• Uncategorized
  • 0

গদ্যে পূর্বা দাস

আচ্ছে দিন 

বিকেলে একটু বেরিয়েছিলাম কেনাকাটা করতে। তাড়া ছিল না, ধীরে সুস্হে হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা দূর চলে এসেছি। ভাল লাগে এই নতুন শহরে; একটু অন্যরকম মানুষজন, দোকানপাট, গাড়ি এমনকি ঘোড়াও। মাঝে মাঝে দুএকটা উটে টানা ভ্যান দেখলে হাঁকরা ছেলের মতো থেমে যাই। আগাপাশতলা ছবি তুলি মোবাইল ক্যামেরায় আর হ্যাংলা চোখে চেয়ে থাকি যতক্ষণ দেখা যায়। আশপাশের লোকেরা নিশ্চয়ই `আদিখ্যেতা’ বলে, মুখ ব্যাকায় । বলুক গে, আমার তাতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু মুশকিলটা হল খুচরো। হ্যাঁ, এই খুচরো সমস্যায় আপাতত আমি কাহিল। অটোওয়ালা খুচরো না থাকলে তুলবেই না গাড়িতে সব্জি বাজারে  তো পচা ধনেপাতা আর কালো ভেন্ডি দেবে বদলে। সেদিন  এক কেজি ময়দা, গুঁড়ো সাবান আর কি কি কিনে আশি টাকা হল, একটা একশ টাকার নোট দিয়েছি গ্রসারিতে, দুটো ক্যাডবেরিস পার্ক ধরিয়ে দিল। আরে পাঁচ টাকা অবধি ঠিক আছে, কুড়ি টাকাও দেবে না! বলে, আপনি আশিটাকাই দিন তবে। রেগেমেগে ওর সামনেই পার্ক দুটো এক বিশালদেহী গোমাতা কে খাইয়ে দিয়েছি।
পায়ে পায়ে রাজীব গান্ধি নগরের সীমা পেরিয়েছি কখন খেয়াল নেই। মহাবীরনগর সার্কেলের দিকটায় গাড়ি টাড়ি আরো কম। লোকজনও কম। রাস্তার দুপাশে নগরউন্নয়ণ বিভাগের লাগানো প্রতিটি গাছে ফুল ফুটে আছে বিকেল আলো করে। দুপুরে বৃষ্টি হওয়াতে ঝরেছেও অনেক। আর একটু এগোতে দেখি, সারি সারি প্রায় পনেরো কুড়ি জন মেয়ে মদ্দ মিলে ভুট্টা বিক্রি করছে। এরা বলে আমিরিকান ভুট্টা। কি মিষ্টি দানাগুলো। বঙ্গদেশ এ জিনিসে বঞ্চিত। একটি দেহাতি বৌয়ের ট্রলিভ্যানের কাছে গিয়ে দাড়াই। গোটাচারেক ভুট্টা কিনব আজ। শুধুই খাওয়া যায়। আবার কর্নস্যুপও আমার খুব প্রিয়। ব্যাগে একটা আধময়লা পঞ্চাশ টাকা আছে দেখে নিলাম। বৌটার প্রায় গলা অবধি ঘোমটা টানা। সাথে দুটো বাচ্চা মেয়ে। বছর দশেক হবে একটা। অন্যটা দেড় বছর হবে হয়ত, টলমলে পায়ে ট্রলির ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভুট্টা পোড়ানোর আগুন করা আছে একপাশে। আমার ভয়, বিস্ময় এর তোয়াক্কা না করে ঐটুকু বাচ্ছা একটা ছোট টুলের ওপর দাঁড়িয়ে ট্রলির ওপরে বাঁধা কাপড়ের ছাউনি থেকে একটা প্লাস্টিক ব্যাগ পেড়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। `পনি লে পনি…’ আরে এ কথাও বলে দেখি। নাম কি রে পুতুল, তোর? `ছাইনি’। কি? সাইনি? `না, না..’ ওর মা বলল, `সুহানী নাম ওর।’ বাঃ মিষ্টি নাম তো। বড় মেয়েটাকে বললাম, একটা ছবি তুলব? বলল, `জরুর’। এতক্ষনে ঘোমটা উঠল শ্রীমতির। সত্যিই শ্রীমতি। পাতলা গোলাপী ঠোঁট আর চোখটা একদম হেপবার্ন। বলল, আমার স্বামীরও আছে এরকম ফটোতোলা মোবাইল। হা আআ – দশহাজারকি। বলে কি! বললাম, তা তোমার স্বামী মহারাজটি কোথায়? কি করে সে? `মকানকা কাম’ । মানে রাজমিস্ত্রী আর কি। তো সে মক্কেলকে ধারে কাছে দেখছি না তো! বলল, গেছে তো ব্যাঙ্কে, সে অনেকক্ষণ হল। এটিএম কার্ড এসেছে জানিয়েছে ব্যাঙ্ক; তাই আনতে গেছে। এবার থেকে সবকিছু অনলাইনে হবে। এবার আর বাক্যি সরছে না আমার মুখে। নিজে আমি কষ্টে সদ্য শিখেছি অনলাইন টিকিট কাটতে। এরা অনলাইনে করবে কি! ভুট্টা বেচে কত টাকা থাকবে ব্যাঙ্কে? সাহস করে জিজ্ঞাসা করেই ফেলি, থাকো কোথায় তোমরা? কেন! এখানেই। চুলা বন্ধ করে বিটিদের নিয়ে এখানেই শুই। আর স্বামীজী? বড় মেয়েটা ট্রলির নীচে বাঁধা প্যারাসুট কাপড়ের ঢাকনা সরিয়ে দেখালো, সেখানেও একটুকরো পাটাতন জোড়া রয়েছে। মানে পুরো ফ্যামিলি এই ট্রলিতে। আমার ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখ দেখে ওর মায়া হল বোধহয়। বলল, আঁধার কার্ড হয়ে গেছে আমাদের। আর কি যেন একটা জুড়লেই সরকার অনেক টাকা লোন দেবে গো। গবরাবরট এ একটা জমি দেখেছি। পেলেই ওখানে বাড়ি করে নেব। ভুট্টার দাম মেটাতে কড়কড়ে একটা দশটাকার নোট ফেরৎ দিল।
বৃষ্টি এল আবার। ঝিরঝিরিয়ে। ছাদে মেলা জামাকাপড় গুলো ভিজল বোধহয়। সুহানীরা থেকে গেল ঐ ট্রলিভ্যানেই, চৈত্র-বৈশাখের আঁধির সাথে, জ্যৈষ্ঠ আটচল্লিশ ডিগ্রি আর এ ভরা ভাদ্রে, ওদের দশহাজারি মোবাইল আর এটিএম কার্ড সহ। লাখটাকার বাড়ির স্বপ্ন নিয়ে আচ্ছে দিনের আশায় হয়তো l

 

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!