ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ৪১)

আলাপ
বিশেষ প্রণাম : সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরকে
এই পর্ব থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য ঘরানারগুলির কথা লিখবো ভেবেছিলাম। এমন সময় ঘটলো ইন্দ্রপতন! সরস্বতী পুজোর বিসর্জনের দিন বিদায় নিলেন সরস্বতীর বরপুত্রী শ্রদ্ধেয়া লতা মঙ্গেশকর, যার সম্বন্ধে উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খান বলেছিলেন “কমবখত, কভি বেসুরী হি নহি গাতি!” অর্থাৎ যার গানের একটি স্বরও কখনো বেসুরো লাগতো না। স্বয়ং বড়ে গুলাম আলি খান সাহেব আদর করে যার সম্বন্ধে এমন কথা বলেছেন, তাঁকে ছাড়া কী করে সম্পূর্ণ হয় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কথা! তাই এই পর্ব নিবেদন করলাম লতা মঙ্গেশকরের দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব নিয়ে। যদিও তিনি মূলতঃ প্লে-ব্যাক সিঙ্গার ছিলেন, অর্থাৎ চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন, কিন্তু শুধু সেই জনারে কখনোই সীমাবদ্ধ করা যায় না তাঁর সঙ্গীত! অনেকেই জানেন না তিনি কী অসাধারণ বিশুদ্ধ খেয়াল গেয়েছেন, গেয়েছেন অজস্র অপূর্ব ভজন, গীত ও উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীত! এ ছাড়া তিনি যে সময় প্লে-ব্যাক শুরু করেন, তখন থেকে শুরু করে ষাটের দশক পর্যন্ত হিন্দী চলচ্চিত্রের গানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব ছিলো অত্যন্ত বেশী। তারপরেও আশির দশক পর্যন্ত লতাজী অনেক শাস্ত্রীয় রাগে নিবদ্ধ প্লে-ব্যাক গান গেয়েছেন। হিন্দী সিনেমার জগতে অনেক সুরকার ছিলেন, যাঁরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে শিক্ষিত, যেমন নৌশাদজী, শচীনদেব ও রাহুল দেববর্মন, মদনমোহন, রৌশন ও পরবর্তীকালে শিব-হরি, রবীন্দ্র জৈন প্রভৃতি। তাঁরা লতার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পারদর্শিতাকে অসম্ভব সুন্দর ভাবে ব্যবহার করে তৈরী করেছেন ভারতীয় রাগসঙ্গীতের ওপর নিবদ্ধ অজস্র সিনেমার গান যেগুলির প্রভাব থেকে আমরা আজও বেরোতে পারিনি। এখনো এগুলি সুর আমাদের এক অন্য জগতে নিয়ে যায়।
আমরা ভাবি লতাজীর কন্ঠ ঈশ্বরপ্রদত্ত। হয়তো খানিকটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছিল, কিন্তু মূলতঃ এমন কন্ঠ তৈরী হয়েছিলো নিরন্তর শাস্ত্রীয়সঙ্গীত সাধনা ও রিওয়াজের মধ্য দিয়ে। সঙ্গে ছিলো অসম্ভব শৃঙ্খলা ও দৃঢ় সংকল্প।
আসুন দেখে নেওয়া যাক কেমন ভাবে শুরু হয়েছিলো প্রদীপ জ্বলার আগে সলতে পাকানোর ইতিহাস। লতা মঙ্গেশকরজীর শাস্ত্রীয়সঙ্গীত সাধনা ও শিক্ষার কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলে নিতে হবে তাঁর পিতা পন্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরজীর কথা। ১৯০০ সালে পর্তুগীজ অধ্যুষিত গোয়ার মঙ্গেশী গ্রামে দীননাথজীর জন্ম হয়। কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন একজন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে দীননাথ মঙ্গেশকর বাবা মাশেলকরের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি গোয়ালিয়র ঘরানার পন্ডিত রামকৃষ্ণ বুয়া ভাজের জোরালো স্টাইলের অনুরক্ত হয়ে তাঁর গান্ডাবদ্ধ শিষ্য হন। এরপর তিনি বিকানীর যান এবং পন্ডিত সুখদেব প্রসাদের কাছে কিরানা ঘরানায়ও শিক্ষা করেন।
সেই সময় মহারাষ্ট্রে নাট্যসঙ্গীত খুবই বিখ্যাত ছিলো। দীননাথ মঙ্গেশকর মারাঠি থিয়েটারে অভিনয় করে, নাট্যসঙ্গীত গেয়ে যেটুকু উপার্জন করতেন তাই দিয়েই সংসার চলতো। তিনি বলবন্ত মন্ডলী বলে একটি নাট্য সঙ্গীত ও নাটকের দল তৈরী করেন। তাঁর সুন্দর চেহারা ও অপূর্ব কন্ঠের জন্য অল্প সময়েই সেই দল খুব জনপ্রিয় হয়। স্বয়ং বালগন্ধর্ব তাঁর নাট্য সঙ্গীতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তাঁর পায়ে পয়সায় মোড়া একটি কার্পেট ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তখনকার যুগে ওভাবেই পুরস্কৃত করার প্রচলন ছিলো।
দীননাথ মঙ্গেশকর দুবার বিবাহ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সেবন্তীর গর্ভেই জন্ম হয় তাঁর চার কন্যা ও এক পুত্রের। তাঁরাই হলেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, উষা মঙ্গেশকর এবং মীনা খাদিকর এবং হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর। প্রথম সন্তান লতার নাম ছোটবেলায় ছিলো হেমা। কিন্তু দীননাথজী আদর করে তাঁকে ডাকতেন লতা। সেই থেকে সেই নামটিই রয়ে গেলো এবং সে নামেই বিখ্যাত হলেন সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী।
লতার যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স, একদিন দীননাথজী ছাত্রদের গান শেখাচ্ছিলেন। তিনি পুরিয়া ধানেশ্রী রেওয়াজ করতে বলে কিছু কাজে ঘরে গেছিলেন। লতা কাছেই খেলে বেড়াচ্ছিলেন। একটি ছাত্র গাইতে গাইতে একটি স্বর বেসুরো লাগানোয় লতা গিয়ে তাঁকে একেবারে সঠিক সুরটি শিখিয়ে দেন। এতো ছোট মেয়ের গলায় এতো সুন্দর সুর শুনে অবাক হয়ে যান দীননাথজী। তিনি স্ত্রীকে ডেকে বলেন “দেখো, আমাদের ঘরে এক গায়িকা এসে গেছে! এ হবে আমার নতুন শিষ্যা”। এর পরেই সেই পুরিয়া ধানেশ্রী রাগই লতাজীকে শেখাতে শুরু করেন দীননাথজী।
মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকে লতাজীর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা শুরু হয় তাঁর পিতা দীননাথ মঙ্গেশকরের কাছে গোয়ালিয়র ঘরানার স্টাইলে। খুব ছোটবেলা থেকেই লতার গলা ছিলো বাঁশীর মতো সরু ও সুরেলা। রিনরিনে সেই গলা শুনেই দীননাথ বুঝেছিলেন যে এই মেয়েটির গান হবে। পরে আশা ভোঁসলেজী গল্প করেছেন, দিদি লতাকে খুব মন দিয়ে শেখাতেন বাবা দীননাথজী আর আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই রেওয়াজ শুনতেন তিনি। কিন্তু তাঁকে সেইভাবে শেখাতেন না বাবা। তাই দিদির ওপর খুব রাগ হতো আশাজীর। তাঁর স্কুলের পড়াশুনা খুব কম বয়সেই বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলে একদিন আপন মনে গান গাইছিলেন লতা। এক শিক্ষিকা তাঁকে বকে তাঁর গান থামিয়ে দেন এবং স্কুলে গান গাইতে বারণ করেন। সেই রাগে লতা স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দেন। লতা স্কুলে যেতে চাইতেন বোন আশাকে নিয়ে। কিন্তু স্কুলে তাঁকে বোনকে নিয়ে যেতেও দেওয়া হয়নি।
সেই সময় নাট্যসঙ্গীত জগতে দীননাথজীর বেশ নাম হয় এবং তিনি মহারাষ্ট্রের সাংলীতে এসে একটি বাড়ি করেন। বাড়িটি ছিলো বেশ বড়ো তিনতলা বাড়ি। সেখানে তেরোটি ঘর ছিলো। তাঁর বড়ো পরিবার ওপরের দুটি তলায় থাকতেন এবং নীচতলাটি বিভিন্ন পরিবারকে ভাড়া দেওয়া ছিলো।
লতাজী বলেছেন তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বন্দিশ শিখতে সবচেয়ে ভালোবাসতেন। যতগুলি পারেন বন্দিশ বাবার কাছ থেকে তুলে নিতেন। ছোট বয়সে আলাপ বা তানে তাঁর ততো মন ছিলো না। কিন্তু গলায় এমন সুর ছিলো যে অতি অল্প আয়াসেই, যখন চাইতেন অদ্ভুত সুন্দর তান বেরিয়ে আসতো গলা থেকে।
মাত্র নয় বছর বয়সে বাবার নাট্য সঙ্গীত দলে গান গাইতে শুরু করেন লতা। তাঁর বাবা সেবার শোলাপুরে অনুষ্ঠান করতে গেছেন। তিনি বায়না ধরেন তিনিও স্টেজে গাইবেন। দীননাথজী প্রথমে রাজী হননি। কিন্তু লতাজীর জেদের কাছে তাঁকে হার মানতে হয়। সেদিন তিনি রাগ খাম্বাবতী এবং দুটি মারাঠি গান করেন। প্রচুর হাততালি পেয়েছিলেন। তাঁর পরে তাঁর বাবা প্রায় সারারাত গান করেন। বাবার কোলে স্টেজেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন লতা।
সঙ্গীত শিক্ষা করার সময় বাবার একটি উপদেশ লতা সারাজীবন মনে রেখেছিলেন। তাঁর বাবা বলেছিলেন “যখন গুরুর সামনে গাইবে সব সময় ভাববে তোমাকে তাঁর চেয়েও ভালো গাইতে হবে। কখনো ভাববে না গুরুর সামনে কী করে গাইবো। তুমি যদি তাঁর গানকেও ছাড়িয়ে যেতে পারো তবেই তোমার শিক্ষা সার্থক হবে।“
কিন্তু এর পরেই নাট্যসঙ্গীতের কদর কমে যায়। শো কমে যেতে শুরু করে। টাকাপয়সার টানাটানিতে সংসার চলা মুশকিল হয়। এই সময়েই দীননাথজী অসুস্থ ও মদ্যাসক্ত হয়ে পড়েন। মাত্র ৪১ বছর বয়সে দীননাথজীর মৃত্যু হয়। লতা তখন সবে কিশোরী। অন্য ভাই বোনেরা আরো অনেক ছোট। তাঁদের সবার দায়িত্ব পড়ে লতার ওপর। সেই সময় তাঁদের পারিবারিক বন্ধু মাস্টার ভিনায়কজী, যার নবযুগ চিত্রপট নামে একটি ফিল্ম কোম্পানী ছিলো, মঙ্গেশকর পরিবারকে প্রচুর সাহায্য করেন। তিনিই লতাকে মাত্র তেরো বছর বয়সে মারাঠি সিনেমায় গান ও অভিনয় করার সুযোগ করে দেন।
১৯৪৫ সালে ভিনায়কজীর কোম্পানী বম্বেতে চলে গেলে, লতাও সেখানে চলে যান। সেই সময় বম্বেতে তিনি ভেন্ডিবাজার ঘরানার উস্তাদ আমান আলি ও আমানত আলি খানের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করেন এবং পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
১৯৪৮ সালে ভিনায়কজীর মৃত্যু হয়। তখন গুলাম হায়দর সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে লতাকে তৈরী করতে শুরু করেন। তিনি শশধর মুখার্জীর কাছে লতাকে নিয়ে যান। কিন্তু প্রথমে লতার গান তাঁর পছন্দ হয়নি। তিনি বলেন যে ফিল্মী গানের তুলনায় লতার গলা খুব পাতলা ও হালকা। এতে ভাব খেলবে না। মনে রাখতে হবে প্লে-ব্যাক সঙ্গীতে তখন বাজার মাতাচ্ছেন শামশাদ বেগম ও নুরজাহানের মতো শিল্পীরা, যাঁদের গলার আওয়াজ ছিলো অনেক ভারী। তাতে রুষ্ট হয়ে গুলাম হায়দার উত্তর দিয়েছিলেন যে এরপর এমন দিন আসবে যে অনেক প্রযোজক ও পরিচালককে লতার পায়ে পড়ে গান গাওয়ানোর জন্য ভিক্ষা চাইতে হবে। এরপর মজবুর ছবিতে তিনি লতাকে প্রথম সুযোগ করে দেন গান করার। কিন্তু সেই সিনেমায় তিনি নিজের সরু গলা পরিবর্তন করে নুরজাহানের স্টাইল নকল করে অপেক্ষাকৃত মোটা গলায় গান করেন। কিন্তু তাঁর এই গানটি হিট হওয়ায় তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কারো নকল না করে স্বকন্ঠে গাওয়া শুরু করেন ও নিজের স্টাইল তৈরী করেন। এরপর শুধুই লতার জয়যাত্রার পালা শুরু হয়। অসংখ্য সিনেমা, অসংখ্য ভালো গান। সেই ইতিহাস তো সবারই জানা, গানগুলিও অতি পরিচিত।
আমরা যেহেতু আলাপের পাতায় তাঁর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নির্ভর গানগুলির আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবো, তাই প্রধাণতঃ বলবো উনিশশো পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে নৌশাদজী, শংকর জয়কিষণ, মদনমোহনজী ও শচীনদেব বর্মনের সঙ্গে তাঁর জুটির কথা এবং সত্তরের দশকে রাহুল দেব বর্মন ও রবীন্দ্র জৈনের সঙ্গে লতার জুটিতে তৈরী অসাধারণ শাস্ত্রীয় রাগ নির্ভর গানগুলির কথা।
১৯৫২ সালে তৈরী হয় অসাধারণ একটি সাঙ্গীতিক হিট “বৈজু বাওড়া”। এতে নৌশাদজীর সুরে গান করেন লতা ও মহম্মদ রফি। সেখানে লতার গলায় বিখ্যাত হয় ভৈরব রাগে সেই উদাস করা বিরহের গান “মোহে ভুল গয়ে সাবরিয়া”। সিনেমায় গানটি কোন অবস্থায় ব্যবহৃত হবে সেই অনুযায়ী একটি রাগাশ্রয়ী গানকেও কতটা নরম করে মন ছুঁয়ে গাওয়া যায় তার উদাহরণ এই গানটি।
১৯৫৪ সালে লতা ও রফির জুটিতে নৌশাদজীর সুরে রাগ বসন্তবাহারে “মন কি বীণ মাতওয়ারী বাজে” অসাধারণ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা না থাকলে গাওয়া সম্ভব নয়। প্রায় এক দশকে তাঁরা একসঙ্গে তৈরী করেছিলেন অনেক অমর গান, যেমন ১৯৬৬ সালে দিল দিয়া দর্দ লিয়া ছবিতে মেঘমল্লারে “সাওন আয়ে ইয়া না আয়ে জিয়া যব ঝুমে সাওন হ্যায়”।
১৯৫৫ সালে সীমা ছবিতে শংকর জয়কিষনের সঙ্গে জুটিতে তৈরী হয় “মনমোহনা বড়ে ঝুঠে”। গানটি পুরোপুরি জয়জয়ন্তী রাগে আধারিত এবং গানটির শেষে অবিস্মরণীয় সাপাট তান করেন লতা। সেই তানের বিদ্যুত গতি, স্পষ্টতা, তীব্র সঠিক সুর যে কোন মার্গসঙ্গীত শিল্পীর পক্ষে ঈর্ষার বিষয়!
১৯৬০ সালে রিলিজ হওয়া সুপারহিট মুঘল-এ-আজম ছবিতে নৌশাদ তৈরী করলেন অপূর্ব ঠুংরী! মধুবালাজীর লিপে গারা রাগে আধারিত সেই ঠুংরী “মোহে পনঘট মে নন্দলাল ছেড় গয়ো রে” কি কেউ ভুলতে পারবে?
১৯৬০ সালে রাজ কাপুর বানান জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায়। এতে শংকর জয়কিষণের সুরে বসন্তমুখারী রাগে লতা গাইলেন “ও বসন্তি পবন পাগল না যা রে না যা রোকো কোঈ”
১৯৬১ সালে সলিল চৌধুরীর সুরে ছায়া সিনেমায় লতা গাইলেন বাহার রাগের একটি ছোট খেয়াল অবলম্বনে অপূর্ব গান “ছম ছম নাচত আয়ী বাহার”
শচীনদেব বর্মনজীর সুরে লতা গাইতে শুরু করেন ষাটের দশক থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত। তাঁদের জুটিতে তৈরী হয় অভিমান, গাইড ইত্যাদি অজস্র সঙ্গীতময় চলচ্চিত্র ও অনেক রাগাশ্রিত অমর সঙ্গীত, যেমন অভিমান ছবিতে “পিয়া বিনা পিয়া বিনা বাঁশীয়া বাজে না বাজে না” কিংবা গাইড ছবিতে “মোসে ছল কিয়ে যায়” অথবা ছোটে নবাব ছবিতে মালগুঞ্জি রাগে “ঘর আ যা ঘির আঈ বদরা সাবরিয়া”
১৯৭০ সালে দস্তক সিনেমায় রৌশনের সুরে লতা গাইলেন রাগ চারুকেশীতে আধারিত আর একটি অমর গান “বইয়াঁ না ধরো ও বালমা”
সত্তরের দশকে পিতা শচীনদেব বর্মনের থেকে সুরের যাদুদন্ড হাতে তুলে নিলেন পুত্র রাহুলদেব বর্মন। তাঁর সুরে লতা গাইলেন বেশ কিছু অমর রাগাশ্রয়ী গান। যেমন অমর প্রেম ছবিতে টোড়ি ও খমাজের ওপর “রয়না বিতি যায়” ও “বড়া নটখট হ্যায় রে কৃষ্ণ কানহাইয়া” কিংবা পরিচয় ছবিতে ইমন কল্যানের ওপর “বিতি না বিতায়ী রয়না”।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে লতা মঙ্গেশকরের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষাকে দারুণ ভাবে ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্র জৈন তাঁর রাম তেরি গঙ্গা মইলি ছবিতে “এক মীরা এক রাধা” গানটিতে। ব্যবহার করেছিলেন ভূপেন হাজারিকা রুদালী ছবিতে মিয়াঁ মল্লারে “ঝুটিমুটি মিতবা আওন বোলে” গানে। আরেকটি ব্যতিক্রমী সিনেমা লমহে। এতে শিবকুমার শর্মা ও হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার সুরে লতাজী গাইলেন একটি দাদরা “মোহে ছেড়ো না নন্দ কে লালা”
বিভিন্ন ছবিতে লতার রাগাশ্রয়ী গানের কথা বললেও প্রায় কয়েকশো গান হয়তো উঠে আসবে। সব তো তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই এবার চলে আসি লতা মঙ্গেশকরের কিছু নন-ফিল্মী গানে। ছায়াছবিতে ছাড়াও লতা মঙ্গেশকর কিছু অসাধারণ ভজন গেয়েছেন হিন্দী ও মারাঠী ভাষায়। এ ছাড়াও কিছু গীত ও গজল গেয়েছেন। এর বেশীরভাগগুলিরই সুর দিয়েছেন তাঁর ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরজী। লতার মতোই তাঁর ভাই হৃদয়নাথ এবং বোন আশা ভোঁসলেজী প্রত্যেকেরই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা এবং বেস অত্যন্ত শক্তিশালী। কিছু অসাধারণ সুরারোপ করেছেন হৃদয়নাথজী। তার মধ্যে অসম্ভব বিখ্যাত হয় লতাজীর মীরা ভজনগুলি, যার বেশীরভাগই মারাঠি ভাষায়, যেমন দরবারী কানাড়ায় আধারিত “মারারী গিরিধারী গোপাল দুসরো না কোয়া” কিংবা “সমহারো নন্দনন্দন” বা “কিনু সঙ্গ খেলুঁ হোলি”। আর একটি বিখ্যাত হিন্দী মীরা ভজন কৌশিধ্বনি রাগে আধারিত হৃদয়নাথজীর সুরে “উড় যা রে কাগা বন কা”। এ ছাড়াও আছে বেশ কিছু গীত ও গজল।
সিনেমার গান তাঁকে গোটা ভারতে বিখ্যাত করলেও মনে প্রাণে তিনি চেয়েছিলেন একজন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী হতে। বিভিন্ন সাক্ষাতকারে তিনি দুঃখ করে বলেছেন যে শুরু রুটি রুজির জন্য এবং ভাই বোনদের মানুষ করার জন্য তাঁকে সিনেমায় গান গাইতে হয়েছিলো। তা না হলে তিনি সবসময়েই বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গাইতেন। তাঁর মনে বিরাট খেদ ছিলো যে তিনি কখনো কোন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মেলনের স্টেজে বসে দু ঘন্টা বিশুদ্ধ খেয়াল গাইতে পারলেন না। সঙ্গীতের প্রতি কতোটা ভালোবাসা থাকলে গোটা ভারতবর্ষের ভালোবাসা পেয়ে, গোটা পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে, সারাজীবনে অজস্র পুরস্কার পেয়েও ভারতরত্ন লতা মঙ্গেশকর তাঁর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গায়নকেই জীবনের লক্ষ্য ছিলো বলে মনে করতে পারেন! খ্যাতি যশ অর্থ কোন কিছুই তাঁকে সেই আনন্দ দিতে পারেনি বলে তিনি মনে করেন, যা তাঁকে দিতে পারতো বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। একবিংশ শতকে তিনি নিজেকে স্টেজ ও সিনেমার গান থেকে সরিয়ে নিলেও বাড়িতে প্রতিদিন তাঁর দিন শুরু হতো তানপুরা নিয়ে রেওয়াজ করে। তাঁর খুব ইচ্ছা ছিলো আর একবার তিনি নিজের প্রিয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে ফিরে আসবেন জনতার দরবারে। কিন্তু অতিমারী ও বয়স তাঁর এই ইচ্ছাকে পূর্ণ হতে দিলো না। কিন্তু আমাদের মনের তানপুরায় চিরদিন বাজবে তাঁর সুমিষ্ট সুরেলা বলিষ্ঠ বিশিষ্ট সেই আওয়াজ যা তাঁকে অবিসংবাদী সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী করেছিলো।