- 16
- 0
রাধাকৃষ্ণ সংবাদ
রাধা :
ওগো প্রিয় সখা, কালসমুদ্রের তীরে
সহস্র বছরের ঘুমের অতল অন্ধকার থেকে উঠে এলাম
মধু বৃন্দাবনের মনোসরণীতে। আজও ধুলোয় মিশে আছে
আবির আর আশ্লেষ, হাওয়ায় ভাসছে সুমধুর সুর আর সংরাগ
সুনিবিড় আকর্ষণ মিলন মধুর সুখ ও সম্ভোগ
মনে পড়ে যায় আমার রক্তে, কুসুমে মাখা সেই ভয়ঙ্কর দোলযাপন !
কৃষ্ণ :
প্রিয়ে, অপরাধ নিওনা, আমি বিস্মিত নই
জানি, সময়ের সরণীতে তুমি একদিন আসবেই -
তোমার সুগন্ধি আলিঙ্গনে মেটাবো হাজার বছরের তৃষ্ণা
আমার নাভিপদ্মে ছড়িয়ে যাবে মগ্ন সুখের ঢেউ
তুমি রাজার নন্দিনী, রাজ-ঐশ্বর্য বৈভব তোমার আজন্ম লালিত
সংস্কার। ভালবাসার কাঙাল আমি, সোনা-দানা মণি মাণিক্য
নেহাৎ তুচ্ছ, অন্তরে জ্বলে অনির্বাণ বেদনার দাহ .....
রাধা:
তোমার প্রাণপ্রিয়া রাধার পত্র পেয়েছ নিশ্চয় !
কী এমন অপরাধ, যার তরে নিশিদিন বিরহের অগ্নিদাহ
পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যায় কাঠ কয়লা যেমন
তেমনি আমার হৃদয় নিরবধি প্রতীক্ষার প্রহর গোনে
বিচ্ছেদের আকুল ক্রন্দনে দু'চোখে অশ্রুবান
ঘরে কি থাকতে পারে, কৃষ্ণসাপ কাটে যারে ?
কৃষ্ণ :
বিশ্বাস করো সখি, সত্যের অপলাপ নয়
কান্না ফুরিয়ে যায় এক সময়, তোমার আমার সকল হৃদয়ের
অযুত কোটি বিশ্বের প্রেমিক যুগলের। আমরা ঠিক কতটুকু
পাই এ-ওকে, যার তরে অনন্ত কোটি বর্ষ বিনিদ্র যাপন ।
পাওয়ার আকুল বাসনায় নিরন্তর কৃচ্ছ্রসাধন
রাধাঃ
এত কিছু বুঝিনে সখা, আমি যে অবোধ
বালা, অজ্ঞাতে কখন যে ভালোবেসে পেয়েছি প্রবোধ
ঘন শ্যাম অঙ্গ, কজ্জ্বল কালো কেশদাম, শিখি জুড়ে ময়ুর পুচ্ছ
ত্রিভঙ্গ মুরারি, হাতে বেণু, পায়ে নুপুর নিক্কন
ওগো বাঁশরিয়া, বাঁশরীর বোলে ওঠে রাধা রাধা নাম
কি মধুর তান, – কি বা দিশি কি বা নিশি কিবা মধ্যযাম
এ কি ভোলা যায় তুমি যে পুরুষ নও, রমনীমোহন
গোপীমন চোর মা যশোদার নয়নাভিরাম
কোটি কল্প সখা সঙ্গ, শ্রীদাম সুদাম বসুদাম
সনে গোচারণ খেলা, অপরাহ্ বেলা
ব্রহ্মা যার পায় না নাগাল, শ্রীবিষ্ণু মহেশ্বর আদি
আমি সামান্য রমণী, বিদুষী নই, সরলা -
এ বক্ষ মাঝে জড়াইব তব রাঙা দুটি পা
ধৈর্য কেমনে রাখি -
কৃষ্ণ :
সখি, অভিমান ভোলো, বিশ্বাস হারিওনা
তোমার আমার ভালবাসা সে তো জন্ম জন্মান্তরের রাই
এ বিরহ বেদন সে তো কর্মের ফল, বড়ই দুর্লঙ্ঘ
তুমি নারী, বুঝবে না পুরুষ হৃদয়ের অব্যক্ত যন্ত্রণার বাণী
কত নীরব কান্না চাপা থাকে বুকের নিভৃত অন্ধকারে
কত নিশি জাগা চোখের কালিমা অনাবিষ্কৃত থেকে যায়
অন্তর মথিত কত যন্ত্রণা, মানবের বিশ্ববীক্ষায় !
রাধা :
অমর লতার মতো আমার যৌবনে মেখে নিচ্ছি জ্যোৎস্নার রূপালি রং
তোমার দেওয়া ভালবাসার পরম আদর, দংশনের দাগ, কবেই মুছে গেছে
আমার শরীর থেকে:
সময় যেমন সাদরে মুছে দেয় প্রসব চিহ্ন প্রসূতির দেহ থেকে
মুছে দিতে পারে নি আমার মন থেকে দোলখেলার সেই সুখানুভূতি।
কৃষ্ণ :
দুঃখ কোরোনা প্রিয়ে, দুঃখই তো সুখের উৎসভূমি
ভালবাসার ব্যথা চির আনন্দের হয়, ফুলের পাপড়ি
মাড়িয়েই যেতে হয় ফুলশয্যার ঘরে, এ কথা বোঝ না তুমি ?
না পাওয়ার বেদনা মধুময়, প্রাপ্তির আসঙ্গে যেতে হলে
সজ্জিত বস্ত্রে অলক্ষে মলিনতা থেকে যায়, এটাই প্রেমের স্বরূপ
কৃষ্ণপ্রেমে কলঙ্ক-কাঁটা সে তো থাকবেই ।
রাধা :
ওগো, চতুর চূড়ামণি, প্রতি অঙ্গের যন্ত্রণা, রোমের জন্য রোমকূপের
স্নায়ুর জন্য স্নায়ুতন্ত্রীর, নিঃশ্বাসের জন্য প্রশ্বাসের,
অশ্রুত কত ধ্বনির জন্য অব্যক্ত কত
শব্দের, একটা গোটা জন্মের কান্না, তাকি শুনতে পেয়েছ কোনদিন ?
মনে পড়ে সখাসনে গোচারণ খেলা, কদম্ব বৃক্ষের তলে প্রেমলীলা
কালিন্দীর তীরে যমুনা মিলন, বিরজার কুঞ্জে রাত্রিবাস
কৃষ্ণ :
ভুলিনি প্রিয়া, সেদিনের সুন্দর সোনালি স্মৃতি
তোমার চুল হয়ে উঠেছিল নৈঋতের কালো মেঘ
তোমার চোখে দেখেছি পরিত্র অবগাহন, মোহ মদিরতা
তোমার ঠোঁটে বাণীময় ভাষা, মহাকবি বাল্মিকীর মতো
আকন্ঠ পিপাসায় দিয়েছিলে তৃষ্ণার জল
প্রবল জ্বরে যখন ওষ্ঠাগত প্রাণ, তখন দিয়েছিলে
মস্তকে জলপট্টি, ঠিক মহিয়সী মায়ের মতো
তোমাকে ভোলা যায় না, তবু ভুলতে হয় জগৎকল্যাণে
কর্তব্যের টানে । অনন্ত কাল তোমার প্রেমের কাছে ঋণী
দেবদাস কি পার্বতীকে ভুলে যেতে পারে
ছায়া কি ভুলে যায় বৃক্ষের তলদেশ। দুঃস্বপ্নের রাত
চিরন্তন নির্বিকল্প জ্যোৎস্নায় স্বপ্ন ভেসে যায়
তোমার চোখের আলো, রক্তিম ঠোঁটের মায়া
ক্রমাগত সুদূরে মিলায়। বুঝি না তো কিছু
এ জীবন অশ্রুধারাপাতে কেন গেল বয়ে ?
সীমাহীন দিগন্তের মগ্ন রামধনু উন্মোচিত হয়, তবু
দেখি পরাজয়, সব আলো দিগন্তে মিলায়।
রাধা :
সখা আমার, প্রিয় আমার, কবে হবে মধুর মিলন
সখিগণ সাজায়েছে অপরূপ শোভিত পুষ্পসজ্জা
কুঞ্জ আলো করে রয়েছে অশোক, কিংশুক, নব মল্লিকা
দুই দিকে রসের বালিশ, শ্রদ্ধা ও ভক্তির আলিঙ্গন
কবে অবসান হবে নিশিজাগা রাত, ওগো কৃষ্ণচন্দ্র
জনম দুঃখিনী রাধার সকরুণ আবেদন।
কৃষ্ণ :
অবহেলা আর বিষণ্ণতার প্রশ্নে তুমি পূর্ণতা চাইবে
উত্তরহীনা হবে না, অবিচল বিশ্বাসে নিঃশব্দে
পেরিয়ে যাবো মায়ার চৌরাস্তা, হারিয়ে যাবো শেষ বিকেলের
নিরুদ্দেশ সূর্যের মতো। গোধূলির রঙে পুনরায়
জেগে উঠবে নিসর্গের মায়ায়। তোমার হৃদয়ের বেলাভূমে
সমুদ্রের অসীম ঊর্মিমালায় হেমন্তের হিমেল বাতাসে।
রাধা :
সেদিন বসন্তের রাতে তুমি উজাড় করে দিয়েছিলে সমস্ত রতিশাস্ত্র
জয় করে নিতে চেয়েছিলে আমার শরীর যৌবন মন, নির্বোধ তুমি
আমি সমর্পিতা, তোমার অঙ্গে লীন হওয়াই ছিল একমাত্র
অভীপ্সা, তা তুমি বোঝনি নিঠুর কানাই -
সেদিনের রতি হয়েছিল যুদ্ধের পটভূমি, দেহে তোমার গভীর চুম্বন
আলিঙ্গন, শৃঙ্গার, বিহার, আমার প্রতিটি অঙ্গ করেছিল
শিথিল, জ্ঞান হারিয়েছিলাম ক্ষণকাল, তোমার সুতীর আশ্লেষে।
কৃষ্ণ :
মিলন বাসরে দাহ থাকে, যন্ত্রণার লেশ অনিঃশ্বেষ -
একটা সময় তুমি যেন মুক, অনিচ্ছুক মৈথুন শেষে
অন্ধকারে লুকিয়ে কাঁদো, তারপর শয্যায় ঘুমন্ত রাত
তখন তোমার মুখ কিশোরীর মুখ, অপাপবিদ্ধ শরীর, খোলা চুল
অবিন্যস্ত শাড়ির ভাঁজ, পবিত্র দুটি পা, ইচ্ছে করে রাঙা দুটি পা
জড়িয়ে বলি, ক্ষমা করো রাধে, অপরাধ নিওনা
আমি শুধু প্রেমিক না, আমি যে পুরুষ।
তুমি পরমা প্রকৃতি, তোমার সুশীতল কোল
জন্মশুদ্ধা, আরাধনা যার সাধন ভূমি
আমার হ্লাদিনী শক্তির অংশোদ্ভূতা, জানে অন্তর্যামী।
রাধা :
তুমি প্রতারণা করনি তোমার প্রেমিকার সাথে
চূড়ান্ত সম্ভোগ শেষে ছুঁড়ে দাওনি লোকলজ্জার
মানিময় অন্ধকারে। তোমার মাথায় ছিল নন্দিত উপায়
নন্দদুলাল, তোমার ছলনায় শুরু হয় আবিরের উৎসব
হোলিখেলা, গোকুলবাসী নরনারী বেরোল পথে
মাখিয়ে দিল রঙের ফাওয়া - এ ওর সাথে
মেখেছিল প্রেমের আবির। উজ্জ্বল রংয়ের আড়ালে আমার
শরীর ও বসনের সমস্ত রক্তের দাগ সেদিন ঢাকা পড়েছিল
কৃষ্ণ :
অভিশাপ দেবে, দাও, দুঃখ নেই, কালের নিয়মে
সাদরে বুক পেতে নেবো, যে কৃষ্ণের নামে আসমুদ্র হিমাচল
উদ্বেল হয়ে ওঠে, গাভীসব পথ ভুলে যায় গোচারণ মাঝে
আমি সেই নন্দকিশোর, ভক্ত সুদামার প্রাণপ্রিয়
তুমি শুধু আমার প্রেয়সী নও, আমার আরাধ্যা দেবী
শত জন্মের সাধনার ধন
আমি দেখতে পাই তোমার চোখের জলের ধারা
হৃদয়-বিদীর্ণ হাহাকার, ওগো নীলাম্বরা
বিষাদ বলয়ে অশোক পুষ্পচয়ন, সে বড়ো কঠিন
কাজ, সে কেবল সাধিকাই পারে।
জন্মান্তরে শোধ করব তোমার ঋণের দায়
বহিরঙ্গে রাধা হবো, অন্তর কৃষ্ণময়।
রাধাঃ
আমার জীবনব্যাপী শুধু ব্যর্থতা। পরাজয়ের গ্লানিময় ইতিহাস
সময়ের সরণীতে তুমি একদিন ঈশ্বর হয়ে গেলে
কুরুক্ষেত্রের মধ্যমণি, তোমায় ঘিরে সেবা পরিচর্যায়
তোমার ঈশ্বরীরা, রুক্মিনী, সত্যভামা, কত দাস-দাসী
কত পাত্র-মিত্র-অমাত্য, কে নেই সেই দলে ?
আমি রইলাম ব্যর্থতার অতল অন্ধকারে
নিরুদ্দেশের গহিন গহ্বরে বঞ্চনাকে সঙ্গী করে।
কৃষ্ণ :
জগতের সকল পুরুষ চায় রূপমুগ্ধা নারী
দু'চোখ ভরা প্রেম, হৃদয়ের সুধাভাণ্ড অমৃত আস্বাদ
আজ বসন্ত রং সরোবরে অবগাহন রত তোমার সারা দেহে
বিচিত্র রং-এর বাহার সবুজ, হলুদ, লাল, নীল, সোনালি,
ঠোঁটে, চিবুকে, ঘাড়ে ও গলায় সোহাগের উজ্জ্বল রেখা
অনিন্দ্যসুন্দর, ভালোবাসা ভালোলাগায় দখিনা মলয়
স্পর্শে লাল পলাশ কদম্বের বনে ওঠে মর্মর
ফাল্গুনের কল্লোলে বসন্ত রংয়ের উড়ান উৎসবে
তোমার দরজা খোলনি হৃদয়পুরে, ওগো অনিন্দিতা
ভূমিহীন আমি অপার বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষায় আছি
কবে পাবো তোমার নিমন্ত্রণ প্রেমের উজ্জ্বল অগ্নিস্নানে।
রাধা :
আজ আমি পূর্ণ, তোমার আমার সম্পর্কের
আর এক নাম অপেক্ষা । অনন্ত কাল অপেক্ষা।
আজ আর নেই বুকভাঙা শূন্যতা, দিগন্ত রেখা ছুঁয়ে
খুঁজে ফেরা উন্মাদিনীর মতো, ক্ষত বিক্ষত হওয়ার নেই ভীতি
শুভ পূর্ণিমার রাত, আজ আমি শান্ত, সমাহিত
এই মধুমাস, নিকুঞ্জ কানন, কালিন্দী ডহর
তোমার জনম দুঃখিনী, বৃষভানু রাজনন্দিনী রাধা
সমস্ত অভিমান ভুলে, যন্ত্রণার কণ্টক মাড়িয়ে সমর্পিতা
ফিরে এসো সখা, আমি যে তোমার বড় আপনার জন
সাধনসঙ্গিনী জন্ম জন্মান্তরের রাই।
0 Comments.