- 2
- 0
প্রযুক্তির সমাজ, সমাজের প্রযুক্তি
উন্নত প্রযুক্তি সব সময় স্বাগত কিন্তু সেই প্রযুক্তি যখন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে কিংবা ভুল মানুষের হাতে পড়ে তখন তা সর্বনাশের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে এমনই এক ক্ষমতার প্রদর্শন করতে গিয়ে বিশ্বকে কলঙ্কিত করেছিল পরমাণু বোমা।
সময় এগিয়ে গেছে আমরা উন্নত প্রযুক্তির হাত ধরে চাঁদে জমি কেনার মত জায়গায় দাঁড়িয়েছি।
মুহূর্তের মধ্যে আমরা বিশ্বের যে কোন জায়গায় যোগাযোগ করে নিতে পারছি। ইন্টারনেট আমাদের বাড়ির মধ্যে পৌঁছে দিচ্ছে নানাবিদ সুযোগ-সুবিধা।
পরবর্তীতে AI এসেছে, যা মুহূর্তের মধ্যে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারছে। কিন্তু এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)আমাদের যে সংশয় এনে দিচ্ছে তা খুব বিপজ্জনক।
বিশেষত সাহিত্যচর্চায় খুব আশঙ্কার বিষয় হয়ে উঠেছে AI . বিষয় বলে দিলে AI লিখে দিচ্ছে কবিতা, গল্প , এমনকি উপন্যাসও । এক্ষেত্রে সম্পাদক এবং পাঠক বিড়ম্বনায় পড়ছেন । তবে কি মৌলিক কিছু থাকবে না ? কিংবা কোনটি মৌলিক আর কোনটি AI দ্বারা সৃষ্ট কিভাবে বুঝবে পাঠক ? এই বিপর্যয় থেকে মুক্তির কি আদৌ কোন পথ আছে ?
সম্প্রতি একজন লেখিকা ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন এ বছর শারদীয়া সংখ্যায় তাঁর লেখালেখি। সেখানে দেখা গেল তিনি ন'টি উপন্যাস লিখেছেন। গল্প কবিতা এবং উপন্যাসিকা লিখেছেন তার সংখ্যাও কম নয়। এই পোষ্টের পরিপ্রেক্ষিতে এক বিশিষ্ট কবি লিখলেন কিভাবে সম্ভব? এও বললেন যে একবার নোবেল জয়ী সাহিত্যিক কি বলেছিলেন । এরপর প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে কেউ কেউ লেখিকার পক্ষে এবং কেউ কেউ বিশিষ্ট কবির পক্ষে মতামত বিনিময় করলেন। ব্যাপারটা তা নয়, ব্যাপারটার মধ্যে মৌলিকত্ব এবং সময়ের সংকুলান নিয়ে প্রশ্ন উঠল। আদৌ কি এটা সম্ভব ?
একটি উপন্যাস লিখতে কত সময় লাগে জিজ্ঞাসা করলে বেশিরভাগ সাহিত্যিকরা জানালেন, যদি কোন একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর গবেষণামূলক উপন্যাস লিখতে হয় তবে ন্যূনতম সময় লাগে দু'বছর। তাহলে এক বছরে শারদীয়ায় কিভাবে কেউ ন'টি উপন্যাস বড়গল্প ছোটগল্প কবিতা এবং উপন্যাসিকা মিলে ৫০ টির মতো লেখা লিখতে পারেন ?
কেউ কেউ আবার বললেন বিতর্কে না গিয়ে আপনি চেষ্টা করুন অর্থাৎ সঠিক মূল্যায়ন কিংবা সঠিক উত্তর কারো কাছে নেই । এটাই ধরে নিলাম।
সবচেয়ে বড় সংকটের বিষয় হল, বর্তমান সময়ে। পাঠক কোথায়?
এই শতাব্দীর জাতক-জাতিকারা বাংলা সাহিত্য পড়ছে কিনা সেটি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন ! এখনো আমাদের পাঠক খুলতে গেলে প্রবীণদের কাছে ছুটে যেতে হয়। কিংবা কোন আগ্রহী লেখক ।
এই সংশয়ের জায়গায় দাঁড়িয়েও এই বছর যে হারে শারদীয় সংখ্যা প্রকাশ হচ্ছে। তা অবাক করার মত। অর্থাৎ কোন ঋণাত্মক পরিস্থিতিকে মান্যতা দিতে কখনোই রাজি নয় বাংলার সাহিত্য জগত।
বিশেষত সম্পাদকরা তাদের প্রচেষ্টা বছরের পর বছর চালিয়ে যাচ্ছেন শুধুমাত্র পাঠকের অপেক্ষায়।
একদিন শিল্পাঞ্চলের এর জনপ্রিয় লেখক কে জিজ্ঞাসা করা হল আপনি এ বছর কতগুলি পুজো সংখ্যায় লিখেছেন? তিনি গৌরবের সাথে জানালেন প্রায় ৪০ টি হবে। ইতিমধ্যে চার-পাঁচটি পত্রিকা হাতে পেয়েছি। জানতে চাইলাম যেগুলি পেয়েছেন সেগুলি কি পড়া হয়েছে? বা চল্লিশটা পত্রিকা হাতে পেলে সবগুলি কি পড়তে পারবেন বা পড়েন?
উনি বললেন, সব পড়া সম্ভব হয় না। কিছু কিছু বাছাই করে পড়ি এবং এক্ষেত্রে অবশ্যই পরিচিত লেখকদের লেখা পড়ার চেষ্টা করি। একজন লেখকের এমন উত্তরে আমি অবাক হয়ে যাই।
তিনি লিখতে পারেন ৪০ টি পত্রিকায় এবং তিনি আশা করেন তার লেখা সবাই পড়বে অথচ তিনি সবার লেখা পড়বেন না। এখানে আমার গাণিতিক ভুল হলেও সাহিত্য কিন্তু পিছিয়ে গেল , তাই নয় কি ?
তিনি এও সগর্বে জানালেন, যে পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হয় না সে পত্রিকা তিনি কিনে পড়েন না। কিংবা যে সকল সম্পাদক প্রি- বুকিং এর কথা বলেন সেখানেও তিনি নেই।
জনৈক এক প্রবীণ সাহিত্যিক জানালেন, দুর্গাপুরের সব পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয় না , তবে তিনি চেষ্টা করেন সব পত্রিকাগুলি কিনে সংগ্রহ করার। এবং এই সময়ে কারা কি লিখছে তা জানার। তিনি বললেন অফুরন্ত সময়ে তিনি পুজোর সময় বেশ কয়েকটি পুজো সংখ্যা পড়ে ফেলেন। এখানেও নতুন করে ভাবতে শুরু করলাম। সুতরাং ক্রমশ ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক এর সমন্বয়ে যে নির্যাস পাওয়া যায় সেখান থেকেই নতুন ভাবনার জন্ম নিক।
AI কে অস্বীকার করার আর কোন জায়গা নেই।তবে এর অপপ্রয়োগকে আটকানোর চেষ্টা আমাদের করে যেতে হবে। সমাজের অন্যান্য দিক অথবা সাহিত্য যাই হোক না কেন।
বিজ্ঞান কখনোই ধ্বংসের কথা বলে না বরং যুক্তিকে মান্যতা দিয়ে গ্রহণ করার নামই বিজ্ঞান।
তবুও একশ্রেণীর সুবিধাবাদী মানুষ যুগ যুগ ধরে যেকোনো ভালো জিনিসের অপপ্রয়োগে সমাজকে কলঙ্কিত করেছে। সময়ের হাত ধরে সেই সংস্কৃতি আরো বেশি কলঙ্কিত হতে চাইছে। আমরা বিশ্বাস করি এখনো সমাজে সুচিন্তক সুশিক্ষিত মানুষের ছড়াছড়ি তাই এই অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে।
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে বিশ্ব দরবারে বরাবর।
বাংলা সংস্কৃতির সেই ধারাকে সচল রাখতে আমাদের সমাজ ভাবনাকে আরো বেশি করে ছড়িয়ে দিতে হবে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথায় বলি ,
"জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব - তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবাে জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযােগ্য করে যাবাে আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।"
0 Comments.