- 18
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
হরিদাদুর বক্তব্যে সকলের প্রতিক্রিয়া কেমন? পড়ুন ২৪তম পর্বে…
কোন এক রবিবার ইয়োকে ও তার মা হরিকে নিয়ে কোবে শহরের এক বড় বৌদ্ধ প্যাগোডায় গেল। সেখানে হরি, বৌদ্ধদের অনুষ্ঠানে গৌতম বুদ্ধের জীবনী থেকে সকলকে অনেক গল্পকথা শোনায়। বৌদ্ধ পুরোহিতগন হরিকে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করতে বলে ভারত থেকে একমাত্র বৌদ্ধ ধর্ম্মের প্রতিনিধি হিসাবে মাউন্ট ফুজীর নীচে পৃথিবীর বৃহত্তম বৌদ্ধ সম্মেলনে যোগদান করতে বলে। হরি, পুরোহিতদের অনুরোধে সেখানে একটি ছোট বক্তৃতাও দেয়। ধর্ম নিয়ে এক অভূতপূর্ব ভাষনে ওখানে উপস্থিত সাধুদের মন জয় করে নেয়। বৌদ্ধ পুরোহিতগণ ‘সাধু সাধু’ বলে হরিকে করজোড়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে।
ছোট্ট বিট্টুর কাছ থেকে এমন অজানা কাহিনি শুনে ঘোতন কেমন যেন হয়ে গেল। ও অবাক হয়ে বিট্টুর কথা শুনছিল। বিট্টু সেটা খেয়াল করে ঘোতনকে বলল,
“ও ঘোতনকাকা, কি হলো তোমার? মুখ হাঁ করে আছ কেন?”
ঘোতন বিট্টুকে বুকে জড়িয়ে ধরল। খুব আদর করল।
“আমার সোনাবাবা বিট্টু। আজ আমার মনে হচ্ছে জীবনে অনেক ভুল করেছি। ভগবান আছেন। মানুষের মধ্যেই আছেন। তাই তো তোর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তোর সাথে দেখা না হলে আমার জীবন নরক হয়ে যেত। একটা কথা বলব বিট্টু”
“হ্যাঁ, বলো। একটা কেন? অনেক কথা বল”
“আমার সাথে হরিদাদুর পরিচয় করিয়ে দিবি?”
“হ্যাঁ দেব। হরিদাদু খুব ভালো, আমাকে খুব আদর করে। এই কিছুক্ষণ আগে তুমি যেমন আদর করলে, তেমন আদর। জানো, ঘোতনকাকা, আমার মা-ও আমাকে খুব আদর করত”
“আজ থেকে আমিও তোকে খুব আদর করব। আমার আবদার একটাই, হরিদাদুর সাথে দেখা করব”
“তাহলে আমরা এখান থেকে হরিদাদুর বাড়ি পালাই”
“হুম, বিট্টু, এটা তুই খুব ভালো বলেছিস। একটু ভাবতে দে”
ঘোতন বেশ কিছুক্ষণ ভাবল। যদি এখান থেকে হরিদাদুর কাছে যাওয়া যায় তবে বেশ ভালো হবে। সাথে বিট্টু আছে। সে নিশ্চয়ই হরিদাদুকে বুঝিয়ে বলবে। ঘোতন ছেলেধরা, ক্রিমিনাল আগে ছিল, কিন্তু বিট্টুর জন্য সে খুব ভালো হয়ে গেছে। সে হল এখন বিট্টুর প্রকৃত সঙ্গী। বিট্টুকে সাবধানে ওর বাবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই হবে মূল লক্ষ্য। অনেক কিছু ভাবনা ঘোতনের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই ভাবনা থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য ঘোতন বিট্টুকে বলল,
“হরিদাদুর পরের ঘটনাগুলো বলে ফেল, বিট্টু। হরিদাদুর গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগছে”
বিট্টু যেখানে শেষ করেছিল, সেখান থেকেই আবার শুরু করল…
বৌদ্ধদের আলোচনা সভা থেকে তারপর ইয়োকে এবং ওর মা, হরিকে নিয়ে তাদের বাড়ী ফিরে আসে। সেদিন ইয়োকের বাবাও টোকিও থেকে ফিরে এসেছে। হরির সাথে পরিচয় হল। বৌদ্ধদের সভায় তার বক্তৃতা যে সবাইকে মোহিত করেছে সে ব্যাপারে ইয়োকের মা তার স্বামীকে জানাতেই উনি উচ্ছ্বসিত হলেন। হরির মত একজন মানুষ তাদের বাড়িতে এসেছে, তিনি ভীষণ আপ্লুত হলেন। সাথে সাথে তিনি হরিকে মিটসুবিশি কোম্পানিতে একটা উঁচু পদে এবং ভাল মাহিনায় একটি চাকরীর প্রস্তাব দেন। এবং ইয়োকে-কে বিবাহ করে সে দেশের নাগরিক হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু হরি সে প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। সে ইয়োকের বাবাকে জানায়,
“আমি বৌদ্ধদের মহাসভায় যে কথাগুলো বলেছিলাম, সে কথাগুলো নাম বা মান বাড়ানোর জন্য শুধু বক্তৃতা দিইনি। আমি মন থেকে যা পালন করি। সেগুলোই এই বৌদ্ধধর্ম মহাসভায় সবার সামনে তুলে ধরেছি। এমন প্রস্তাব দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার পক্ষে তা সম্ভব হবে না। আমি আমার দেশকে ভালোবাসি। বিবাহ আমি আমার দেশের মেয়ের সাথেই করব”
হরি ইয়োকের বাড়ি থেকে পরমুহূর্তেই বেরিয়ে আসে। কোবে বন্দরে ওদের জাহাজে ফিরে এসেছে। এবার এই বন্দর থেকে জাহাজ অন্য বন্দরে যাওয়ার সময় হয়েছে। হরিদের জাহাজ কোবের নিকটবর্তী ওসাকা বন্দরে প্রবেশ করে গেল। ইয়োকের হরিকে খুব পছন্দ হয়েছিল। সে কোবে থেকে গাড়ীতে ড্রাইভ করে ওসাকায় এসে হরির সাথে প্রায়ই দেখা করতে আসত। কোবে থেকে ওসাকা বন্দর মাত্র দু’ঘন্টা গাড়ী ড্রাইভ। ওসাকা জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। ওসাকা বন্দর থেকে ট্রেন চোদ্দ মিনিটে ওসাকা শহর যায়। দূরত্ব মাত্র বিয়াল্লিশ মাইল। ট্রেন একদিন মাত্র এক মিনিট দেরী করেছিল। সেখানকার যাত্রীরা কমপ্লেন বুকে লিখে চলে যায়। পরের দিন ট্রেনের ড্রাইভার বদলি হয়ে যায়। শহরের মেন্ শপিং সেন্টার পাওয়া যায় ইয়ামাসিটা চো রাস্তার ধারে। এ শহরে বড় বড় বিল্ডিং এবং বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্স। ইয়োকে বলে, ওসাকা টোকিওর থেকে অনেক ভাল শহর। ওসাকার অদূরে জাপানের পুরোনো রাজধানী কিয়োটো।
জাপানে গভীর রাত্রেও নির্ভয়ে ঘোরাফেরা করা যায়। রাস্তায় কোন বিপদ হলেই এক ফোন কলেই ভ্রাম্যমান পুলিশ ট্যাক্সি এসে যায় এবং সাথে সাথে ঐ স্থানেই বিচার হয়, অপরাধীর সাজাও হয়ে যায়। মূলতঃ রাস্তায় সাধারণ পথচারীদের মধ্যে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদেরই বেশী দেখা যায়। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রধান গুণ হল আনুগত্য, সততা এবং রাজনীতি বর্জিত। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষার পর প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকেই তার ছুটির দিনগুলিতে কোন না কোন প্রতিষ্ঠানে ট্রেনিং দেওয়া হয়।
ওসাকায় বেশ কিছুদিন থাকার পর হরিদের জাহাজ ওখান থেকে ইয়োকোহামা শহরে চলে যায়। জাহাজ থেকে সিঁড়িতে নামা মাত্রই শহর শুরু। জাপানে অবশ্য প্রতিটি বড় শহরেই একটি করে জাহাজের বন্দর থাকে। জেটির পাশেই একটি বড় বিল্ডিং "সিল্ক শপিং সেন্টার"। ঠিক তার পাশেই সমূদ্রের পাড়ে একটি বড় পার্ক। পার্কে একটি অচল জাহাজ বাধা আছে। স্কুলের ছাত্ররা এবং বিদেশিরা টিকিট করে জাহাজটি পরিদর্শন করে। একজন গাইড জাহাজ সম্বন্ধে অনেক কিছু তথ্য দিয়ে থাকে। পার্কের পাশেই টাওয়ার, একটি লাইট হাউস। লিফটে চেপে টাওয়ারের উপর যাওয়া যায়। সেখানেও মার্কেটিং শপ, রেস্টুরেন্ট আছে। টাওয়ার থেকে দূরবীন দিয়ে সমস্ত শহর এবং দূরে অসংখ্য জাহাজ দেখা যায়। ইয়োকোহামা বড় বন্দর, এখানে সব সময় প্রায় অনেক জাহাজ দেখা যাবে। এছাড়া জাপানে কাজের গতি খুব দ্রুত, কোন জাহাজ বন্দরে বেশীদিন থাকে না। টাওয়ারের নীচেই হট ডগ হাউজ, এখানে বিখ্যাত হটডগ ও স্ন্যাকস পাওয়া যায়। একজন আমেরিকান এটার মালিক। সর্ব্বদাই ভীড়। প্রচুর বিক্রি। পাশে কেবলমাত্র মিলিটারী অফিসার ও সৈনিকদের জন্য ইয়োকোহামা আমেরিকান সৈন্যের বেস্ (দুর্গ) আছে। আমেরিকা থেকে গ্রাজুয়েট হওয়ার পর ছাত্ররা মিলিটারী ট্রেনিং নিতে এখানে আসে। একজন নিগ্রো ট্রেনিং অফিসারের সাথে হরির আলাপ হল। তার সঙ্গে রাত্রে নাইট ক্লাবে যাওয়া হল। শহরের সবচেয়ে সুন্দরী জাপানী মেয়েরা এই নাইট ক্লাবের ড্যান্সিং হলে আসে। শনি-রবিবার সারারাত্র নাচ হয়। এখানে স্টেজে বিভিন্ন ধরনের নাচ দেখা যায় এবং শেখাও যায়। হরিকে নিগ্রো অফিসার নাচার অনুরোধ করে। হরি এক সুন্দরী মহিলার সাথে দারুণ তালে নাচতে থাকে। নিগ্রো অফিসার হরির নাচে মুগ্ধ হয়ে ওর হাতের ঘড়ি হরিকে উপহার দেয়।
নাইট ক্লাবের পাশেই বড় পোষ্ট অফিস। তার পাশে একটা মাল্টিল্যাংগুয়েজ কোচিং সেন্টার। সেখানে বিকেলে রোজ মেয়েরা বিভিন্ন ভাষা শেখার ক্লাস করে। হরি, ক্যামেরা নিয়ে সেখানে যায়। ইংলিশ ক্লাশের বেশ কিছু মেয়ে হরিকে নাইট ক্লাবে ড্যান্স করতে দেখেছিল। তারা হরির সাথে আলাপ করার জন্য ঘিরে ধরে। তারা হরির ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়ে ছবি তোলার জন্য আবদার করল। হরি, মেয়েদের ফটো নেয়। দু’জন সুন্দরী, একজন অবিবাহিতা নাম কাজুকো ও তার বান্ধবী বিবাহিতা এক ইনজিনিয়ারের স্ত্রী। তারা হরির জাহাজ দেখতে চাইল। হরি জাহাজে তাদের ডিনারের জন্য আপ্যায়ন করল। পরের দিন ইংরেজী ক্লাশে কাজুকো তাদের লেডী টিচারকে হরি সম্বন্ধে বলে। হরির ব্যবহার, নাচ ও তার ইংলিশ কথা বলার ধরণে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে। লেডি টিচার হরিকে দেখতে চাইলেন। হরিকে ইংলিশ ক্লাসে নিয়ে আসার জন্য কাজুকোকে অনুরোধ করে। হরির ডাক পড়তেই সে ইংলিশ ক্লাসে যায়।
---------------------
ইংলিশ ক্লাসে হরিকে ডাকা হল… পড়ুন পরের ২৫তম পর্বে…
0 Comments.