ক্যাফে ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজে সুব্রত সরকার (পর্ব – ৭)

গ্রামীণ পর্যটনে ” শিবপুর-ঋতবনী” র হাতছানি

এই শহর ছেড়ে অল্প দূরে আমাদের পল্লী বাংলার রূপ-রস-গন্ধ আর দূষণহীন সুবাতাস নিয়ে পথিক-পর্যটকদের স্বাগত জানিয়ে গড়ে উঠেছে এক নতুন পর্যটনকেন্দ্র-” শিবপুর -ঋতবনী”। গ্রামীণ পর্যটনের নন্দনকাননে এই নতুন ফুলের সুবাস দু’দন্ড শান্তি দেবে প্রাণে -মনে !..

দুটো মানুষের আবেগ, ভালোবাসা আর স্বপ্নের সাজমহল হল ঋতবনী।

গ্রামকে ভালোবেসে, গ্রামের কাছে ফিরে গিয়ে, গ্রামের মানুষজনকে পাশে নিয়ে, তাঁদের কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে অল্পবয়সী এই দম্পতি দিব্যোদক-পারমিতা গড়ে তুলেছে এই প্রাণের পান্থশালাকে। ঋতবনী এক সার্থক গ্রামীণ পর্যটন কেন্দ্র। পথিক, মুসাফির  তুমি এসো। শান্ত হও। জুড়াও তোমার হৃদয়।

কর্মক্লান্ত, দূষণজব্দ নাগরিক ভীড়ে হাঁসফাঁস করা একঘেয়ে জীবনের থেকে বেরিয়ে একটু মুক্তির স্বাদ-আনন্দ পেতে এই দু’ দন্ডের শান্তির নীড়ে চলে আসা যায়। এখানে ঘুমের বড়ি দরকার হয় না। ঘুম পাড়ানি বাতাস বয় সবসময়!…

শহর কলকাতা থেকে সামান্য পথ পেরিয়ে হুশ করে দৌড়ে চলে যাওয়া যায় এই নির্জনতায়।

এই নির্মলতায়। এই সবুজনিকেতনে। শান্তি ও প্রশান্তি হাত ধরাধরি করে রয়েছে ঋতবনীর হৃদকমলে!..

পল্লীবাংলার অন্তঃস্থলে সবুজের সাম্রাজ্যে মাটির গন্ধমেখে গড়ে উঠেছে শ্রান্ত- ক্লান্ত পর্যটকদের মন ভালো করে দেওয়ার দারুণ এই বিশ্রামবাড়ি – ঋতবনী।

মস্তবড় এক বাঁশেরকেল্লার মত দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই মনে হবে, আহ্  কি আনন্দ আকাশে বাতাসে!.. মুসাফির মন মৌজ করো!..

বাড়ির বাইরে আরও একটা আমার বাড়ির মতই বাড়ি ঋতবনী।  চারটে বড় ঘর, ডোম টেন্ট, একটা ছোট্ট গোল পুকুর। দুটো ঘাট।  সবুজ ঘাসে সাজানো এক টুকরো মাঠ। ঠাকুর ঘর। মস্ত একটা ছাদ। সামনে জল টলটল জলাশয়। শস্যক্ষেত। নীল ঝকঝকে আকাশ। গ্রামের শান্ত, সহজ সরল মানুষজন। আর মন কেমন করা চারপাশের নির্জনতা মনকে মুহূর্তেই জয় করে নেয়।

গত বছর দুর্গাপুজোর আয়োজন করেই পথচলা

শুরু করেছিল ঋতবনী। আমি ছিলাম বিজয়া দশমীর অতিথি।

নীম কাঠের তৈরী করা একচালার সুন্দর দুর্গাপ্রতিমাকে পুজো করেছে দিব্যোদক ( বনি) – পারমিতা। সঙ্গে ছিল গ্রামের সাধারণ মানুষজন আর কিছু পর্যটক অতিথি বন্ধু।

শরৎ এর ঝকঝকে নীল আকাশ থাকলেও মাঝে মাঝে কালো মেঘ এসে দু’এক পশলা বৃষ্টি উপহার দিয়ে ভেসে চলে যাচ্ছে। আমি নতুন গড়ে ওঠা বাড়িটার চারপাশ ঘুরে বেড়িয়ে দেখে চোখের আরাম, মনের শান্তি নিয়ে জলাশয়ের দিকে মুখ করে বাগানে এসে বসলাম।

প্রত্যেকটা ঘর – বারান্দা সাজানো হয়েছে খুব রুচিময়তায়। আমাদের হারিয়ে যাওয়া, বাতিল হয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া এমন সব ছোট ছোট জিনিসকে ওঁরা ফিরিয়ে এনেছে ঘর সাজানোর উপকরণ করে। খুব পরিপাটি করে যত্ন নিয়ে ঋতবনীকে পর্যটকদের জন্য সাজিয়ে তুলেছে। ঘরের দেওয়ালে চিত্রময় বেতের কুলো, তালপাতার হাত পাখা, মাটির নানান মূর্তি, শৌখিন সব  আসবাবপত্র পুরোনো দিনের স্মৃতিকে উসকে দেবে। এমনকি লাইটের সুইচগুলোও সেই কবেকার  কালো কালো সুইচ!.. মাটির থালা, বাটি, গ্লাস আর খাবার টেবিলে মাটির ফুলদানিতে নীল শাপলাফুলের সুন্দর উপস্থিতি। দেওয়ালে ঝোলানো রয়েছে তীর ধনুক ও পুরোনো দিনের বন্দুক। এমন আরও কত অভিনব সুন্দর সুন্দর সব জিনিস দিয়ে পরম যত্নে ঋতবনীকে সুন্দর করে তুলেছে। একসাথে এত কিছু হারিয়ে যাওয়া জিনিসকে দেখার আনন্দ কম নয়। ভ্রমণ তো বিস্ময়কে সম্মানিত করে। তাই আমার বারবারই মনে হয়েছে এমন এক ছোট্ট ভ্রমণে এত বিস্ময় মুগ্ধ হওয়া এক পরম প্রাপ্তি।

গ্রামীণ পর্যটনে এসে গ্রামকে কাছ থেকে দেখার আনন্দ সবচেয়ে বড় আনন্দ। এই শিবপুর গ্রামটি আমাদের গ্রামবাংলার অন্য আর পাঁচটা গ্রামের মত পরিচিত সাধারণ গ্রামের মতই  সুন্দর। এখানে এসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। দু-চোখ ভরে সবুজকে দেখা যায়। পাখির গান শোনা যায়। দূষণে দমবন্ধ হয় না। মিষ্টি বাতাসে ঘুম নেমে আসে দু’চোখের পাতায়।

এখানে একছুটে এসে একটা গোটা দিন ঘুরে বেড়িয়ে ভুরি ভোজ করে যেমন দিব্যি ফিরে আসা যায়, তেমন আবার একটা বা দুটো রাত পরম শ্রান্তিতে শুয়ে বসে গল্প করে গান শুনে মনের মত সব খাবারগুলোকে তৃপ্তি ভরে খেয়ে সুখকে বেশ চেখে চেখে দেখে নেওয়াও যায়!..

কলকাতার সায়েন্স সিটি থেকে কমবেশি এক ঘন্টার সড়ক যাত্রা। এরাস্তা বড় সুন্দর। এ হল বাসন্তী হাইওয়ে। এপথ ধরে সোজা চলে যাওয়া যায় গোসাবা- ঝড়খালি হয়ে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবনে। ভৌগলিক অবস্থানে এটা দক্ষিণ ২৪ পরগণা। কিন্তু শিবপুর প্রশাসনিক দিক থেকে পড়ছে উত্তর ২৪ পরগণায়।

সায়েন্স সিটি থেকেই চোখ জুড়ানো শুরু হয়ে যায়। যেমন সুন্দর রাস্তা, তেমন দু’পাশের দৃশ্য। সবুজ আর সবুজ। পথে পড়বে একে একে সব গ্রামীণ জনপদ চৌবাগা, বানতলা, বামনঘাটা, ভোজের হাট, বিবিরহাট, পাগলা হাট, ভাঙড়, ঘটকপুকুর। এখান থেকে আরও ছ কিমি পথ পেরিয়ে এসে পড়বে চন্ডিপুর বাজার। তারপর আরও একটু এগিয়ে বড় সড়ক থেকে ডানদিকে গ্রামের পথে নেমে পড়তে হবে। এই পথ গিয়ে উঠেছে শিবপুর গ্রামের ঋতবনীতে।

শিবপুর গ্রামের ঋতবনীতে থেকে কাছের টাকিও টুক করে ঘুরে চলে আসা যায়। মাত্র ২১ কিমি পথ। ইছামতীর তীরে পৌঁছে একটু নৌকো ভ্রমণও বাড়তি আনন্দ দেবে। মন চাইলে একদম হাত বাড়ানো দূরত্বে মালঞ্চর বিখ্যাত মাছের বাজারটাও দর্শন করে দৃষ্টিসুখ পাওয়া যায়। মালঞ্চ থেকে আরও একটু এগিয়ে সরবেরিয়া হয়ে ধামাখালিও ঘুরে নৌকো ভ্রমণ করে আসা যায়।

ঋতবনীর ছোট্ট ভ্রমণকে মন চাইলে বড় করা যায়। মন না চাইলে চুপচাপ বসে উপভোগ করুণ। বিশ্রামের সুখে সুখী হয়ে উঠুন। দু’দণ্ড নিজের সাথে নিজের অনেক না বলা কথাগুলো বলে নিন। হাল্কা হয়ে উঠুন। জীবনকে সহজ ভাবে ধরার মধ্যে যে আনন্দ তাকে ফিরিয়ে আনুন। প্রাত্যহিক জীবনের জটিল কুটিল পাকদণ্ডীর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে এনে এই মুক্তির আনন্দে মেতে থাকুন। দেখবেন আপনার মন কেমন গুণ গুণ করে গাইছে, কান পেতে সে গান শুনুন, “আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, এই আকাশে…আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে…

একটু ফুরসৎ জুটিয়ে ছুটে চলে আসা এই গ্রামীণ আস্তানায় খুঁজে পাবেন কত শান্তি। কত প্রশান্তি। আর কি আনন্দ হদয়ে হৃদয়ে!..

ভ্রমণ তো এই আনন্দেরই জন্মদাত্রী!..

জয় হোক এমন সব গ্রামীণ পর্যটনের।

                        ***

কিভাবে যাবেন- কলকাতা সায়েন্স সিটি থেকে সড়ক পথে সোজা চলে আসা যায়। আবার

ঘটকপুকুর থেকে অটোতে শিবপুর পার্ক বললেই হবে। নামমাত্র ভাড়ায় দিব্যি পৌঁছে যাবেন ঋতবনীতে।

কোথায় থাকবেন- ” শিবপুর- ঋতবনী”।

৯৮৩৬৫৯৯৯৪৪ / ৯৪৩২৪২১৪৭৭

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।