Wed 15 April 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব - ৪১)

maro news
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব - ৪১)

শহরতলির ইতিকথা

  "নাথি মেরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আয়", বলে পিসিমা চায়ের কাপ দুটো রমাকান্তও রাজীবের হাতে দিলেন;রমাকান্তবাবু ও রাজীব, ঘরের মধ্যে পিসিমার ঘরের বড় পালংকের দু প্রান্তে পা ঝুলিয়ে বসে, প্রিন্সিপালমশাই'র ইন-চার্জ সংক্রান্ত নোটিশ নিয়ে আলোচনা করছিল; পিসিমা, ঘরে ঢোকার মুখে, তা শুনতে পেয়ে,বেশ রাগত-স্বরেই এ কথা বলেছেন।

     রমাকান্তবাবু, তিনবছর বয়সেই মাতৃহারা; এই পিসিমাই বুকে করে ভাই'র পুত্রকে মানুষ করেছেন; ওনারও একপুত্র ছিল, অল্প বয়সেই মারা গেছে; রমাকান্তই তাঁর পুত্রশোক ভুলিয়েছে; রমাকান্ত'র বাবাও আর বিয়ে-থা করেননি, দেশ-সেবা নিয়েই মেতে আছেন; গান্ধিবাদী, ইউনিয়ন-বোর্ডের প্রেসিডেন্ট; দিদির কাছেই খাওয়া-দাওয়া করেন, দিনের বেলা, বাড়িতে অল্প সময়ের জন্যই থাকেন; ওনার বাড়িও গ্রামে, পিসিমার এ বাড়ি থেকে মাইল তিনেক তো হবেই; সাইকেল নিয়ে টোঁ, টোঁ করে এ গ্রামও গ্রামে যান; সরকারের থেকে গ্রামোন্নয়নের জন্য যে টাকা আসে, তাতে বড় জোর তহসিলদারের মাইনে হয়, তাই লোকের কাছ থেকে চাঁদা তুলে গ্রামের সেবা করা ছাড়া আর কোনও পথই খোলা থাকে না, অবশ্য রেয়ন -কোম্পানি, আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

         রেয়ন ফ্যাক্টরীর কাছেই পিসিমার শ্বশুর বাড়ি, রহেছে বিশাল বাগান; অধিকাংশ জমিই রেয়ন ফ্যাক্টরীকে বিক্রি করে পিসে মশাই হয়তো অন্তর্জলির সুবিধার জন্যই, এই গঙ্গার ঘাটের কাছে বাড়ি করেছিলেন। পিসে- মশাইও কবেই স্বর্গে গেছেন; সে সব কী আজকের কথা!

       নৈশ-বিভাগের অধ্যাপক বলেই, দিনের বেলায় চা খেয়ে ঘরের টুকিটাকি কাজ সেরে, দেশের সব খবরা-খবর জানার জন্য খবরের কাগজ তন্ন তন্ন করে পড়াই রমাকান্তের একমাত্র কাজ। রাজীব, এসেছে; গল্পের ফাঁকে, পিসিমার উক্তিকে টেনে রাজীব বলে, "পিসিমা, তোমার বাগানের, কেয়ার-টেকার করে আমাকে রাখ; একটা কুঁড়ে করে, বাগানের ফল, মূল খেয়ে তিব্বি চালিয়ে নেব।"

  উত্তরে পিসিমা বলেন", দাঁড়া, দুটোর গলায় যখন দুটৌ দজ্জালকে ঝুলিয়ে দেব, বুঝবি; নে, নে, তোরা ওঠ, চান-টান, করে খেয়ে আমাকে রেয়াই দে;" রাজীব, সাইকেল নিয়ে বাড়ির পথে, আর রমাকান্ত, তেল মেখে গঙ্গার ঘাটের অভিমুখে। চারটের সময় কলেজ যাবার রাস্তার তে- মাথায় লাইব্রেরির সামনে দাঁড়ানো, তারপর, দু'জনে একসঙ্গে সাইকেল করে কলেজে যাওয়া, এটা প্রায় দৈনন্দিনই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

     একদিন তো, দু'জনে সাইকেল নিয়ে কলেজের পথে;এদিকে,ছেলের দলও ট্রেন থেকে নেমে দলবেঁধে রাস্তা জুড়ে কলেজ অভিমুখে। অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থার হাল খুবই খারাপ, বাস চলে বটে, তবে তার সময়ের জ্ঞান খুবই কম, তাই ট্রেনই ভরসা।

কলেজটির অবস্থানও ট্রেনের মেন- লাইনও কাটোয়া রেল লাইনের মাঝে,ফলে কাটোয়া লাইনের ট্রেন থেকে নামা ছেলেদের সঙ্গে পথেই রমাকান্তবাবু-রজতের দেখা হয়ে যায়।

ছেলেদের দল রাস্তা জুড়ে চলেছে, পিছনেএকটু তফাতে, দুই অধ্যাপক আছেন সাইকেলে, সামনে ছেলেদের মধ্যে একজন, দু'হাত প্রসারিত করে বলছে, "বলবো, রমা, রমা, পাস করিয়ে দাও, পাস করিয়ে দাও"; এমন সময়, অধ্যাপক-দ্বয়, রাস্তা ছেড়ে দেবার জন্য, সাইকেলের ঘন্টি বাজালে, ছেলেদের দল পিছনে তাকিয়ে অপ্রতিভ হয়ে পথ ছেড়ে দেয়,আর,অধ্যাপক-দ্বয়ও কৃত্রিম গাম্ভীর্যে সাইকেল চালিয়ে কলেজ অভিমুখী। কলেজে, অফিসের বড়বাবুর টেবিলের সামনে থাকা চেয়ারে বসে, দু'জনে আর হাসি চেপে রাখতে পারলো না। বড়বাবুও সব শুনে, হাস্যরসে মেতে উঠলো; এই তিনজনই কলেজের নৈশ বিভাগের প্রাণ-ভোমরা বললেও অত্যুক্তি হয় না; তিনজনই ব্যাচেলর, তাই ঘরে ফেরার নেই তাড়া; আবার স্থানীয়, সাইকেল করেই আসা-যাওয়া; অন্য অধ্যাপকদের তো ঘরে ফেরার তাড়া; তারা দূরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা , বাস আসে অনিয়মিত, আবার ট্রেন পেতেও যেতে হবে রিক্সা, না পেলে, হন্টনই ভরসা। যাই হোক, সব ছাত্ররা চলে গেলে, ঐ তিনজন কলেজ থেকে বেরোয়; অনেক সময় কলেজের বাহাদুর,তালা দেবে বলে এসে তাগাদা দিলে, তবেই ওরা গল্পের আসরের ইতি করে। কলেজের বেতনের অনিশ্চয়তা কেটেছে,গভর্নিং-বডির মিটিংএ ওদের রেট্রোসস্পেক্টিভ এফেক্ট দিয়ে নিয়োগপত্র দিয়েছে,অর্থাৎ যে অনিশ্চয়তার মধ্যে ওরা ছিল, তা কেটেছে, এবার গভনিং-বডিতে বিভাগের সমস্যা তুলে ধরার জন্য প্রতিনিধি পাঠাবার সময় এসেছে। দিনের বেলার অধ্যাপকদের আধিপত্য বাড়তে চলেছে। দূর অঞ্চলের তিনজন ফুল-টাইমার অধ্যাপকই, দিবা-বিভাগের অধ্যাপকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চলেছে। নৈশ-বিভাগ থেকে দু'জন অধ্যাপক, গভর্নিং-বডিতে নির্বাচিত হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই, সেক্রেটারি হিসেবে প্রিন্সিপালমশাই, নির্বাচনের নোটিশ জারি করতে চলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

চলবে

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register