আজকের লেখায় ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

কান্না হাসির দোল দোলানো পৌষফাগুনের পালা

শীতের দিনে নামল বাদল,
​​ বসল তবু মেলা।
বিকেল বেলায় ভিড় জমেছে,
​​ ভাঙল সকাল বেলা।
শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা? করোনার আবহে এবছর এই মেলা মানুষের মনে গল্পের মতই হয়ে থাকল। পৌষ উৎসব পালিত হলেও এ বার পৌষমেলা হবে না শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতীর কোর্ট কমিটির বৈঠকে এমনই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
যদিও এ মেলার শুরুর গল্প কিন্তু শান্তিনিকেতনে নয়। কলকাতার কাছেই গোরিটির বাগানে। ৭ পৌষ দিনটি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জীবনে এক অতীব স্মরণীয় পুণ্যদিন, তাঁর দীক্ষার দিন। ১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ অর্থাৎ ২১ ডিসেম্বর ১৮৪৩ দেবেন্দ্রনাথ কুড়িজন অনুরাগী নিয়ে রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। তাঁরই প্রয়াসে দু-বছরে প্রায় পাঁচশ জন ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষাগ্রহণ করেন। আনন্দিত দেবেন্দ্রনাথ পলতার পরপারে তাঁর গোরিটির বাগানে ব্রাহ্ম বন্ধুদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করেন। ৮/৯ টি বোটে করে সকলে ওই বাগানে যায়, প্রাত:কালে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মের জয়ধ্বনি আরম্ভ করে। এ ভাবেই শুরু হল পৌষমেলার। নিজের আত্মজীবনীতে লিখছেনও সে স্মৃতি। ‘‘তখন ব্রাহ্মের সহিত ব্রাহ্মের আশ্চর্য্য হৃদয়ের মিল ছিল। সহোদর ভাইয়ে ভাইয়েও এমন মিল দেখা যায় না। যখন ব্রাহ্মদের মধ্যে পরস্পরের এমন সৌহার্দ্য দেখিলাম, তখন আমার মনে বড়ই আহ্লাদ হইল। আমি মনে করিলাম যে, নগরের বাহিরে প্রশস্ত ক্ষেত্রে ইঁহাদের প্রতি পৌষমাসে একটা মেলা হইলে ভাল হয়।সেখানে পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ -সদ্ভাববৃদ্ধি ও ধর্ম্ম বিষয়ে আলোচনা হইয়া সকলের উন্নতি হইতে থাকিবে। আমি এই উদ্দেশে ১৭৬৭ শকের ৭ই পৌষ পলতার পরপারে আমার গেরিটির বাগানে সকলকে নিমন্ত্রণ করি। … ইহাতে ব্রাহ্মদের একটি মহোৎসব হইয়াছিল।’’ …
এই প্রথম মেলার সতের বছর পর ১৮৬২ সালের ফ্রেব্রুয়ারি- মার্চ নাগাদ শান্তিনিকেতন আশ্রমের সূচনা, ছাতিমতলায় পেলেন প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি। ১৮৬৩ সালের ১লা মার্চ জমি বন্দোবস্ত হল, আশ্রম প্রতিষ্ঠা হল। তখন দেবেন্দ্র নির্দেশ করলেন — ধর্মভাব উদ্দীপনের জন্য ট্রাষ্টীরা বছরে বছরে একটি মেলা বসাবার চেষ্টা ও উদ্যোগ করবেন। এ মেলায় প্রতিমা পূজো হবে না, কুৎসিত আমোদ-উল্লাস হবে না, মদ মাংস ছাড়া সব ধরনের জিনিস কেনা বেচা চলবে। আয়ের টাকায় আশ্রমের উন্নতির কাজ করা হবে। শান্তিনিকেতনে উপাসনা মন্দির হল ১৮৯৫ তে, পৌষ উৎসব চালু হল, তবে মেলা তার পরে। প্রথম পৌষ উৎসব ও মন্দির প্রতিষ্ঠার বর্ণনা পাওয়া যায় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। ৭ পৌষের সকালে সঙ্কীর্তন আরম্ভ হল। শ্রদ্ধাভক্তি সহকারে সবাই শান্তিনিকেতন বাড়ি থেকে মন্দিরের দিকে যেতে লাগল। বেহালা থেকে আগত ব্রাহ্মবন্ধুরা মৃদঙ্গ বাজিয়ে গাইতে লাগল — ‘প্রাণ ভরে গান কর, ভবে ত্রাণ পাবে আর নাহি ভয়’।
১৮৯৪ সালে ২১ ডিসেম্বরে প্রথম পৌষমেলার বিবরণে বলা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে মঙ্গলগীত গাইতে গাইতে সবাই মন্দির প্রদক্ষিণ করল। পরে আচার্যরা বেদী গ্রহণ করল, ক্ষিতীন্দ্র সবাইকে স্বাগত জানালেনন। এরপর হেমচন্দ্রের বক্তৃতা পাঠ, সঙ্গে প্রধান আচার্যের উপদেশ পাঠ, তারপর চিন্তামণির প্রার্থনা। তারপর গান ও সমাপ্তি। মন্দিরের সিঁড়িতে বহুসংখ্যক ভোজ্য সুসজ্জিত ছিল। রবীন্দ্রনাথ সেখানে দাঁড়িয়ে ভোজ্য উৎসর্গ করলেন, সবস্ত্র ভোজ্য অনাথ দীন দু:খী আতুরদের দেওয়া হল। দুপুরবেলায় দোকান বসল, স্থানীয় লোক ভিড় করল। এ সময় রাজা হরিশচন্দ্রের উপাখ্যান গীত হল। সন্ধ্যা নামল। সান্ধ্য উপাসনা উদ্বোধন করলেন প্রিয়নাথ শাস্ত্রী ও তারপর অন্যান্যদের বক্তৃতা। এরপর আতসবাজি। তারপর চটচটা শব্দে বহ্নুৎসব। লোকদের মধ্যে মহাকোলাহল।
১৯০১-এ স্থাপন হয়েছিল ব্রহ্মবিদ্যালয়। তারপর মেলা। ব্যাপক কেনাবেচা। বাউল সম্প্রদায় নানা স্থানে নাচগান করছে। ব্যাপক ভিড়। কতকগুলো বালক ক্ষৌমবস্ত্র পরিধান করে বসে আছে। প্রথমে সত্যেন্দ্র বিদ্যালয় সম্বন্ধে কিছু বললেন। পরে রবীন্দ্রনাথ ছাত্রদের ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত করলেন। বেলা শেষ হল, কাচনির্মিত মন্দিরে আলো জ্বলে উঠল। আলোকছটায় ঘরের নানা বর্ণ উদ্ভাসিত। ১৯০৪ এর মেলার বর্ণনা — দুপুরে মেলা শুরু, স্থানীয় দ্রব্যাদির যথেষ্ট ক্রয় বিক্রয়। দীন হীন দরিদ্রেরা অন্নবস্ত্র পেয়ে উল্লসিত। রাতে বিপুল বহ্নুৎসব। এ মেলায় আপত্তিকর কিছু নেই। আদিপর্বের এ মেলার বৈশিষ্ট্য ৪টি — কলকাতা আগত ব্রাহ্মনেতাদের পরিচালনায় মন্দিরে সকাল সন্ধ্যায় ব্রহ্মোপাসনা। দীন দরিদ্রদের অন্নবস্ত্র দান। যাত্রাভিনয়, বাউল গান, কীর্তন, আতসবাজি।
মহর্ষি প্রয়াণের পর রবীন্দ্রনাথ এই ত্রিদিবসের রূপকার। শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা প্রথম বসল ১৮৯৪ সালে, ৭ পৌষ, মন্দিরের পাশের মাঠে ও ছাতিমতলার ছায়ায়। উৎসবের সূচনা হয় বৈতালিক গানে। গাওয়া হয় —
আজি যত তারা তব আকাশে
সবে মোর প্রাণ ভরি প্রকাশে ॥
নিখিল তোমার এসেছে ছুটিয়া, মোর মাঝে আজি পড়েছে টুটিয়া হে,
তব নিকুঞ্জের মঞ্জরী যত আমারি অঙ্গে বিকাশে ॥
মন্দিরের সোপানে দাঁড়িয়ে অনাথ আতুরদের বস্ত্র ভোজ্য উৎসর্গ। উপাসনায় তাঁর ভাষণ। ‘শান্তিনিকেতন’ গ্রন্থমালায় রবীন্দ্র ভাষণগুলি সংকলিত-
“শান্তিনিকেতনের সাম্বৎসরিক উৎসবের সফলতার মর্মস্থান যদি উদঘাটন করে দেখি, তবে দেখতে পাব, এর মধ্যে সেই বীজ অমর হয়ে আছে, যে বীজ থেকে এই আশ্রম-বনস্পতি জন্মলাভ করেছে, সে হচ্ছে সেই দীক্ষাগ্রহণের বীজ”। … মহর্ষির জীবনের একটি ৭ পৌষকে সেই প্রাণস্বরূপ অমৃতপুরুষ একদিন নি:শব্দে স্পর্শ করে গিয়েছেন, তার উপরে আর মৃত্যুর অধিকার রইল না।
শুধু ভাষণ বা বক্তৃতা নয়, চিঠিপত্রেও আছে এই পৌষপার্বণ সম্পর্কে কবির শ্রদ্ধা ও অনুরাগ। অজিতকুমার চক্রবর্তীকে তিনি লেখেন, –
কল্যানীয়েষু
508, W. High Street, Urbana, Illinois, U. S. A.
‘আজ ৭ই পৌষ। কাল সন্ধ্যার সময় যখন একলা আমার শোবার ঘরে আলো জ্বালিয়ে বসলুম আমার বুকের মধ্যে এমন একটা বেদনা বোধ হতে লাগল সে আমি বলতে পারিনে, সে বেদনা শরীরের কি মনের তা জানিনে, কিন্তু আমাকে ব্যাকুল করে তুললে। তখন আমার মনে পড়ল ঠিক সেই সময়ে তোমাদের ভোরের বেলার উৎসব আরম্ভ হয়েছে। কেননা এখনকার সঙ্গে তোমাদের সময়ের প্রায় বারো ঘন্টা তফাৎ। তোমাদের সমস্ত উৎসব আমার হৃদয়কে বোধ হয় আকর্ষণ করছিল। কাল রাত্রে ঘুম থেকে প্রায় মাঝে-মাঝে জেগে উঠে ব্যথা বোধ করছিলুম। স্বপ্ন দেখলুম, তোমাদের সকালকার উৎসব আরম্ভ হয়েছে। আমি যেন এখান থেকে সেখানে গিয়ে পৌঁছেছি, কিন্তু কেউ জানে না। তুমি তখন গান গাচ্ছ, –
জাগো সকলে (এবে) অমৃতের অধিকারী।
নয়ন খুলিয়া দেখ করুণানিধান, পাপতাপহারী
পুরব-অরুণ-জ্যোতি মহিমা প্রচারে,
বিহগ যশ গায় তাহারি।
আমি মন্দিরের উত্তর বারান্দা দিয়ে আস্তে আস্তে ছায়ার মতো যাচ্ছি তোমাদের পিছনে গিয়ে বসব, তোমরা কেউ কেউ টের পেয়ে আশ্চর্য হয়ে উঠেছ। এমনতরো সুস্পষ্ট স্বপ্ন আমি অনেকদিন দেখিনি, জেগে উঠে ঐ গানটা আমার মনে স্পষ্ট বাজতে লাগল। হায়রে, এদেশে কি তেমন সকাল হয় না?’’
মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে
একেলা রয়েছ নীরব শয়ন-‘পরে–
প্রিয়তম হে, জাগো জাগো জাগো ॥
‘প্রিয় রাণু’কে লিখছেন তার স্কুলের প্রাইজের মজার খবরের জবাবে, ‘‘তোমাদের প্রাইজে কত লোক জমা হয়েছিল? পঞ্চাশ জন? কিন্তু আমাদের এখানে মেলায় অন্ততঃ দশ হাজার লোক তো হয়েইছিল।… এখানকার মাঠে যা চিৎকার হয়েছিল তাতে কত রকমেরই আওয়াজ মিলেছিল, তার কি সংখ্যা ছিল। ছোটো ছেলের কান্না, বড়োদের হাঁকডাক, ডুগডুগির বাদ্য, গোরুর গাড়ির ক্যাঁচকোঁচ, যাত্রার দলের চিৎকার, তুবড়িবাজির সোঁ সোঁ, পটকার ফুটফাট, পুলিশ-চৌকিদারের হৈ হৈ, হাসি, কান্না, গান, চেঁচামেচি, ঝগড়া ইত্যাদি ইত্যাদি।’’
আশ্রমের প্রথম যুগের ছাত্র সুধীরঞ্জন দাস লিখছেন — ‘সাতই পৌষের দিন তিনেক আগে থাকতেই লোক সমাগম শুরু হল। কতদূর গ্রাম থেকে গোরুর গাড়িতে পসরা বোঝাই করে কত দোকানী পসারী আসতে লাগল। কত রকমের হাঁড়ী কলসী – কোনোটা বা লাল, কোনোটা বা কালো। … সন্ধ্যার সময় মন্দিরে উপাসনা করলেন গুরুদেব। রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর ছোট ছোট দল বেঁধে এক একজন মাস্টার মশায়ের তত্ত্বাবধানে ছেলেরা বাজি দেখতে গেল। তখনকার দিনে বাজি পোড়ানো হত রতনকুঠির উত্তর পুব দিকে। অনেক রাতে প্রাক্‌ কুটিরে ফিরে এসে হাতমুখ ধুয়ে শুয়ে পড়া গেল।
আরেক প্রাক্তনী, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মা লিখছেন, ‘‘৭ই পৌষের ভোর চারটায় দিনেন্দ্রনাথের পরিচালনায় বৈতালিক গানের দল গান গেয়ে আশ্রম প্রদক্ষিণ করত। দিনুবাবুর দরাজ কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসত সকলের মিলিত কণ্ঠস্বরের ঊর্ধ্বে। আমরা কয়েকজন উৎসাহী ছাত্র বৈতালিকের আগেই শেষ রাত্রির অন্ধকারে কুয়ো থেকে জল তুলে স্নান করে নিতাম।’’
প্রমথনাথ বিশী তাঁর ৭ই পৌষের উৎসবের বিবরণে লেখেন — ‘‘সন্ধ্যার সময়ে মেলার ভিড় এত বাড়িয়া উঠিত যে, তাহা সংযত করার সাধ্য রায়পুরের রবিসিংহ ছাড়া আর কাহারো ছিল না। হাঁ, জনতা সংযত কবিবার মতো চেহারা বটে! রবিসিংহের ধুতি লাল, চাদর লাল, পাগড়ি লাল, চক্ষুদুটোও যেন লাল। পুলিশের তো শুধু পাগড়ি লাল। এই শক্তি-পুরুষ বেত হাতে সপাসপ জনতাকে আঘাত করিয়া চলিয়াছেন, জনতা শশব্যস্ত হইয়া আত্মনিয়ন্ত্রণ করিতেছে।… রবিসিংহ আধুনিক ডিরেক্টরদের অখ্যাত পূর্বপুরুষ।’’
শুধুই স্মৃতির মেলা, তিন দিনের স্মৃতির সংসার! সেই যে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “এই মেলাই আমাদের দেশে বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহ্বান করে। এই উৎসবে পল্লী আপনার সমস্ত সংকীর্ণতা বিস্মৃত হয় — তাহার হৃদয় খুলিয়া দান করিবার ও গ্রহণ করিবার এই প্রধান উপলক্ষ্য। … এইখানেই দেশের মন পাইবার প্রকৃত অবকাশ ঘটে”।
রবীন্দ্র ভাবনা অনুসরণ করেই শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা চলেছে বহুবছর ধরে। তবে, এ সবই আজ ইতিহাস হতে চলেছে। দশকের পর দশক ধরে শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী যে মানবতার, সৌভ্রাতৃত্বের আদর্শ তুলে ধরেছে, যার আকর্ষণে ছুটে আসেন দেশ-দেশান্তরের মানুষ, এবার করোনার আবহে তা বন্ধ হতে বসেছে। এর আগে মেলা বন্ধ হয়েছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়, ৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়। দুর্ভিক্ষ, হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা ইত্যাদির প্রতিক্রিয়া পড়েছিল পৌষমেলার ওপর। ৪১ সালের মেলা প্রাণহীন হয়েছিল, দোকান পসরা তেমন বসেনি। ‘সাহিত্যিকা’ চা জলখাবার দোকানের লভ্যাংশ পাঠিয়েছিল মেদিনীপুরের বন্যার্তদের ত্রাণভাণ্ডারে। ৪৩ সালে ৪৬ সালে দুর্ভিক্ষ বা দাঙ্গার কারণে মেলা বন্ধ ছিল। ৪৪ সালে ৮ তারিখে বার্ষিক সভার সঙ্গে বিশ্বভারতীর সমাবর্তন চালু হয়। আস্তে আস্তে মেলা প্রসারিত হল ৩দিন ও ৩ রাত্রে। ৫১ সালে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়রূপে স্বীকৃতি পাবার পর বিশ্বভারতীর জীবনে দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে, পৌষমেলায় ভিড় বাড়ে। ১৯৫০ থেকে ৭ পৌষের উপাসনা ব্রহ্ম-মন্দিরের পরিবর্তে ছাতিমতলায় স্থানান্তরিত হয়। ৬১ সালে মেলা চলে যায় মন্দির সংলগ্ন মাঠ থেকে পূর্বপল্লীর মাঠে। কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর ৮ পৌষের সমাবর্তনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তথা বিশ্বভারতীর আচার্য। ৬৭ তে ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে আম্রকুঞ্জে বোমা বিস্ফোরণ হলে পৌষ উৎসবে সমাবর্তন বন্ধ করা হয়। রবীন্দ্র তিরোধানের পর অনুষ্ঠানসূচীতে নূতনত্ব হল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ স্মারক বক্তৃতা। ৮ পৌষ বিকেলে বেদ উপনিষদ প্রসঙ্গে বক্তৃতা। ভিড় ক্রমবর্ধমান হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের হলঘর, ক্লাসরুমে খড় তেরপল শতরঞ্চি বিছিয়ে বহিরাগতদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এককালে তাঁবু খাটানো হত। এছাড়া অনেক অস্থায়ী হোটেল গড়ে ওঠে।
আজ শান্তিনিকেতনের পৌষমেলার খ্যাতি ছড়িয়ে গেছে বঙ্গভূমি থেকে বিশ্বভূমিতে। মানুষ আসছে নানা ভারতীয় অঞ্চল থেকে, বিদেশীদের আগমন চোখে না পড়ে পারে না। কেন্দ্রভূমিতে আছেন রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্র পরিমণ্ডল, বিশ্বভারতীর অভিনব শিক্ষাদর্শ — এ কথা আজ মুষ্টিমেয় মানুষের চেতনায় বিরাজ করে। আশা করা যায় এই চেতনার অবলুপ্তি ঘটবে না।

ঋণঃ রবীন্দ্ররচনাবলী। রবিজীবনী – প্রশান্ত কুমার পাল। রবীন্দ্র জীবনকথা: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। ব্রহ্মবিদ্যালয় – অজিতকুমার চক্রবর্তী। চিঠিপত্র।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!