন্য রোজ স্কুলে আসবে। মা-বাবারাও নিশ্চিন্ত হবে, সন্তানরা অন্ততঃ খাবারটুকু তো পাবে। একটু পুষ্টিকর খাবার জুটবে তাদের কপালে।


শ্রেণীকক্ষ -- সব মিলে চতুর্থ শ্রেণীতে ৩৫ জন ছাত্রছাত্রী। ক্লাশ চলছে। দীপকবাবু গ্রামের আনাচে কানাচে ঘুরে বাবা-মায়েদের বুঝিয়ে এই ছাত্রছাত্রীদের স্কুলমুখী করতে সমর্থ হয়েছেন। ওদের মুখগুলো দেখলে আনন্দে ভরে ওঠে শিক্ষক দীপকবাবুর মন। এদের স্বাস্থ্য ভাল না হলেও চোখ দুটো উজ্জ্বল। সবসময় এরা আনন্দমুখর। ক্লাশ চলাকালীন দ্বিতীয় বেঞ্চে ক্লাশের সবচেয়ে ভাল ছেলেটিকে বেশ কয়েকদিন ধরে কেমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে। ওকে ওইরকম দেখলে মনে কষ্ট হয়। তাই বিপুলকে জিজ্ঞেস করে, "কি হয়েছে?" উত্তরে বিপুল বলে, "কিছু না।"

জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরের তক্তাপোষে লেপটে আছে বিপুলের মা। শরীরে কিছু নেই। হাড়গোড়গুলো শুধু আছে। হাঁপাচ্ছে, বুকটা হাপড়ের মতো ওঠানামা করছে। ঘরটা বাসের অযোগ্য। স্যাঁতসেঁতে, আবার দমবন্ধ অবস্থা। জানালা বলে কিছু নেই। একা ওর মা শুয়ে আছে। রান্নাঘর, বাথরুম বলে কিছু নেই। সামনে একটু দাওয়া।পুরোনো কাপড় দিয়ে ওপরটা ঢাকা।

বিপুলের বন্ধুরা কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছে , বিপুল দুপুরে খাচ্ছে কিন্তু পাতের ডিমটা পকেটে ভরে নিচ্ছে। একই জিনিস বেশ কয়েকদিন ধরে দেখার পর ওরা দীপক স্যারকে জানায়। দীপক স্যারও নজর রাখে। জানতে চাইলে বলে, "না স্যার, আমি তো এখানেই খাই।" দীপক স্যার বুঝল, ও মিথ্যে বলছে। তাই ওকে শাস্তি দেবার তোড়জোড় শুরু করল। কিন্তু চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রধান শিক্ষক সমীরবাবুর সাথে কথা বলেন। এই সমীর স্যার আবার বিপুলের ওপর অত্যন্ত স্নেহশীল। কারণ স্কুলের স্পোর্টসে সব বিভাগেই বিপুল প্রথম পুরস্কার ছিনিয়ে নেয়। ছাত্রদের ফুটবল খেলাতেও ও স্কুলের জন্য পুরস্কার নিয়ে আসে। পরদিন দুই শিক্ষক বিপুলকে মিড ডে মিল খাবার খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর পিছু নেয়। অতি সন্তর্পনে গিয়ে ওর ঘরে পৌঁছায়।গিয়ে অবাক হয়ে দেখে, বিপুল ডিমটা চারভাগে ভাগ করে ধীরে ধীরে মাকে খাওয়াচ্ছে। স্যারদের দেখে বিপুল লজ্জায় পড়ে যায়। বলে, "স্যার, আসলে মাকে তো কোন পুষ্টিকর খাবার দিতে পারি না। আমি তো সুস্থ। তাই আমি না খেয়ে মাকে খেতে দিই।" দীপকবাবু আর সমীরবাবু বলল, "তুই আর চিন্তা করিস না। এখন তোর মায়ের ভাল চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে। খাবারের দায়িত্বও আমাদের। তোর মা ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে। মন খারাপ করিস না।"

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register