বই-চর্চা তে অমিত চৌধুরী

মৃত্যুর জয়গান নয় জীবনগাঁথা

কবিতার জন্ম নাকি বিরহ বেদনায়। শেক্সপীয়র বলেন ‘ভালোবাসাময়’। ভালোবাসার সার্থকতা জানি-বিরহে দু’জন এক জায়গায় না থেকে দূরে থাকার মাধুর্যে। বলা যায়-মধুর যন্ত্রণাময়। কবি মানিক বৈরাগীর কাব্যগ্রন্থ ‘মৃত্যুর গান গাই’একুশের বইমেলা ২০২২ চট্টগ্রামের খড়িমাটি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

আমরা জানি যে, মদের নেশায় মাতাল না হয়ে উন্মাতাল শব্দতরঙ্গে আমেরিকার প্রখ্যাত কবি গ্রীন্সবার্গ একটি কাব্য লিখেছিলেন একরাতে। আর তাই বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্র প্রতিভার প্রতিদ্বন্দ্বীতুল্য কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘ভালবেসে হয়ে উঠি একা’। এসব কাব্যগাঁথাময় মানুষ মানবজীবনের জয়গাঁথাকে ‘বিরহে ও মিলনের’অম্লমধুর মাধুর্যে অনুভব করে থাকে। তার এ কাব্যের আগের বইটির নাম‘ছাইস্বর্ণ অম্লজলে’। এ গ্রন্থে তার বাঙ্গময়তার বাঁধনে নতুনত্ব ও উত্তরাধুনিকতার প্রয়োগ পৌরাণিক মিথের প্রয়োগেও অসাধারণ। মৃত্যু চেতনার যন্ত্রণাময় কবি যেনো Surrealism প্রভাবে ফরাসী কাব্যের গন্ধ শুঁকে নিচ্ছে নিজে ও বাঙালি কবিকুলকে দিয়েও। কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতার বই ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। অর্থাৎ কবি যেনো কাব্যের বই লেখার মাধ্যমে স্থির চিত্তে মানুষ হিসেবে আত্মত্যাগ করেছেন। দ্বিতীয় মৃত্যুর মানে কবির মৃত্যু হওয়ার মানে দ্বিতীয় মৃত্যু। মানুষ হিসেবে সাধারণ মৃত্যু হচ্ছে এটা। কবির ভাষ্যে আর তৃতীয় মৃত্যু হচ্ছে ‘আমিও চলে চলি-তৃতীয় মৃত্যুর দেশে’। সেটি কোনটি? প্রশ্নোত্তর সোজা। কবির জন্মভূমি মাতামুহুরীর ভাটির টানে। তাই কবি ভেসে চলেন মাতামুহুরীর টানে টানে। পুরোরাজ্য ঘুরে আসলেও কবি মানিক বৈরাগী নাড়ির টানে মাতামুহুরীর তীরে ফিরে আসে।
কবির ভাষায়-
নগর নীরব, নীল জোছনায় ডাকাত শীতের কামড়
সাদা কুয়াশায় ভিজে সুবেহ সাদিকের কর্পূর সুরভি মেখে
মাতামুহুরির ভাটির টানে, আমিও ভেসে চলি তৃতীয় মৃত্যুর দেশে।
কখনো কাঁদেনি বৃক্ষপাতা ঝরে গেলে
তবুও পলি জমে তলানিতে, চর জাগে বাস্তুহীনেরা স্বপ্ন দেখে
প্রতিদিনের ঝরাপাতা পলির স্তুপ জমে মনের অতলে
হৃদয় চরে ফুটেছে নীল ক্যাকটাস, স্বপ্ন দেখেনি কেহ
আমি শুধু স্বপ্ন দেখি চতুর্থ মৃত্যুর দেশ। ( মৃত্যুর গান গাই, ১, পৃ. ৭)।

সার্বিক বিবেচনায় গাছের ডাল কাটানো বৃক্ষও কাঁদে। কিন্তু তা ঝরে গেলে কাঁদে না বলে মনে হয়। আবার কবির চৈতন্যে নদীর বুকে উর্বর পলি যে এক সময় খালি হয়ে যাবে। রস ও নীল ক্যাক্টাস হলে স্বপ্ন দেখেনি এখনো। কেননা আকাশ মানে তো অসীমলোকের শূন্যতা। যার বিস্তীর্ণ সৌরলোক এজন্য বিশাল জলদীর মতো নীলাভ। স্বপ্নীল চোখ না হলে কী এটার সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়? কবির স্বপ্ন দেখা তাই-চতুর্থ মৃত্যুও দেশ-খুঁজে ফেরা। কেননা কবিরা এরকম দেখতে পারে। আত্মত্যাগের উৎকৃষ্ট উদাহরণ-জীবনানন্দ দাশ- ‘আট বছর আগের একদিন’। এ কবিতায় মৃত্যৃ চেতনার গানের স্বরে স্বপ্নভগ্ন হৃদয়ের আকুতি অবোধ মানুষের মত বোঝানোর জন্যই কাব্যমালার সৃষ্টি।
তৃতীয় অনুস্বরে অংশে যমদূত তথা আজরাইলকেই তো কাব্যিক গাথায় চমকে দিয়েছে কবি মানিক বৈরাগী। তার উচ্চারণ-
`আজরাইল সাহেব একটু দাঁড়ান
এখনো তার সঙ্গে আমার গল্প শেষ হয়নি।’

আজরাইলকে উপেক্ষার ছলে মানিকের উচ্চারণ-
`গোস্তাকি মাফ করবেন আমার
অন্যত্র তাড়া আছে
আচ্ছা যাও আমি ডাকবো (মৃত্যুর গান গাই, ৩, পৃ. ৯)

এখানে কবি যুদ্ধেও ভয়াবহতার বিরুদ্ধে এক কাতারে সামিল হওয়ার জন্য কাস্তে হাতুড়ির যুগল চাহিনি বাজিয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ‘এসো মৃতুর গান গাই’ঘোষণার জয় ঢংকা বাজিয়ে। তার চেতনায় বিপ্লবী আবুজর গিফারীর কলবের নফসে সিল মেরে বলতে পারেন ‘ম্যায় কুচভি নেহি, নেহি ইমানদার’(মৃত্যুর গান গাই, পৃ ১০)। এখানেও এ সত্য ধ্রুবসত্যে উপনীত। কেননা সৎ ইমানদার মানুষের সংখ্যা যদি বেশি হয়ে থাকে-তাহলে বিশ্বটাই হয় স্বর্গ নগরী। আর কাউকে নরক যন্ত্রণায় ভোগ করতে হবেনা হয়তো। গড়পরতা মানুষের মতো কবি এখানেই তার উচ্চারণের চারণধ্বনি-
‘আমি মানুষপ্রাণী, এ কারণে প্রাণসত্তা আলাদা, সেটা টের পায়
পৃথিবী, খোদা। খোদাকে শুধাই, তোমার পরীক্ষার ফল
প্রকাশিত হবে কবে? ইলহাম আসে ইথারেও, বাতাসে বাতাসে,
পাতালে আর ঊর্ধ্বে আচানক শিহরণ জাগে তণুমনে, আমি টের
পাই, আরো পরীক্ষণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করবে আমাকে। (মৃত্যুর গান গাই, ৫, পৃ-১১)।

আর স্পষ্ট করতে চায় কবির রাজনৈতিক চেতনাকে। তিনি উপলব্ধি করেন ছাত্র আন্দোলন থেকে, চৌরাস্তার মোড়ে ভাষ্কর্য নির্মাণ, অথবা নিজের হাতেই নিজের মিনার, ‘কিতাবি আদর্শে কীট মানুষের প্রপঞ্চক বক্তব্যে শ্রেণিসংগ্রাম, ক্রুসেড, জিহাদে বেড়েছে সংঘাত দেখতে দেখতে ‘কতো প্রাণ হলো বলিদান’(পৃ: ১২)। মিছিল মিটিং থেকে শিক্ষা নেয় রুশবিপ্লব পরবর্তী যুক্তবঙ্গের মানুষ ’ভঙ্গ দেশের দুই অংশে তাও ১৯২০/২২ এর দিকে। কাব্য হয়, হয় গল্প ও উপন্যাস। তলস্তয় কিংবা বাংলা সাহিত্যে শওকত ওসমানের কল্যাণের ‘জননী’ লেখা হয়। জননী জন্মভূমির বুকে তখন দেখা যাবে-‘কবির মৃত্যু হবে নিস্তব্ধ রূপালি জোসনা খচিত রাতে’। কবির ভাষায়-
‘আমার মরণ হবে নিঃসঙ্গ নিস্তব্ধ রূপালি জোসনাখচিত রাতে
পচা পুতিগন্ধে মুখরিত বাতাসে।
মোগলদের অরক্ষিত পানশালার পাশে নাচঘরের সাজোয়া
কামরায়। ভেজা শ্যাওলার পিচ্ছিল কার্পেটে বুলবুলের ললিত
নৃত্য মুদ্রা মুদ্রণ করছি বিষাক্ত গিরগিটির ছোবল খেতে খেতে। (মৃত্যুর গান গাই-৮, পৃ. ১৪)।
এভাবেও মানুষ পরলোকের সাঁকো পেরোতো চায়। এ চাওয়া মায়াকভস্কির স্বচৈতন্যে স্পষ্ট আত্মত্যাগের পিস্তল ছোঁড়া ধ্বনির ব্যাঞ্জনা শুনায়। এভাবে কবি চায় পরজন্মেও বেদন হতে। কবি মানিকের উপলব্ধি-
‘হে খোদা, আমার কাজ
বৃক্ষ হত্যা নয়। যার কাছে পাঠাও বারবার, তো মানুষ নয়,
বৃক্ষ। বৃক্ষের প্রাণহরণের কৌশল কী? জানিনা কীভাবে
বৃক্ষের জান কবজ করতে হয়।’

‘আবার যাও, যেখানে পাও ঐ বান্দার জান কবজ করে আসো।
তোমার যা যা দায়িত্ব তাই করো।’(মৃত্যুর গান গাই-১০, পৃ. ১৬)।

হুকুম তামিলে এসে দেখে বৃক্ষটি আর নাই কবিতা চত্বরে,
ওখানে গান গায় কোকিল, বাঁশি বাজায় হলুদিয়া পা্খি। (পৃ. ১৬)

বৃক্ষটির জন্য কাঁদছে প্রাণ, কাঁদছে তাই মৃত্যুর গান গেয়ে গেয়ে মৃত্যুবরণ করতে রাজি কবি। এ মৃত্যু কবিকে দেয় অমরত্ব।
##
মৃত্যুর গান গাই
মানিক বৈরাগী
ধরণ- কবিতা
প্রচ্ছদ – নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
মূল্য – ৫০টাকা
প্রকাশক – খড়িমাটি
প্রকাশ কাল – ২০২২ একুশের বইমেলা।

লেখক – কবি, সম্পাদক মূল্যায়ন।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!