ক্যাফে গদ্যে সুদীপ সেনগুপ্ত

পেশায় স্কুল শিক্ষক , নেশায় ক্রিকেট প্রেমী

দ্য ফিনিশার

বলতে দ্বিধা নেই শেষ কিছু বছর আমি মহেন্দ্র সিং ধোনির সমালোচনা করেছি । কিন্তু সেটা নেহাতই ক্রিকেটীয় কারণে । আমি বাঙালী তাই বলে আমাকে অন্য রাজ্যের ক্যাপ্টেন কে সমালোচনা করতে হবে এইসবে আমি বিশ্বাসী নই । আর দাদা বনাম ধোনি কিংবা ধোনি বনাম বিরাট এর মধ্যে তুলনা আজকালকার যারা আই পি এল জেনারেশন অর্থাৎ যারা শেষ ৬-৭ বছর ধরে ক্রিকেট দেখছে তারাই করে ।
মহেন্দ্র সিং ধোনি গত ৭ই জুলাই ৩৯ এ পড়লেন । ক্রিকেটার বলুন কি ফুটবলার যেকোন স্পোর্টস ব্যক্তিত্বের রিফ্লেক্স স্ট্যামিনা স্ট্রেংথ কখনই ২৫ অথবা ৩০ বছরের মতন হওয়া সম্ভব নয়। ধোনি কে কৃতিত্ব দেওয়া যায় এই কারণে যে উনি এই বয়সেও নিজের স্ট্রেংথ স্ট্যামিনা বেশ অনেক টাই ধরে রেখেছেন । কিন্তু রিফ্লেক্স এর ঘাটতি হওয়া স্বাভাবিক আর সেটাই হচ্ছে বিগত ২-৩ বছর ধরে । ব্যাটিং এর কথা পরে আসছি কিন্তু আগের বছর ওয়ার্ল্ড কাপে ধোনি ক্ষমার অযোগ্য কিছু স্ট্যাম্পিং মিস করেছে যেটা ওর কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত এবং তার সাথে বাই দিয়েছে প্রচুর । কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঠিক করে বল তালুবন্দী হচ্ছিল না ।
এবার যদি ব্যাটিং এর কথায় ফিরি নিজের জীবনের প্রথম ২-৩ বছরের কথা বাদ দিলে ধোনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল একজন ফিনিশার হিসেবে যে ইনিংস টা তৈরি করতেও জানত । এই সময় সে আই সি সি এর বর্ষ সেরাও হয়েছে । প্রচুর ম্যাচ জিতিয়েছে একার হতে । কখনও টেল এন্ডার কে সাথে নিয়ে হারা ম্যাচ বার করেছে কখনও টিমের রানকে ভদ্রস্থ জায়গায় নিয়ে গেছে । কিন্তু ২০১৬ সালের পরে ওর ব্যাটিং এর যে প্লাস পয়েন্ট ছিল যে সিঙ্গল রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল করার ক্ষমতা সেটা মারাত্মক কমে এসেছে । বিশেষ করে স্লো মিডিয়াম পেসার এবং স্পিনার এদের নিয়ে যে ধোনি ছেলেখেলা করত তাদের বিরুদ্ধে ধোনি কেমন দমে গেছে । যে স্ট্রাইক রেট আগে ৯০ এর ওপরে ছিল সেটা এখন ৮৭ তে নেমে এসেছে । যে ব্যাটিং অ্যাভারেজ ছিল ৫২+ তা এখন নেমে এসেছে ৫০ এ । আর সেটা ধোনি ইচ্ছে করে করছে এটা আমি বলছি না ।এটা সবার সাথে হবেই । ৩৫+ হলেই যে কোন স্পোর্টস ম্যান তার স্বাভাবিক খেলোয়াড়ি দক্ষতার নিচে নামতে থাকে । সে যেই হোক । কিছু অবশ্যই ব্যতিক্রম থাকে । আর একটা কথা ধোনি ব্যাটিং হোক কি উইকেটকিপিং দুটো তেই আনকনভেনসনাল । ঋতিবিরুদ্ধ । ব্যাকরণ সম্মত নয়। সেটাই ওর প্লাস পয়েন্ট ছিল। ইদানিং সেটা এই বয়সে আর কাজে আসছে না । ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি শেষ হওয়ার পর ভারত ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যায় । সেখানে ধোনি একটা হাফ সেঞ্চুরি করে যেটা ইতিহাসে ভারতের ব্যাটসম্যান দের মধ্যে দ্বিতীয় ধীরতম । আই সি সি টুর্নামেন্টের কথা যদি আমি বিবেচনা করি একমাত্র ২০১১ এর ফাইনাল বাদ দিয়ে ধোনির বিশ্বকাপ রেকর্ড একদমই নিম্ন মানের । ইন্ডিয়ার ব্যাটিং লাইন আপের কথাই ধরুন । টপ অর্ডার ফেল করলে আমাদের ব্যাটিং শেষ। সে ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফাইনাল হোক কি ২০১৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল । কিন্তু একসময় সচিন সেহবাগ গম্ভীর এর মত টপ অর্ডার ব্যর্থ হলেও আমরা কিন্তু জিততাম ! তার প্রধান কারণ ছিল মিডল অর্ডারে যুবরাজ রায়না এবং অতি অব্যশই টপ ফর্মের ধোনির উপস্থিতি । এখন যুবরাজ রায়না নেই । টপ ফর্মের ধোনিও নেই । তাই আমাদের মিডল অর্ডার এর অবস্থা এখন শোচনীয়। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি অনেকেই দেখি মিডল অর্ডারে ধোনির সমালোচনা মেনে নিতে পারেনা । অনেকেই বলে বাকিরা কি করছিল । ঠিক একদম ঠিক । কিন্তু এটাও দেখতে হবে ধোনি সেই উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গেছে বলেই কিন্তু এই সমালোচনা টা হচ্ছে। আর যেহেতু ও মিডল অর্ডারের সবচে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় তাই ওর সমালোচনা তো স্বাভাবিক ব্যাপার ।
এটা ধোনি নিয়ে আমার সাম্প্রতিক উপলব্ধি। এখনই মনে করি ২০১৭ এর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর ধোনির খেলা ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল। একান্তই ব্যক্তিগত মত । আমি তো একজন ক্ষুদ্র সমর্থক যার অন্ধভক্তি শুধু তার দেশের ক্রিকেট টিমের প্রতি । তবুও ধোনি যা দিয়ে গেছে এই দেশকে তাতে ওর খেলোয়াড়ি সত্তা আঘাতপ্রাপ্ত হলেও একজন রোল মডেল হিসেবে তার জনপ্রিয়তা কখনও হ্রাস পাবে না । ধোনি এর ভারতীয় ক্রিকেট সবচেয়ে বড় অবদান কি জানেন ??? ধোনি কে দেখে ভারতের ছোট শহরের , প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলে মেয়েরাও স্বপ্ন দেখে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার । ধোনি পরবর্তী যুগে সাধারণ ঘরের ছেলেপুলেদের স্বপ্ন নতুন উড়ান পেয়েছে । ধোনি দেখিয়েছে ক্রিকেটার হতে গেলে শুধু টেকনিক নয় কঠিন মানসিকতার সাহায্যেও আন্তজার্তিক ক্রিকেট সাফল্য পাওয়া যায় । ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মাথা ঠাণ্ডা রাখা , বোলার দের কে অনবরত নির্দেশ দেওয়া এসব ধোনিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে । আমি ধোনির অন্ধ ভক্ত নই। কিন্তু আছে প্রচন্ড শ্রদ্ধা । আর সেই জনই চাই না ধোনি নিজেকে বয়ে বেড়াক । ক্রিকেট থেকে তুমি অনেক পেয়েছ , তার চেয়েও ক্রিকেট কে দিয়েছ অনেক কিছু , দেশ কে দিয়েছ অনেক কিছু। চাই না আমার মত আরও অনেকে যেমন সমালোচনা করছে সেরকম ভাবে করে যাক ।
শুভ জন্মদিন মহেন্দ্র সিং ধোনি । ভালো থাকুন , সুস্থ থাকুন । যতই সমালোচনা করি , চিরজীবন যখনই আপনার কথা ভাববো কানের কাছে এটাই যেন শুধু বাজে ” Dhoni finishes off in style , India lifts the world cup after 28 years ..”
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!