বিকেল। শব্দটার মধ্যেই একটা ম্যাজিক আছে। ঠিক সেই সময়টা, যখন সূর্যের আলোর রং কাঁসা থেকে তামা হতে শুরু করে, এক একদিন অদ্ভুত লালচে গোলাপি, কনে দেখা আলো। আজকাল সেভাবে দেখা হয়ে ওঠে না, তাই সবকিছুর মত বিকেল খুঁজতেও পেছন দিকেই তাকাতে হয়। আর কান টানলে মাথার মত, বিকেলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে খেলার প্রসঙ্গ, তা সে মাঠে গিয়েই হোক,বা ঘর-উঠোনের এক কোণে রান্নাবাটি, পুতুল নিয়ে বসেই হোক।
স্কুল ছুটি হত তিনটে থেকে চারটের মধ্যে। চারটেয় ছুটি মোটেই পছন্দসই ছিল না, তিনটে হলে বেজায় মজা। কোনমতে বাড়ি ফিরে ব্যাগটা ধড়াম্ করে টেবিলে রাখা, জামা বদলানো, কিছু একটা নাকে মুখে গুঁজে দৌড় দৌড় দৌড়। পেছন থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলির মত আসত মায়ের শাসানি,’সন্ধে হওয়ার আগেই বাড়ি এসে পড়তে বসবি কিন্তু!’ তখন সেসব কে শোনে। এক ছুট্টে মাঠে। হ্যাঁ মাঠ বলে একটা বস্তুও ছিল বৈকি, ফ্ল্যাটবাড়িতে পরিণত হওয়ার ‘সৌভাগ্য’ তখনও তাদের হয়নি। তাই কিছু অতিসাধারণ বাচ্চা ছেলেমেয়েদের বিকেলের আনন্দটুকু ছিল তাদের ঘিরেই। কুমিরডাঙা, লক অ্যান্ড কি, চোর ধরা, নাম পাতাপাতি, ওপেন টি বায়োস্কোপ, সব চলত। হাঁপিয়ে গেলে ঘাসে শুয়ে পড়া,নয়ত বসে রুমাল চোর। ধুলোবালি লাগত গায়ে, আঁচড়, কাঁটাফোটা, কেটে-ছড়ে যাওয়া, ফোলা, কালসিটে ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। তাছাড়াও সঙ্গী ছিল লালু, কালু, ভুলু কুকুর আর তাদের বাচ্চারা, কালী ছাগল আর তার দুই ছানা,পাশের পাড়ার ঘরবন্দি দুই সাদাকালো খরগোশ আর পাশের বাড়ির গরুর বাছুর হরিণ(হরিণের মত গায়ের রং বলে নামকরণ)। এদের সৌজন্যে একরাউন্ড ‘জীবে প্রেম’ চলত। যদিও ছাগল এবং গরুরা সেজন্য গোবর আর নাদি ছড়াতে মাঠটাকে রেহাই দিত না। কিন্তু সবকিছুর ওপরে একরাশ আশ্চর্য আলো ঢেলে দিত বিকেলের সূর্য, সেই আদুরে লাল গোলাপি। আর কিছুর দরকার হত না।
নাঃ, বোধহয় দরকার হত। ‘তোর টিমে, তোর পাশে’ খেলার মত বন্ধুর, ধরা পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ‘আব্বুলিশ’ বলে চেঁচিয়ে ওঠার, চোর দেওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য রকমারি ফন্দিফিকিরের, রুমালচোর আর নাম পাতাপাতি খেলায় বন্ধুর সঙ্গে প্ল্যান করে অনন্ত জোচ্চুরির। ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি, মুখ দেখাদেখি বন্ধ– সওব হত, আর রাত শেষ হলেই আড়ির বদলে ভাব হয়ে যেত। না হয়ে উপায় কি! না হলে তো খেলা বন্ধ, বাড়িতে বসে বসে পাঁচের প্রশ্নমালা থেকে অঙ্ক করতে হবে। কে সুখে থাকতে ভূতের কিল খেতে চায়?
শীতের দিনে খেলা একটু বদল হত, অন্যান্য খেলার বদলে ব্যাডমিন্টন। তবে আসল মজা ছিল গরমের আর পুজোর ছুটিতে, তখন শুধু বিকেল নয়, সকালেও খেলার ছুটি পাওয়া যেত। এসময়ই বাক্স থেকে বের হত পুতুলেরা। বাড়ির শাসনে রান্নাবাটি আর পুতুল খেলার মাঝে সবসময়ই একটা গন্ডী রাখতে হত। রান্নাবাটি খেলার সময় ছিল সকালে, যখন বাসন হত মাটির ভাঁড়, নারকোল মালা, পাতার লুচি, ইঁটের গুঁড়োর মশলা, স্টোনচিপসের মাংস রান্না হত আর যথেচ্ছ জলকাদা ঘাঁটা যেত। এখনকার মায়েরা তো দূরস্হান, বাচ্চারাও সেসব অপকর্মের কাহিনী শুনলে ভিরমি খাবে। স্বাভাবিকভাবেই সেই নব্বইয়ের দশকেও ঘরে সাজিয়ে রাখা পুতুলদের(সঙ্গে তাদের খাট আলমারি, জামাকাপড়) জল আর কাদা থেকে শতহস্ত দূরে রাখার একটা প্রবল চেষ্টা আমার মা’ও করেছিলেন। ফলে বাড়ির পুতুলদের নিয়ে খেলতে হলে সকলকে যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন ও ভদ্রসভ্য হয়ে খেলতে হত। ফলাফল দাঁড়াতো পুতুল খেলার নামে রীতিমতো কাহিনী বানানোয়, আর হলফ করে বলতে পারি, সেসব গল্প টেলিপ্যাথি তে শুনেই আজকালকার সিরিয়াল লেখকরা করে খাচ্ছেন। যাকে বলে পুরো সামাজিক যাত্রাপালা। দুই পুতুল বৌ, আকাশ বৌ আর নয়ান বৌ(নামটা বঙ্কিমচন্দ্র থেকে স্রেফ ঝেড়ে দেওয়া, কারণ দজ্জাল বৌ এর একটা নাম তো চাই)। স্বাভাবিকভাবেই প্রথমজন ভালো, সুন্দর, গোছানো সংসার ও অপেক্ষাকৃত বড়লোক, আর দ্বিতীয়জন ঠিক তার উল্টো।এদের দুজনের মোটেই বনে না, মানে অজান্তেই খেলায় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ থেকে ‘গোপাল-রাখাল দ্বন্দ্বসমাস’ পর্যন্ত চলে এসেছিল। এমনকি কলোনিয়াল হ্যাংওভারের দিকটাও ছেড়ে দেওয়া হয়নি, কারণ মাঝেমধ্যে এদের এক প্রতিবেশী মহিলা ও তার স্বামীও এন্ট্রি নিতেন, যারা সোনালী চুল ও পিটপিট চোখের কুলীন ডল ছিলেন(এরা আরো বেশী বড়লোক)। এদের সকলের কান্ডকারখানায় বাড়ি সরগরম হয়ে থাকত, আর আমরা ছিলাম সূত্রধর, মানে গল্পের ন্যারেটরবিশেষ। কেন জানি না, নিজেদের বৌ সাজার আগ্রহ খুব একটা ছিল না, এমনকি আরেকটু বড় হয়ে বৌ আর বিয়ের গুরুত্ব বুঝলেও আমরা রাজকুমারী, বড়জোর রানী সাজতে চাইতাম, হয়ত স্বয়ম্বরও, নিজেদের অবস্থান ছেড়ে, কল্পনায়। মন আমাদের ছেলেমানুষেরই ছিল, কিন্তু চার পাশের দেখা আর বইয়ে পড়া ঘটনাদের আত্মস্থ করেছিল অজান্তেই। সত্যি বলতে কি, আজকাল মনে হয়, বছর পঁচিশ আগেও ছোট মেয়েদের পুতুলখেলা নিয়ে আজ একটা মোটাসোটা সোশিওলজির থিসিস হয়ে যেতে পারে।
সে তত্ত্বচর্চা না হয় থাক। পুরোনো দিনের গল্প করতে করতে আবার বর্তমানেই ফিরি, সেই ছুটির জন্য, বিকেলের জন্য একরাশ মনকেমন নিয়ে। পুতুলেরা আজো আছে, সাজানো গোছানো, ওদের কাজ ফুরিয়েছে, গল্পও। আজকাল ও জায়গাটা অন্য অনেক কিছু নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আজও হঠাৎ ছাদে উঠলে যদি গোলাপি রঙের একটুকরো পশ্চিম আকাশ চোখে পড়ে, তখন স্পষ্ট শুনতে পাই ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে যাওয়া এক মাঠের মাঝে দাঁড়ানো একটা বছর দশেকের মেয়ের গলা,
“এক ছোটা সা লমহা হ্যায়
যো খতম নেহি হোতা
ম্যায় লাখ জ্বালাতি হুঁ
উয়ো ভস্ম নেহি হোতা….
….ছোড় আয়ে হম উয়ো গলিয়াঁ…”