- 16
- 0
শেষ কামরার সাক্ষী
রাত বারোটা সতেরো। হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে অন্ধকারের বুক চিরে ছুটতে শুরু করল শেষ ট্রেন। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি; কাচের গায়ে জলের রেখাগুলো একে অন্যকে ছাড়িয়ে নামছে, ভেতরে শুধু চাকার একটানা, নিঃসঙ্গ ধাতব গান।
অদ্রিজ জানালার ধারে একা বসে। তিন বছর পর কলকাতায় ফিরছে সে — একটা অচেনা নম্বর থেকে আসা দুটো বাক্যের জন্য।
"ঈশানী মারা গেছে। শেষবার দেখতে চাইলে, আজ রাতের শেষ ট্রেনে ওঠো।"
ঈশানী — এই একটা নামের ভেতর জমা আছে তিন বছরের না-বলা কথা, না-কাঁদা কান্না। মেয়েটি হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছিল একদিন, আর তারপর শুধু গুজব ভেসে বেড়িয়েছে — বিদেশ, বিয়ে, মৃত্যু। কোনোটাই প্রমাণ হয়নি। আজও অদ্রিজ জানে না, সত্যি কোনটা।
কামরার দরজা খুলে ভেতরে এল এক নারী। কালো শাড়ি, ভেজা চুল কপালে লেপ্টে, মুখের অর্ধেক ছাতার আড়ালে। এসে বসল ঠিক সামনের সিটে।
"আপনি অদ্রিজ?"
চমকে তাকাল অদ্রিজ। মেয়েটির চোখদুটো দেখে বুকের ভেতরটা এক লহমায় হিম হয়ে গেল — অবিকল ঈশানীর চোখ।
"আপনি কে?"
উত্তর না দিয়ে একটা পুরনো, ভেজায় ভারী খাম এগিয়ে দিল সে। "এটা আপনাকে দিতে বলেছিল।"
"কে বলেছে?"
"ঈশানী।" মৃদু স্বর।
খাম খুলল অদ্রিজ। ভেতরে একফালি কাগজ, দুটো লাইন —
"আমার মৃত্যুর খবর যদি পাও, কাউকে বিশ্বাস কোরো না। এমনকি আমাকেও নয়।"
মুখ তুলতেই দেখল সামনের সিট খালি। মেয়েটি নেই। শুধু কাচে বৃষ্টির দাগ, আর কামরাজুড়ে একটা নিঃশব্দ চাপ, যেন কেউ এইমাত্র নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে।
পরদিন অদ্রিজ গেল ঈশানীর পুরনো বাড়িতে। দরজায় মরচে-ধরা তালা। পাশের বাড়ির বৃদ্ধ বললেন, "ঈশানী তো তিন বছর আগেই মারা গেছে, বাবা। নৌকাডুবিতে। দেহ পাওয়া যায়নি।"
"পুলিশে খবর হয়েছিল?"
"হয়েছিল নিশ্চয়ই। তবে ব্যাপারটা কেমন করে যেন চাপা পড়ে গেল।" বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না, চোখ সরিয়ে নিলেন — যেন কিছু একটা জানেন, বলতে ভয় পাচ্ছেন।
সে রাতে ঘরে ফিরে অদ্রিজ খুলল তার পুরনো ফাইল — তিন বছর আগের অসমাপ্ত অনুসন্ধান-রিপোর্ট। শহরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী রুদ্রনীল সেনের কালো টাকা, জমি-দখলের বেআইনি চুক্তি, প্রশাসনের ভেতরের মদত — সব প্রমাণ জমা ছিল সেখানে। প্রকাশের ঠিক আগের রাতে ঈশানী বলেছিল, "অদ্রিজ, তুমি জানো না তুমি কী করতে যাচ্ছ।"
পরদিনই চাকরি গেল তার। ঈশানী নিখোঁজ হল। রিপোর্টও হারিয়ে গিয়েছিল অফিসের লকার থেকে — আর আজ, তিন বছর পর, সেটা আবার তার টেবিলে, কেউ যেন ইচ্ছে করেই রেখে গেছে।
শেষ পাতায় লাল কালিতে দাগ দেওয়া একটা নাম — সায়ন মুখার্জী। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, যে গত তিন বছরে একবারও ঈশানীর প্রসঙ্গ তোলেনি।
ফোন বাজল। অচেনা নম্বর।
"অদ্রিজ, আমাকে খুঁজতে যেয়ো না।" ঈশানীর কণ্ঠ, ক্ষীণ, ভাঙা।
"ঈশানী? তুমি বেঁচে আছ?"
"এই মুহূর্তে।"
লাইন কেটে গেল।
রাত দুটোয় দরজার নিচ দিয়ে একটা পেনড্রাইভ ঢুকল ঘরে। খুলতেই ভেসে উঠল ভিডিও — স্ক্রিনে ঈশানী, চোখে আতঙ্ক, পেছনে কারও ছায়া নড়ে ওঠে। নিচে লেখা: "তোমার রিপোর্টের আসল বিষয় রুদ্রনীল সেন নয়। রুদ্রনীলের টাকা যেত আরও একজনের কাছে। আর সেই মানুষটা তোমার খুব কাছের।"
ভিডিও শেষ হয়ে গেল। ফোন করল সায়নকে, বন্ধ পেল। ঠিক তখনই দরজায় তিনটে টোকা। খুলে দেখল কেউ নেই — শুধু মেঝেয় পড়ে একটা পুরনো ছবি, অদ্রিজ আর ঈশানীর। পেছনে লেখা: "তুমি যাকে বন্ধু ভাবো, সেই তোমার শত্রু।"
পরদিন ভোরে গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে অদ্রিজ দেখল, ঈশানী এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। সত্যিকারের ঈশানী, রক্তমাংসের। কতক্ষণ কোনো কথাই বেরোল না তার মুখ দিয়ে।
"তুমি চলে গিয়েছিলে কেন?" শেষে জিজ্ঞেস করল।
"তোমাকে বাঁচাতে।" চোখ নামিয়ে বলল ঈশানী।
"সায়ন — ও-ই তো এর পেছনে?"
মাথা নাড়ল ঈশানী। "রুদ্রনীলের আসল খেলাটা চালাত সায়নই। তোমার রিপোর্ট ওর বিরুদ্ধেই গিয়েছিল।"
"তুমি জানলে কী করে, এত ভেতরের কথা?"
ঈশানী চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর শুধু বলল, "কারণ ও আমাকে বিশ্বাস করত। আর আমি সেই বিশ্বাসটাকেই অস্ত্র করেছিলাম — তোমার জন্য।"
দূরে সাইরেন বেজে উঠল। "সব প্রমাণ পুলিশের হাতে চলে যাচ্ছে। এবার তুমি নিরাপদ।"
"আর তুমি?"
মৃদু হাসল ঈশানী। "আমার নিরাপত্তা নিয়ে ভেবো না।" তারপর সে হেঁটে চলে গেল, ঘাটের কুয়াশায় মিলিয়ে, যেন কখনও ছিলই না।
দু'মাস পর সায়ন গ্রেপ্তার হয়েছে, রুদ্রনীল সেনও। অদ্রিজের জীবন কিছুটা স্বাভাবিকের দিকে ফিরছে। কিন্তু ঈশানী নিখোঁজ। একদিন একটা চিঠি এল, খামের গায়ে লেখা — "অদ্রিজের জন্য।" ভেতরে চারটে লাইন —
সব সত্যি বলিনি।
সায়নকে যে ভাবে চিনি, সেটাও পুরোপুরি সত্যি নয়।
শেষ ট্রেনের সাত নম্বর কামরায় এসো, যদি সত্যিই সবটা জানতে চাও।
— ঈশানী
জানত, যাওয়া ঠিক হবে না। তবু গেল।
রাত বারোটা সতেরোয় ট্রেন ছাড়ল। সাত নম্বর কামরা প্রায় ফাঁকা — শুধু জানালার পাশে বসে এক নারী। কালো শাড়ি, ভেজা চুল। অদ্রিজ ধীরে এগিয়ে গেল। মেয়েটি মুখ তুলল।
ঈশানী। মৃদু হেসে বলল, "তুমি এসেছ।"
অদ্রিজ বসল, প্রায় রুদ্ধশ্বাসে। "শেষ সত্যিটা বলো।"
ঈশানী তার হাত ধরল। "সায়ন আমার প্রেমিক ছিল না, স্বামীও নয়। আমার ভাই — মায়ের দিক থেকে, যে সম্পর্কের কথা আমাদের পরিবার কখনও প্রকাশ্যে বলেনি। আমাকে পাঠানো হয়েছিল তোমার কাছাকাছি — তোমার রিপোর্টের প্রমাণ সরিয়ে ফেলতে। কিন্তু সত্যিটা জানার পর, নিজের রক্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছিল আমাকে। সেই লজ্জা, সেই ভয় — এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম নিজের ভেতর।"
অদ্রিজের চোখে জল জমল। "তাহলে তুমি এখনও আমাকে ভালোবাসো?"
সরাসরি উত্তর দিল না ঈশানী। শুধু বলল, "ভালোবাসি বলেই তো তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছি — এমনকি নিজের ভাইকে ধ্বংস করেও।"
ট্রেন ঢুকে গেল একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গে। এক মুহূর্তের জন্য নিভে গেল সব আলো। আলো ফিরতেই অদ্রিজ দেখল, সামনের সিট খালি। ঈশানী নেই। শুধু তার হাতে ধরা একটা শেষ চিঠি।
খুলল। ভেতরে দুটো লাইন —
"আমাকে আর খুঁজো না। কারণ তুমি যাকে ঈশানী বলে ভালোবেসেছ, সে তিন বছর আগেই হারিয়ে গেছে — আর যে ফিরে এসেছিল, সে শুধু তার ছায়া, তোমাকে বাঁচানোর জন্য ফিরে আসা এক ছায়া।"
ট্রেন তখনও ছুটছে অন্ধকার চিরে। অদ্রিজ প্রথমবার বুঝল — তিন বছর ধরে যে সত্যিটা সে খুঁজে বেড়িয়েছে, সেটা হয়তো কখনওই পুরোপুরি ধরা দেবে না। কিন্তু জানালার কাচে লেগে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর মতোই, একটা কথা স্থির হয়ে রইল তার বুকে — ভালোবাসাটা মিথ্যে ছিল না। সেটা আজও বেঁচে আছে, ছায়ার মতো, তবু বেঁচে আছে।
0 Comments.