Thu 03 September 2026
Cluster Coding Blog

কর্ণফুলির গল্প বলায় প্রকাশ চন্দ্র রায়

maro news
কর্ণফুলির গল্প বলায় প্রকাশ চন্দ্র রায়

ভালবাসার জল

পূজার ছুটিতে প্রাণিসম্পদ অফিসের কম্পাউন্ডার যতীনদা বলল, -চলো দাদা, আমার গ্রামের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে আসি। ওর বাড়ী গাইবান্ধা জেলার সাদুল্ল্যাপুরে। এককথায় রাজী হয়ে গেলাম। আমিতো ঝাড়া হাত-পা এক প্রাণী। মা একাই সংসার দেখা-শুনা করেন, আমি ডিপ্লোমা পাশ করে সবেমাত্র হোমিওপ্যাথিক চেম্বার খুলে বসেছি থানা শহরে। কীসের ডাক্তারী করা কীসের কী! সারাদিন শুধু টো টো করে ঘুরে বেড়ানো আর এর ওর সাথে আড্ডাবাজীতে মেতে থাকাই আমার কাজ। ছোট্ট থানা শহরের প্রায় সকল অফিসের কর্মকর্তা, কর্মচারীগণ আমার বন্ধু। তাছাড়া এলাকার সাহিত্য, সঙ্গীত বিষয়ক সংগঠন গুলোর সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে চাঁদা আদায় করতে হয় প্রায় প্রতিটি অফিস থেকে বিধায় আমাকে চিনতে আর বেশী দেরী হয় না তাঁদের। পরদিন বিকালে পৌঁছলাম যতীনদার বাড়ীতে। আমার চেহারা-সুরত আর ঠাট-বাট দেখে তো পাড়ার মহিলা পুরুষের ভীড় জমে গেল ওদের আঙ্গিনায়। ২৩ বছরের টগবগে যুবক আমি, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, চোস্ত পাজামার উপর কলারওয়ালা লিনেনের পাঞ্জাবী-গলায় বুকে নকশা কাটা তার। হাতে ওমেক্স ঘড়ি, দু'সেট গগলস- একসেট সানগ্লাস, অন্য সেট হোয়াইট। কাঁধে ঝুলানো ইয়া বড় ইয়াসিকা ক্যামেরা, পায়ে চেইনবুট। আরও আছে ট্র্যাভেল ব্যাগে ফটো এ্যালবাম, তিনসেট শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি-লুঙ্গি গামছা,নেইল কাটার আর প্রসাধন সামগ্রী। মানিব্যাগে হাজার তিনেক টাকা। জমায়েত লোকজনের মধ্যে যুবতী মেয়েরা আড়চোখে তাকাতে তাকাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, তা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। যা হোক-রাতে পোষা হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় যতীনদার মায়ের আকুলি-বিকুলি অনুরোধ- -বাবা, আমি মুখ্যসুখ্য মানুষ, রান্না-বান্না ভালো জানি না, মনে কিছু নিও না বাপ। খাওয়ার পরে খোল, করতাল আর হারমোনিয়াম সহযোগে কীর্তনের আসরেও মাত করে দিলাম নানা ঢঙের কীর্তন গেয়ে গেয়ে। পরদিন পূজোর নারকেলের নাড়ু, দই চিড়া, গুড় মুড়ি, আরো হরেক রকমের নাস্তা সেরে চললাম যতীনদার মামার বাড়ী, মাইল তিনেক দূরে, কামার পাড়া স্টেশন এর কাছে। আকাশী-নীল রঙের ক্যারোলিন শার্ট, অফ হোয়াইট গ্যাবাডিনের প্যান্ট আর চকলেট কালারের চেইন বুট পড়েছি আমি, অ্যাশ কালারের সানগ্লাসটা মাথায় গোঁজা। দুজনের বাহন একটা ইন্ডিয়ান হিরো বাই-সাইকেল। যতীনদা চালক আর আমি ক্যারিয়ারে হোন্ডার যাত্রীর মত দু'দিকে দু'পা দিয়ে মাস্তানী স্টাইলে বসা যাত্রী। যেতে যেতে যতীনদা ফিসফিস করে বলল-, -দাদা, আমার দূর-সম্পর্কের মামা'র একটিই মাত্র মেয়ে, নাম চম্পা। বেশকিছু সম্পত্তির মালিক হবে সে মামা মারা গেলে। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই, সেজন্যই তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি ভাই, ভালমত দেখেশুনে তুমি কিন্ত রায় দিবে। হাসতে হাসতে বললাম, -তাহলে আমার জন্যেও ওখানে একটা ম্যানেজ করে দাও না কেন! দুজনে এক গ্রামেই শুভকাজটা সেরে ফেলি। যতীনদা মজা পেয়ে বলল, -আছে-আছে, তোমার জন্য টপ সুন্দরী একটা মেয়ে আছে, নাম সৌদা-সৌদামিনী। মামার বাড়ীর পাশের বাড়ীতেই, কিন্তু ওরা খুবই গরীব, গাভীর দুধ বিক্রি করে সংসার চলে...কিচ্ছু দিতে পারবে না ওরা। আমি উৎসাহী হয়ে বললাম, -আরে ধ্যেৎ, কিচ্ছু লাগবে না, দরকার পড়লে আমিই ওদের যথেষ্ট সাহায্য করতে পারবো। ওর মামার বাড়ীতে পৌঁছার সাথে সাথে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো, পাড়ার ছেলেমেয়েরা এসে ঘিরে ধরলো আমাদেরকে। দর্শকদের মধ্যে সৌদামিনীও ছিল, চম্পাই পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরে সেই আমাদের ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে ঘরে রাখলো। গ্রাম্য সুন্দরী,বেশ চটুল স্বভাবের মেয়ে, ক্লাশ নাইনে পড়ে মাত্র। চঞ্চল বিধায় সেই প্রথমে কথা বলল, -দাদা আপনারা কী খুব ধনী মানুষ? বললাম -নাতো, কেন? -আপনাকে দেখে তাই মনে হচ্ছে তো! চা-নাস্তার পরে যতীনদা বলল, -যা সৌদা, দাদাকে তোদের বাড়ীতে নিয়ে যা। সঙ্গে সঙ্গেই সৌদামিনী আমার হাত ধরে টানতে লাগল। গেলাম ওদের বাড়ীতে। সৌদার ঘরের বেড়া নানাপ্রকার অঙ্কনচিত্রে ভর্তি। বললাম -এসব কী! ওর মা বললেন -সৌদামিনী পড়াশুনার চেয়ে ছবি আঁকতেই সময় কাটায় বেশী, এসকল তারই নিদর্শন। আরও বললেন, -তাই ওর বিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত চলছে, কালকে লোকজন আসবে ওকে দেখতে। কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। বললাম, -মাত্র তো ক্লাশ নাইনে পড়ছে। পরদিন বিকেলে বাড়ী ফেরার জন্য সাজগোজ করছি। রাতে চম্পাদের বাড়ীতেই ছিলাম যতীনদাসহ। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন সৌদামিনীর মা, বললেন, -বাবা- তোমাকে একটু আমাদের বাড়ীতে আসতে হবে। কী ব্যাপার কাকীমা! কাকীমা বললেন, -গিয়ে দ্যাখো সৌদামিনী কেমন পাগলামী শুরু করেছে। চটজলদি ছুটে গেলাম ওদের বাড়ীতে, গিয়ে দেখি- সৌদাকে দেখতে ছেলে নিজেই এসেছে কয়েকজন বন্ধুসহ, বাইরে ঘরে তারা চা-নাস্তা করছে আর সৌদামিনী তার ঘরে কপাট বন্ধ করে হু-হু করে কান্না জুড়ে দিয়েছে, কারো কথাতেই সে আর কপাট খুলছে না। কপাটে ধাক্কা মারতে মারতে আমি ডাকলাম, -সৌদা, কপাট খোলো। কান্না থামিয়ে সে কপাট খুললো বটে কিন্ত আমি ভিতরে প্রবেশ করামাত্রই আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো- -আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকেও বিয়ে করবো না; না-না-না। আমি হতভম্ব হয়ে পিছন ফিরে দেখি ওর বাবা মা'সহ পাড়ার বেশকিছু কৌতুহলী মহিলা ও বাচ্চারা জটলা করে আমাদের দুজনের কান্ডকীর্তি দেখছে আর সৌদামিনীর মা পরণের শাড়ীর আঁচল দিয়ে তার নিজের দু'চোখের জল মুছছেন। বিশ বছর পরে বেড়াতে গেলাম লালমণির'হাটে। আমার ওয়াইফ সেখানে একটা এনজিও'তে চাকুরীরত। বিকালে সে বলল, -চলো তো পাশের গ্রামে যাই, কয়েকজনের কাছে কিস্তির টাকা তুলতে হবে। গেলাম ওর সাথে ওই গ্রামে, আমাদের ছেলেটাও সাথে গেল। ছেলে গোল্ডেন ফাইভ পেয়ে কেবল এস,এস,সি পাশ করেছে। গ্রামের প্রথম বাড়ীটাতে ঢুকতেই খুব সুন্দরী এক মহিলা আমাদেরকে বসতে দিয়ে, বিস্ফোরিত চোখে আমাকে দেখতে লাগলো! ব্যাপারটা বেশ দৃষ্টিকটু হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আমি অধঃমুখে বসে থাকলাম। পরক্ষণেই মহিলাটি প্রায় ছুটে গিয়ে তাদের ঘরে ঢুকলো এবং কিছুক্ষণ পরেই বেরিয়ে এলো, হাতে তার পুরনো একখানা বি,টু সাইজের সাদাকালো লেমিনেটেড ফটো। ফটোটা আমার হাতে দিয়ে বললো, -দেখো তো দাদা,চিনতে পারো কি-না! আমার ছেলে ছবিটা কেড়ে নিয়ে দেখে দেখে চিনতে না পেরে, ওর মায়ের হাতে দিলো, ছবিটা দেখেই ওর মা বলে উঠলো, - এটাতো তোমার বাবা'র ছবি রে বাবা! আমি চমকে উঠলাম! -মানে! মানেটা মহিলাটিই ভেঙ্গে দিল-আমাদের ছেলেটিকে কাছে টেনে নিয়েই বলল, -বাপধন, আমিই তোমার প্রথম মা। ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত ছেলে কিচ্ছু বুঝলো না, আমিও না! ছেলেকে আদর করতে করতে মহিলা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, -দাদা-আমি সেই সৌদামিনী, বিশ বছর আগে যাকে এই ছবিটা দিয়েছিলে। আমি এখনো তোমাকেই ভালবাসি-ভালবাসি। চমকে উঠে চোখ তুলে দেখি-আবেগে আপ্লুত সৌদামিনীর দু'চোখের কোণে টলমল করছে ভালবাসার জল।
Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register