ক্যাফে গল্পে অভিক সাধু

অনুঘটক

বিমলবাবু ছাপোষা মধ্যবিত্ত – বলা চলে ছাপোষা মধ্যবিত্ত শব্দবন্ধটা যেন তাঁদের মতো কিছু মানুষকে দেখেই সৃষ্টি হয়েছিল | তাঁর সেলসের চাকরিটা আর বছরদুয়েক আছে | আগের সেলস ম্যানেজার তাও একটা বাস্তবসম্মত , মানে যা পূরণ করা যায় সেইরকম সেলস টার্গেট দিতেন | কিন্তু নতুন সেলস হেড , মিস্টার আগরওয়াল প্রফিট ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না – তাই তাঁর আকাশছোঁয়া টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে বিমলবাবুদের অবস্থা দুর্বিসহ | আজকাল মাঝেমধ্যে বিমলবাবু ভাবেন যে ভলেন্টিয়ারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নেবেন কিনা ! কিন্তু সংসারের হালের কথা চিন্তা করে তিনি আর ওই পথেও এগোতে সাহস পান না ! অফিস থেকে বাড়িতে ফিরে যে একটু শান্তি পাবেন তারও উপায় নেই | স্ত্রীর খিটিরমিটির লেগেই আছে | একমাত্র ছেলে কমলের কাজ হলো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো | কোনোভাবে বি.কম পাস্ করে পাড়ার ক্লাবে টাইমপাস করে ! আজকাল ক্লাবগুলো নানা ধরণের অনুদান পায় – তখন কমলের ফুর্তি দেখে কে | রোজ রাতে মদ খেয়ে বাড়িতে ঢোকা তো বিমলবাবু মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন , আজকাল তাঁর সন্দেহ হয় ছেলে অন্যরকম কোনো নেশাও করে কিনা |
অথচ স্ত্রীর জন্য কোনো কিছু বলা যায় না ! গিন্নি বলেন আজকাল ওরকম নাকি অনেকেই করছে | আর কমল নাকি কিছুদিনের মধ্যেই সিভিক পুলিশ জাতীয় চাকরি পাবে | যদিও বিমলবাবু জানেন যে সে গুড়ে বালি – কারণ বাবার হোটেলে খেয়ে খেয়ে আর ক্লাবে গুলতানি মেরে মেরে কমলের চরিত্রে যে আলসেমির জং পড়েছে তা সারিয়ে ওর পক্ষে কোনো খাটুনির কাজ করা অসম্ভব |

তবে আজকের ঘটনা আপাত শান্ত বিমলবাবুকেও নাড়িয়ে দিলো | বিমলবাবুর মেয়ের মোটামুটি ভালোই বিয়ে হয়েছে – মেয়ে স্কুলে পড়ায় , জামাই অসীম ব্যাংকে কাজ করে | আজ মেয়ে বিমলবাবুকে ফোন করেছিল | মেয়ে রীতা তার মাকেই বেশি ফোন করে , তাই আজ তাঁকে ফোন করাতে বিমল কিছুটা অবাকই হয়েছিলেন |
“হ্যাঁ – বল কেমন আছিস ?” – বিমল স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করলেও মনে উদ্বেগটা থাকে |
রীতা :”বাবা – এব্যাপারটা আমি মাকে আগেই জানিয়েছি কিন্তু কিছু হয় নি | তাই আজ তোমাকে ফোন করলাম ”
“কি ব্যাপার বলতো ?”
“ভাই মাঝেমাঝেই এখানে আসে ”
“তাই – জানিনাতো ! তোর মাও বোধহয় জানেনা – জানলে বলতো নিশ্চই !”
“না – মাও জানেনা | আমি যদিও হটাৎ এতো ঘনঘন আসার কারণ বুঝতাম না – কিন্তু সেদিন তোমার জামাই বললো নয় নয় করে ভাইকে ও শেষ ৩ মাসে পনের হাজার টাকার মতো দিয়েছে | ফেরত চাইলে বলে একটু অপেক্ষা করতে- বলে কিসে নাকি ইনভেস্ট করছে | রিটার্ন পেলেই টাকা দেবে | কিন্তু ফেরত দেবার কোনো নাম নেই ! বাবা ,অসীমতো ব্যাংকে চাকরিই করে – বাঁ হাতের পয়সা তো নেই ! আমার শুনে ভীষণ লজ্জা লাগলো ! এরপরে হয়তো শ্বশুর শাশুড়িও এইব্যাপারটা জানতে পারবেন | ওঁরা কি ভাববেন বলতো আমাদেরকে নিয়ে ? আজই তুমি ওকে একটু কড়াভাবে বোলো এব্যাপারটা ”
বিমলবাবু হতাশভাবে বলেন -“তুই তো জানিস আমার কথা ও শোনে না ”
রীতা :”তোমরাই ভালো আছো – মাও কোনো দায় নিলো না , এখন তুমিও কি সুন্দর গা বাঁচিয়ে চলছো !”
এই বলে সে ফোনটা কেটে দেয় |
বিমল মর্মাহত হয়ে বসে থাকেন |
বিমলদের অফিসের পিছনে একটা পার্ক আছে | আগে হয়তো সুন্দর ছিল কিন্তু রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে দুতিনটি ভাঙা বেঞ্চ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই | তাও বিকেলের দিকে কাছাকাছি থেকে বাচ্চারা এসে খেলাধুলা করে | অফিসের কাজ শেষ হলে বিমল একা ওই পার্কে গিয়ে বসলেন | মনটা আজ অন্যদিনের থেকে একটু বেশি খারাপ ! আজ অন্য কেউই পার্কে নেই | আবার হ্যালোজেনটাও জ্বলছে না | একদিকে ভালোই হয়েছে – বিমলের আজ আলো ভালো লাগছে না | কতক্ষন একভাবে মাথায় হাত রেখে বসেছিলেন তা তাঁর নিজেরই খেয়াল নেই | হটাৎ একটা ভারী গলা -“কি করছেন এখানে বসে ?” চমকে তাকিয়ে দেখেন এক বিরাট পুরুষ সামনে দাঁড়িয়ে আছে ! গুন্ডা মস্তান নাকি ? কখন এলো ? পায়ের আওয়াজ পেলেন না তো ? নাকি নিজেকে নিয়ে এতো ব্যস্ত ছিলেন যে খেয়ালই করেন নি !
লোকটা গমগমে গলায় আবার বলে উঠলো -“বোবা নাকি ? এখানে এইসময় কি করছেন ?”
বিমল বললেন – ” আচ্ছা চলে যাচ্ছি !”
লোকটা জোরে হেসে উঠলো -“যাবেনই বা কোথায় ? আপনার তো যাকে বলে কোনো প্রকৃত ঘরই নেই !”
বিমল এবার একটু বিরক্তস্বরে বলে ওঠেন -“দেখুন আপনার বোধহয় কোথাও ভুল হচ্ছে ”
লোকটি বিমলকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীরভাবে বলে ওঠে -” কিছু ভুল নেই ! প্রকৃত গৃহ কাকে বলে জানেন ? যেখানে শান্তি পাওয়া যায় | আপনার জীবনে তো ওই জিনিসটি নেই ”
বলে হটাৎ সে মাথাতে কি একটা লাগিয়ে দেয় – সেটা হোমের টিকার মতো চটচট করতে থাকে বিমলের কপালটা |
লোকটা বলে ওঠে -” যান – ওষুধ লাগিয়ে দিলাম | কাল থেকে আপনার সময় বদলাবে |”
বিমল বলে -“আপনি কে ?”
লোকটা আবার হেসে ওঠে -“আমি ভীম | যারা ভালো অথচ মানসিক জোরের অভাবে কষ্ট পায় তাঁদের কাউকে কাউকে আমি কখনো দেখা দিয়ে অনুঘটকের দ্বারা মনের আগুনটা জ্বালিয়ে দি ”
বিমলবাবু ভাবলেন লোকটা পাগল নাকি ? পাগল ছাগল যাই হোক , বিশাল চেহারা | হয়ত মেরেধরে টাকাকড়ি কেড়ে নেবে | বিমল দ্রুত পার্ক ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন |
ঘরে পৌঁছে দেখলেন গিন্নি আর ছেলে টিভিতে একটি রিয়ালিটি শো দেখছে | বিমলের দেখে মাথাটা গরম হয়ে গেলো | তবু যথাসম্ভব শান্তস্বরে ছেলেকে বললেন -“কমল – তুই কিন্তু অসীমের টাকাটা নিয়ে ভালো করিসনি | যতই হোক সে জামাই মানুষ |”
কমল তির্যকভাবে বলে ওঠে -“দিদির তাহলে তোমার কাছে চুকলি কাটা হয়ে গেছে ? বাহ্ ! চমৎকার !”
বিমল বলে -“কথাটা কি রীতা মিথ্যে বলেছে ? তোর অসীমের কাছ থেকে টাকাটা নিতে লজ্জা করলো না !”
“বাবা – আমার চাকরির জন্য কিছু ঘুষ দরকার | এমনিতে প্রাইমারি স্কুল টিচারের চাকরি পেতে গেলে পাঁচ লাখও কম পড়ে যায় – আমাদের ক্লাবের সাধনদার সোর্সে তিন লাখের মধ্যে হয়ে যাবে | সোর্সকে প্রথমে অগ্রিম হাজার তিরিশের মতো দেবার কথা ছিল | মায়ের কাছ থেকে পনেরহাজার মতো পেয়েছি | বাকি ওদের কাছ থেকে নিয়েছি – চাকরি পেলেই মাসে মাসে শোধ দেব ! সমস্যাটা কোথায় ? ”
“তুই ঘুষ দিয়ে চাকরি করবি ?”
গিন্নি এসময় বলে ওঠেন -“ও আজকাল সবাই করছে | তুমি কি সত্যযুগে বাস করো ?”
বিমল কোনোক্রমে বলেন -“বাকি টাকা ?”
কমল বলে ওঠে -“সে ব্যবস্থা আমি করে ফেলেছি | তোমার গ্রামের যে জমিটা আছে , সেটা তো কোনো কাজে লাগে না | তিনুকাকার সাথে একদিন গিয়ে কথা বলে এসেছি | তিনুকাকা চার লাখ অবধি উঠতে রাজি আছে ”
বিমল স্তম্ভিত হয়ে যান | তিনি বলেন -“এতবড় সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমাকে একবার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করলি না ?”
গিন্নি ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন -” তোমাকে জিজ্ঞেস করেই বা কি হতো ? পেতে জমির চার লাখ দর ?”
বিমল আর কিছু বললেন না – তবে সেদিন তিনি আর রাত্রে খেলেন না |
স্ত্রী শোবার আগে বললেন -“কাল চুপচাপ দলিলে সই করে দেবে | এমন সুযোগ বারবার আসেনা |”
বিমল শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলেন সেলসের ট্যুরের শেষে চুপিচুপি তিনি কতবার ওখানে গেছেন | শুধু নিরিবিলিতে নিজের শৈশবটাকে আবার ছুঁয়ে দেখতে !তাঁর স্ত্রী যদিও জানতো যে তিনি ট্যুরেই আছেন | বিঘে দুয়েক জমি আর একপাশে একটা ছোট্ট একতলা বাড়ি | জমিতে বাবার লাগানো নারকেল গাছ , মায়ের লাগানো শিউলি গাছ যেন তাঁকে তাঁর বাবামার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় | তাঁর ছোটবেলা – যেটা হয়তো তাঁর জীবনের সবথেকে আনন্দের সময় কেটেছে ওখানেই ! এইসব ভাবতে ভাবতে কখন তাঁর দুচোখে ঘুম নেমে এলো তা তিনি বুঝতেই পারলেন না !

সকালে উঠে বিমল বেশ ফুরফুরে ভাব অনুভব করলেন | বাড়িতে কমল নেই – গিন্নি রান্নাঘরে | বিমল আনন্দবাজারটা তুলে সবে দেখছেন এমন সময় কমলের গলা “আসুন তিনুকাকা |”
বিমল দেখলেন তিনকড়ি ঢুকছেন | তিনকড়ির গ্রামে মহাজনী কারবার , এখন পঞ্চায়েতের একজন গন্যমান্য ব্যক্তি -এককথায় প্রভাবশালী লোক |
তিনকড়ি -“কি বিমল ভালো তো ?”
বিমল -“এই চলছে | আপনি কেমন আছেন ?”
“আমার কি ভাই একটা কাজ ? কাল পার্টিতে রাজ্যস্তরের একটা মিটিং হবে নেতাজি ইনডোরে | আমি একদিন আগেই চলে এলাম – ভাবলাম তোমার কাছে কাজের কথাটা সেরে যাই | রথ দেখা কলা বেচা দুটোই হবে !”
বিমল গিন্নির চোখের ইশারা অগ্রাহ্য করে বললেন -” কিন্তু জমি তো আমি বেচবো না !”
তিনকড়ি বললেন -” সেকি কথা ? আমাকে এরকম হ্যারাস করার মানেটা কি ?”
“সে মানে তো আপনি বুঝবেন তিনুদা | আমার জমি , আমার সাথে কথা না বলে কমলের কথায় চলে আসাটা তো আপনার একপ্রকার বোকামি হয়েছে | তাই না ?” বিমল শান্তস্বরে কথাগুলো বলে নিজেই অবাক হয়ে যান | তাঁর মধ্যে এতো সাহস ছিল তা নিজেই জানতেন না |
তিনকড়ি কমলকে বললেন -“এরপরথেকে যা করার একটু বুঝেসুঝে কোরো | তোমার কথাতে আমার সময় নষ্ট করাটাই ভুল হয়েছে |” এই বলে তিনি দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেলেন |
কমল বসে থাকা বিমলকে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো -“কেন এমন করলে বোলো ? কেন ?”
হটাৎ বিমল দাঁড়িয়ে উঠে কমলকে সপাটে একটা চড় মারেন |
“তুমি এতো বড় ছেলেকে চড় মারলে ?” গিন্নি চেঁচিয়ে ওঠেন |
“হ্যাঁ – আরো আগেই মারা উচিত ছিল | তাহলে অনেক সমস্যা হয়তো এড়ানো যেত ! আর শোনো , এই বাড়ির ভাড়া এখনো আমি দিই | গ্রামের বাড়িটাও আইনত আমার | যার ভালো লাগবেনা সে নিজের পথ নিজে দেখে নিতে পারে | আর কমল, তোর নামে আমি যে একাউন্টটা রেখেছি – ওখান থেকে ১৫ হাজার টাকা তুলে অসীমকে এক্ষুনি দিয়ে আয় |”
ঘরে একদম পিনড্রপ সাইলেন্স | কমল ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে যায় | স্ত্রী কিছুক্ষন স্তম্ভিতভাবে বিমলের দিকে তাকিয়ে রান্নাঘরে চলে যান |
হটাৎ বিমলের মোবাইলটা বেজে ওঠে -কিন্তু কোনো নম্বর ফুটে ওঠে না স্ক্রিনে !
বিমল ফোনটা রিসিভ করেন |
একটা গুরুগম্ভীর গলা – কিন্তু চেনা চেনা লাগে |
গমগমে স্বরে গলাটা বলে ওঠে -” দেখলে তো ? শিরদাঁড়া সোজা রাখলে বিপদ অনেকসময় এমনিই কেটে যায় | আমি দাদাকেও অনেকদিন আগে সেই কথাটাই বলেছিলাম – কিন্তু দাদা মানত না ! কিন্তু শেষমেষ যুদ্ধ করেই নিজের অধিকার তাঁকে ফিরে পেতে হয় | জীবনটাও তো একটা যুদ্ধ -তাই না ?”
বিমল কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে যায় |

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!