- 10
- 0
ধাতু অধাতুর যাদু
প্রকৃতিকে তৈরি করলো ? এ প্রশ্ন অবান্তর। পৃথিবীর জন্ম সময় থেকে তার বস্তু প্রকৃতির গঠন ও চরিত্র নির্ধারিত হয়েছে। চাপ ,তাপ এবং সাম্যের ভিত্তিতে রাসায়নিক মৌল পদার্থ আপন আপন ধর্ম লাভ করেছে সমগ্র সৌরমণ্ডল একটা শক্তিবলয় । এই শক্তিবলয় পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহ ও উপগ্রহের আয়নীয় পদার্থগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম রেখেছে। সূর্য,গ্রহ, উপগ্রহ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র জীবাণু অণু পরমাণু এই নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয় । সকলের কাজ পূর্ব নির্ধারিত বলেই শৃঙ্খলা এবং সাম্য অবস্থায় থাকে। কেউ কারো সীমা লঙ্ঘন করে না । তবে গঠনগত ধর্মে সীমা লঙ্ঘনের প্রবণতা রয়েছে। তাই পৃথিবীর মৌল পদার্থগুলো তিনটে ভাগে বিভাজিত - ধাতু , অধাতু এবং উভধর্মী। অনেকটা পুরুষ,নারী ও উভলিঙ্গ হিজড়াদের মতো।
রসায়ন বিজ্ঞানে ধাতু (Metals) ক্ষারীয় ধর্ম বিশিষ্ট। ধাতুগুলো (যেমন: সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম) জলের সাথে বিক্রিয়া করে ক্ষার তৈরি করে।ধাতব অক্সাইডগুলো সাধারণত ক্ষারীয় (Basic) প্রকৃতির হয়। উদাহরণস্বরূপ, সোডিয়াম অক্সাইড (Na_2O) জলের সাথে মিশলে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH) ক্ষার তৈরি করে।ধাতুর পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ কক্ষে সাধারণত ১, ২ বা ৩টি ইলেকট্রন থাকে। এরা রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় ইলেকট্রন বর্জন করে ক্যাটায়নে (ধন্যাত্মক আয়ন) পরিণত হতে চায়।এদের মধ্যে মুক্ত ইলেকট্রন (Free electrons) থাকায় এরা তাপ ও বিদ্যুতের সুপরিবাহী (যেমন: তামা, অ্যালুমিনিয়াম)।ধাতুকে পিটিয়ে পাতলা পাতে পরিণত করা যায় (নমনীয়) এবং টেনে সরু তারে রূপান্তর করা যায় (প্রসার্য)।ধাতুর পরমাণুর আকার বা ব্যাসার্ধ তুলনামূলকভাবে বড় হয়। ফলে এদের সর্ববহিঃস্থ কক্ষপথের ইলেকট্রনের ওপর নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ বল খুব দুর্বল থাকে। অতি অল্প শক্তিতেই এই ইলেকট্রনগুলো পরমাণুর বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে পুরো ধাতব কেলাসে (Lattice) ফ্রিলি ঘোরাফেরা করতে পারে।যখন ধাতুতে তড়িৎ বিভব বা তাপ প্রয়োগ করা হয়, তখন এই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো দ্রুত প্রবাহিত হয়ে বিদ্যুৎ বহন করে এবং নিজেদের গতিশক্তি বাড়িয়ে তাপ পরিবহন করে।মুক্ত ইলেকট্রনের উপস্থিতিই ধাতুকে পজিটিভ ধর্মী ও সুপরিবাহী করে তোলে, (মানব পুরুষ প্রকৃতির মতো নিঃসরণের জন্য উন্মুখ।)
অধাতু (Non-metals) অম্লীয় ধর্ম বিশিষ্ট।অধাতুগুলো (যেমন: সালফার, কার্বন, নাইট্রোজেন) সাধারণত অম্লীয় (Acidic) অক্সাইড গঠন করে।অধাতব অক্সাইড জলের সাথে মিশলে অ্যাসিড তৈরি হয়। যেমন: সালফার ডাই-অক্সাইড (SO_2) জলের সাথে বিক্রিয়া করে সালফিউরাস অ্যাসিড (H_2SO_3) গঠন করে।অধাতুর সর্ববহিঃস্থ কক্ষে সাধারণত ৪, ৫, ৬ বা ৭টি ইলেকট্রন থাকে। এরা বিক্রিয়ার সময় ইলেকট্রন গ্রহণ করে অ্যানায়নে (ঋণাত্মক আয়ন) পরিণত হতে চায়।এরা সাধারণত তাপ ও বিদ্যুতের অপরিবাহী বা কুপরিবাহী (যেমন: সালফার, ফসফরাস)। ব্যতিক্রম: গ্রাফাইট (বিদ্যুৎ পরিবাহী)।অধাতুগুলো ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়; এদের পিটলে বা টানলে গুঁড়ো হয়ে যায়।অধাতুর পরমাণুর আকার ক্ষুদ্র হওয়ায় নিউক্লিয়াস তার বহিস্থ কক্ষপথের ইলেকট্রনগুলোকে খুব শক্তভাবে টেনে ধরে রাখে। এরা স্থায়ী ইলেকট্রন বিন্যাস (অষ্টক পূর্ণ) পাওয়ার জন্য অন্য পরমাণু থেকে ইলেকট্রন গ্রহণ বা শেয়ার করতে চায়। এদের মধ্যে কোনো মুক্ত ইলেকট্রন থাকে না। সমস্ত ইলেকট্রন সমযোজী বা আয়নীয় বন্ধনে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে। মুক্ত পরিবাহক (Free Charge Carrier) না থাকায় তড়িৎ বা তাপ প্রবাহের পথ অবরুদ্ধ থাকে। মুক্ত ইলেকট্রনের অনুপস্থিতি ও নিউক্লিয়াসের তীব্র আকর্ষণ অধাতুকে নেগেটিভ ধর্মী ও অপরিবাহী করে।(মানব নারীর মাতৃ কোষের মতো গ্রহণের জন্য উন্মুখ)
উভধর্মী মৌল (Amphoteric Elements) কিছু মৌল রয়েছে যাদের অক্সাইড অ্যাসিড এবং ক্ষার—উভয় হিসেবেই আচরণ করতে পারে। এদের উভধর্মী মৌল বলা হয় (যেমন: অ্যালুমিনিয়াম, জিংক)।
মোটকথা কোনো মৌল নিজে অ্যাসিড বা ক্ষার না হলেও, মৌলটির চরিত্র (ধাতু না অধাতু) নির্ধারণ করে তার তৈরি যৌগটি অ্যাসিডিক হবে নাকি ক্ষারীয় হবে।
DNA -এর উৎপত্তি
আদি পৃথিবীতে RNA ওয়ার্ল্ড (RNA World) থেকে DNA-র উৎপত্তি এবং কেন এটি স্থায়ী জিনোমিক উপাদান হিসেবে নির্বাচিত হলো প্রধানত তিনটি রাসায়নিক পরিবর্তন এবং এনজাইমেটিক রূপান্তরে । RNA-এর গঠনে থাকা রাইবোজ (Ribose) শর্করার 2' নম্বর কার্বনে একটি হাইড্রোক্সিল গ্রুপ (-OH) থাকে। আদিম এনজাইম বা প্রোটিন-অনুঘটকের প্রভাবে এই 2'-OH গ্রুপটি অপসারিত হয়ে কেবল একটি হাইড্রোজেন (-H) পরমাণুতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াতেই গঠিত হয় ডি-অক্সিরাইবোজ (Deoxyribose) শর্করা। এছাড়া RNA-তে ব্যবহৃত নাইট্রোজেন বেস ইউরাসিল (Uracil) মিথাইলেশন (Methylation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এনজাইমের সাহায্যে থাইমিন (Thymine)-এ রূপান্তরিত হয়। থাইমিন প্রকৃতপক্ষে মিথাইলেটেড ইউরাসিল (5\text{-methyluracil})। এছাড়াও আদিম মেমব্রেনবদ্ধ কোষে থাকা RNA টেমপ্লেট হিসেবে কাজ করে। আদিম এনজাইম (যা আধুনিক Reverse Transcriptase-এর পূর্বসূরি) RNA থেকে একক-সূত্রক DNA সংকলন করে। পরবর্তীতে পরিপূরক সূত্রক তৈরির মাধ্যমে গঠিত হয় দ্বিসূত্রক DNA (Double-stranded DNA)।
DNA কেন তৈরি হলো?
জীবনের প্রাথমিক রূপ RNA কেন্দ্রিক হলেও, কোষীয় জটিলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে RNA-এর কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। DNA মূলত জীবনের তথ্য সংরক্ষণকে অধিকতর স্থায়ী, সুরক্ষিত ও নিখুঁত করার জন্য । RNA-এর 2'-OH গ্রুপ থাকার কারণে এটি অত্যন্ত অস্থায়ী এবং জলীয় বিশ্লেষণে (Hydrolysis) সহজে ভেঙে যায়। DNA-তে এই 2'-OH গ্রুপ না থাকায় এটি অত্যন্ত সুসংহত এবং দীর্ঘকাল স্থায়ী হতে পারে। DNA প্রধানত ডাবল-হেলিক্স (Double-stranded) গঠনে থাকে। এটি ভেতরের নাইট্রোজেন বেসগুলোকে বাহ্যিক রাসায়নিক আক্রমণ ও মিউটেশন থেকে রক্ষা করে। কোনো এক সূত্রক ক্ষতিগ্রস্ত হলে অপত্য বা পরিপূরক সূত্রকটি দেখে ত্রুটি সংশোধন করা সহজ হয়।RNA-তে স্বাভাবিকভাবে সাইটোসিন (Cytosin) ডিঅ্যামিনেশনের মাধ্যমে ইউরাসিলে রূপান্তরিত হতে পারে, যা RNA রিডিংয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে। DNA-তে ইউরাসিলের পরিবর্তে থাইমিন থাকায় কোষ সহজেই বুঝতে পারে কোথায় সাইটোসিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তা মেরামত করে নিতে পারে। অস্থায়ী ও সহজে ভেঙে যাওয়ার কারণে RNA দীর্ঘ তথ্য ধারণ করতে সক্ষম ছিল না। জটিল কোষীয় জীবনের জন্য প্রয়োজন ছিল হাজার হাজার প্রোটিন তৈরির সংকেত ধারণকারী বড় জিনোম, যা কেবল স্থায়ী DNA-র পক্ষেই ধারণ করা সম্ভব। মোটকথা RNA ছিল অনুঘটক ও তথ্যের প্রাথমিক সেতু, কিন্তু জীবনের জটিলতা বৃদ্ধি এবং বংশগতির তথ্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদেই বিবর্তনের নিয়মে RNA থেকে অধিকতর স্থায়ী ও সুরক্ষিত DNA-র আবির্ভাব ঘটে। DNA-র মূল কাজই হলো জীবনের তথ্য সংরক্ষণ (Information Storage) এবং বংশপরম্পরায় সেই তথ্যের প্রবাহকে নির্ভুল রেখে জীবনের ধারা বা বংশবিস্তার অব্যাহত রাখা (Hereditary Continuity)।
(DNA প্রোটিন তৈরির সমস্ত নির্দেশাবলী (Genetic Code) কোডেড অবস্থায় সুরক্ষিত রাখে, যাতে কোষ ঠিক কখন, কোন প্রোটিন বা এনজাইম তৈরি করবে তা নিয়ন্ত্রিত হয়। কোষ বিভাজনের সময় DNA নিজের অবিকল অনু his (নির্ভুল অনুলিপায়ন (Replication)প্রতিলিপি তৈরি করে, ফলে নতুন প্রতিটি কোষেই মূল তথ্য সমানভাবে পৌঁছে যায়। DNA নিজে সরাসরি সব কাজ করে না; এটি প্রথমে নিজের বার্তা RNA-তে পাঠায় (Transcription), আর RNA সেই বার্তা অনুযায়ী প্রোটিন তৈরি করে (Translation)। প্রোটিনই শেষ পর্যন্ত যাবতীয় জৈবিক ক্রিয়া পরিচালনা করে। খুব সামান্য ও নিয়ন্ত্রিত মিউটেশনের মাধ্যমে DNA জীবের মধ্যে বৈচিত্র্য আনে, যা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং বিবর্তনে সাহায্য করে।
নারী ও পুরুষ
জীবন সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকেই পরমাণু ও মৌলের পর্যায়সারণী—বিশেষ করে ধাতু (Metals) এবং অধাতু (Non-metals)-এর মধ্যকার পারস্পরিক রাসায়নিক বল ও ইলেকট্রন আদান-প্রদানই জৈব রাসায়নিক বিবর্তনের ভিত্তি প্রস্তুত করেছে।
জীবনের মৌলিক উপাদান—DNA, RNA, প্রোটিন, লিপিড এবং শর্করার প্রধান রাসায়নিক ভিত্তি হলো অধাতু । কেননা অধাতু কার্বনের সমযোজী বন্ধন গঠনের অনন্য ক্ষমতার জন্যই জটিল জৈব অণু (অ্যামিনো অ্যাসিড, নিউক্লিওটাইড) গঠন সম্ভব হয়েছে।হাইড্রোজেন (text{H}) ও অক্সিজেন (text{O}) থেকে জলের সৃষ্টি এবং জলীয় মাধ্যম শক্তি রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। অধাতু নাইট্রোজেন (text{N}) ও ফসফরাস (text{P}) মূলত নিউক্লিক অ্যাসিডের (DNA ও RNA) নাইট্রোজেনাস বেস এবং শক্তি স্থানান্তরকারী অণু (ATP)-র অপরিহার্য উপাদান।
শুধুমাত্র অধাতু দিয়ে জৈব প্রক্রিয়াগুলো সচল রাখা সম্ভব ছিল না। রাসায়নিক বিক্রিয়াকে দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট করতে প্রয়োজন হয় ধাতব আয়নের । RNA এবং DNA পলিমারেজ এনজাইমের সঠিক কার্যকারিতার জন্য [text{Mg}^{2+}] আয়ন অপরিহার্য। আদিম পৃথিবীতে RNA-র ভেতর থেকে প্রতিলিপি গঠনের (Self-replication) নেপথ্যে ম্যাগনেসিয়াম ও অন্যান্য ক্ষারীয় ধাতুর ভূমিকা ছিল প্রধান।জিঙ্ক (text{Zn}^{2+}) ও লোহা (text{Fe}^{2+}/\ text{Fe}^{3+})-ও প্রাচীন এনজাইমে ইলেকট্রন স্থানান্তর এবং প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন ধরে রাখতে এই সংক্রান্ত ধাতুগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।সোডিয়াম (text{Na}^+), পটাশিয়াম (text{K}^+) ও ক্যালসিয়াম (text{Ca}^{2+}) মেমব্রেনের ভেতরের ও বাইরের রাসায়নিক সমতা এবং সংকেত আদান-প্রদান বজায় রাখে।
বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বহুকোষী জীবের আত্মপ্রকাশ এবং পরবর্তী ধাপে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর বিশেষায়িত কোষ হিসেবে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও ধাতু ও অধাতুর সূক্ষ্ম রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ কাজ করে । শুক্রাণুর অক্রোসোম বিক্রিয়া এবং সাঁতার কাটার শক্তিতে ক্যালসিয়াম (text{Ca}^{2+}) এবং জিংক (text{Zn}^{2+}) আয়নের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে।নিষেকের (Fertilization) মুহূর্তে ডিম্বাণু থেকে জিংক আয়নের একটি প্রবল বিস্ফোরণ ঘটে (যা 'Zinc Spark' নামে পরিচিত)। এটি অন্য কোনো শুক্রাণুকে ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয় এবং ভ্রূণ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে।
অতএব, জড় জগতের ধাতু ও অধাতুর ইলেক্ট্রন স্থানান্তরের ভৌত-রাসায়নিক নিয়মই পরিবর্ধিত হয়ে একসময় জীবন্ত কোষ, DNA-র অনুলিপায়ন এবং জননকোষ সৃষ্টির মাধ্যমে জীবনের ধারাবাহিকতাকে বা পুনর্জন্মকে বজায় রাখে।
0 Comments.