সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৪)

কেল্লা নিজামতের পথে
আজ খুব বৃষ্টি৷ ঠিক করলাম একবার ঘুরে দেখব চকবাজার এলাকা। মুন্নি বেগমের প্রিয় চকবাজার। তার হাতেই নির্মিত। মিরজাফরের প্রিয় বেগম হিসাবে মুর্শিদাবাদে তার বিস্তর নামডাক। কিন্তু এসব তো অনেক পরের কথা। আগে তো মুর্শিদকুলীর চেহেল সেতুন। ঠিক এই চকবাজারেই। কিন্তু এখন আর ছিটেফোঁটাও নেই৷ সবটাই উধাও। ঠিক যেমন ভাবে উধাও সিরাজের হীরাঝিল। তবে একসময়কার চেহেল সেতুন নবাবের দরবার বাড়ি৷ আর প্রাসাদ কুলুরীতে। সদ্য মুর্শিদাবাদে আসা নায়েব নাজিম মুর্শিদকুলী তখন দিল্লীর বাদশা ঔরঙ্গজেবের বড় প্রিয়। বাংলা থেকে সিক্কা টাকায় নজরানা ঠিক ঠিক সময়ে পৌঁছে যায় তাঁর দরবারে। কোনো বিলম্ব নেই৷ আর বাংলায় ততদিনে নিজের রাজপাট গুছিয়েও নিয়েছেন মুর্শিদকুলী। ঢাকা থেকে আসবার সময়ে সঙ্গে সঙ্গী হিসাবে ছিল বিশ্বস্ত জনেরা। আর ছিল বন্ধু ও পরামর্শদাতা মানিক চাঁদ। লোকে বলে টাকার কুমির। জৈন ব্যবসায়ী হিসাবে তারও হাঁকডাক কম নয়৷ মুর্শিদাবাদে এসে নবাববাড়ির কাছেই মহিমাপুরে তিনি তৈরি করেছেন প্রাসাদ আর গদি। নায়েব নাজিম আর মানিকচাঁদের বন্ধুত্বও বহু চর্চিত। সুখে দু:খে বিপদে আপদে নতুন জায়গায় দুজনেই দুজনের সঙ্গী আর পরামর্শদাতা। মুর্শিদকুলী জন্মগত ভাবে হিন্দু৷ পরে ধর্মান্তরিত মুসলিম। দাক্ষিণাত্যে ওড়িয়া ব্রাহ্মণ ঘরে জন্ম। আসল নাম সূর্য নারায়ণ মিশ্র। কিন্তু ভাগ্যের বদলে মুর্শিদকুলী। জন্মের পরেই গরীব বাবা মা ছেলেকে বিক্রি করে দিলেন মোঘল দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী হাজি সফি ইসফাহানির হাতে৷ তিনিও কৃতদাস হিসাবে কিনে নিলেন ছোট সূর্য নারায়ণকে। নতুন নাম হয় মুহাম্মদ হাদী বা মির্জা হাদী। কিন্তু ক্রীতদাস হাদীকে সন্তান স্নেহে শিক্ষিত করে তোলেন সফি ইসফাহানি। শুরুটা এভাবেই। বাকি পথ জুড়ে আছে বাংলার ভাগ্যের সাথে। প্রথম জীবনে বিদর্ভ প্রদেশের দেওয়ান হাজি আবদুল্লা কুরেশীর কাছে কাজ শুরু করেন। এতো গেল মুর্শিদকুলীর কথা। কিন্তু চকবাজারে এসে তো চোখ চড়কগাছ। কোথায় মুর্শিদকুলি? কোথায় চেহেল সেতুন? আর কোথায়ই বা সেই আড়ম্বর। সামনে ত্রিপলী দরজা। স্থাপত্যে নবাবী আভিজাত্য স্পষ্ট। দরজার ওপরে তাকিয়ে দেখলাম খানিকক্ষণ। অভিযাত নহবতখানা। আজ খালি। কিন্তু নবাবী আমলে এখানেই বসত নহবত। জাঁকজমকপূর্ণ কেল্লা নিজামতের মুখ দরজা হিসাবে ত্রিপলী দরজার মাথায় বসত নহবতের আসর। কল্পনা করে একবার দেখুন তো। কেমন ছিল সেই নবাবী মুর্শিদাবাদ। যাকে দেখে স্বয়ং ক্লাইভও চমকে গেছিলেন। মুর্শিদকুলী খানের হাতে আদ্যোপান্ত তৈরি একটা রাজধানী মাত্র কয়েক বছরেই যে আভিজাত্য লাভ করে, তা সত্যিই বিদেশীদের চোখে ঈর্ষনীয়। ব্যতিক্রম ছিল না ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক অফিসার ক্লাইভ বা ওয়াটসনও। মুর্শিদাবাদের জাঁকজমক ও সম্পদ দেখে তাঁরা আকর্ষিত হন। তৎকালীন লন্ডনের থেকেও বেশি সম্পদশালী ও জাঁকজমকপূর্ণ বলে উল্লেখ করতে দুবার ভাবতে হয়নি তাঁদের। হ্যাঁ, এমনই ছিল তখনকার মুর্শিদাবাদ। অবিভক্ত বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজধানী।
যাই হোক, এভাবেই ত্রিপলী দরজার নীচ দিয়ে যাবার সময় হয়ত আজও নহবতের আওয়াজ দুলিয়ে নিয়ে গেল কেল্লা নিজামতের দিকে। ত্রিপলী দরজা। মুর্শিদকুলীর জামাই ও বাংলায় নাসিরি রাজবংশের দ্বিতীয় স্বাধীন নবাব সুজাউদ্দিন খানের হাতে তৈরি সম্পূর্ণ নবাবী ঘরানায় নগরে ঢোকবার মুখ্য দরজা। কেল্লা নিজামতে প্রবেশের আরও কয়েকটি দরজা ছিল সেকালে। কিন্তু সেসব আজ আর নেই। পড়ে আছে ত্রিপলী দরজাই। এরপর কেল্লা নিজামত। কেল্লা নিজামত নবাবদের নিজস্ব জায়গা। নগরের বাইরে এ এক আলো ঝলমলে অঞ্চল। আজকের হাজারদুয়ারি, মোতি মসজিদ এলাকাটুকু শুধু বেঁচে আছে সমস্ত নিজামতের অস্তিত্বটুকু বুকে ধরে। কিন্তু কেল্লা নিজামতের বেশিরভাগ জায়গাই যখন দেখি আগাছার দখলে আর সবই প্রায় ভগ্নস্তুপে পরিণত, তখন যেন মনেই আসেনা নগরের নবাবী জাঁকজমক।
চলার পথে ধোঁয়াশা ঘিরে রাখছে অজানা মুর্শিদাবাদ। আমি পকেট হাতড়ালাম। কয়েকটা খুচরো পয়সা বের করে এগিয়ে দিলাম বাঁপাশে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকা ভিখিরির হাতে। শান্ত মহাজন যেন। চেয়ে থাকার গোপনে ফেরি করছে হারানো মঞ্জিল। আমরাও কত অনায়াসে হাতে তুলে দিচ্ছি খুচরো পয়সা। কিন্তু সকলেই যেন নবাবের অনুচর। এক নি:শব্দ প্রত্যয় নিয়ে চষে বেড়াচ্ছে তামাম মুর্শিদাবাদ। অলিতে গলিতে, রাজপথে। শরীরে তাদের ক্ষত। কিন্তু কিসের? অভাব? নাকি তীব্র হাহাকার? কী খুঁজে বেড়ায় তারা? এতসব প্রশ্নের জটে মিশে যাচ্ছে আরও একটা দিন। কিন্তু সবচেয়ে ঘন ঘন অন্ধকার বোধহয় গ্রাস করে একমাত্র মুর্শিদাবাদকেই। গিলে খায় এই আজব নগরী। আর আধবেলা না খাওয়া মানুষগুলো সত্যই যেন সেই নগরীর বরকন্দাজ। একবুক হতাশা৷
নবাবে সিরাজের ছিন্নভিন্ন দেহ ঘিরে তখনো জটলা। অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে মানুষ। আশপাশে দহনের চিহ্ন। কিন্তু সেদিনও শহর কত শান্ত। ঠিক আজকের মতোই। হাতির পিঠে নিথর শুয়ে থাকা কিশোর নবাব কি তখনো হাত পেতে চেয়ে রেখেছিলেন খুচরো পয়সা? কিন্তু কে ছোঁবে তাঁকে? পিছনেই যে গোরাদের সেনা। বুটে মার্চপাস্টের শব্দ তখন ঘিরে নিয়েছে আদ্যোপান্ত নগরীটাকে। ইংরেজদের দাপট। বিজয়ের উল্লাস। ক্লাইভের হুঙ্কার। এখনো অনেক কাজ বাকি। হীরাঝিলকে নস্যাৎ করা। মীরজাফরকে মসনদে বসানো। মুর্শিদাবাদ থেকে রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তর। প্রায় সত্তর বছরের বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের পতন। আর সাহেবদের তৈরি কোম্পানি বাহাদুরের হাত ধরে উঠে আসা একটা গণ্ডগ্রাম থেকে কলকাতার আশ্চর্য উত্থান। এ এক পট পরিবর্তনের গল্প। কিন্তু কোথায় আজ মুর্শিদকুলী? কোথায় সুজাউদ্দিন? আর কোথায় বর্গী দমনের একমাত্র কাণ্ডারী নবাব আলিবর্দী? গাঢ় হয়েছে ত্রিপলী দরজার অন্ধকার। নিভে গেছে কেল্লা নিজামতের আলো। কিন্তু আজও হাত বাড়িয়ে দুটো খুচরো পয়সার দাবী জানায় অচেনা মুর্শিদাবাদ। আমার তখনও কেল্লা নিজামতের কেন্দ্রে পৌঁছতে অনেক রাস্তা বাকি।