সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৯)

আমার মেয়েবেলা

শুধুই বাবার কথা

আমার মেয়েবেলার,, আশি ভাগ জুড়ে রয়েছে শুধুই আমার বাবা। বাবার সঙ্গে কাটানো সময়,,, বিচ্ছেদ,,, যন্ত্রণা,,, এই নিয়েই কেটে গেল আমার জীবনের কতগুলো বছর! প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে আমি শুধু সেইসবই যাপন করে এসেছি আমার মেয়েবেলার সঙ্গে। আমার পরিবারের সঙ্গে। সেই সময়ের সঙ্গে। তাই এই পঞ্চাশের কোটায় এসেও আমার আর কিছুই ভোলা হয় নি। বলা যায় ভোলা গেল না।
স্মৃতিচারণের মধ্যেও তো জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়? বাঁচিয়ে রাখা যায়? তাই আজ জীবনের শেষ বেলায় এসেও মন যেন থেকে গিয়েছে সেই কিশোরী মেয়েবেলায়,, নিজেকে এখনও সেই ষোড়শী ভাবতে এতটুকুও সংকোচ বোধ করি না। আমার ষোড়শী বেলা, সেই সময় আমার কত আপনজন! আমার বাবা মা ভাই, আমাদের সেই ভরা সংসার। আমার কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত,,, এই সবের মধ্যেই যেন আমার সব ভালোলাগা,, সবটুকু ভালোবাসা!
আর তার থেকেই তো জন্ম আমার অনিকেত দার।
সাইকোলজির ভাষায় এটা কিন্তু মোটেও কোনও মানসিক সমস্যা নয়। বিজ্ঞানী ফ্রয়েডের মতে এই ধরনের প্রবণতাকে regression tendency বলে।
শিশুরা যেমন মায়ের পেটের মধ্যে যে ধরনের নিরাপত্তা বোধ করে। ঠিক সেইরকমই একটা ব্যাপার। এত বড়ো হয়ে যাওয়ার পরও আমি সেই নিরাপত্তা বা নিরাপদের সেই অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। এই ধরনের মানুষেরা সেইজন্য কষ্ট পায় বেশি। সারা জীবন একটা যন্ত্রণার ঘরে বাস করতে থাকে।
যাইহোক আমার বাবার কথা লিখতে বসলে কিছুতেই ফুরোতে চায় না। কোনটা ছেড়ে কোনটা যে লিখব ভেবেই কুল পাই না। এত বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন বাবার, ভগবান যেন বাবাকে ঢেলে সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন এই পৃথিবীতে। কত গুণ ছিল বাবার! কত যে প্রতিভা!!ভাবতে বসলে অবাক হয়ে যাই। এত দিয়েছেন,, এতওও দিয়েছেন, কিন্তু একটা মারাত্মক জিনিস দেন নি ঈশ্বর। ইচ্ছে করেই দেন নি। হয়তো সব পেলে নষ্ট জীবন। তাই বাবা এত ভাল অংক জানা সত্ত্বেও জীবনের হিসেবটা মেলাতে পারে নি। এত ভাল মানুষ হলে কি পৃথিবীতে ঠিকঠাক টেঁকা যায়? বাবার যে যোগ্যতা ছিল না তা কিন্তু নয়। এত গুণ এত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাবাকে কিন্তু একজন সাকসেসফুল ম্যান এর আসনে বসানো যাবে না। সোজা কথায় বাবা ছিল জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়া একজন ব্যর্থ সৈনিক।
আজ বাবার সমালোচনা করতে বসিনি। সেই ধৃষ্টতা আমার নেই। কিন্তু বাবার জন্য খুব কষ্ট হয়। সেই মানুষটার জন্য কষ্ট হয়।আপসোস করি। সেই মানুষটার নিঃশব্দ যন্ত্রণা, হাহাকার আমি প্রতি মুহূর্তে টের পাই। আর টের পাই বলে আমার বুকেও সেই যন্ত্রণা সেই হাহাকার সেই রক্তক্ষরণ।
কী ছিল না বাবার? বাবা খুব ভাল মানুষ ছিল, ভাল ফুটবল খেলত। গোলকিপার ছিল। সেই সময় মুর্শিদাবাদ জেলায় বাবার মতো দ্বিতীয় কোনও গোলকিপারের নাম শোনা যেত না। ডিস্ট্রিক্ট এ খেলত বাবা। কলকাতায় এক নামী দল খেলাতে চেয়েছিল বাবাকে দিয়ে। কিন্তু ঐ,,, একটা গুণের অভাব ছিল বাবার ,,, যেটা ভগবান দেন নি।
জীবনকে কিভাবে গুছিয়ে নিতে হয় সেটা বাবা একেবারেই জানত না। শুধু এক টুকরো ভালোবাসার খোঁজেই কাটিয়ে দিয়েছে একটা গোটা জীবন।
জীবনে চলতে গেলে একটু স্বার্থপর হতে হবে, নিজের একটা লক্ষ্য স্থির করে এগোতে হবে সব বাধা কাটিয়ে, লক্ষ্যভ্রষ্ট মানুষ বিশেষ করে,, আনসাকসেসফুল একটা জীবন আমাদের সমাজে, পরিবারে কোনও দিন যে সমাদর পায় নি, আর পাবেও না। এই সোজা সমীকরণটাই বাবা জানত না। নাকি জেনেও হয়তো না বোঝার ভান করেছে লোকটা। পরোপকারের ভুতটাতো জন্ম থেকেই, সেই এগারো মাস বয়স থেকে শিখেছে সত্যিকারের স্যাক্রিফাইস কাকে বলে।
একই পরিবারে এক ছেলের আদর বেশি তো অন্য ছেলের আদর কম। একজন অত্যন্ত সম্মানিত, তার কথাই শেষ কথা, আর একজনের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করে না। শুধু কি একটা পরিবারে? সমাজেও তো !প্রতিষ্ঠিত মানুষের বাক্ স্বাধীনতার অধিকার থাকে বেশি। একজন সাধারণ মানুষের যুক্তিসঙ্গত কথা কেউ কি সে ভাবে পাত্তা দেয়?
কিন্তু জীবন তো একটাই, একবারই। তাই এই জীবনটাকে পরিপূর্ণ করার দায়িত্ব তো আমাদেরই। তাই না?
বাবাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। খুব ছোট থেকেই বাবার সঙ্গে আমার অনেক কথা হত, শুধু যে হাজিবিজি হাসাহাসির কথা তা নয়। অনেক ভারী গুরুত্বপূর্ণ কথা, যে কথা বাবা শুধু আমার সঙ্গেই আলোচনা করত।
রাজনীতি থেকে আরম্ভ করে সামাজিক পারিবারিক সব রকম কথা বলতাম আমরা। পলিটিক্যাল সায়েন্স এর প্রথম পাঠ আমার বাবার কাছেই। কী সুন্দর করে যে বোঝাত! প্রথম সংস্কৃত পড়িয়ে ছিল বাবাই।
এখন বড্ড আপসোস হয় আর কিছুদিন যদি বাবাকে পেতাম, কত কথা বলার ছিল, শোনার ছিল। বলব বলব করে অনেক কথা বলাই হয়নি। আর কাউকে বলাও হল না। পেলামই না বাবার মতো।
জীবনে চলতে গেলে গুরুজন দের মতামত, পরামর্শ খুব দামী। আমি এটা খুব বিশ্বাস করি।জীবনের এই শেষ বেলায় এসেও বাবাকে খুব মিস করি। কত কিছু জানা হয় নি। জিজ্ঞেস করা হয় নি। আমার যে আগে থেকে জিজ্ঞেস করে নেওয়া উচিত ছিল, এটা তখন বুঝতে পারি নি। ভুল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বোঝা তো উচিত ছিল আমার!!
বাবা আমাকে একটু বড়ো হতেই নানা ভাবে ইঙ্গিত দিয়েছিল বাবার আয়ু ৬১ বছর। বাবা জানত। বাবা যে ভবিষ্যত দেখতে পেত!
জীবনের পথে চলতে চলতে কোথাও আটকে গেলে এখন ভাবতে বসি বাবা থাকলে কি বলত? কিন্তু হয় না। বাবার মতো ভাবতে পারি না। আসলে বাবা তো বাবাই হয়,, তাইনা!
এক এক সময় আমার দিশেহারা অবস্থা হয়, কী করব কোথায় যাব কাকে জিজ্ঞেস করব কেউ তো নেই ভাল বুদ্ধি দেওয়ার। বাবা মার মতো নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মানুষ কোথায় পাব?
জীবন যেমন শেখায় তেমন ই শিখি। ঠোক্কর খাই, ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াই, আবার পড়ে যাই, এভাবেই তো এগোনো। বাবা থাকলে হয়তো এতটা হত না।
তো যা বলছিলাম, বাবাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম এত ভাল খেল, বিশেষ করে তুমি ডিস্ট্রিক্ট এ খেলেছিলে, খেলার জন্যই তোমার চাকরি পাওয়া। কলকাতার বড়ো ক্লাব থেকে ডাক আসে নি? বাবা বলল এসেছিল তো যেদিন যাওয়ার কথা আটকে গেলাম। বাবা (দাদু) একটা কাজ দিল। না বলতে পারলাম না। কী শান্ত গলায় বলেছিল! এতটুকু ক্ষোভ দেখতে পাইনি।
দাদুর কয়লার ব্যবসা ছিল। ওয়াগন ভর্তি কয়লা এসে পৌঁছালে সেগুলো যতক্ষণ না নামানো হচ্ছে পাহারা দিতে হয়। কারণ ওয়াগন থেকে মাল চুরির ঘটনা কোনও নতুন কিছু নয়। কয়লা আসছে দাদুর কাছে খবর এল। এবার সেই ওয়াগন ভর্তি কয়লা পাহারা দেবে কে? মাল খালাস করাবে কে? লাখ লাখ টাকার ব্যাপার,,, বাবা ছাড়া আর কেউ পারবে না করবেও না। সবাই ব্যস্ত তাদের পড়াশোনা চাকরি নিয়ে । সবার সব কিছু ছিল। কিন্তু কিছু ছিল না এই মানুষটার। সবাই শুধু বাবার ভালো মানুষির সুযোগ নিয়ে, বাবাকে ব্যবহার করে গেছে।
একটা দিন, একটা রাত,,, মাত্র চব্বিশ ঘন্টার ব্যাপার ছিল। বাবা ছুটি পায় নি। দাদু বাবার ক্যারিয়ারের কথা একবারও ভাবে নি। অথচ বাবারা পাঁচ ভাই। ভোরে কলকাতায় পৌঁছে ইন্টারভিউ দিয়ে রাতের ট্রেন ধরে বাবা রঘুনাথগঞ্জ আরামসে পৌঁছে যেত। কিন্তু বাবা সেভাবে বলতেই পারে নি তার বাবাকে। বাবা যে দাদুকে অসম্ভব ভালো বাসত! দাদুর অসুবিধা হবে ভেবে বাবা তার নিজের স্বপ্ন টা কবর দিয়েছিল নিজের হাতেই।
নিজেরটা তো নিজেকেই বুঝতে হবে, নাকি? বাবা সাতদিন ধরে স্টেশন আর বাড়ি করেছে। রাতে মাল পাহারায় স্টেশনেই ঘুমিয়েছে। একটা সতের আঠের বছরের ছেলেকে যেখানে শাসনের দরকার ছিল সেখানে রাতের পর রাত ছেড়ে দিয়েছে নিজের প্রয়োজনে।
বাবা ছিল ভাইদের মধ্যে সেজ। অর্জুন ছিল বাবা। ত্যাগ কাকে বলে সে আমার বাবাই দেখিয়ে ছিল। সেই এগারো মাস বয়স থেকে শুরু হয়েছিল আত্মত্যাগ।
শুধু ছোট বেলার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। বড়ো বয়স থেকে জীবনের শেষ বয়স পর্যন্ত বাবার আত্মত্যাগের কাহিনী ঝুড়ি ঝুড়ি। খুব খারাপ লেগেছিল বাবার জন্য। এত বড়ো সুযোগ ছিল, এত বড়ো উজ্জ্বল ভবিষ্যত অপেক্ষা করছিল বাবার জন্য। কিন্তু বাবার এই আত্মত্যাগের গল্প শেষ পর্যন্ত কেউ মনেই রাখে নি। খুব রাগ হয় বাবার জন্য। কারণ বাবা ছিল আমার গুরু। হিরো ছিল আমার। তাই ছোট বেলা থেকেই বাবাকে নকল করতাম। বাবার মতো হতে চাইতাম। কিন্তু বাবাকে আদর্শ করতে গিয়ে আমারই বা কী হল? কী পেলাম জীবনে? যেটা পেলাম তার থেকে অনেক বেশি পাওয়ার কথা ছিল আমার।
না। এসব আমার কথা নয়। আমাকে প্রায়ই শুনতে হয় কারোর না কারোর থেকে।।
বাবার কথা বলে শেষ করা যাবে না। মাথা গরম হয়ে যায়। এত বোকা ছিল!
কিভাবে যে একটা সৎ মানুষকে অসৎ এর তকমা দেওয়া হয়েছিল তারও উদাহরণ আছে।
বাবার সেই ছোট্ট বেলার কথা। কাকা জ্যেঠারা হাসাহাসি করতে করতে বলেছিল। কিন্তু আমার কোনও দিনই হাসি পায় নি সে কথা শুনে। আমি সেখানে দেখেছিলাম, আমার বাবা কিভাবে বদ বুদ্ধির প্যাঁচে পড়ে তাদের বাবা মার কাছে ধোলাই খেয়ে ছিল। অপমানিত হয়েছিল।
ছোটবেলাতেও বাবা বাড়ির অনেক কাজ করত। বাজার করা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
তখনকার যুগে বাড়িতে অনেক (পাড়া প্রতিবেশীর) পোষ্য মানুষ হত বাড়ির ছেলে মেয়ে দের সঙ্গেই। আমার ছোট কাকার ভিক্ষে ভাই( পৈতের সময় তিন দিন ব্রহ্মচর্য পালনের পর, ঘর থেকে বেরোনোর পর যিনি প্রথম ভিক্ষা দেন। তিনিই ভিক্ষেমা হিসেবে পরিচিত হন। ভিক্ষেমার ছেলেকে ভিক্ষে ভাই বলা হত।) তো যাই হোক সেই ভিক্ষে ভাই আমাদের বাড়ি থেকেই মানুষ। ভীষণ চালাক ছিল আমার ঐ কাকা। বাবা প্রতিদিন বাজারে যায়। পঞ্চাশ পয়সা কেজি দরে আলু কেনে , বা কুমড়ো কেনে। বড়ো সংসার প্রতিদিন দু কেজি আলু তো লাগতই। হল কি বাবা যদি এক টাকার দু কেজি আলু কেনে তো আমার ঐ কাকা নব্বই পয়সায় কেনে। বাড়িতে এসে ঠাকুমাকে দশ পয়সা ফেরত দেয়। বাবাকে ঠাকুমা বলে তুই প্রতিদিন বাজার থেক দশ পয়সা মারিস। তখন কার দিনে দশ পয়সার দাম অনেক। বাবা কে আর বাজার করতে দেওয়া হলনা। কি অপমান! বাবার মুখ কাঁচুমাচু।
বাবা আমার ছোট কাকাকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিনে বাজার ঘুরে এল। আলু সেই পঞ্চাশ পয়সা কেজিই ।কী মুশকিল বাবারা আর কিছুতেই বুঝতে পারে না। ব্যাপারটা কি? ও দশ পয়সা কমে কী করে আনছে? একদিন বাবা ওই কাকার পিছু পিছু গিয়ে দেখে ঐ কাকা দু কেজির জায়গায় এক কেজি নশো গ্রাম আলু নিচ্ছে । এক কেজি নশো গ্রামের দাম তো নব্বই পয়সাই।। দু কেজির সঙ্গে
এক কেজি নশো গ্রামের ফারাক কে কিভাবে আর বুঝবে।
এটা পড়লে বেশ মজার ঘটনা মনে হতে পারে কিন্তু সেটা আমার একবারও মজা লাগে নি। একটা ছেলের সততার নিলাম হয়েছিল দিনের পর দিন,তারই পরিবারের কাছে।
এই ছিল আমার বাবা। যে নাকি মাত্র এগারো মাস বয়স থেকেই সংসারে অবহেলিত,,, মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। কিন্তু যেতে পারত না।
বাবা তার মায়ের কাছে সে রকম আদর পায় নি যতটা পাওয়া উচিত ছিল। একটু মায়ের দুধ খাওয়ার জন্য ছটফট করত। কিন্তু তাকে গরু, ছাগলের দুধের সঙ্গে জল মিশিয়ে খাওয়ানো হত। খাওয়াত বাবার ঠাকুমা। কেন?
কারণ এগারো মাসের বাচ্চা ছেলেটার খাঁটি গরুর দুধ খেয়ে ব্লাড ডিসেন্ট্রি হয়েছিল।
বাবা ছিল বাড়ির সেজ ছেলে। পরপর তিনটে ছেলে। ঠাকুমার আর ভাল লাগে না। ভগবান মুখ তুলে চাইলেন। বাবার জন্মের এগারো মাসের মাথায় আমার বড়ো পিসি জন্মালো। বাড়িতে হৈ হৈ পড়ে গেল। চল্লিশ বছর পর বাড়িতে মেয়ে হয়েছে। শুরু হল বাবার আত্মত্যাগের জীবন। হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের কাছে চলে গেলে খুব মুশকিল। সদ্যজাত মেয়ের অসুবিধে হবে । ঠাকুমাই বা দুটো বাচ্চাকে সামলায় কী করে? ঠাকুমা তখন মেয়ে অন্তপ্রাণ। অসাধারণ দেখতে ছিল আমার বড়ো পিসিকে। সকলের নয়নের মণি। আমার বাবাও অসাধারণ দেখতে হয়েছিল। কিন্তু আদর পাওয়াও তো কপালে থাকতে হয়! যেটা বাবার একদম ই ছিল না।।
এগারো মাসের বাচ্চা,, সেও তার মাকে কিছুতেই ছাড়বে না। কান্নাকাটি করে তার অধিকার আদায় করে নিতে চায়। ঐ বয়স থেকেই পরিস্থিতি বাবাকে শিখিয়েছিল, অধিকার,, ভালোবাসা অত সহজে পাওয়া যায় না। হয় প্রতিবাদ কর, স্বার্থপর হও
নয়তো স্বার্থত্যাগ কর।
যাইহোক সব সমস্যা সমাধানেরই রাস্তা থাকে। তাই বাবাকে ঠাকুমার কাছ থেকে একটু দুরে কোমরে দড়ি বেঁধে রাখা হল। দূর থেকে ঐ টুকু একটা বাচ্চা দিনের পর দিন দেখেছে মা কেমন হয়। কেমন ভাবে আদর করে, ঘুম পাড়ায়। বাবা সারাদিন ঠোঁট ফুলিয়ে ফুলিয়ে নানা ভাবে কেঁদে বাড়ির সব্বাইকে বিশেষ করে ঠাকুমাকে বোঝাতে চাইত। মা ই তো বোঝে সন্তানের কষ্ট! কাঁদতে কাঁদতে কোন কোন সময় মাটিতেই ঘুমিয়ে পড়ত বাবা। কোমরে দড়ির দাগ হয়ে গিয়েছিল। আমি এই সমস্ত কথা শুনেছিলাম বাবার ঠাকুমার কাছে। যিনি বাবাকে মানুষ করেছিলেন।।
এইভাবে থাকতে থাকতে বাবা অসুস্থ হয়ে গেল।
টাইফয়েড হয়েছিল। ডাক্তার এসে জবাব দিয়ে গেল। রাতটা কাটলে হয়।
ঠাকুমা সেই রাত বাবাকে নিয়ে শুয়েছিল আর একমনে মাকালিকে স্মরণ করেছিল। (শ্মশান কালি)
আমাদের রঘুনাথগঞ্জে শ্মশান কালি খুবই জাগ্রত। ঠাকুমার খুব বিশ্বাস ছিল। মাঝরাতে সেই মা কালি ঠাকুমার হাতে মোটা চুল জড়ানো শেকড় দিয়ে বলেছিলেন “সাবধানে রাখিস। এটাই তোর ছেলেকে রক্ষা করবে।
আর আমার প্রসাদ ছেলের মুখে দিস”——-
পরদিন ভোরে ঠাকুমা ঘুম চোখে হাতের মুঠোয় দেখতে পায় চুল জড়ানো শেকড়। বার চোদ্দ হাত পর্যন্ত খোলা হয়েছিল সেই চুল। তারপর আর কেউ সাহস করে নি। বাবার গায়ে সেই আশীর্বাদী শেকড় ছোঁয়ানো হল। বাবার মুখে শ্মশান কালির প্রসাদ দেওয়া হল। বাবা বেঁচে উঠল। নাম রাখা হল দেবীপ্রসাদ। আমিও দেখেছি ওই আশীর্বাদী মোটা চুল জড়ানো এক ইঞ্চির শেকড়। এ কোনও গল্প কথা নয়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। আমাদের যে কোনও শুভ কাজে ঠাকুমা আমাদের মাথায় ঠেকিয়ে দিত। বাবার শরীর খারাপ হলেই ঐ শেকড় ছুঁইয়ে দিত আমার ঠাকুমা।
ঠাকুমা ঐ শেকড়টি একটা কৌটোর মধ্যে রেখে দিয়েছিল।
একটা আশ্চর্যের কথা বলি ২০০৩ এর ২০ ডিসেম্বর আমার বড়ো জ্যেঠু মারা যায়। ২০০৪ এর ১লা ডিসেম্বর আমার বাবা মারা যায়। বাবা মারা যাওয়ার পর মুখ বন্ধ কৌটোর ভেতর থেকে ঐ মোটা চুল জড়ানো শেকড়টাও উধাও হয়ে যায়। কাজ মিটে যাওয়ার পর ঠাকুমা ঐ কৌটো খুলে মাকালির আশীর্বাদী শেকড় আর পান নি। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখেছিলাম, কৌটোর ঢাকনা বন্ধ অথচ শেকড়টা নেই।
বাবার মৃত্যুর চার বছর পর ঠাকুমা মারা যায়।
আমার বড়ো পিসি মারা যান মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়েসে।(১৯৯০)
অসাধারণ সুন্দরী ছিল আমার বড়ো পিসি। রূপে গুণে একেবারে লক্ষ্মী সরস্বতী। ঠাকুমা তাঁর জীবদ্দশায় তিন ছেলে (বড়ো জ্যেঠু, বাবা আর ছোট কাকা) এক মেয়ে (বড়ো পিসি) বড়ো নাতি(আমার ভাই) এবং পুত্র বধূ (বড়ো জ্যেঠিমা ) এবং আমার দাদুর মৃত্যু দেখেছিল। খুব কষ্ট পেয়েছিল আমার ঠাকুমা। এতগুলো ছেলে মেয়ের মৃত্যু শোক!
কিন্তু একটা মানুষের জন্য আর একটা মানুষের একটু একটু করে হারিয়ে যাওয়া ,, সবার থেকে,, পরিবার থেকে চেনা সংসার থেকে,,,
না । তার কথা সেভাবে কেউ মনে রাখেনি। মনে রাখেনি তার আত্মত্যাগ, ভালো মানুষি, তার পরোপকারীতা এবং অবশ্যই তার প্রতিভা….

ক্রমশঃ

(বাবার কথা তো একটা এপিসোডে শেষ করা যায় না। তাই চলবে আরও কিছু এপিসোড শুধু বাবাকে নিয়েই। কারণ আমার মেয়েবেলা মানেই বাবার ছেলেবেলা,, শৈশব,, যৌবন…..)
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!