• Uncategorized
  • 0

১০০তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন “বর্ষায় হেমন্তে” – লিখেছেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ধরা যাক তিনি এক বিস্তৃত নদীর মত। তাঁর গানের ভাণ্ডারে অমূল্য সব ধনরত্ন। তার থেকেই এক আঁচলা জল নিয়ে গণ্ডূষ করি আজ। হেমন্তের স্মৃতি তর্পণ হোক শতবর্ষের জন্মদিনে ।
তিনি ক্রিকেট খেললেও খেলতে পারতেন। যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং পাঠ পর্ব না চুকিয়ে ফেললে তাঁর আশাকরি ঝকঝকে কর্পোরেট কেরিয়ার হতে পারত । দেশ পত্রিকায় যার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়েছিল তিনি কিন্তু ইচ্ছে করলে সফল লেখক হলেও হতে পারতেন কিন্তু এই বহুমুখী প্রতিভা বুঝি তাঁর জন্মছকে সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার প্রবল দিশা দেখিয়েছিল আর সেটাই বুঝি ছিল তাঁর একমাত্র ভবিতব্য। যা সর্বত ভাবে সফল হয়েও ছিল আজ শতবর্ষে পা দেওয়া হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে ।
ফিল্মফেয়ার থেকে ডিলিটপ্রাপ্তি, জীবনে আরও আরও পুরস্কার তাঁকে সম্মানিত করতে পেরে গর্বিত। তবুও একদিন সরকারের দেওয়া পদ্মবিভূষণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি। আজ তাঁর গান দিয়েই তাঁকে স্মরণ করব। গঙ্গা জলেই গঙ্গা পুজো হয় শুনেছি। তবে তাঁর গান দিয়েই তাঁর স্মরণ, মনন হোক। সেই গান স্মৃতি রোমন্থনেই হবে জন্মদিনের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপন ।
সেসময় সব শিল্পীদের মুখে এক রব। মানুষ হিসেবে বড্ড ভালো ছিলেন হেমন্তবাবু। লতা মঙ্গেশকর তাঁর ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ অ্যালবামে জানিয়েই দিলেন, ‘হেমন্তদার গান শুনলেই মনে হয় মন্দিরে বসে কোনও এক সাধু ভজন গাইছেন।’ আর মান্না দে এই বড় মনের মানুষটিকে বলতেন, ‘মিষ্টি সুরকার, মিষ্টি গায়ক, মিষ্টি মানুষ’ এই বলে। হেমন্ত বাবু ইচ্ছে করলে সব গান‌ই নিজে গাইতে পারতেন কিন্তু সুযোগ দিতেন সবাইকে।
কলার দেওয়া কনুই অবধি হাতা গোটানো সাদা শার্ট, ধুতি পরে আজানুলম্বিতের কোলের উপর হারমোনিয়ম ছিল তাঁর সিগনেচার। কবিবন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় তাঁর গানের দরজা প্রথম খুলে যায় । নবম শ্রেণিতে আকাশবাণী দিয়ে শুরু হয় গানের কেরিয়ার। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ইচ্ছেতেই ১৯৩৭-এ তাঁর প্রথম রেকর্ড বেরোয় ‘কলম্বিয়া’ থেকে। নন ফিল্মি গান। “জানিতে যদি গো তুমি আর বল গো বল মোরে” । নরেশ ভট্টাচার্যের কথা এবং শৈলেশ দাশগুপ্তর সুরে। ছেলেবেলায় জন্মে শুনিনি। পরে শুনে মনে হয়েছিল এ আমার হেমন্তের কণ্ঠ নয় কারণ সেসময়ের রেকর্ডিং, স্বর ক্ষেপণের অনুন্নত প্রযুক্তি আর কেমন একটা প্রচ্ছন্ন হতাশা গান জুড়ে। এমনই হত অবিশ্যি সে যুগে। যাই হোক সেসময় সে গান উতরে গিয়েছিল।
এরপর ১৯৪০-এ ‘নিমাই সন্ন্যাস’ সিনেমায় গায়ক হিসেবে প্রথম কণ্ঠদান। কীর্তন বা ভাবসঙ্গীত । উতরে গিয়েছিল ঠিকঠাক।
১৯৪৪-এ ‘কেন পান্থ এ চঞ্চলতা’ এবং ‘আমার আর হবে না দেরি’এই গানদুটি দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে পা রাখা। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয় নি। পঙ্কজকুমার মল্লিক যুগের অবসান ঘটেছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ ধরেই। ‘মুক্তি’ ছবিতে পঙ্কজকুমার মল্লিক ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’ গানটি। পঙ্কজবাবুর সুর অনুমোদন করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। নিজের পরিচালনায় ‘অনিন্দিতা’ ছবিতে যখন গানটি আবার ব্যবহার করলেন হেমন্ত, দু’টি স্তবক বেশি নিলেন। সুরকার হিসেবে শুধু পঙ্কজ মল্লিকের নামই রেখেছিলেন। নিজের নাম যুগ্ম ভাবে সুরকার হিসেবেও রাখেননি, কারণ অগ্রজ ‘পঙ্কজদা’র প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা। সেদিন রবিঠাকুরের কবিতা হয়ে উঠল স্বয়ং সম্পূর্ণ একখানি গান তাঁর হাতে, তাঁর গায়কীতে।
কিশোরীবেলা থেকেই সেই বাবার বয়সী মানুষ টা যেন কোথায় প্রণম্য এক প্রেমিকের জায়গা দখল করে নিল। গান ভালোবাসি কিন্তু তাই বলে এ আমার কি এক প্রচ্ছন্ন, প্রেম মেশানো ভক্তি! গ্রাস করে নিল যেন। লতা মঙ্গেশকরকে বাংলা গানের জগতে নিয়ে আসার কৃতিত্ব তাঁরই। শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে। পরে ‘প্রেম এক বারই এসেছিল নীরবে’ গানটি যখন লতাকে দিয়ে গাইয়ে উভয়েই সফলতার শীর্ষে।
‘আনন্দমঠ’ ছবিতে লতা মঙ্গেশকর কে দিয়ে ‘বন্দে মাতরম্’ গান গাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের। ছবিটির কথা হয়তো আজকের দর্শক ভুলেই গিয়েছেন, কিন্তু দেশাত্মবোধের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই গান। ‘হারানো সুর’-এ গীতা দত্তকে দিয়ে ‘তুমি যে আমার’ গানটি গাওয়ানোতেও তাঁর ক্রেডিট। রেকর্ডিং হওয়ার পরও প্রচুর সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল । কেউ বলেছিল বেশি ‘ফ্ল্যাট’ হয়ে গেল, কেউ বলল সাদামাটা। সুরকার হেমন্ত কিন্তু বলে গেলেন, চিন্তা নেই, এ গান লাগবেই। মিলে গেছিল তাঁর কথা।
‘নাগিন’ ছবিতে হারমোনিয়াম আর ক্লাভিয়োলিন ব্যবহার করে সাপুড়ের বিনের আওয়াজ সারা ছবিতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, ভারত মেতেছিল সেই সুরে। এর জন্যও পরিচালক ও প্রযোজকের সঙ্গে মতানৈক্য হয়েছিল তাঁর। বিনীত যুক্তিতে, অথচ গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁদের শেষ পর্যন্ত স্বমতে এনেছিলেন সুরকার হেমন্ত কুমার । সুপার ডুপার হিটসে সুর এখনো।
বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক সি রামচন্দ্র একবার প্রশ্ন করেছিলেন তাঁকে “আপনি তো গায়ক, সুরকার, প্রযোজক। এর মধ্যে কোনটি তে আপনি স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন?সবচেয়ে ভাল লাগে কোনটি?”
হেমন্তবাবুর উত্তর ছিল, “অবশ্যই গায়ক।” সুরকার হিসেবে আপাত ভাবে নিজের মূল্যায়ন সম্পর্কে খানিকটা উদাসীন ছিলেন তিনি নিজেই। খুব সহজ সরল সুর করতেন। কিন্তু তাতেই উতরে গেছে একের পর এক কত গান।
কিশোরকুমার ‘লুকোচুরি’ ছবির সুরারোপের দায়িত্ব তুলে দিলেন হেমন্তর হাতে। তাঁরই নিজের সুরে গাওয়া ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’ স্থান করে নিল বিবিসি-র সমীক্ষায় পঞ্চাশ বছরের সেরা গানের তালিকায়। গুরু দত্তের ‘সাহিব বিবি আউর গোলাম’ ছবিতেও তাই।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রযোজনায় ও সুরে ‘নীল আকাশের নীচে’র ‘ও নদী রে’? এভাবে যেন আর কেউ গাইতেই পারলেন না কস্মিনকালে। আকাশের নীলের সঙ্গে তাঁর গায়কীর রসায়ন যেন জমে গেছিল অদ্ভুতভাবে । নদীর উদ্দেশ্যে তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে প্রক্ষিপ্ত সেই আহ্বান? ‘ও নদীরে… ‘ বলে সেই প্রতিধ্বনি ? এখনো শুনতে পাই স্থান কাল পাত্র ভেদে যে কোন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে।
এখনো অকালবৈশাখীর ঝড় ওঠে আজো। উথালপাথাল করা সেই ঝড়ের উন্মাদনা ছিল শাপমোচনের ঝড় উঠেছে, বাউল বাতাস গানের মধ্যে । সেই ঝড় থামতেই সুরের আকাশে শুকতারা কে খুঁজে পেয়েছিলেন চঞ্চল, বিহ্বল, প্রেমিক হেমন্ত। আর সুরের আসর থেকে ফুলের বাসরে সেই সুর ছড়িয়ে দিয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। এই সব গান যেন তাঁর জন্য‌, হ্যাঁ, আমার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্য‌ই রচিত হয়েছিল। বন্ধু তোমার পথের সাথীকে খুঁজে নিও শুনতে গেলে এখনো মনে পড়ে যায় ফেলে আসা বন্ধুতার দিনগুলোকে। অথবা তারে বলে দিও, সে যেন আসেনা কিম্বা ওগো কাজলনয়না হরিণী শুনলে এখনো অনুভূত হয় কৈশোরের শিহরণ। তাই বুঝি এতকাল পরেও তিনি সফল। প্রতিবার ফাগুণ এলেই সেই ব্যাথার গান বুকে বাজে। সব সজনীরাই বুঝি মনে মনে অনুভব করেন সেই প্রেমরোগের মোচড়।
তাঁর জনপ্রিয় অ্যালবামের গান ‘কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো’ গানটি কত যে প্রেমের প্রকাশ ঘটিয়েছে সেটা আগের প্রজন্মকে জিজ্ঞেস করলে এখনো টের পাওয়া যায়।
সত্তরের দশকে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় শ্রাবন্তী মজুমদারের সঙ্গে ডুয়েট গান ‘আয় খুকু আয়’? বাবা-মেয়ের ইমোশনাল জার্নি পরতে পরতে যেন ফুটিয়ে তুলেছেন ।
সলিল চৌধুরীর জন্য হেমন্তবাবুকে আমরা নতুন করে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলাম। একের পর এক সেইসব কালজয়ী গান তাঁর অমোঘ কন্ঠে অনন্য মাত্রা পেয়েছিল। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কোনো এক গাঁয়ের বধু কিম্বা রানার থেকে সত্যেন্দ্রনাথের পালকির গান অথবা হেমন্তবাবুর নিজের কথায় শোনো কোনো একদিন যতবার শোনা হোক পুরনো হয়না যেন। সলিল চৌধুরীর লেখা ও সুরে ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ গানটি আজও সমান প্রচলিত। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া এই গান পরে বলিউডে ব্যবহার করা হয়।
আধুনিক যুগের কবিতার মত করে তিনি লিখেছিলেন “মেঘ কালো আঁধার কালো”। কি অপূর্ব সেই গান। যেমন কথা তেমনি সুরের মেলবন্ধন।
১৯৫৯ এর ছবি ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবিতে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘এই রাত তোমার আমার’ গানটির সুর করেছিলেন তিনিই। আমাদের স্মৃতিতে অমর এই গান। ছবির সিকোয়েন্স অনুযায়ী মারাত্মকভাবে সফল।
তাঁকে ঘিরে পথ চলার শেষ আজও হয়নি, তবে তাঁর কন্ঠে ‘সপ্তপদী’ ছবির এই পথ যদি না শেষ হয় আজও সমানভাবে হিট। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গাওয়া এই গানে ছায়াছবির পর্দায় যেন নতুন করে জন্ম হয়েছিল উত্তম-সুচিত্রার।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে রচিত ‘মাগো ভাবনা কেন’ গানটি আজও কোথাও না কোথাও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে বহু শিল্পীর কন্ঠে প্রকাশিত হয়েছে এই গান।কিন্তু সেই অনুরণন যেন অশ্রুত ।
এখনো তাঁর গান শুনতে শুনতে ছবির দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় তিনি বলছেন, “আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি” অথবা “এই বালুকাবেলায় আমি লিখেছিনু” আমার জন্য‌ই যেন প্রেমিক হেমন্ত গেয়েছিলেন বুঝি। শুধু আমার কেন? যৌবনে পদার্পণ করা সব মেয়েদের মনের কথায় সেই ভালোবাসার মূর্ছণা। ‘আমি যে তোমারি’ অ্যালবামের এই গান চিরকালের রোমান্টিক হিট ‘আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি গানখানি’।
নচিকেতা ঘোষের সুরে অজস্র গান গেয়েছেন তিনি। রীতিমত ঝড় তুলেছিলেন। প্রতিটি গান আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। কি সেই রহস্য? কোথায় লুকিয়ে সেই জনপ্রিয়তার জাদুকাঠি?
খুঁজেই চলব আমরা সারা জীবন ধরে।
তিনি‌ই পারেন এমন বুঝি করে বিলিয়ে দিতে। তাই বুঝি তাঁর গানের স্বরলিপি আজীবন অমর হয়ে লেখা থাকবে বাংলাগানের পাতায় পাতায়, ছত্রে ছত্রে। একদিন হয়তবা পাখীরাও ধরা দেবে সেই স্বরলিপিতে। অসীম আকাশ ছেড়ে তাদের ঠোঁটেও সেই গান বুঝি অমর হয়ে ফিরবে। আকাশে বাতাসে ভেসেই থাকবে সেই সুর । ফুলে ফুলে ঢাকা বনতলে আমরা। তাঁর পথ চেয়ে বসে থাকব, আবার এক একমেবাদ্বিতীয় হেমন্তের জন্য। আপাতত সেটুকুনি প্রতীক্ষা।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!