দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৪৫)

পর্ব – ১৪৫

শশাঙ্ক পাল মেয়েকে বললেন, ওসব বাদ দে। পার্ল কি যেন মহিলার ব‍্যাপারে  কি বলছিস?
শ‍্যামলী বলল, বাবা, পার্ল সিডেনস্ট্রিকার বাক যে সে মহিলা নন। সাহিত্যে নোবেলজয়ী মহিলা। গুড আর্থ নামে অসাধারণ একটা ব‌ই লিখেছেন।
শশাঙ্ক পাল অধৈর্য হয়ে বললেন, তো বিয়ের ব‍্যাপারে তুই ওঁর কথা যে তুলছিস, তার কারণটা কি?
সন্ধ‍্যা দিয়ে এসে বাসন্তীবালা সোফায় বসতে বসতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমারও যেমন! ওর সাথে কথা বলা মানেই সময় নষ্ট। এত রকম হাবিজাবি কথা একটার পর একটা বলে যাবে যে তোমার নিজের কাজ সব ডুবে যাবে।
শশাঙ্ক পাল স্ত্রীকে বললেন, তুমি সবিতাকে বলো চা আনতে।
তখনই সবিতা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। সাথে মুড়ি, বেগুনি।
শশাঙ্ক বললেন, তুই এত কিছু একসাথে নিয়ে উঠলি যে বড়? পড়ে গেলে কে দেখবে?
সবিতা বললেন, ওমা, পড়ে যাব কেন, দিনের মধ্যে পাঁচশো বার উঠছি নামছি। ওরে শ‍্যামলিমা, বেগুনিগুলো বাবাকে দে না?
বাসন্তীবালা বললেন, হ‍্যাঁ রে, ছেলেদুটোকে জলখাবার দিয়েছিস?
সবিতা বললেন, বৌরাণী, তাদেরকে না দিয়ে কোনো দিন কাউকে কিচু দিইচি?
শশাঙ্ক পাল বললেন, আমি বেগুনি খাব না যা।
সবিতা ম্লান মুখে বলল, শীতের দিনে বাজারে এই বড় বড় বেগুন উঠেছে। পুড়িয়ে খেতেও ভালো। তা দুটো না হয় খেলেই।
বাসন্তীবালা বললেন, তা তোর দাদা সামলে সুমলে চলতে চায় তো চলুক না। কি থেকে কী হয়? তেলেভাজা জিনিসটা তো সুবিধার নয়!
বেগুনির প্লেট সরিয়ে দিয়ে একমুঠো শুকনো মুড়ি মুখে দিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে শশাঙ্ক বললেন, তো ভদ্রমহিলার কী কথা বলতে চাচ্ছিস?
শ‍্যামলী বলল, আমেরিকার কলেজে ওঁর পড়াশুনা। জাতেও আমেরিকান। ওঁর বাবা ছিলেন খ্রীস্টধর্মের ঝানু প্রচারক। লোকটার সংসারে মন ছিল না। সর্বদা ধর্মপ্রচারের কাজে ব‍্যস্ত। পার্লের মা বেশিরভাগ সময়ই একা একা সংসার টানতে বাধ‍্য হয়েছেন।
বাসন্তীবালা বললেন, এই গল্পটা বলার জন‍্য তোর বাবাকে আমেরিকা দেখাস্ না। এ তো ওঁর নিজের ঘরের গল্প। সারাদিন কুলি সেজে তেল কালি মেখে ভূতের মতো খাটত। তখন তোরা কচি। একটু রাত হলো কি তনু কান্না জুড়ত, বাপি ক‌ই? তুই ছোটো ছিলি। অতো বুঝতে পারতিস না। মুখের মধ্যে বুকটা গুঁজে দিলে তোকে নিয়ে আর ভাবতে হত না। তখনও অতনু পেটে আসেনি। একদিন খাট থেকে শান্তু লাফিয়ে পড়ে জিভ কেটে ফেলল। উঃ, সে কি উপুঝন্তি রক্ত। তখনও বাড়িতে ফোন আসতে অনেক দেরি। আমি অতো রক্ত দেখে ভয় পেয়ে গেছি। হে ঠাকুর কি করলে তুমি! মানুষটাকে শিগগির পাঠিয়ে দাও।
রাত এগারোটার পরে ফিরল তোর বাপ। পকেট থেকে অনেকগুলো টাকা বের করে বলল, আলমারিতে রেখে দাও। তখন তোরা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গিয়েছিস।
হা ক্লান্ত মানুষটাকে আর কিছু বলতে ইচ্ছে করে নি। সকালে উঠে দেখি ভগবানের দয়ায় শান্তুর জিভ অনেকটা ঠিক হয়ে গিয়েছে। তোর বাবার সে সব খোঁজ নেই। সকালে উঠেই দৌড়েছে গ‍্যারাজে। বাড়ির লোকজন কি খাবে, কেমন আছে, তাকানোর ফুরসৎটুকু নেই।  কাউকে দিয়ে ব‍্যাগ ভরতি করে বাজারটা পাঠিয়ে দিত। তারপর সারাদিন আর খবর নেই। রাত্রে ফিরে একটাই কথা। মুঠোয় ভরতি টাকা আমার হাতে দিয়ে বলত, আলমারিতে গুছিয়ে রাখো। ব‍্যস্, স্বামীর কর্তব‍্য হয়ে গেল। কেমন আছো , কিভাবে চলছে, কোনো কথা বলার সময় নেই। খেতে খেতেই ঘুমিয়ে পড়তে চাইত।  কান বললে ঘুমের ঘোরে ধান শুনত। ওই মানুষের সঙ্গে কথা বলবে কে? আমার দুঃখ আমি বুকে চেপে চেপে রেখে দিয়েছি।
সবিতা গালে হাত দিয়ে বলল, বৌরাণী, এই গল্পটা তুমি আমাকে সাড়ে তিনশো বার শুনিয়েছ। আমি বলে কিছু বলি না। স্বামী স্ত্রীর নিজেদের কথা, আমি বেওয়া মানুষ, কোন্ লজ্জায় আমি কিছু বলব? কিন্তু ভেবে দেখো, দাদা আমার রোজ বাজার করে পাঠিয়ে দিয়েছে। খাবারের কষ্ট নেই। যা ইচ্ছা খাও। টাটকা মাছ আর  দুধ রোজ। আর মুঠো মুঠো টাকা রোজগার করে এনে ব‌উয়ের হাতে তুলে দেওয়া। এরপর তুমি খুব কষ্ট পেয়েছি বললে, আমি কিছুই বলব না।
বাসন্তীবালা বললেন, শুধুমাত্র পেটে খেতে পেলেই মিটে গেল? টাকা নিয়ে আমি মেয়েমানুষ কি করব শুনি? আমি কোনোদিন বাইরে একা গিইচি?
সবিতা ছাড়বে কেন! সে বলে বসল, আমার দাদাটা সব গুছিয়ে পাঠিয়ে দিত, মাছটা রে, দুধটা রে, ফলটা রে, সব। তাই তোমার বাইরে বেরোনোর দরকারটাই পড়ত না। যাদের স্বামী হাতে করে কিছু আনে না, বৌকে ঝি খাটতে যেতে হয়, তারপরেও বৌয়ের টাকা ক’টা কেড়ে নিয়ে বর নেশা করতে যায়। এসে বৌকে বাপ মা তুলে গালাগালি করে। রুখে দাঁড়ালে যেমনটা খুশি তেমনি করে পেটায়, তেমন হাতে তো পড়ো নি। আমার দাদার খু়ঁত তো তুমি ধরবেই।
শশাঙ্ক সবিতাকে ধমক দিলেন। তুই চুপ করবি? মেয়েটা একটা দরকারি কথা বলছে, তো তোরা ভ‍্যাজরম ভ‍্যাজরম শুরু করলি।
সবিতা বললেন, তোমার মেয়ে সেই ছোটবেলায় ইংরেজি ছড়া বলত। পুষি বেড়াল বিলেতে গিয়ে রাণী দেখতে গিয়েছে , আর কি দেখে এলে জিজ্ঞেস করলে বলছে, রাণীর চেয়ারের নিচে একটা নেংটি ইঁদুর দেখে এসেছে। আহাহা,  খরচাপাতি করে বিলেতে গিয়ে বাছা আমার নেংটি ইঁদুর দেখে এলেন। এই হল তোমার মেয়ের গল্প। হাবিজাবি কত কি বলে যাবে। আসলে স‌অব সাতবাসি  জানা কথা। চেয়ারের নিচে লুকিয়ে থাকা নেংটি ইঁদুরের ব‍্যাখ‍্যান।
শশাঙ্ক ইঙ্গিতে সবিতাকে চুপ করতে বলে শ‍্যামলীকে জিজ্ঞেস করলেন, বল্ মা, বাক কি বললেন!
মেয়ে বলল, বাবা, বাক একটা চমৎকার কথা বললেন। এ গুড ম‍্যারেজ ইজ় ওয়ান হুইচ অ্যালাউজ় ফর চেঞ্জ অ্যাণ্ড গ্রোথ ইন দি ইনডিভিজুয়ালস অ্যাণ্ড ইন দ‍্য ওয়ে দে এক্সপ্রেস দেয়ার লাভ।
বাসন্তীবালা বললেন, এর মানে কি?
শ‍্যামলী বলল, স্বামী স্ত্রীর বয়স বাড়তে থাকলে তাদের ভালবাসা প্রকাশের ধরনধারনে বদল হবে, আরো গাঢ় হবে, আর সেই জিনিসটা হবার সুযোগ থাকতে হবে। সেটা হলে তবেই তাকে ভাল বিয়ে বলতে হবে।
শশাঙ্ক চুপ করে বসে র‌ইলেন। বাসন্তীবালা বললেন, এটা আর নতুন কথা নাকি? বয়স বাড়লে ভালবাসার রকমসকম বদলাবে না? চিরকাল প্রথম বিয়ের মতো থেকে যাবে না কি?
শ‍্যামলী বলল, মুশকিলের কথাটা হল পার্ল এস বাক তাঁর নিজের প্রথম বিয়েটা টেঁকাতে পারেন নি।
বাসন্তীবালা বললেন, সে কি, কেন?
এমন সময় অরিন্দম দাশগুপ্ত ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি কি আসতে পারি?
শশাঙ্ক পাল হেসে বললেন, এসো এসো। শ‍্যামলী উঠে গিয়ে তাঁকে ডেকে এনে নিজের সোফাটায় বসিয়ে, খাটের উপর বাবার কাছ বসল।
শশাঙ্ক বলছিলেন, আমি শ‍্যামলীর কাছে গল্প শুনছিলাম।
অরিন্দম বললেন, কিসের গল্প?
শ‍্যামলী ঠোঁট টিপে হেসে বলল, পার্ল এস বাকের বিয়ে ভাঙার গল্প!

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।