পাঁচফোড়নে শ্রীতন্বী চক্রবর্তী

আধুনিক ইংরেজি নাটকে আধুনিকীকরণ এবং আন্দোলন

১৯৭০ বা ১৯৮০ সালের পরে কোনোভাবে সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ার না থাকলেও বারবার উঠে এসেছে সংগঠিত আন্দোলনের বিষয়গুলি। বেকারত্ব, সার্বভৌমত্বের পরিকাঠামো, সামাজিক বিপন্নতা, অস্তিত্ববাদের সঙ্কট, সময় ও ইতিহাসের গর্ভে বাড়তে থাকা একটি আন্দোলনের জন্মক্ষণকে চিহ্নিত করা, এবং তাকে পালন এবং পুষ্ট করা-এ সবই আধুনিক ভারতীয় ইংরেজি নাটকের মধ্যে কিছু কিছু প্রতীক এবং চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সাম্প্রদায়িকতা, সমকামী সম্পর্কের জটিলতা, নারী-পুরুষ বিভাজন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের স্বৈরাচার, ক্রমশ ভালোবাসাহীন, গোত্রহীন, নৈরাশ্যবাদী এক এবং অনেক জীবনের সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে নিজেদের জীবনের জিমন্যাস্টিকে অংশগ্রহন করে যায় প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রী। তাই কখনো বা নিরুত্তাপ স্বামীর মুখের উপর পণপ্রথা নিয়ে যোগ্য তির্যক মন্তব্য করে ওঠে দিনা মেহতা-র নায়িকা মালিনী, দিনার নাটক Brides are not for Burning –এ:

Malini: “Last year three hundred and fifty women died of burns in this city alone, some of them over-insured wives…”
Anil: “What are you trying to say?”
Malini: “…And when they died-plucked in their bloom by fiery fingers-the husband’s family came into a lot of money.”

আবার কখনো আধুনিকীকরণের জাঁতাকলে আটকে পড়ে মহেশ এলকুঞ্চওয়ারের সোনাটা নাটকের এক পাত্রী দোলন সেন তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে, কিছুটা অনাদরণীয়, উষ্মা-মিশ্রিত ভাবাবেগে লাগামছাড়া নায়িকা হয়ে উঠতে চায়, গানের কলি আর কিছুটা এক অপরিসীম উদাসীনতা মিশ্রিত কণ্ঠে বলে ওঠেঃ “we are all in boxes”, অরুণা, দোলন এবং সুভদ্রা, এলকুঞ্ছওয়ারের আধুনিকোত্তর নাটকীয় নারীরা “Sway to life with abandon”, আর এই পরিত্যাগেই তারা তাদের জীবনের আনন্দ সংযোজনের অধিকারকে প্রবলভাবে স্বীকৃতি দেয়। এলকুঞ্ছওয়ার মারাঠী থিয়েটারে শুধু যে মহনগর বা megalopolis এর মানুষদের জীবনযাত্রা, পারস্পরিক অভিসম্পাত আর ঘাত-প্রতিঘাতের নিরুত্তাপ অংযোগচিহ্নগুলিকে বর্ণনা করেছেন তাইই নয়, বরং অন্যদিকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পোস্টমডার্নিস্ট একটি উভয়সংকট, মনস্তাত্তিক প্রতিযোগিতা, অতীত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান সময়ের আন্তঃযোগ প্রণালীসমূহ-এই সবই তার চরিত্ররা মঞ্চায়ন করে চলেন সামগ্রিকভাবে। সোহাগ সেনের নির্দেশনায় কলকাতা এন্সেম্বেল এর নিবেদনে সোনাটার মুহূর্তগুলি কখনো বা ক্ষয়রোধের সন্মুখীন হয়, কখনো বা আলো, আধারি এক পরিমণ্ডলে পিয়ানোর মন কেমন করা নোটসগুলো দর্শকমনে সৃষ্টি করে চলে মহানাগরিক দৃষ্টিক্ষীণতার এক অতুলনীয় নাটকীয় রচনা। চেয়ার-টেবিল-ফুলদানী-সোফা-বারক্যাবিনেটের সাথে থেকেই ভারতীয় ইংরেজি নাটকের চরিত্রগুলিও বুঝিয়ে দেয় আমাদের কৃত্রিম সুখের প্রলেপটা খসে পড়তে পারে যেকোনো মুহূর্তে আর গুলিয়ে যেতে পারে আমাদের যেকোনো যুক্তিনিষ্ঠতা। এলকুঞ্ছওয়ার এর অটোবায়োগ্রাফি, গডসন, রিফ্লেকশন, পার্টি আর ওয়াডা চিরেবান্দি (Old Stone Mansion) সৃষ্টি করে কাটা-জোড়ার খেলা, বুদ্ধিমত্তা, ভালোবাসা, সামাজিক এবং পারিবারিক অনুশাসনের অপ্রয়োজনীয়তা আর কিছু ঘ্যানঘ্যানে, মধ্যবিত্ত অনুভূতির স্থিতিকরণ , গভীর অবচেতনের স্তর থেকে উঠে আসা আত্মিক বিশোধনের জায়গা এলকুঞ্ছওয়ার বা মহেশ দত্তানি অথবা মঞ্জুলা পদ্মনাভনের ভারতীয় ইংরেজি নাটকে তাই প্রায় নেই বললেই চলে। আলোর আতিশয্য নেই, তবে মাঝেমাঝে ফ্রেসনেল ল্যান্টার্ন, এলিপসইডাল রিফ্লেকশন স্পটলাইট আর PAR সৃষ্টি করে চলে এক বিচিত্রদৃকের মাধ্যমে আলোর মঞ্চায়ন। গ্রীক নাটকের মতো সূত্রধর অথবা ‘কোরাসের’ বাহুল্য না থাকলেও, পরিমার্জিত সংস্করণে নিরন্তর রচনা হয়ে চলে আধুনিক ট্র্যাজিক নায়ক অথবা নায়িকার। মহেশ দত্তানির ‘তারা’, ‘ড্যান্স লাইক এ ম্যান’ বা ‘ফাইনাল সলিউশনস’, অথবা ‘ব্রেভলি ফট দা কুইন’ তাই নাট্যরূপায়নের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয় সাজসজ্জায় পরিণত একটি বৈঠকখানা, নেপথ্যে বাজতে থাকে হয় ঠুমরি, নয়তো বাঁশির সুরেলা মূর্ছনা, অথবা তাল, নৃত্যছন্দের আওয়াজ।

আবহ, লয়ে, ছন্দে পরিবর্তিত হতে থাকে চারিত্রিক সম্ভাষণ-বিনিময় ও দৃশ্যকল্প। আবহ প্রজেকশন নিয়েও ভারতীয় ইংরেজি নাটকে নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষা হয়ে চলেছে। আলেক পদমসির অথবা জেকব রঞ্জন আর জাস্টিন লুই-এর Krishna’s Dairy শিল্পীসত্ত্বা এবং দর্শকদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরী করে রংবেরঙের মুখোশের ব্যবহার এবং স্বরক্ষেপণ আর ভয়েস মডুলেশন-এর দ্বারা। একটি চরিত্রের মধ্য থেকে অন্য চরিত্রে পুনঃপুনঃ প্রবেশ করা, এক অদ্ভুত মালয়ালম উচ্চারণে রঞ্জনের কথা বলা এবং রঞ্জনের জিনায় পরিণত হওয়া মুখোশের আড়ালে বরং একধরনের নাটকীয় স্বকীয়তার জন্ম দেয়|

সাসপেনশন অফ ডিস্বিলিফ, অবিশ্বাস, এবং দর্শকমনে সেই প্রাথমিক অবিশ্বাসের স্থগিতাদেশ বেশ ভালো রকমেরই চোখে পড়ে, স্পেস বা স্থান এর সঠিক মূল্যায়ন, এবং স্বর, সুর এবং অক্ষরের উচ্চারণে কখনো বা প্রশ্রয় অথবা কখনো বা প্রশ্রয়হীনতা| ইংরেজি এখানে নেটিভ না, বরং ‘learnt language’ আর ঠিক সেই কারনে আরও বেশী ভঙ্গুর হয়ে চলে, ভারতীয় ইংরেজি নাটক-র চারিত্রিক এবং মঞ্চসজ্জার পরিস্ফুটনে। একদিকে যেমন তাই প্রসেনিয়াম থিয়েটার নিয়ে গবেষণা চলছে, অন্যদিকে, ব্রিটিশ ক্লোসেটেড ড্রামা–র আদলে বারবার উঠে আসে ফ্লেক্সিবল থিয়েটার এবং থ্রাস্ট থিয়েটার এর নিখুঁত চিত্রণ। এমনকি রতন থিয়ামের মতো নাট্য-রূপকার এবং থিয়েটার স্রষ্টারা তো প্রাচীন মার্শাল আর্টের ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্যশৈলীও তুলে ধরেছেন বেশ কিছু নাটকের মধ্য দিয়ে, যেমন উরুভঙ্গঁম এবং চক্রব্যূহ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।