আমি সল্টলেকের যেখানে আগে থাকতাম তখন সেখান থেকে আমার অফিসে যাতায়াতের তেমন সুবিধা ছিল না। বাস পেতে হলে অনেকটা হেঁটে যেতে হত। ওই সরকারি আবাসনে তখন সবে গিয়েছি। আবাসনটির পাশেই একটি খাল বয়ে চলেছে। খালের ওপারে নিকো পার্ক। অফিস ছিল গনেশচন্দ্র এভিনিউতে। প্রতিদিন যাতায়াতে খুব কষ্ট হত। বহুদিন আগে তৈরি হওয়া এই আবাসন কি এক আইনি জটিলতায় আটকে ছিল। যাদের দরকার ছিল একটা বাসস্থানের, তারা দরখাস্ত করে অপেক্ষা করছিল। একসময় দেওয়া শুরু হল।
সল্টলেক অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের নিজস্ব গাড়ি আছে। অনেকেই ওই অঞ্চলে প্রাসাদের মতো বাড়ি করেছে। তাদের জীবন এক অন্য খাতে বয়ে চলে। আমার পরিচিত লোকেরা যখন শুনত আমি সল্টলেকে থাকি তখন তাদের খুব অবাক হতে দেখেছি। তাদের এমন ভাব যেন বিরাট কিছু একটা করে ফেলেছি। কেউ কেউ মনে করত এত তাড়াতাড়ি আমি সল্টলেকে থাকার ব্যবস্থা করলাম কী করে। নিশ্চয়ই কিছু এদিক ওদিক আছে। অনেক কষ্টে বোঝাতে হত আমি যে সল্টলেকে আছি এতে আমার বাহাদুরি কিছু নেই। সরকারি অফিসে চাকরি করার জন্য অনেকের মতো আমার ভাগ্যেও সেটা জুটেছে।
সল্টলেক অঞ্চলে যাদের নিজস্ব গাড়ি নেই তাদেরই যাতায়াতের সমস্যা। ফলে যা হয়। সমবেত আন্দোলন করে একে তাকে ধরে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সমস্যা সমাধানের জন্য বেলেঘাটা থেকে একটা বাস টেনে নিয়ে আসা হল আমাদের আবাসনের কাছে। তখন আমাদের আবাসন থেকে বাসটির শিয়ালদা যাবার ভাড়া দু’ টাকা। আর বাবুঘাটের ভাড়াও তাই। এই নিয়ে মাস খানেকের মতো যাত্রীদের বচসা, আলোচনা, কন্ডাকটারের সঙ্গে হাতাহাতি হওয়ার পর সবাই চুপচাপ হয়ে গেল।
একসময় ট্রাম ভাড়া এক পয়সা বেড়ে যাওয়ার জন্য নানা রকম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলত মানুষজন। তখন কলেজে পড়তাম। মহত্মা গান্ধী রোডের উপর আমি একটা ট্রাম জ্বলতে দেখেছি। তাই দেখে থমকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সবাই ছোটাছুটি করছে। আমার সামনে একজন ভদ্রলোক এসে বললেন, ‘এই খোকা কি দেখছ এখানে দাঁড়িয়ে। কোথায় যাবে?’
খোকা শুনে অন্য সময় হয়ত খেপচুরিয়াস হয়ে যেতাম। সেদিন হলাম না। বললাম, ‘শিয়ালদা।’
তখন আমি থাকতাম ইছাপুরে।উনি যাবেন হাবরা।তারপর আর কোনোদিন ওনার সঙ্গে দেখা হয়নি। পরে অনুভব করেছিলাম সেদিন উনি যদি আমাকে ওখান থেকে না নিয়ে আসতেন আমি বিস্ময়ে হাবার মতো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বিপদ তো হতই। পরের দিন খবরের কাগজে ফলাও করে জ্বলন্ত ট্রামের ছবির সঙ্গে খবর বেড়িয়েছিল। প্রচুর লোকজনকে ধরপাকড়ের খবরও। বাড়িতে এইকথা অনেকদিন পরে মাকে বলেছি।
এখন যে তেমন হয় না তা নয়। তবে একপয়সা ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য নয়।
আজকাল চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি পরামর্শ দেন কোন টেনশন করবেন না। মানুষেরা খুব বাধ্য। ফয়দার খোঁজ না থাকলে তারা আজকাল সহসা উত্তেজিত হয় না। এই সুযোগে শুধু বাস ভাড়া বেড়ে যাওয়াই নয়, নানা বোঝা চেপে বসে যায় মানুষের থাকে কাঁধে।
যদি কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখে তার মুখে ফুটে উঠেছে বলিরেখা তখন সে আকুল হয়ে সংগ্রহ করতে চায় এমন এক প্রসাধন, ইদানিং যা বলিরেখা মুছে দিয়ে ফিরিয়ে দেবে হারানো যৌবন। বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে ফেলতে চায় নিজেদের দুঃখ চাহিদা এমন আরও যাবতীয় কিছু।
যাঁর কথা বলতে চাইছি তিনি ভবনাথবাবু। সব বিষয়েই সারাক্ষণ বিরক্ত হয়ে আছেন। তার অফিস শিয়ালদা।এই অঞ্চলের যাদের অফিস ধর্মতলা, বিবাদীবাগ ও বাবুঘাটের কাছাকাছি তাদের বাস ভাড়াও দু টাকা, এটা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
শুনতে পাচ্ছি ভবনাথবাবু নাকি বাসের কন্ডাক্টরের সঙ্গে ঝগড়া করেই চলেছেন প্রথম প্রথম দু-একজন তাঁর হয়ে কথা বলত। তারপর যে যার নিজের মতো।
যাদের অফিস ভবনাথবাবুর মতো শিয়ালদাতে নয় তারা খুব চটে গেল। ভবনাথবাবু চিল্লামিল্লির জন্য যদি ধর্মতলা বা বাবুঘাটের ভাড়া বেড়ে যায় তাহলে তো বিপদ। আমাকে একদিন পরিচিত একজন বলল, ‘আপনি ওই লোকটির সঙ্গে এত কথা বলেন কেন?’
বললাম, ‘একজন কথা বলতে চাইলে তো না বলতে পারি না।’ যদিও তখনও আমরা ওরা বিষয়টি চালু হয়নি। বুঝলাম আমার কথাটি পছন্দ হয়নি।
ভবনাথবাবুকে একদিন বললাম, ‘রোজ রোজ এভাবে রাগারাগি করে নিজের শরীর মন নষ্ট করছেন কেন?’ কথাটা শুনে উনি যে ভাবে তাকালেন, বুঝলাম আমার কথা পছন্দ হয়নি।
একদিন সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে একটা কাজ মিটিয়ে ধর্মতলার দিকে যাচ্ছি দেখি উল্টোদিক থেকে ভবনাথ বাবু আসছেন। ঘামে জামা ভিজে। বুকটা ক্লান্তিতে দ্রুত ওঠানামা করছে। চুল এলোমেলো। মনে হল খুব বিপর্যস্ত অবস্থা।
আগ বাড়িয়ে বললাম, ‘ওদিকে কোন কাজে গিয়েছিলেন?’
‘না অফিস যাচ্ছি। এছাড়া সকালে আর অন্য কি কাজ আছে?’
‘আপনার অফিস তো শিয়ালদায়!’
‘ তাতে কি হয়েছে? গিয়েছিলাম বাবুঘাট। দু’টাকা যখন দিতেই হবে তখন আমার যেখানে খুশি যেতে পারি। আজকে বাসের কন্ডাক্টারকে খুব জব্দ করেছি বুঝলেন। দু’টাকায় একেবারে বাবুঘাট। একটা কথা বলতে পারেনি।’ বলেই বাবুঘাট থেকে হেঁটে আসা ক্লান্ত ভবনাথবাবু বললেন, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলার এক্কেবারে সময় নেই। পরে একদিন দেখা হলে সব বলব।’
মাথার উপরে ঠা ঠা রোদ। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ভবনাথবাবুর। যাবার আগে বললেন, ‘অফিসে তো আবার তিনি বসে আছেন লাল দাগ দেবার জন্য। চলি।’
যেতে যেতে হাত তুলে বললেন, ‘দেখবেন একদিন ও ব্যাটাকেও টাইট দেব।সেদিন বাছাধন বুঝবে কত ধানে কত চাল।’ এই বলে তিনি হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন শিয়ালদার দিকে।