আজ বলবো খেয়ালের সবচেয়ে পুরোনো এবং বিখ্যাত ঘরানা অর্থাৎ “গোয়ালিয়র ঘরানা” নিয়ে। এই ঘরানার সূচনা হয় মুঘল সাম্রাজ্যকালে ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ অর্থাৎ সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত এক দীর্ঘ সময় জুড়ে মধ্যযুগে এই ঘরানার বিখ্যাত গায়ক কলাবন্তরা মাতিয়ে রেখেছিলেন উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতকে। তাঁদের প্রত্যেককে বলা যায় খেয়াল গানের এক একটি স্তম্ভস্বরূপ! আজ যা আমরা উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত বলে জানি ও শুনি তার এই অত্যন্ত জনপ্রিয় রূপ তৈরী করে দিয়ে গেছেন এঁরাই। আধুনিক যুগে একেই এগিয়ে নিয়ে গেছেন ঘরানার বিখ্যাত শিল্পিরা।
গোয়ালিয়র ঘরানার প্রথম বিখ্যাত গায়ক এবং আরো বহু ঘরানার পূর্বপুরুষ হলেন মিয়াঁ তানসেন। সুতরাং গোয়ালিয়র ঘরানার কথা বলতে গেলে প্রথমেই তাঁর কথা দিয়ে শুরু করতে হবে। খ্রীষ্টিয় ১৫০০ শতাব্দীতে মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রের কাছে এক গ্রামে একটি হিন্দু পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তখন তাঁর নাম ছিলো রামতনু। কথিত আছে ছয় বছর বয়সেই তাঁর মধ্যে সাংগীতিক প্রতিভা পরিলক্ষিত হয়। তাঁর পিতাও সঙ্গীতজ্ঞ ও বীণবাদক ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছে হলেও তাঁর প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয় স্বামী হরিদাসের কাছে। স্বামী হরিদাস বৃন্দাবন থেকে এসে গোয়ালিয়রে রাজা মানসিং তোমরের সভাগায়ক হন। তিনি বৈষ্ণবীয় গায়নপদ্ধতিতে গান করতেন। তানসেনের সঙ্গীতের খ্যাতি নিজ গ্রামের গন্ডি ছাড়িয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শীঘ্রই তিনি গোয়ালিয়রের রাজার সভায় আমন্ত্রিত হন। সেখানে তিনি স্বামী হরিদাসের সাহচর্য পান এবং তাঁর ধ্রুপদীয় সঙ্গীতরীতির প্রভাব তাঁর ওপর পড়ে। তাঁর তানসেন নামটিও গোয়ালিয়রের রাজাই দেন। এরপর গোয়ালিয়র থেকে বিদায় নিয়ে মেওয়াটের রাজা রামচন্দ্রের সভাগায়ক হিসাবে গাইতে শুরু করেন তানসেন। রাজা নিজেও সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন এবং তাঁরা দুজন একসাথে বহু গান রচনা করেন। সেই বন্দিজগুলি আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। বেশীরভাগই হিন্দু দেবদেবীদের বন্দনা করে লেখা, শিব, বিষ্ণু, সরস্বতী, গণেশ ইত্যাদির বন্দনা এবং প্রকৃতির বর্ণনা করে গানগুলি লিখিত হয়। রাজা ও সম্রাট আকবরের বন্দনা করেও তিনি গান রচনা করেছেন। গানের ভাষা বেশীরভাগ ছিলো ব্রজভাষা ও হিন্দীর মিশ্রিত রূপ।
তানসেনের সংগীতের সুখ্যাতি ক্রমে সম্রাট আকবরের কানে পৌঁছয় এবং তিনি রাজা রামচন্দ্রের কাছে দূত পাঠান তানসেনকে তাঁর সভায় পাঠানোর জন্য। তানসেন প্রথমে যেতে চাননি, কিন্তু রামচন্দ্র বলেন এমন সুযোগ তাঁর ছাড়া উচিত নয়। উপঢৌকন সহ তানসেনকে তিনি আকবরের দরবারে পাঠান। আকবর তখন ফতেপুর সিক্রিতে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেছেন। তানসেনের গান শুনে আকবর এতো খুশী হন যে তাঁকে দরবারের নবরত্নের একজন হিসাবে সম্মান দেন। আকবরের সভায় গায়নকালে, সুফি সন্ত মহম্মদ ঘাউসের সাহচর্যে তাঁর গানে সুফি রীতির ছোঁয়া লাগে। তানসেনের গান হিন্দু মুসলমান ঐক্যের প্রতিক হয়ে ওঠে। আকবরই তানসেনকে মিয়াঁ অর্থাৎ বিশারদ উপাধি দেন। ফতেপুর সিক্রির দেওয়ান-ই-আম এ অনুপ তালাও বলে আকবর একটি পুকুর খনন করেন। তার সামনেই ছিলো তানসেনের বসার আসন, যেখানে বসে তিনি ঐশ্বরিক সঙ্গীত সৃষ্টি করে গেছেন। এখনো যেন সেখানকার প্রতিটি লাল পাথর তানসেনের অপূর্ব সঙ্গীতের সাক্ষ্য দেয়।
তানসেন বেশ কিছু নতুন রাগের সৃষ্টি করেন যেমন মিয়াঁ কি মলহার, মিয়াঁ কি টোড়ি ইত্যাদি। তানসেন সম্বন্ধে অনেক অলৌকিক গল্প প্রচলিত আছে। কথিত আছে তিনি দীপক রাগ গেয়ে আগুন জ্বালাতে পারতেন এবং মেঘমল্লার গেয়ে বৃষ্টি আনতে পারতেন। মেঘমল্লার এখনো প্রচলিত থাকলেও, দীপক রাগের কোন নিশ্চিত রূপ যা তিনি গাইতেন, তা এখন আর শোনা যায় না। বিলাবল, পুর্বী এবং খামাজ ঠাটে দীপক শোনা যায়, কিন্তু কোনটি সঠিক তা জানা যায় না। শোনা যায় তানসেন জীবজন্তুর ভাষা বুঝতে পারতেন এবং তারা তাঁর গান বুঝতে পারতো। একবার আকবরের একটি হাতি পাগল হয়ে যায়। আকবর কিছুতেই হাতিতে চড়তে পারছিলেন না। তখন তানসেন গান করায় হাতিটি শান্ত হয়ে যায় এবং তিনি চড়তে সক্ষম হন।
তানসেন হুসাইনি বলে এক মহিলাকে বিবাহ করেন। অনেকে বলেন আকবরের কন্যা মেহেরুন্নিসার সঙ্গেও তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর ছেলেমেয়েরা সুরত সেন, সরত সেন, তরঙ্গ খান, বিলওয়াস খান এবং কন্যা সরস্বতী সকলেই সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। শোনা যায় আকবরের অনুরোধে তানসেন একবার দীপক রাগ গাওয়াতে, সভায় আগুন ধরে যায়। তখন কন্যা সরস্বতীই মেঘমল্লার গেয়ে বর্ষা নামান ও আগুন নেভান।
কথিত আছে ১৫৮৬ সালে দিল্লীতে মিয়াঁ তানসেনের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যু বিশাল মিছিল বেরোয় এবং স্বয়ং সম্রাট আকবর সেই মিছিলে অংশ নেন।
বর্তমানে তানসেনের স্মৃতিতে প্রতি বছর গোয়ালিয়রে “তানসেন সমারোহ” সঙ্গীতসভা আয়োজিত হয় এবং এক একজন বিখ্যাত মার্গসঙ্গীত শিল্পিকে তানসেন সম্মানে ভূষিত করা হয়।
গোয়ালিয়র ঘরানার কথা একদিনে শেষ হওয়ার নয়। এই ঘরানার অন্যান্য বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সম্বন্ধে বলবো পরের পর্বে।