সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৪)

হায়দ্রাবাদ ভ্রমণ 

যাইহোক মেজাজটা আমাদের তিন জনেরই বেশ খিঁচরে গেল। শুরুতেই এতটা ঠকে যাব আমরা একদমই ভাবি নি। আমরা বড়ো ভালবেসে ছিলাম এই শহর টাকে। আগু পিছু না ভেবে!

যাইহোক এরপর অটোতে ফেরার সময় বেশ বার্গেনিং শুরু করলাম। কি করা যাবে। শহরটা সুন্দর হলেও মানুষজন ট্যুরিস্ট দের ঠকাতে ব্যস্ত এটা বেশ বুঝতে পারলাম।

মন খারাপ নিয়েই চললাম স্নো ওয়ার্ল্ড দেখতে। এই শহরের লোকেরা যাকে বলে ” মিনি কাশ্মীর”।

স্নো ওয়ার্ল্ড হল একটা দুর্দান্ত বিনোদন এর জায়গা।প্রায় দুই একর জমি নিয়ে তৈরি হয়েছে। ইন্দিরা পার্ক এবং হুসেইন সাগর হ্রদের পাশে এটি অবস্থিত। ২০০৪ সাল নাগাদ তৈরি হয়েছিল ওশান পার্ক মাল্টি টেক লিমিটেড কোম্পানির দ্বারা। অবশ্য স্থানীয় পর্যটন বিভাগেরও সহযোগিতা ছিল।এটি ভারতের প্রথম এবং বিশ্বের বৃহত্তম মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের পরেই এই স্নো ওয়ার্ল্ডের স্থান। সেদিক দিয়ে দেখলে স্নো ওয়ার্ল্ড আমাদের গর্বের একটা বিশেষ দর্শনীয় স্থান। তাই আমিও বেশ খানিকটা গর্ব বুকে ভরে অটোয় করে চললাম স্নো ওয়ার্ল্ড দেখতে।

ওখানে গিয়ে কিন্তু মনটা ভাল হয়ে গেল।। বেশ বড়ো একটা জমজমাট জায়গা। নানা রকমের দোকানে দোকানে ভর্তি পুরো জায়গাটা।
এই প্রথম দেখলাম “ফিস স্পা”।১৫০ টাকায় ১৫ মিনিটের জন্য জলে পা ডুবিয়ে রাখতে হবে। আর শয়ে শয়ে মাছ এসে পায়ের চামড়া খুবলে খুবলে খাবে। ভেবেই গাটা কেমন কিলবিলিয়ে উঠল। আমাকে পুলের ছেলেটা প্রাণপণ বোঝাতে লাগলো খুব ভালো লাগবে। দারুন লাগবে মেমসাব। পা একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে। একবার ট্রাই করে দেখুন না। দেখলুম ছোট্ট পুলের চারপাশে সবাই পা ডুবিয়ে বসে রয়েছে। কালো কালো বিভিন্ন সাইজের মাছ ওদের পা দুটো কে একেবারে ছেঁকে ধরেছে।ওরে বাবা ঐ দৃশ্য দেখেই আমার শরীরের মধ্যে কেমন যেন করে উঠল। বাপরে দরকার নেই বাবা। আমার পা এমনিতেই বেশ পরিস্কার। তবুও একজন কে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলুম কেমন লাগছে। বলল দারুন খুব ভাল লাগছে। আমি কোন কথা না বলে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে ওখান থেকে মানে মানে সরে আসলুম। বেশিক্ষণ তাকাতেও ইচ্ছে করছিল না আমার।

এবার আসল ফটো সেশন শুরু হল। অনেকগুলো ছবি তোলার পর মনটা একদমই ভালো হয়ে গেল। ভুলে গেলাম একটু আগের ঘটনা। যাইহোক লোকপিছু ৫০০ টাকা মোট ১৫০০টাকার টিকিট কেটে আমরা তিনজন বরফ রাজ্যে ঢোকার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। তবে এখন কিন্তু টিকিটের দাম আর ৫০০ টাকা নেই। ৬৫০/৭০০ টাকা হবে।

টিকিট দেখিয়ে ঢুকলাম বরফ রাজ্যে। লাইন দিয়ে টুপি কোর্ট গ্লাভস মোজা জুতো পরে আমরা একদম রেডি।
এবারে কিন্তু সত্যি সত্যিই আমরা একেবারে বরফের দেশ মিনি কাশ্মীরে প্রবেশ করলাম।

একটা বিরাট হল! আর তেমনই প্রচন্ড ঠাণ্ডা!চারিদিকে বরফ আর বরফ। বরফে পা ঢুকে যাচ্ছে একেবারে। একদম সত্যি কারের বরফ রাজ্যে ঢুকে পড়লাম মনে হচ্ছে। সত্যিই খুব অবাক হচ্ছিলাম এই যে বরফ রাজ্যে ঢুকে পড়ছি এই অনুভূতিটা পাওয়ার জন যে কয়েকশ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে সেটা বুঝতে পারলাম। সত্যিই বাহবা দিতে হয় এই মিনি কাশ্মীরের কর্তৃপক্ষ এবং আর্কিটেক্টকে। অসাধারণ কাজ বলে বোঝানো যাবে না।

একটি বিশালাকার ২০০ টনের মতো কৃত্রিম বরফের স্তর মেঝেতে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং এটি এমন ভাবে প্রস্তুত করা যে এই মেঝের বরফ কোনভাবেই গলে যাবে না। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ টন বরফ এই মেঝের ওপর বিছোনো হয়। অস্ট্রেলিয়ার পেটেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই কৃত্রিম বরফ তৈরি করা হয়েছে।

হলের ভেতরটা একটা বড়ো গুহার মতো। অসাধারণ সাজানো গোছানোর জন্য প্লাস্টার অফ প্যারিস ব্যবহার করা হয়েছে। স্নো ওয়ার্ল্ড এর ডিজাইন করেছেন বাঙালি আর্কিটেক্ট নীতিশ রায়। এটা কিন্তু বাঙালী হিসেবে ভীষন একটা গর্বের বিষয় আমাদের কাছে।
গুহার চারপাশে কাশ্মীরের বরফে ঢাকা পাহাড়ের ছবি সাঁটা রয়েছে। দেখে গুলমার্গ সোনমার্গেরই ছবি মনে হল। একটা কাশ্মীর কাশ্মীর ফিলিং আনতে যতটা করা যায় তার থেকেও বেশি কিছু করা হয়েছে। বাইরে মে মাসের ঐ প্রচণ্ড গরম আর এখানের তাপমাত্রা মাইনাস পাঁচ ডিগ্রি। তার উপর স্নো ফল ভাবা যায়! দারুন, দারুন একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। বুঝতে বুঝতেই কিছুটা সময় চলে যায়।কর্তৃপক্ষের ভাবনাকে একটা বিরাট স্যালুট জানাতেই হয়।

ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।