রবিবারে রবি-বার – এ মৃদুল শ্রীমানী

মৃত্যুর নিপুণ শিল্প

নীতু, দৌহিত্র নীতীন্দ্রনাথের এই মৃত‍্যু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখালেখির আরেক দিকে বিকাশ ঘটিয়েছিল। “পুনশ্চ” কাব‍্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন বিদেশের মাটিতে অকালপ্রয়াত দৌহিত্রকে। এই কাব‍্যগ্রন্থের বিশ্বশোক ( রচনা ১১ ভাদ্র, ১৩৩৯) কবিতাসহ আরো কয়েকটি কবিতায় নীতুর মৃত্যুর অভিঘাত রয়েছে। “পুকুর-ধারে” ( রচনা ২৫ শ্রাবণ, ১৩৩৯) এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। নীতুর মৃত্যুসংবাদ পাবার অল্প পরেই লেখা এই কবিতার বিষয়ে নির্মলকুমারী মহলানবীশের স্মৃতিচারণ ( “বাইশে শ্রাবণ”) :

প্রতিমাদিরা এলে সবাই মিলে কবির ঘরে গিয়ে বসা হল। রথীন্দ্রনাথকে কবি প্রশ্ন করলেন, “নিতুর খবর পেয়েছিস্, সে এখন ভালো আছে, না?” রথীবাবু বললেন, না খবর ভালো না। কবি প্রথমটা ঠিক বুঝতে পারলেন না। বললেন, ” ভালো? কাল এণ্ডরুজও আমাকে লিখেছেন যে নিতু অনেকটা ভালো আছে। হয়তো কিছুদিন পরেই ওকে দেশে নিয়ে আসতে পারা যাবে।” রথীবাবু এবারে চেষ্টা করে গলা চড়িয়ে বললেন, না, খবর ভালো নয়। আজকের কাগজে বেরিয়েছে। কবি শুনেই একেবারে স্তব্ধ হয়ে রথীবাবুর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। একটু পরেই শান্তভাবে সহজ গলায় বললেন, “বৌমা আজই শান্তিনিকেতনে চলে যান, সেখানে বুড়ি ( নন্দিতা, নিতুর বোন) একা রয়েছে। আমি আজ না গিয়ে কাল যাবো, তুই আমার সঙ্গে যাস্।”

রথীবাবুরা চলে যাবার পর ঘণ্টা দুই একেবারে চুপ করে বসে রইলেন। দুপুরে যখন খাবার দিতে গেলাম, দেখি একেবারে সহজ মানুষ। মুখের ভাবে কথায় বার্তায় কোন পরিবর্তন বোঝা যায় না। অথচ আমরা সকলেই জানি নিতু ওঁর কতখানি ছিল।

খাবার পরে খাতা নিয়ে লিখতে বসলেন একটা ছোটো গদ‍্য কবিতা (পুকুর-ধারে) ; সেটা ‘পুনশ্চ’তে বেরিয়েছে। কবিতাটাতে মৃত্যুর কোনো ভাষাই নেই, তবু অন্তরের একটা বেদনা ধরা পড়েছে। আমাকে ডেকে লেখাটা পড়ে শোনালেন, আর বললেন, “জীবনের গভীর দুঃখের সময়েই দেখি লেখা আপনি সহজে আসে। মন বোধহয় নিজের রচনাশক্তির ভিতরে ছুটি পেতে চায়।” আশ্চর্য হয়ে গেলাম তাঁকে দেখে। একমাত্র দৌহিত্রের বিদেশে মৃত্যু হল; কী অসাধারণ ধৈর্যের সঙ্গে সে সংবাদ গ্রহণ করলেন, এ দৃশ্য না দেখলে ওঁর একটা বড়ো দিক অজানা থেকে যেতো।”

 যত্নশীল পাঠক নির্মলকুমারী মহলানবীশের এই স্মৃতিচারণটুকু মননে রেখে পুনশ্চের কবিতাগুলি খুঁটিয়ে পড়তে পারেন। এই কাব‍্যগ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায় টুকরো টুকরো কয়েকটি পংক্তির দিকে নজর দিতে চাই:

হঠাৎ-বর্ষণে চারি দিক থেকে ঘোলা জলের ধারা

যেমন নেমে আসে, সেইরকমটা।

তবু ঝেঁকে ঝেঁকে উঠে টলমল করে কলম চলছে,

যেমনটা হয় মদ খেয়ে নাচতে গেলে।

তবু শেষ করব এ চিঠি,

কুয়াশার ভিতর দিয়েও জাহাজ যেমন চলে,

কল বন্ধ করে না। 

( কবিতার নাম: নাটক, রচনা ৯ ভাদ্র, ১৩৩৯)

 কাল আপন পায়ের চিহ্ন যায় মুছে মুছে,

স্মৃতির বোঝা আমরাই বা জমাই কেন,

এক দিনের দায় টানি কেন আর-এক দিনের ‘পরে,

দেনা-পাওনা চুকিয়ে দিয়ে হাতে হাতে

ছুটি নিয়ে যাই-না কেন সামনের দিকে চেয়ে।

(কবিতার নাম : নূতন কাল, রচনা ১ভাদ্র, ১৩৩৯)

এখানকার বাদল-দিনে আর আমার বাদল-গানে,

তারা কেউ আছে কেউ গেল চলে।

আমারও যখন শেষ হবে দিনের কাজ,

নিশীথরাত্রের তারা ডাক দেবে

আকাশের ওপার থেকে–

তার পরে?…

…পশ্চিমের আকাশপ্রান্তে

আঁকা থাকবে একটি নীলাঞ্জনরেখা।

(কবিতার নাম: খোয়াই, রচনা ৩০ শ্রাবণ ১৩৩৯)

 ‘ফাঁক’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন: 

আমার বয়সে

মনকে বলার সময় এল–

কাজ নিয়ে কোরো না বাড়াবাড়ি,

ধীরে সুস্থে চলো,

যথোচিত পরিমাণে ভুলতে করো শুরু…

আজ আমার মন ফিরেছে 

সেই কাজ ভোলার অসাবধানে।..

মাঝে মাঝে ভুলো, মাঝে মাঝে ফাঁক বিছিয়ে রেখো জীবনে;..

মনে রাখবার দিন ক্ষণ আমারো আছে,

অনেক কথা, অনেক দুঃখ।…

(রচনা: ১১ ভাদ্র ১৩৩৯)

 ‘শেষ দান’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন:

…কাঞ্চন গাছ আছে একা দাঁড়িয়ে,

আপন শ‍্যামল পৃথিবীতে নয়,

মানুষের-পায়ে-দলা গরিব ধুলোর ‘পরে।

…উচ্ছ্বসিত সবুজ কোলাহলের মধ‍্যে কোন্ চরম দিনের অদৃশ‍্য দূত দিল ওর দ্বারে নাড়া,

… একদিন নামে শেষ আলো,

নেচে যায় কচি পাতার শেষ ছেলেখেলার আসরে।…

তার সব দান এক বসন্তে দিল উজাড় ক’রে।

তার পরে বিদায় নিল

এই ধূসর ধূলির উদাসীনতার কাছে। 

(রচনা ৫ ভাদ্র ১৩৩৯)

 উল্লেখ করা দরকার যে,শুধু পুনশ্চে নয়, অনেক আগে ২০ শ্রাবণ ১৩১৭ বঙ্গাব্দে লেখা গীতাঞ্জলি কাব‍্যগ্রন্থের ‘যাবার দিনে’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছিলেন:

“যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই…

অপরূপকে দেখে গেলেম দুটি নয়ন মেলে…

এইখানে শেষ করেন যদি

শেষ করে দিন তাই।”

 ‘ডাকঘর’ নাটকের মধ‍্যেও একটা সুদূরের ডাক আছে। নাটকটি তিনদিনে লিখে ফেলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ইন্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস থেকে ১৩১৮ বঙ্গাব্দে মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় প্রকাশ করেন ‘ডাকঘর’। ১৩১৮ বঙ্গাব্দের ৩১ ভাদ্র মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়কে লিখছেন রবীন্দ্রনাথ  : ‘আমি ছোট্ট একটি নাটক লিখেছি….আমার নিজের ভাল লেগেছে — সেই পুরস্কারটা পাওয়া গেছে।” কোন্ মানসিক পটভূমিকায় ‘ডাকঘর’ রচিত হয়েছিল, তার একটি আভাস পাওয়া যায় নির্ঝরিণী সরকারকে লেখা কবির একটি চিঠি থেকে। নাট‍্যরচনার অল্প কয়েকদিন পরে, ২২ আশ্বিন ১৩১৮ তারিখে লেখা সেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন: 

‘ মা, আমি দূরদেশে যাবার জন‍্যে প্রস্তুত হচ্চি। আমার সেখানে অন‍্য কোনো প্রয়োজন নেই– কেবল কিছু দিন থেকে আমার মন এই কথা বলচে যে, যে পৃথিবীতে জন্মেছি সেই পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে নিয়ে তবে তার থেকে বিদায় নেব। এর পরে আর ত সময় হবে না।”

 ১৩২২ বঙ্গাব্দের ৪ পৌষ শান্তিনিকেতন আশ্রমবাসীদের কাছে ডাকঘরের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন:

“ডাকঘর যখন লিখি তখন হঠাৎ আমার অন্তরের মধ‍্যে আবেগের তরঙ্গ জেগে উঠেছিল। তোমাদের ঋতু-উৎসবের জন‍্য লিখি নি।

 শান্তিনিকেতনের ছাদের উপর মাদুর পেতে পড়ে থাকতুম। প্রবল একটা আবেগ এসেছিল ভিতরে। চল চল বাইরে, যাবার আগে তোমাকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে হবে — সেখানকার মানুষের সুখ-দুঃখের উচ্ছ্বাসের পরিচয় পেতে হবে। সে সময় বিদ‍্যালয়ের কাজে বেশ ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কি হল। রাত দুটো-তিনটের সময় অন্ধকার ছাদে এসে মনটা পাখা বিস্তার করল। যাই যাই এমন একটা বেদনা মনে জেগে উঠল। ..আমার মনে হচ্ছিল একটা কিছু ঘটবে, হয়ত মৃত‍্যু। স্টেশনে যেন তাড়াতাড়ি লাফিয়ে উঠতে হবে সেই রকমের একটা আনন্দ আমার মনে জাগছিল। যেন এখান হতে যাচ্ছি। বেঁচে গেলুম। এমন করে যখন ডাকছেন তখন আমার দায় নেই। কোথাও যাবার ডাক ও মৃত্যুর কথা উভয় মিলে , খুব একটা আবেগে সেই চঞ্চলতাকে ভাষাতে ডাকঘরে কলম চালিয়ে প্রকাশ করলুম। … এটা সেই সময়ে আমার মনের ভিতর যে অকারণ চাঞ্চল্য দূরের দিকে হাত বাড়াচ্ছিল, দূরের যাত্রায় যিনি দূর থেকে ডাকছিলেন, তাঁকে দৌড়ে গিয়ে ধরবার একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা। …চলে যাওয়ার মধ‍্যে যে বিচিত্র আনন্দ তা আমাকে ডাক দিয়েছিল…”।

 ১৯২১ সালের ৪ জুন বার্লিন থেকে বন্ধু চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ডরুজকে লিখেছিলেন:

 I remember, at the time when I wrote it, my own feeling which inspired me to write it. Amal represents the man whose soul has received the call of the open road — he seeks freedom from the comfortable enclosure of habits sanctioned by the prudent and from walls of rigid opinion built for him by the respectable.

 ১৯১৭ সালের ১০ অক্টোবর বিচিত্রায় ডাকঘর অভিনয় হয়েছিল। ওইদিন নাটকটির অভিনয়কালে “আমি চঞ্চল হে”, ” গ্রাম-ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ” , “ভেঙে মোর ঘরের চাবি” গানগুলি গাওয়া হয়েছিল।

 বছর বাইশ পরে একবার ১৯৩৯ সালে ডাকঘরের অভিনয়ের জন‍্য অনেকদিন ধরে মহড়া চলেছিল। যদিও শেষপর্যন্ত অভিনয়টি বাস্তবায়িত হয় নি, তবুও অভিনয় উপলক্ষে কবিগুরু কয়েকটি গান রচনা করেন। এরমধ‍্যে ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ গানটি অত‍্যন্ত পরিচিত। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গান ছিল

 “সমুখে শান্তিপারাবার–

ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।

তুমি হবে চিরসাথি, লও লও হে ক্রোড় পাতি–

অসীমের পথে জ্বলিবে জ‍্যোতি ধ্রুবতারকার।।

মুক্তিদাতা, তোমার ক্ষমা তোমার দয়া

হবে চিরপাথেয় চিরযাত্রার।

হয় যেন মর্তের বন্ধনক্ষয়, বিরাট বিশ্ব বাহু মেলি লয়–

পায় অন্তরে নির্ভয় পরিচয় মহা-অজানার।।”

(রচনা ০৩ ডিসেম্বর, ১৯৩৯)

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুচেতনা নিয়ে কথা বলতে গেলে ‘রক্তকরবী’ নাটকটির কথা না বললেই নয়।

রক্তকরবী রবীন্দ্রনাথের বহু যত্নসাধ‍্য সৃষ্টি। পাণ্ডুলিপি অবস্থায় প্রথমে এর নাম ছিল যক্ষপুরী, পরে দাঁড়িয়েছিল নন্দিনী। নাটকটির রচনা কাজ শুরু হয়েছিল ১৩৩০ এর গ্রীষ্মাবকাশে, শিলং পাহাড়ে। বেশ কয়েকটি বার নাটকটির পরিবর্তন পরিমার্জন করে চলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অন্ততঃ দশটি পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যায় এই নন্দিনীর পালার। ৯ জুন ১৯২৩ তারিখে লেখা পূরবী কাব‍্যগ্রন্থের ‘শিলঙের চিঠি’ কবিতায় বেশ বুঝতে পারা যায় নাটকটির সৃষ্টিকর্ম চলছিল শিলঙে, ১৯২৩ সালের জুন মাসে। বাংলাভাষায় নাটকটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ হয়েছিল বিশ্বভারতী গ্রন্থালয় থেকে, তারিখটি ছিল ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ১২ পৌষ, ইংরেজি ক‍্যালেন্ডারে ২৭ ডিসেম্বর, ১৯২৬। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবার বেশ অনেক দিন আগে প্রবাসী পত্রিকার আশ্বিন ১৩৩১ সংখ‍্যায় সম্পূর্ণ নাটকটি মুদ্রিত হয়। লক্ষ্য করার বিষয় যে রক্তকরবী প্রকাশের আগেই এর ইংরেজি অনুবাদ Red Oleanders নামে Visva-Bharati Quarterly পত্রিকায় ১৯২৪ সালে এবং ১৯২৫ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশ হয়েছিল। নাটকটি লেনার্ড এলমহার্স্টকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। নাটকটি লেখার সময়ে শিলঙে রাণু অধিকারী কবির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছিলেন।

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশায় রক্তকরবীর একটি অভিনয় হয়েছিল বিহার ভূকম্প পীড়িতের সাহায‍্যার্থে, দি টেগোর ড্রামাটিক গ্রুপের আয়োজনে, নাট‍্য-নিকেতন রঙ্গমঞ্চে, ১৯৩৪ সালের ৬ এপ্রিল তারিখে। এই অভিনয়ের দর্শক সাধারণের মধ‍্যে বিতরিত অভিনয়পত্রীতে নাটকটির মর্মকথা লিখে দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেটি দর্শকদের নাটকটি বোঝার সাহায‍্যার্থে বিতরণ করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই ভূমিকার উপরে কলম চালিয়েছিলেন। সেই অভিনয়পত্রীতে পাই:

“এই নাট‍্যব‍্যাপার চলেছে যক্ষপুরীতে যেখানে মাটির তলায় কবর দেওয়া থাকে যক্ষের ধন, পাতালের কাছাকাছি একটা জায়গায়। ..এখানকার মালিক যে, সে আছে অষ্টপ্রহর, অসংখ্য মানুষের সুখদুঃখ থেকে দূরে, একটা অত্যন্ত জটিল জালের আবরণে ভীষণ তার অদৃশ্য শক্তি নিয়ে প্রচ্ছন্ন। প্রকৃতির বক্ষ থেকে মানুষের প্রাণ থেকে শক্তি শোষণ করে নিয়ে স্ফীত হবার যাদু সে জানে, তাই নিয়ে অমানুষিক নির্মমতার নানা পরীক্ষায় সে নিযুক্ত। তার পরীক্ষাশালায় যে প্রবেশ করে সে বেরিয়ে আসে কঙ্কালসার হয়ে।

 ..এইখানে তপ্ত ফাল্গুনের প্রখর আলোয় কোনো এক প্রমত্ত বসন্তদিন ফুটিয়ে তুললে একটি রক্তকরবী। আনন্দহীন কর্মের আবর্জনার একধারে মূল‍্যহীন আনন্দের ইসারা জানালে সেই ফুল। বিশু পাগল সে আগলভাঙা প্রাণ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় এই রক্তকরবীকে ঘিরে — মরুভূমির খোলা বাতাস যেন সে।…

যক্ষপুরীর মানুষ ধরা ফাঁদে কখন্ ধরা পড়েছে নন্দিনী। সে ছিল রঞ্জনের নর্মসখী, প্রেমের নন্দনবনে, এখানে এসেছে প্রাণগ্রাসী পাতালপুরীর হাঁ-করা গহ্বরের প্রদোষান্ধকারে। রঞ্জনের বাঁশির ডাকের সুর আসে নন্দিনীর চোখে, তার হাসিতে, তার চলায় বলায় চঞ্চল হয়ে ওঠে যক্ষপুরীর বাহনের দল।

রঞ্জনের বাঁশি ডাকে থেকে থেকে নন্দিনীকে কাজের ভিড়ের মধ‍্যেও। এই খবরটা জানে মালিক; — আর সে এও জানে যে, যে সোনা সে পায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণ দেউলে ক’রে সেই সোনা নিয়ে সে আনন্দ পায় না কণামাত্র। তাই সে ঐশ্বর্যের পিঞ্জরে গর্জাতে থাকে বন্ধ‍্যা সম্পদের নিষ্ফলতায়। রঞ্জন আর নন্দিনীর মাঝে সে সৃষ্টি করতে চায় প্রচণ্ড বিচ্ছেদ। পিপাসার্ত নীরস কণ্ঠের নিরানন্দ অট্টহাসি হাসে সে আপন জটিল জালের আড়ালে ব’সে — নন্দিনীর ‘পরে তার নিগূঢ় টান ঈর্ষায় সাংঘাতিক হয়ে ওঠে।’

 রবীন্দ্রনাথ লেনার্ড এলমহার্স্ট সাহেবের কাছে নন্দিনী চরিত্র নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এলমহার্স্ট কবির মৌখিক আলোচনা স্মরণ করে বিস্তারিত লিখেছিলেন। তারই একটু:

We have become numbers, with numbers on our doors, our telephones, our cars, our factories, our restaurants, our votes, and our tickets at sports or theatre. Even as worshippers we are card indexed.

Nandini then is this touch of life, the spirit of joy in life. Matched with Ranjan the spirit of joy in work, together they embody the spirit of love; love in union, union in love, a harmony before which the discord of greed is scattered as under a spell….

 রবীন্দ্রনাথ আমেরিকা থেকে তাঁর নাতি দিনেন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন:

ছবিটা ভাল করে দেখ্ — কেরোসিন তেলের অন্ধকূপ –এর তলায় আছে তেল আর মাথায় উঠচে ধোঁয়া। এখানকার লক্ষেশ্বরদের এই দশা — এরা নিজের ধোঁয়ার মধ‍্যে নিজে বিলুপ্ত, সূর্যের আলো এদের মানস চক্ষে পৌঁছায় না।…

 ‘যাত্রী’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

যক্ষপুরে পুরুষের প্রবল শক্তি মাটির তলা থেকে সোনার সম্পদ ছিন্ন করে আনছে। নিষ্ঠুর সংগ্রহের লুব্ধ চেষ্টার তাড়নায় প্রাণের মাধুর্য সেখান থেকে নির্বাসিত। সেখানে জটিলতার জালে আপনাকে আপনি জড়িত করে মানুষ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই সে ভুলেছে সোনার চেয়ে আনন্দের দাম বেশি; ভুলেছে, প্রতাপের মধ‍্যে পূর্ণতা নেই, প্রেমের মধ্যেই পূর্ণতা। সেখানে মানুষকে দাস করে রাখবার প্রকাণ্ড আয়োজনে মানুষ নিজেকেই নিজে বন্দী করেছে।

প্রমথনাথ বিশীর কাছে ক্ষিতিমোহন সেন রক্তকরবী প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্য জানিয়েছিলেন। প্রমথনাথ বিশীর রবীন্দ্রনাট‍্যপ্রবাহ গ্রন্থে পাওয়া যায়:

মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পূর্বে একদিন কথা প্রসঙ্গে কবি বলিয়াছিলেন — দেখুন, প্রাণের জন‍্য ভয় নাই। উপনিষদ বলেন, প্রাণই সত‍্য, তার মৃত্যু নেই, ভয় ছিল জড়ের জন‍্য। বিজ্ঞান বলছেন, প্রকৃতির হাতে রচিত যে বস্তু, তারও মৃত্যু নেই। মরে যতসব মানুষের রচা কৃত্রিম অসত্য বস্তু। রক্তকরবীতে আমি সে কথা বলেছি। হাজার বাঁধন বেঁধেও, শত চাপা দিয়েও প্রাণকে কে কবে মারতে পেরেছে?

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!