ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ১৩)

আলাপ

কিরানা ঘরানায় উস্তাদ আব্দুল করিম খানের পর দ্বিতীয় প্রজন্মে বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন তাঁর পুত্র ও কন্যা সুরেশ বাবু মানে এবং হীরাবাঈ বরোদেকর। এ ছাড়া তাঁর শিষ্যদের মধ্যে বিখ্যাত হন সওয়াই গন্ধর্ব, বাসবরাজ রাজগুরু, রৌশনারা বেগম, গাঙ্গুবাঈ হাঙ্গল, প্রভা আত্রে প্রভৃতি। এঁরা কেউই কারো থেকে কম নন তবে সবাইকে নিয়ে তো এই সীমিত পরিসরে লেখা সম্ভব নয়, তাই এবার বলবো একেবারে আধুনিক কাল পর্যন্ত সর্বাপেক্ষা খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় কিরানা ঘরানার শিল্পী ভারতরত্ন পন্ডিত ভীমসেন যোশীজির কথা। বলা যায় তিনি তাঁর ঘরানাকে বিখ্যাতই করেননি, ছাপিয়ে গেছিলেন। মানুষ আগে তাঁর গানের কথা বলে, পরে তাঁর ঘরানার কথা।
পন্ডিত ভীমসেন যোশীর জীবনকথা বিচিত্র। বহু গল্প লুকিয়ে আছে তাঁর অত্যন্ত সফল সাঙ্গীতিক জীবনে। ১৯২২ সালে কর্ণাটকের ধারোয়াড়ে তাঁর জন্ম হয়। ষোলটি ভাইবোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সকলের বড়ো। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর বাবা চাইতেন ছেলে পড়াশোনা করে বড়ো হোক, যাতে পরিবারের অভাব ঘোচে আর ছোট্ট ভীমসেনের শিশুবয়স থেকেই মন পড়ে থাকতো যে কোনরকম সঙ্গীতে। অতি শিশু বয়সে যখন বিয়ে বা পুজো ইত্যাদি উপলক্ষ্যে সাঙ্গীতিক ব্যান্ড রাস্তা দিয়ে প্রোসেশন করে যেতো, তিনি অতোরকম বাজনা ইত্যাদি দেখে আকৃষ্ট হয়ে তাদের পিছু পিছু দলে মিশে হাঁটতে শুরু করতেন। বাড়ি থেকে বহুদূরে চলে যেতেন। তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারে ঘুমিয়ে পড়তেন। বাবা মা চিন্তায় পাগল হয়ে যেতেন, কিন্তু শিশুকে খুঁজে পেতেন না। তখন পুলিশে খবর দিয়ে তাঁকে খুঁজে নিয়ে আসা হতো। শেষে তাঁর বাবা আর কোন উপায় না দেখে তাঁর গলায় একটি লকেটে লিখে দেন “শিক্ষক যোশীর ছেলে”। তাঁর বাবা গুরুরাজ যোশীকে শিক্ষক হিসাবে সেই অঞ্চলে সবাই চিনতো। তাই সেই লকেট দেখে শিশু ভীমসেনকে বাড়িতে পৌঁছে দিতো। ছোটবেলা থেকেই কোথাও হারমোনিয়াম বা তবলা দেখলেই তা বাজাতে বসে যেতেন ভীমসেন। গান ছাড়া ভীমসেনের ভালো লাগতো কুস্তি লড়তে। গ্রামের আখড়ায় ছোট্টবেলা থেকে গাট্টাগোট্টা ভীমসেন কুস্তিতে ওস্তাদ হয়ে ওঠেন। এইসব অভ্যাসের জন্য বাড়িতে তাঁর হেনস্থা বাড়তে থাকে। বাবা কিছুতেই তাঁকে গান শেখাতে রাজী হন না। এদিকে সৎমাও মারধোর শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত একদিন পাতে আরেকটু ঘি চেয়ে পাননি নয় বছরের ভীমসেন। সেদিনই তিনি ঠিক করেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। ঘুরে বেড়াতে হবে গুরুর সন্ধানে, যতক্ষণ না গান শেখার ব্যবস্থা হয়। পরদিন রাতারাতি বাড়ি থেকে পালিয়ে ট্রেনে চড়ে রওনা দিলেন ভীমসেন।
কর্ণাটকের নানা জায়গায় প্রথম ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। তাঁকে প্রথম গান শেখান কুর্তাকোটির চান্নাপ্পা। তাঁর কাছে তিনি ভৈরব ও ভীমপলাশী শেখেন। তিনি যে জোরালো স্টাইলে গান করতেন, তার গোড়াপত্তন কিন্তু চান্নাপ্পার কাছে শিক্ষা থেকেই হয়। এরপর তিনি শ্যামাচার্য যোশীর কাছে বাগালকোটে কিছুদিন শেখেন। একসময় শ্যামাচার্য যোশী মুম্বইতে তাঁর গান রেকর্ডিং করতে আসেন এবং ভীমসেনকেও সঙ্গে নেন। কয়েকটি গান রেকর্ড করে অসুস্থতার জন্য তাঁকে ফিরে যেতে হয় এবং ভীমসেন যোশীকে তিনি বাকী রেকর্ডিং করতে বলেন। সেই প্রথম ভীমসেনকে কেউ চিনতো না কিন্তু গানগুলি বেশ জনপ্রিয় হয়। ভীমসেনের সঙ্গীত শিক্ষা করার আকাঙ্খা আরো বেড়ে ওঠে। কিন্তু কোন টাকাপয়সা দিতে পারতেন না বলে কেউই বেশীদিন তাঁকে শেখাতেন না। ভীমসেন আবার ট্রেনে করে বেড়িয়ে পড়লেন । ট্রেনে টিকিট কাটার পয়সা ছিলো না বলে টিটিকে গান শুনিয়ে মুক্তি পেয়েছেন কয়েকবার আবার কখনো জেলেও যেতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু ছোটবেলায় কানে যে সেই ঢুকেছিলো আব্দুল করিম খানের ঠুংরি “পিয়া বিনা নাহি আওত চৈন” তা যেন ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াতো ভীমসেনকে অমন সঙ্গীত শিক্ষার জন্য এক প্রকৃত গুরুর সন্ধানে। এই সময় তিনি একটি গানের আসরে সওয়াই গন্ধর্বর গান শোনেন। তাঁর মনে হয় এই তো সেই সঙ্গীত যার সন্ধান তিনি করছেন। কিন্তু সাহস করে সওয়াই গন্ধর্বজীর কাছে যেতেই পারেননি।
এরপর বিজাপুর থেকে পুনে, সেখান থেকে গোয়ালিয়রে আসেন তিনি। ইতিমধ্যে ট্রেনে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে সহযাত্রীরা চাঁদা করে তাঁকে কিছু টাকার ব্যবস্থা করে দেন। গোয়ালিয়রে কিছুদিন থাকার সংস্থান হয়। এখানে বিখ্যাত সরোদ বাজিয়ে উস্তাদ হাফিজ আলি খান সাহেবের কাছে পৌঁছন তিনি। উস্তাদজী তাঁকে মাধব মিউজিক স্কুলে ভর্তি করে দেন। গোয়ালিয়রের মহারাজারা এই স্কুল চালাতেন। কিন্তু ভীমসেনের মন বসে না। আবার পথে বার হন তিনি। দিল্লী লক্ষ্ণৌ রামপুর হয়ে কলকাতায় এসে পৌঁছন। তিনি শুনেছিলেন কলকাতায় অনেক বিখ্যাত ওস্তাদের বাস। তিনি এও শুনেছিলেন যে কলকাতায় সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের বাড়িতে কাজ করলে এবং গান শোনালে কিছু পয়সা পাওয়া যায়। তিনি ঠিক করলেন তাই করবেন এবং সেই পয়সায় গান শিখবেন। অবশেষে সেই সময়কার বিখ্যাত বাংলা সিনেমার শিল্পী পাহাড়ি সান্যাল, যিনি সঙ্গীতের বিশেষ সমঝদার ছিলেন এবং নিজেও গান করতেন, তাঁর বাড়িতে বেশ কিছুদিন কাজ করেন ভীমসেন। পাহাড়ি সান্যাল তাঁর সাঙ্গীতিক প্রতিভার বিষয়ে অবগত ছিলেন না। পরে তাঁর গান শুনে বিস্মিত হয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন যে এমন মানুষকে তাঁর পক্ষে ঘরের কাজের জন্য রাখা সম্ভব নয়। হতাশ হয়ে কলকাতা ত্যাগ করে তিনি পাঞ্জাবের জলন্ধরে চলে যান গুরুর সন্ধানে।
এই সময় তাঁর পিতা তাঁর সন্ধান পান এবং ভীমসেনও এই যাযাবর জীবনে বিতশ্রদ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। তাঁর পিতার ইতিমধ্যে মানসিক পরিবর্তন হয় এবং তিনি বোঝেন যে ভীমসেন সঙ্গীতপাগল। ভীমসেনকে গান শেখানোর জন্য ভর্তি করতে তিনি সম্মত হন। বহু সাধ্যসাধনার পর সওয়াই গন্ধর্বজী ভীমসেনকে তাঁর শিষ্যরূপে স্বীকার করেন। তাঁর বাড়িতে থেকেই গুরু শিষ্য পরম্পরায় তাঁর প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয় কিরানা ঘরানার ঐতিহ্যে।
১৯৪১ সালে ১৯ বছর বয়সে ভীমসেনজী প্রথম স্টেজে কয়েকটি ভজন ও ভক্তি সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এরপর তিনি মুম্বই চলে যান এবং রেডিওতে অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন ১৯৪৩ সাল থেকে এবং পরের বছরই এইচ এম ভি থেকে তাঁর প্রথম ক্লাসিকাল রেকর্ড বেরোয়। ১৯৪৬ সালে গুরু সওয়াই গন্ধর্বজীর ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত সঙ্গীত সমারোহে ভীমসেনের গান শুনে মুগ্ধ হন আপামর শ্রোতা এবং তাঁর নাম গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সঙ্গীত ছিলো শতঃস্ফুর্ত, সরসংস্থান বিশুদ্ধ, গায়কী অতি জোরালো এবং সর্বোপরি অসাধারণ অতি দ্রুত তান যা শুনলে হৃদস্পন্দন থেমে যায়। কিরানা ঘরানার বহু ঐতিহ্যবাহী বন্দিশ গাইতেন যোশীজি। কিরানা ঘরানার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সঙ্গীত কেসরবাঈ কেরকর, বেগম আখতার, এমনকি আমীর খানের গায়কীর দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং ক্রমেই তিনি বিভিন্ন ধরণের স্টাইল তাঁর গানে নিয়ে আসেন, যার জন্য ভারতবর্ষে তাঁর গানের ভক্তের সংখ্যা অগুন্তি! তিনি অনেক সময়েই খেয়াল গাইতে বসে হঠাত হঠাত বিদ্যুৎ চমকের মতো বোলতান করতেন যা শ্রোতাদের চমকে দিতো। শুদ্ধ কল্যান, আভোগী, ললিত, ইমন, আশাবরী, টোড়ি, মিয়াঁ মল্লার, রামকেলি, পুরিয়া ধানেশ্রী, মূলতানি, ভীমপলাশী, দরবারী, মালকৌশ ইত্যাদি কত অসংখ্য রাগে যে পন্ডিতজী গেয়েছেন তা বিস্ময়কর এবং প্রতিটি রেকর্ডই বিখ্যাত। তিনি বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে কোনভাবে বিকৃত করা বা তা নিয়ে কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা করার বিরোধী ছিলেন। শুধুমাত্র কর্ণাটকী সঙ্গীতের যাদুকর বালমুরলীকৃষ্ণজীর সঙ্গে তিনি কয়েকটি যুগলবন্দী করেন।
খেয়াল ছাড়াও তাঁর ভজন যেন শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে দিতো। মনে হতো বাহির জগত তাঁরা সম্পূর্ণ বিস্মৃত এমনই সেই ভজনের সুর, লয়, ছন্দ এবং ভক্তিরস!
পন্ডিত ভীমসেন যোশী বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর দেশাত্মবোধক সঙ্গীত “মিলে সুর মেরা তুমহারা” র জন্যও।
পন্ডিতজী অনেকগুলি নাটকে কাজ করেছেন। তিনি দুবার বিবাহ করেন । প্রথম স্ত্রী ছিলেন তাঁর নিজের মামার মেয়ে। তাঁর সঙ্গে পন্ডিতজীর তিন সন্তান। কিন্তু নাটকে কাজ করা কালীন দ্বিতীয়া স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং হিন্দু সমাজের বিবাহ আইনের বাইরে গিয়ে তিনি তাঁকে বিবাহ করেন। মুম্বইতে আইনতঃ সম্ভব ছিলো না বলে তিনি পুণেতে চলে আসেন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন। দ্বিতীয়া স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দুটি সন্তান ছিলো কিন্তু প্রথমা স্ত্রীকে কোনদিন ত্যাগ করেননি। দীর্ঘদিন দুই স্ত্রীই সন্তানসহ তাঁর সঙ্গে বসবাস করতেন।
বেশ কটি সিনেমায় পন্ডিতজীর কন্ঠ ব্যবহৃত হয়। তার মধ্যে বিখ্যাত হয়ে আছে বৈজু বাওরা সিনেমায় মান্না দের সঙ্গে তাঁর সঙ্গীতের মহারণ “কেতকী গুলাব জুহি” গানটি। এছাড়া বসন্তবাহার, আনকহী প্রভৃতি সিনেমায় তিনি গান করেন এবং দ্বিতীয়টির জন্য ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট মেল সিঙ্গার পান।
পুণেতে প্রতি বছর সওয়াই গন্ধর্ব সঙ্গীত সম্মেলনের আয়োজন হয় পন্ডিতজীর উদ্যোগে। তিনি সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমীর ফেলো হন এবং সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমী সহ আরো বহু পুরস্কার পান।
আমার বহুবার তাঁর অসাধারণ সঙ্গীত শোনার সৌভাগ্য হয়েছে ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্সে। একেবারে স্টেজ জুড়ে বসতেন। তিনি থাকলে স্টেজে আর কারো দিকে চোখ পড়তো না। তাঁর জোরালো সুরেলা গলাটি একবার লাগালে অডিটোরিয়াম সুরে ভরে যেতো। ছুটে আসতেন যারা বাইরে চা পানে গেছিলেন। তাঁর তানের বিদ্যুতে চমকিত হতো কতো মধ্যরাত। ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসতেন শ্রোতারা। ভোররাতে তাঁর ভজন শোনা ছিলো এক ঐশ্বরিক অভিজ্ঞতা! একেবারে শেষের দিকে যখন আর পা গুটিয়ে বসতে পারতেন না স্টেজে তখন চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসেও টানা দু ঘন্টা খেয়াল শুনিয়ে গেছেন পন্ডিতজী। শারীরিক অসুস্থতার কোন পরোয়া করেননি। ২০১১ সালে আমরা ভারতরত্ন অসাধারণ এই শিল্পীকে হারাই।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!