- 4
- 0
শহরতলির ইতিকথা
দেশের শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে।বিক্ষুব্ধ কংগ্রেসের সঙ্গে বামদলগুলো মিলেমিশে শাসন ক্ষমতায় এসেছে,তো বাম-আদর্শের প্রতিফলন ফলতে শুরু হয়ে গেছে---দিকে দিকে,"ভেঙ্গে দাও,গুঁড়িয়ে দাও"স্লোগান---অঞ্চলের কারখানাগুলোয় অশান্তির জোরে,চিমনি থেকে ধোঁয়া ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে; ম্যানেজারদের 'ঘেরাও' নামে,এক অদ্ভুত রকমের অত্যাচার চালু হয়েছে,না জল, না বাথরুম,একটা অমানুষিক অবস্থা;বামদলগুলো,শ্রমিক শ্রেনীর সামনে তাৎক্ষনিক লাভ/সুবিধার গাজর ঝুলিয়ে রাখে; কোম্পানি যে শ্রমিক শ্রেণীর কাছে মাতৃসমা,রুটি-রোজগারের উৎস,অর্থাৎ কোম্পানিটা আমার,এর ভালো-মন্দ'র সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর ভালো-মন্দ যে জড়িয়ে আছে,এ বোধ কখনও গড়ে তুললো না,শুধু মালিকের কালো হাত ভেঙ্গে দাও, গুঁড়িয়ে দাও,ফলতঃ,কারখানা হলো বন্ধ।নেতাদের তো তাতে ক্ষতি নেই,নেতারা তো আর শ্রমিক নয়,ওরা তো পরজীবী; শ্রমিকের সে বোধ নেই---চারদিকে এক অস্থিরতা,আর তার সাথে যোগ হয়েছে সর্বহারা উদ্বাস্ত-মানুষগুলোর পুঞ্জীভূত অবদমিত ঈর্ষার বহিঃপ্রকাশ; স্থানীয় মানুষজনের স্থাবর
সম্পত্তির উপর শুরু হয়েছে জোর,জবর- দখল।
অঞ্চলের গঙ্গার বুকে গজিয়ে ওঠা অস্থায়ী চড়া, এখন স্থায়ী হয়েছে;গঙ্গার জলের স্রোত গেছে কমে; গঙ্গা থেকে বালি তোলার ইজারাদার, অঞ্চলের স্থানীয় ব্যক্তি,অত্যন্ত সজ্জন, কংগ্রেসী ঘরানার,পূর্বতন কংগ্রেসী মন্ত্রিসভার মন্ত্রীর একেবারে কাছের লোক; সরকারি অফিসারেরা খুবই খাতির করে। ফেরিঘাটগুলোও ইজারা নিয়ে পিতৃপুরুষদের বালি তোলার ব্যবসার সম্প্রসারণ করেছেন; অঞ্চলের কোনো ছেলেকে,বেকার বসে থাকতে দেখলেই,নিজের ঐ সব ব্যবসায়ে নিযুক্ত করে থাকেন;বলেন,"তোমার চাহিদামত টাকা দিতে পারবো না,কাজ কর, কাজ শেখ,অন্য জায়গায় পেলেই চলে যাবে,আমি খুশি হবো; মনে রাখবে,অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।" ওদের পিতৃপুরুষদের ব্যবসা এটা,সেই বৃটিশ-আমল থেকেই লিজ নিয়ে, প্রায় শ্রীরামপুর থেকে ত্রিবেনী অঞ্চল পর্যন্ত গঙ্গার বুক থেকে ওরা বালি তুলে আসছেন,বলতে পারা যায়,একেবারে মনোপলি ব্যবসা;স্থানীয় ইট-খোলাগুলোয় বালি তো অপরিহার্য; আবার,পাশাপাশি অঞ্চলের মিউনিসিপ্যালিটিগুলোও,গঙ্গা থেকে জল তুলে ফিলটার করে,তা পাইপ সহযোগে ওভারহেড ট্যাঙ্কে তুলে,পাইপ-লাইনের সাহায্যে নিজেদের অঞ্চলের ট্যাক্স-পেয়ারদের পরিশোধিত পানীয় জল সরবরাহ করে থাকে।আর এই পরিশোধন প্রক্রিয়ায় গঙ্গার সাদা বালি একটা প্রয়োজনীয় উপাদান; সুতরাং,মিউনিসিপ্যালিটিগুলোও তাঁদের তোলা, সাদা-বালির খদ্দের।
গঙ্গার চড়া স্থায়ী হওয়ায়,ফেরি-পারাপার ব্যবসায় খরচ বেড়েছে,এপার থেকে যাত্রীবাহী নৌকো চড়া পর্যন্ত যাবে,ওখান তৈরি করতে হয়েছে আড়ংঘাটা; তারপর বেশ কিছুটা চড়ার উপর হাঁটা পথ,তারপর চড়ার অন্যদিকে থাকা, আড়ংঘাটা থেকে আবার নৌকো করে যাত্রীদের গঙ্গার অপর- পাড়ে নিয়ে যাওয়া। এই বর্ধিত খরচার বেশ কিছুটা,চড়ায় ফসল ফলিয়ে ক্ষতির সামাল দেওয়া চলছে,কারন,পারানি তো,সরকার কতৃক নির্দিষ্ট,বাড়াবার উপায় নেই।বালি তোলার ইজারা,তো চড়ার দখলি স্বত্ব বে-আইনি।এতদিন,কংগ্রেসের মন্ত্রী সভা ছিল,সরকারি অফিসাররা,তাঁকে খাতির করেন,তো কোনো গণ্ডগোল হয়নি,কিন্ত,সরকারের পরিবর্তনেই হয়েছে সমস্যা। জমি সরকারের,অতএব কর দখল,হলো খুনো-খুনি;বিভিন্ন বামদল ,যে যেখানে পারছে,দখল করে নিজের দলের লোক বসিয়ে দিচ্ছে।অঞ্চলের দেবীঠাকুরানীর জমিতে হাত পড়তেই জোটের মুখ্যমন্ত্রীর নড়ে টনক;তিতি-বিরক্ত হয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন। দেশে রাষ্ট্রপতির শাসন চালু হয়েছে। বামদলের মধ্যে উদ্ভুত অতিবামেদের অত্যাচারে বাঙালির নাভিশ্বাস উঠছে;লোকমুখে, সে উপদলের নাম হয়েছে নক্সাল,কারন উত্তরবঙ্গের নক্সালবাড়ি থেকেই এ অত্যাচার,ধ্বংসলীলা শুরু হয়েছে;দঃবঙ্গের অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেও,এ দলের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে ;শিক্ষা-ক্ষেত্রে,বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলো এখন গণ-টোকাটুকির প্রাবল্যে মেধার
যাচাই হয়েছে অবান্তর,শিক্ষালয়
হচ্ছে এখন,"শুয়োরের খোঁয়াড়",অতএব,এর বিনাশই মুক্তির পথ,দিকে,দিকে মুক্তিযুদ্ধের তোড়জোড়
শুরু হয়েছে;এ অঞ্চলের পরিত্যক্ত "হাড়কলের' বিশাল ঘেরা গো-ডাউন হয়েছে ,স্কুল-ছুট ছেলেদের নিয়ে বিপ্লবী তৈরির ট্রেনিংসেন্টার---"বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক,"চীনের চেয়ারম্যান,আমাদের চেয়ারম্যান","মাও-সে তুং জিন্দাবাদ", "তোমার নাম,আমার নাম,ভিয়েতনাম,ভিয়েতনাম",স্লোগানে সাধারণ মানুষের হৃৎকম্প শুরু হয়েছে,হবে না,বিপ্লব হলো বলে! বোমা তৈরির জন্য জনগণের উপর জুলুম ট্যাক্স বসেছে;বিপ্লবের জন্য এটুকু ত্যাগ তো করতেই হবে। স্থানীয় স্কুলগুলোর কয়েকজন শিক্ষকই এসব কাণ্ড-কারখানার পিছনে;ছেলেরা তো ভিয়েতনাম,কোথায়,তাই জানে না,মাও'র "লং মার্চ" কী,কেন, তাই জানে না,আবেগ-ভরা অলস মস্তিষ্ক,তার ধোলাই তো সহজ-সাধ্য --চললো বিপ্লবের জয়ধ্বনি,চললো রাস্তার ট্রাফিক পুলিশ খুন,সে তো বড় জোতদার না!সেই মানুষটার পরিবারের কথা ভাবলে চলে!
রাজীবের বাড়ির পাশ দিয়ে ট্রেনিং
শেষে বিপ্লবীর দল,যখন যায়,তখন,তাদের মুখ-চোখ,এক একটা
নৃশংস খুনে বলে রাজীবের মনে হয়। রাজীব,ওদের চিনতে পারে না,ওদের পথ যে ভুল,নরকের পথ,ওদের যে ভুলপথে ,উদ্দেশ্যেমূলকভাবে পরিচালিত করা হচ্ছে,তা বুঝতে আর বাকি থাকে না; রাজীব ,ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেছে,না,ওদের মস্তিষ্ক উত্তমরূপে ধোলাই করা হয়েছে;রাজীব,সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা ভাবে---"আঠারো" বছর বড় ভয়ানক,বড় আবেগ-চালিত ,কারো কাছে নোওয়ায় না মাথা---কী অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষন! তিনি কি এই"আঠারোর" কথা ভেবেছিলেন,কখনই না;অধঃপতন দেখে, রাজীব মর্মাহত। তাদের কলেজেও এ রোগের ছোঁয়াছ লেগেছে;রোগের প্রাদুর্ভাব,কোলকাতা থেকে ,মফঃস্বলে প্রকাশ হতে যেটুকু সময় লাগে আর কী!
বামদল ও অতিবামেদের মধ্যে চলছে বাদানুবাদ,একেবারে আড়াআড়ি অবস্থান;বামদলের লোকও,অতিবামেদের কাছে হয়েছে সংশোধনবাদী,অর্থাৎ শ্রেণীশত্রু,অতএব ওরাও খতমের খাতায়। কিছুদিন আগেই খতম হয়েছেন,বাংলার শ্রদ্ধেয় জননেতা হেমন্ত বসু মশাই, খতম হয়েছেন,শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-গুরু, ত্রিগুণা সেন মশাই;গুরু হত্যার পাপ, পাপী বাঙালিকে একদিন চোকাতেই হবে; সেদিন হবে বাঙালির কাছে ভয়ানক,হবে দুর্বহ।
বামদলের মধ্যে অন্যতম দলটির একজন লোকজন নিয়ে গিয়ে চড়া দখল করতে গেল; ইজারাদারমশাই 'র
লোকবলও তো কম নয়, হলো লাঠালাঠি, দু'পক্ষেরই কয়েকজন আহত হলো;পুলিশ এলো,তদন্ত শুরু; ফেরি বন্ধ তো করে রাখা যাবে না,তাই কোনো রকমে ফেরি চালালেও,ইজারাদার মশাই ,এবার অন্য পথ ধরলেন;উনি,সরাসরি রাজনীতি না করলেও,কূটনৈতিকে সিদ্ধহস্ত।অতিবামেদের হাতে ঐ হামলাকারীদের নেতা,অতি নৃশংসভাবে খুন হলেন। অঞ্চলের আকাশে-বাতাসে বোমার ধোঁয়া ; রাতের অন্ধকারে ফিসফিস করে কথাবার্তা;রাত-দিন, সি-আর পি'র বুটের আওয়াজ, চারদিকে ধর-পাকড়,
অঞ্চলে শ্মশানের শান্তি বিরাজমান;মানুষকে প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে হয়;ঘরের মানুষ,ঘরে
ফিরলে,অন্যরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
এক অসহনীয় অবস্থা!
---------চলবে
0 Comments.