বিষ্ণু পুরাণে ভারতের সীমা সম্বন্ধে উপরোক্ত দুই লাইনে বলা হয়েছে। উত্তরের হিমালয় থেকে দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত যারা বসবাস করে তারা ভারতীয় আর এই অঞ্চলের নাম ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষ শুধু মাত্র একটা দেশ নয়, একটা আবেগ। ভারতবর্ষ মানে কয়েক কোটি মানুষ নয়, একটা সভ্যতা যা ইতিহাস রচনার সুদীর্ঘ কাল থেকে বহমান। ভারতবর্ষ তৃতীয় বিশ্বের কোন অন্ধকার দেশ নয়, পৃথিবীকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করা এক সংস্কৃতি। ভারতবর্ষ এত ধনসম্পদে পরিপূর্ণ ছিল যে তাকে লুণ্ঠন করতে হাজার বছর ধরে একটার পর একটা জাতি এসেছে। তারা রাজত্ব করেছে, ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে এদেশের আত্মা। কিন্তু ভারত আত্মা কখনো নষ্ট হয় নি। সে টিমটিম করে জ্বলেছে, কখনো সলতে হয়ে গেছে নিভু নিভু। সে উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলেছে, গরিমা হারিয়ে ফেলেছে, তবুও কখনো সে হারিয়ে যায় নি বর্তমান থেকে।
আটশ বছরের মুসলমান শাসন, দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসন, ভেঙ্গে দিয়েছিল ভারতের শক্তিকে। ভারত আজ ভেঙ্গে টুকরো টুকরো। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এক তীর্থস্থান, এক উপাস্য দেবতা, হতে পারে তাদের রূপ আলাদা। এক আদি ভাষা সংস্কৃত। এক বেদ, এক মহাকাব্য, দর্শন, শাস্ত্র, পুরাণ। এক তাদের সংস্কৃতি। কিন্তু ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত, কখনো গুপ্ত সম্রাট সমুদ্র গুপ্ত এদের জয় করে এক ভারতের প্রতিষ্ঠা করলেও তা স্থায়ী হয় নি। একতা ছিল না, সৌভ্রাতৃত্ব ছিল না। আর এর ফল ভোগ করেছি আমরা।
আফগানিস্তান ধ্বংস হয়ে গেছে, হিন্দু সভ্যতার বদলে ইসলামিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে। সোমনাথ মন্দির থেকে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ভেঙ্গে দিয়েছে। তক্ষশিলা থেকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা কিচ্ছু করতে পারি নি কারণ আমাদের একতা ছিল না। মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার হত না যদি না রাজপুতরা তাদের পাশে থাকত। আমরা সব দেশীয় রাজারা সেদিনও ঐক্যবদ্ধ হতে পারি নি। লর্ড ক্লাইভের বিরুদ্ধে পলাশীর যুদ্ধে কেউ তরোয়াল হাতে তুলে নেয় নি। আর তারপর ভাঙ্গা দেশ আর একটি পরিবারের রাজত্বে স্বাধীন ভারত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু নেতৃত্ব পায় নি যথাযথ। সে বারবার নোংরা রাজনীতির কাছে হেরে গেছে। সে বারবার হিন্দু বিদ্বেষ দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করেছে। তার হারানো ঐতিহ্য কেউ পুনরুদ্ধার করতে এগিয়ে আসে নি। বরঞ্চ তাকে বারবার লজ্জায় ফেলা হয়েছে তার সুপ্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের জন্য। কিন্তু আজ দেশ এমন এক রাষ্ট্র নায়ককে নির্বাচন করেছে যে আসমুদ্রহিমাচল এই ভারতবর্ষকে তার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রাস্তায় ফিরিয়ে এনেছে, দেশ আজ ঐক্যবদ্ধ।
করোনা ভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণের চিকিৎসায় যারা দিনরাত এক করে কাজ করছে, যারা জরুরী পরিষেবা চালু রাখার জন্য প্রাণপাত করছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পাঁচ মিনিট হাততালি, ঘন্টা, শঙ্খ বাজাতে বলেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কত যে হাসির রোল উঠেছিল চারদিকে যেন হাততালি দিয়ে করোনা ভাইরাস তাড়ানো হবে। কিন্তু দেশ নজিরবিহীন ভাবে নানা আওয়াজে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে আজ যাদের ছাড়া আমরা নিতান্তই নিরুপায়। আজ দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আজ দেশ দেখেছে সামান্য ঘন্টা বা শঙ্খ বাজানোর মহিমা। আবেগে সবার চোখে জল এসে গিয়েছে।
আমরা যেদিন ঐক্যবদ্ধ হতে পারি নি, সেদিনও এই ভারত আত্মার পরাজয় হতে দিই নি। আমরা তাকে বয়ে নিয়ে চলেছি, নুয়ে গেছে কোমর, ভেঙ্গে গেছে সমস্ত সামাজিক, ধার্মিক রীতিনীতি। তবুও সে টিকে ছিল। আর আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ। কোথাকার কোন চীনা ভাইরাস আমাদের কখনো হারাতে পারবে না। ভারতীয় সভ্যতা অবিনশ্বর, তার সত্ত্বাকে হারানো কালপুরুষের পক্ষেও অসম্ভব।