সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৯)

পদাতিক

একবার যখন শিশুটিকে নিয়ে ওর গৃহপালিকার ঘর থেকে বের করে নিয়ে এসেছেন, তখন যে আর কিছুই করার নেই, সেটা যতক্ষণে বুঝলেন, তখন আর কিছুই করার নেই। তখন তিনি ঘরের দোরগোড়ায়।
ঘরে এসেই আর এক মূহুর্তের জন্যও দেরী করলেন না। ঘরের কেউ কোনোকিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়লেন। পুড়ে যাওয়া ক্ষতস্থানে পরম মমতায় মলম লাগানো শুরু করে দিলেন। ব্যাস, এটাই যেন মন্ত্রের মতো কাজে দিলো। দগদগে ক্ষত দেখে তাঁর স্ত্রীও বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। হাত লাগালেন বলরামবাবুর সাথে। পরম যত্নে-মমতায় শিশুটির ক্ষত নিরাময়ে হাত লাগালেন।
ব্যাস। এবারেও জিতে গেলেন বলরাম করণ। ক্রমেক্রমে তার কাঁচা মাটির ইটের ওপরকার খড়ের চালাটা হয়ে উঠতে লাগলো একটা মন্দির। অনাথ, আর্ত, পিতৃমাতৃহীন শিশুদের নিশ্চিন্ত নির্ভয় আবাস। গ্রামের মানুষজন প্রথমে বাঁকা চোখে চাইলেও ধীরেধীরে বুঝবার চেষ্টা করতে শুরু করলেন যে তাদের পড়শি এই মানুষটি কি সত্যিই একজন প্রকৃত দরদী মনের মালিক না কি অন্যকোনো মতলব আছে মানুষটার মনে।

কথায় বলে উদ্দেশ্যে মহৎ হলে উদ্যোগীর দিকে স্বয়ং ঈশ্বর তার হাত প্রসারিত করেন। এখানে সেটাই প্রমাণিত হলো। ততদিনে দুজন থেকে তিনজন, তিন থেকে পাঁচ, পাঁচ থেকে সাত। তিনি যে সামাজিক এন জি ও টিতে কাজ করতেন, তারা ওঁর এই প্রচেষ্টা দেখে বেতন বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টাকা করলেন। কিন্তু তাতেই বা কী? বৌদি সকাল সকাল বাচ্চাদের জন্য সেদ্ধ চাল ফুটিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজে যেতেন। ঠিকে কাজ, গোয়াল পরিষ্কার করা, ধান কোটা আরও সব কাজ। কিন্তু রোজই যে চালটুকু অন্তত ঘরে থাকতো সে নিশ্চয়তা ছিলো না। এই সময়গুলোতে ঈশ্বরেরা এগিয়ে আসতেন। চালটুকু, কখন সেদ্ধ করার জন্য সামান্য সবজি বা ডাল, কখনোবা মশলাপাতি, তেল পৌঁছে দেওয়া শুরু করলেন বৌদির হেঁসেলে।

ধীরেধীরে আশেপাশের গাঁগঞ্জের মানুষেরাও যৎসামান্য কিছু কাঁচা সবজি, চাল, তেল পৌঁছে দেওয়া শুরু করলেন।

এদিকে বলরামবাবুর বাবা ঈশ্বর খগেন্দ্র নাথ করণ একটা কাজ করে বসলেন। সাতজন অনাথ শিশু, তাঁর সমস্ত নাতি নাতনি ও পাড়াপড়শির শিশুদের পড়াশোনা ও মানসিক বিকাশের লক্ষে একটি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করে বসলেন।

ক্রমশ

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!