সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৩০)

আমার মেয়েবেলা

(ঠাকুমার চলে যাওয়া)

ছোট থেকেই আমি একটা কথা বলা পুতুল ছিলাম। অনর্গল কথা বলতে পারতাম আমি। কথা বললে একটা এক্সট্রা এনার্জি পেতাম। আমার কথায় অন্যরাও মজা পেত। খিলখিল করে হেসে উঠত সবাই। আর আমারও মনে হত একটু কথা বলে যদি কারো মন ভালো হয় ক্ষতি কি?
ছোট থেকেই আমি বন্ধুদের বাবা মা দাদু দিদা ঠাকুমার সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসতাম। কারোর বাড়ি গেলেই দেখতাম সবাই নিজেদের মধ্যেই কথা বলে, গল্প করে, হৈ হৈ করে। কলেজে পড়ার সময় এটা বেশি দেখেছিলাম। ফরাক্কায় কারোর দাদু দিদা অত থাকত না। ওঁরা বেশিরভাগ দেশের বাড়ীতেই থাকত।
কলেজে পড়ার সময় আমি আবার নতুন করে দাদু ঠাকুমার সংস্পর্শে এলাম। দেখতাম বুড়ো বুড়ি বেশিরভাগ সময়ে একাই কাটায়। আসলে সবাই তো ব্যস্ত। কার কত সময় আছে বকরবকর করার।
ওঁদের একাকিত্বটা আমি খুব অনুভব করতাম। ওঁদের সময় ফোন ছিল না। টিভিতে অত চ্যানেল ছিল না।
ছিল বই পড়া চিঠি লেখা আর দিন মাস বছর শুধু একটা চিঠির উত্তরের অপেক্ষায় কাটিয়ে দেওয়া। আমার ঠাকুমা ভীষণ গল্পের বই পড়তে ভালোবাসত। পান সাজতে বসত পরিপাটি করে, মাটিতে নিজের বানানো আসন পেতে। পাশে থাকত বই। যে কোন ধরনের। ঠাকুমা কোনদিনও চন্দননগর (বাপের বাড়ি) আর রঘুনাথগঞ্জের(শ্বশুর বাড়ি) বাইরে কোথাও যায় নি। কিন্তু ঘরে বসেই সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছে। কেউ কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে শুনলেই সেই জায়গাটা সম্বন্ধে সব কিছু কী সুন্দর গড়গড় করে বলে দিতে পারত। কোথায় কী কী দর্শণীয় স্থান , কীভাবে যেতে হবে সব কিছু সুন্দর গুছিয়ে বলতে পারত। সারাদিন তো বটেই গভীর রাত পর্যন্ত সেই বই হাতে আর মুখে পান নিয়ে,,, অসম্ভবনেশা ছিল বই আর পানের,,এক একটা বই যে কতবার করে পড়ত,, লাইব্রেরীতে নতুন বই আসলে খুব আনন্দপেত। সকালে ঘুম চোখেই শুরু করত। তারপর স্নান পুজো আহ্ণিক সেরেই বসে পড়ত। খুবই সল্পাহারি ছিল ,,,, আমার মাঝে মাঝে মনে হত পান মুখে দিলেই ঠাকুমার খাওয়া হয়ে যেত।
গীতা ভাগবত ছিল ঠোঁটের আগায়। একদম শেষের দিকে ঠাকুমা যখন ‘মরণের পরে’ পড়তে শুরু করল,, এবং বার বার পড়তে থাকল পড়তেই থাকল তখন আমার বুকটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠেছিল। ঠাকুমা তো শুধু বাবার মা ছিল তা তো নয়। আশিভাগ আমার ও মা ছিল। সারে তিন বছর বয়েসে বাবা যখন আমাকে দাদুর বাড়িতে রেখে দিয়ে এল তখন আমি কাঁদতে কাঁদতে ঠাকুমার বুকেই মুখ গুঁজে ছিলাম। ঠাকুমার কোলে মাথা রেখে দুর্গা , কালি শিব লক্ষ্মী সরস্বতী গণেশ কৃষ্ণর অষ্টোত্তর নাম শুনতে শুনতে ঘুমোতাম,কত শিক্ষা পেয়েছিলাম ঠাকুমার কাছ থেকে ! নিজের আনন্দ ভালোলাগা সখ আহ্লাদ সব কিছু গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে মুখ বন্ধ করে কিভাবে সংসার করতে হয় শিখিয়ে ছিল আমাকে ।
যতদিন দাদু বেঁচে ছিল ঠাকুমার উপর অন্যায়ের প্রতিবাদ করত। কিন্তু দাদু চলে যাওয়ার পর ঠাকুমা যেন নিজের মধ্যেই গুটিয়ে গিয়েছিল। শুধু অপেক্ষা,,, কবে বারো বছর পূর্ণ হবে। দাদু ঠাকুমার থেকে বারো বছরের বড়ো ছিল। তাই ঠাকুমার স্থির বিশ্বাস ছিল ঠাকুমা ঠিক দাদু মারা যাওয়ার বারো বছর পরেই মারা যাবে। হয়েও ছিল তাই দাদু মারা গিয়েছিল ১৯৯৫ সালে আর ঠাকুমা ২০০৭ এর ১৪ই জুলাই আমার ১৩ তম বিবাহ বার্ষিকীর দিন।
খবরটা কানে আসতেই ছুটে গিয়ে ছিলাম। ঠাকুমা শ্মশানেই অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। আমি তাঁর একমাত্র নাতনি ছিলাম তাই আত্মার টানটাও খুব জোড়ালো ছিল।
প্রতিবছর জুন মাসে গরমের ছুটিতে মেয়েকে(বড়ো) নিয়ে যেতাম বাপের বাড়ি। ঠাকুমা আমার অপেক্ষায় থাকত। ব্যাগটা ধপাস করে রেখেই বাবার কাছে মেয়েকে দিয়েই চলে যেতাম ঠাকুমার কাছে। ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরলেই সেই চেনা গন্ধটা পেতাম। পান দোক্তা জর্দা মেশানো একটা অদ্ভুত সুন্দর মায়া মায়া গন্ধ। এত বছর পরেও আমি সেই গন্ধটা পাই। ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরার সেই যে একটা অনুভুতি সেই যে নরম তুলতুলে শরীর তার উম,, এখনও টের পাই। খুব অবাক লাগে এও কী সম্ভব!
সেবার ইচ্ছে থাকলেও মেয়ের স্কুলের গরমের ছুটিতে যেতেই পারলাম না রঘুনাথ গঞ্জ। কিছুতেই হল না যাওয়া। ঠাকুমা আমার অপেক্ষায় ছিল। একবুক অভিমান নিয়ে একদিন ফোন করল গরমের ছুটিতে এলিনা? আর তোর সঙ্গে আমার দেখা হবে না। একেবারে আমার মরা মুখই দেখিস।
সেই কথার মধ্যে কি ছিল জানি না। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। বলেছিলাম বলোনা ঠাকুমা একথা বলো না। তোমার সঙ্গে আমার ঠিক দেখা হবে। নিশ্চয়ই হবে। ঠাকুমার কথায় বুকের ভেতরটা ধরফরিয়ে উঠেছিল। একটা কেমন যেন মোচড়ানো যন্ত্রণা। মনে হয়েছিল ছুট্টে চলে যাই ঠাকুমার কাছে। কিন্তু তখন তো আমি অত স্বাধীন ছিলাম না। শ্বশুর শাশুড়িকে একদিনের জন্য যাওয়ার কথা বলতেই পারিনি।
সত্যিই আমার আর দেখা হয় নি ঠাকুমার সঙ্গে। ঠাকুমা ঠিক তার একমাস পরই মারা যায়। তবে মৃত্যু সংবাদ আসতেই এক ভাইয়ের সঙ্গে ছুটে গিয়েছিলাম রঘুনাথ গঞ্জ। একদম শ্মাশানে । মেয়েদের নাকি শ্মশানে যেতে নেই। আমার ক্ষেত্রে অবশ্য এই নিয়ম খাটে নি। ২০০৪ এ আমি বাবার কাজ করতে প্রথম শ্মশানে গিয়েছিলাম।
যাইহোক শ্মশানে গিয়ে ঠাকুমার সেই মরা মুখই দেখতে হল। ক্ষমা চেয়ে ছিলাম কিন্তু অভিমানী আমার ঠাকুমা আমাকে ক্ষমা করেছিল কিনা জানিনা। সেই গেলাম কিন্তু একটু সাহস করে যদি বলতে পারতাম আসার কথা। ক’দিন আগে যদি আসতে পারতাম! তাহলে হয়তো ঠাকুমার সঙ্গে আমার শেষ দেখাটা হত।
বাড়িতে ফিরে ঠাকুমার ঘরে কিছুক্ষণ বসে ছিলাম। ঠাকুমার আসনের সামনে সেই চেনা থালায় পরিপাটি করে সাজানো পান। চুন খয়ের সুপুরি দেওয়া আছে। কিন্তু খিলি করা বাকি। কিজানি সেই সময় হয়তো ঠাকুমার শরীর খারাপ করছিল তাই খিলি করতে পারেনি। পাশে দোক্তার কৌটো। আর উল্টোনো একটা বই। কি বই আমার আর সেই সময় দেখার মতো ক্ষমতা ছিল না।
পরিষ্কার পরিপাটি বিছানা। পাশে ঢাকনা দেওয়া জল খাওয়ার পেতলের ঘটি। একটা আসন তার সামনে থালায় সাজা পান। আসনের পাশে একটা অর্ধেক পড়া উল্টোনো বই। আলনায় রাখা পরিষ্কার ধবধবে সাদা সরু পাড়ের থান। অর্ধেক শেষ হওয়া মুড়ি আর বাতাসার কৌটো,, দাদুর ছবির সামনে ধূপের ছাই,, টেবিলে কত বই!! জানালায় পরিষ্কার পর্দা হাওয়ায় ওঠানামা করছে। সবকিছু ঠিকঠাক। কিন্তু আসল মানুষটাই নেই। সেই মুহূর্তটা যে আমি নিজেকে কিভাবে সামলে ছিলাম তা কেবল ঈশ্বরই জানেন। একটাই আফসোস যদি চলে আসতাম তাহলে তো ঠাকুমার সঙ্গে আমার দেখা হত। হয়তো কিছু না বলা কোন কথা বলত। ঠাকুমা বুঝতে পেরেছিল যে সময় এসে গেছে। তাই হয়তো
যাওয়ার আগে বলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু কি কথা?
না। রাতের পর রাত জেগেও তার কূলকিনারা পাইনি। তবে আশায় আছি দেখা তো হবেই, তখন বুড়ির গলা জড়িয়ে সব শুনে নেব।

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!