ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৩২)

তীর্থভূমি বীরভূম ,ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম

বোলপুর থানার অন্তর্গত বোলপুর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে চন্দনপুর গ্রামটি অবস্থিত। এই গ্রামটি অজয় নদীর তীরে অবস্থিত প্রাচীন গ্রাম সুপুর সংলগ্ন। এই গ্রামে একটি ইটের নির্মিত প্রাচীন মন্দির আছে। ১৭৮৬ শকাব্দে বা ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতালকে শ্রী “শ্রী শ্রী শিবদাস রামকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়”এই শব্দ কয়টি উৎকীর্ণ আছে। এই শিবমন্দিরটি পূর্ব দুয়ারী। মন্দিরের প্রবেশ পথের উপরে মধ্যস্থলে রামসীতা উপবিষ্ট, বামদিকে ইউরোপীয় শিল্প রীতি দ্বারা প্রভাবিত দশাবতারগণের প্রতিকৃতি
যথা কল্কি, জগন্নাথ ,বলরাম, পরশুরাম ইত্যাদি
এবং দক্ষিণ দিকে দশমহাবিদ্যা দেবীগণের প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ।

বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়ির ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে চন্দ্রভাগা নদীর তীরে অবস্থিত রাইপুর গ্রাম। মুকুল দে রচিত
‘Birbhum Terracottas’ গ্রন্থের পাতায় (পৃঃ৪১-৪২) এই গ্রামে একটি মন্দিরের উল্লেখ আছে। ১৯৬৪ সালে এই মন্দিরের সমস্ত সুন্দর অলংকরণে শোভিত মৃৎফলক গুলি অপসারিত হয়। মন্দিরটির এখন জীর্ণ অবস্থা। গ্রামের মধ্যে এক জায়গায় চারটি মন্দির আছে। একটি আটচালা মন্দিরের গায়ে প্রতিষ্ঠাফলকে ১৬৯৫ শকাব্দ(১১৮০ বঙ্গাব্দ) উৎকীর্ণ আছে দেখা যায়,
এখানে আরো দুটি মন্দির আছে চারচালা। মন্দিরের সামনে ষাঁড়ের উপরে নন্দী ভৃঙ্গী সহ শিবের প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ আছে। ময়রাপাড়ায়
তিনটি ইটের তৈরি মন্দির আছে। প্রতিষ্ঠাফলকে
১৭৬২ শকাব্দ (১২৪০ বঙ্গাব্দ) উৎকীর্ণ আছে।
গ্রামের মধ্যে পরিত্যক্ত একটি উঁচু গোলাকৃতি সৌধ আছে। সম্ভবতঃ সৈন্যদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য সৌধটি ব্যবহৃত হত। গ্রামে বৃক্ষতলে ধর্ম ঠাকুরের কূর্মমূর্তি আছে।

বোলপুরের কাছে শিয়ানে প্রাপ্ত নয় পালের প্রশস্তি লিপিতে ‘ধরাক্ষেশ্বর নামে শিব ভূমির পরিচয় পাওয়া যায়। লিপি অনুবাদ করার সময় ডঃ দীনেশ চন্দ্র সরকার মহাশয় এই ‘ধরাক্ষেশ্বর’
যে কোথায় অবস্থিত সে ব্যাপারে আলোকপাত করেননি। বীরভূম গবেষক পণ্ডিত হরে কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় মহাশয় বলেছেন ‘ধরাক্ষেশ্বর’ লাভপুর থানায় অবস্থিত বারানসীপুর মৌজায় কোপাই নদীর পশ্চিম তটে অবস্থিত ‘রাখড়েশ্বর’
শিব ক্ষেত্র।
একসময় হুগলি জেলার মহানাদকে কেন্দ্র করে
অবিভক্ত বাংলার অনেক স্থানে নাথ সাধনা কেন্দ্রগুলি স্থাপিত হয়েছিল। ওই সমস্ত শৈবক্ষেত্রের মধ্যে অন্যতম ছিল বীরভূমের ‘ধরাক্ষেশ্বর’। স্থানটির পবিত্রতা সম্পর্কে অবহিত হয়ে পালরাজ নয়পাল দেব এখানে একটি সুউচ্চ শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন বলে শোনা যায়।
পরবর্তীকালে সেই মন্দির বিনষ্ট হলে পুরনো মন্দিরের মাল মশলা দিয়ে রায়পুর গ্রামের জমিদার জগমোহন সিংহ বর্তমানে মন্দিরটি নির্মাণ করান। মন্দিরের প্রতিষ্ঠা লিপিতে লেখা আছে—-
শ্রী শ্রী রাখড়েশ্বরস্য
শ্রী শ্রী মন্দির ং
জগমোহন সিংহেন
কানং শকাব্দ ১৭৩৪

প্রতিষ্ঠা লিপি থেকে জানা যায় ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে এই সুউচ্চ নাগররীতির মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরের উত্তরে একটি অনুচ্চ টেরাকোটা অলংকৃত শিব মন্দির শ্যাম গিরির প্রতিষ্ঠিত জানা যায়। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাফলক বাংলার প্রাচীনতম প্রাকৃত লিপি বলে মনে হয়। বীরভূম গবেষক সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় মনে করেন, যে, বারাণসীপুরে নাথ সাধকদের পর দশনামীদের প্রভাব পড়েছিল।
বারাণসীপুর গ্রামে নবশাখ সম্প্রদায়ের বসতি নিষিদ্ধ ছিল বলে শোনা যায়।

নানুর থানার অন্তর্গত নানুর গ্রামের দক্ষিণে অবস্থিত থুপসরা গ্রামে একটি শিব মন্দিরে কালো শ্লেটে উৎকীর্ণ একটি প্রতিষ্ঠা লিপিতে লেখা আছে——
শ্রীশ্রী শিব জয়ন্তী।
শকাব্দা ১৭৫৫ শক।।
সন ১২৪০ সাল।
শ্রী জন্মেঞ্জয় হাজরা।।
এই প্রতিষ্ঠা লিপিটি মন্দিরের প্রবেশদ্বারের শীর্ষে
লাগানো আছে। প্রতিষ্ঠা লিপি থেকে বোঝা যায় যে, শিব মন্দিরটি জন্মেঞ্জয় হাজরা কর্তৃক ১২৪০ সালের নির্মিত হয়েছিল ‌।
বিভিন্ন গবেষকদের মতে ‘স্তূপেশ্বরী’ থেকে থুপসরা নামটি এসেছে। একসময় হীনযানী বৌদ্ধগণ বাংলার প্রাচীন পল্লীগুলিতে স্তূপ উপাসনা শুরু করেছিলেন। বীরভূমেও এক সময় বৌদ্ধদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল বলে জানা যায়। কাজেই থুপসরায় যে অতীতে বৌদ্ধস্তূপ ছিল এবং সেই স্তূপের আরাধ্যা বৌদ্ধদেবী স্তূপেশ্বরী নামে পরিচিত ছিলেন একথা ভ্রান্ত নয় বলেই মনে হয়।

ইলামবাজার থানার অন্তর্গত ইলামবাজারের পার্শ্ববর্তী গ্রাম দেবীপুর। এইখানে এক মন্দিরে সূক্ষ্মেশ্বরী দেবী প্রতিষ্ঠিতা আছেন।
ওই দেবী মূর্তিটির পাদদেশে লিখিত আছে
দুটি লাইন—-“য়ে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুং তেষাং তথাগতো হ্যাবদৎ
তেষাং‌ চ যো নিরোধ এবং বাদী মহাশ্রমণঃ”

এর অর্থ হলো এই যে,”বিশ্বে যা কিছু ঘটে তার নির্দিষ্ট হেতু রয়েছে। গুরু তথাগত সেই হেতুগুলি বলেন। সেই হেতুগুলির নাশ কিভাবে হতে পারে, সে কথাও বলেন মহাশ্রমণ।
শুধু এই দুটি লাইন নয়, এর সাথে যুক্ত আছে আরো দুটি লাইন।
“অজ্ঞানচ্চীয়তে কর্ম ‌জন্মনঃ কর্ম কারণম্
জ্ঞানান্নচীয়তে কর্ম কর্মাভাবান্ন জায়তে ”

অর্থ হল,” অজ্ঞান দ্বারা আমরা যে সকল কর্ম করে থাকি, সকল কর্মের ফল সঞ্চিত হতে থাকে। সে সকল কর্মের কারণেই আমাদের জন্ম হয়ে থাকে। প্রকৃত জ্ঞানের দ্বারা কর্মের সঞ্চয় রোধ করা যায়। ক্রমে কর্মের অভাব হতে থাকলে জন্ম রোধ করা যায়। জন্ম না হলে জরা , ব্যাধি, মৃত্যু ইত্যাদি নানা দুঃখ ভোগ করতে হয় না।”

এটি একটি বৌদ্ধমন্ত্র। এই বৌদ্ধ মন্ত্রটি ক্ষোদিত দেবীপুর গ্রামের সূক্ষ্মেশ্বরী মূর্তির পাদদেশে।
এই কথাগুলি বৌদ্ধ দর্শনের মূল কথা। কথাগুলি অশ্বজিত বলেছিলেন উপতিষ্যকে। কথা গুলি লিপিবদ্ধ হয়েছিল ‘বিনয়পিটকে’।
এই কারণেই বিভিন্ন পন্ডিতেরা বলেন এই মূর্তিটি বৌদ্ধদের ‘আর্যতারা মূর্তি’।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।