সম্পৃক্তা ধীর পায়ে বাড়ির পেছনে বাগানের দিকে এগোয়। ওর চোখের জল আজ বাঁধ মানে না। জলভরা চোখে বাগানের পথটাও ঝাপসা লাগে। কোনক্রমে ও ওর প্রিয় গাছটার কাছে পৌঁছয়। গাছটাকে জড়িয়ে ধ’রে অঝোরে কাঁদতে থাকে। অস্ফুটে বলে — মা, আমি কী এমন অন্যায় করেছি যে, ও আমাকে…!
সম্পৃক্তার গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে। ওর গায়ে-মাথায়, পিঠে গাছের ডাল-পাতা স্পর্শ করে। কে যেন বলে ওঠে — কাঁদিস না মা! সহনশীলতা বড় গুণ রে! আমাকে দেখছিস না!
সম্পৃক্তা অভিমানী — আর কত সহ্য করব মা! সামান্য একটা কাপ ভেঙে ফেলার জন্য…! আমার গালটা তুমি একবার দেখো!
কথাটা বলে সম্পৃক্তা গাছটাকে জড়িয়ে ধ’রে আবার হু হু করে কেঁদে ওঠে। গাছের ওপর থেকে বউ কথা কও পাখিটা ঠিক তখনই ডেকে ওঠে — বউ কেঁদো না… কেঁদো না…!
গাছটা যেন বলে ওঠে — যা ঘরে যা! কাজে মন দে! এরই নাম তো সংসার।
সম্পৃক্তা প্রতিবাদ করে ওঠে — অকারণ ওর হাতে মার খাওয়া, সব সময় বকুনি খাওয়ার নাম সংসার? আমি কি মানুষ নই!
সম্পৃক্তার কান পেরিয়ে মনের ঘরে কথা বাজতে থাকে — তুই নিশ্চয়ই মানুষ মা। সে-ও মানুষ। কিন্তু মানুষের যে প্রকারভেদ থাকে রে মা! তোদের যে প্রতিলোম বিবাহ। বর্ণের উঁচু-নিচুর কথা আমি বলছি না। বর্ণের ভেদাভেদ করেছে স্বার্থপর মানুষরা। আমি বলছি, মানুষ হিসেবে ওর চেয়ে তুই অনেক উচ্চ মার্গের। তুই হলি সত্ত্বগুণের মানুষ। আর ও রজগুণের। ওর স্বভাবেই আছে অহংকার ও গর্ব, অর্থের মোহ, পার্থিব বাসনা, এইসব। তাই এমন ব্যবহার ওর দোষের নয়। তুই হলি সৎ ও ধর্মজ্ঞান-সম্পন্ন মানুষ। তোর কাজ হল, ওকে আস্তে আস্তে বুঝিয়ে-সুজিয়ে উচ্চমার্গে নিয়ে যাওয়া। যা, ঘরে যা, দুঃখ করিস না। নিশ্চয়ই তুই একসময় ওকে আয়ত্তে আনতে পারবি।
একসময় সম্পৃক্তার চোখের জল শুকোয়। বাগানটা তখন আলোয় আলোময় হয়ে উঠেছে। অজস্র পাখির কলকলানি। বউ কথা কও পাখির ডাকটা আর আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না।
সম্পৃক্তা ঘরে ফিরে আসে। দেখে সংরাগ ঘরে নেই। বোধহয় বাজারে গিয়েছে। ও ঘরের কাজে মন দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঘরে ঢোকামাত্র ওর মনের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় অনেক কথা। পুরুষতান্ত্রিকতা, নারীর মর্যাদা, স্বামীর অত্যাচার, বধূ-নির্যাতন, নারী-স্বাধীনতা, নারী-আন্দোলন ইত্যাদি অনেক অনেক কথা। বহুজনের মুখে বহুবার ও শুনেছে এ কথাগুলো। অনেক সময় গুরুত্ব দেয়নি। আবার অনেক সময় এসব কথা মনের মধ্যে আন্দোলিত হয়ে মনের উষ্মা বাড়িয়েছে, উত্তাপ ছড়িয়েছে। পরক্ষণেই মনে পড়েছে ওর প্রিয় গাছের সান্ত্বনা-বাক্য, ‘সে-ও মানুষ, তবে রজগুণের।’ হয়তো তাই! সারাদিন ও টাকার কথা ভাবে, টাকার পিছনে ছুটে বেড়ায়, টাকা সঞ্চয় করাই যেন ওর জীবনের মূল লক্ষ্য। না কোন শখ-আহ্লাদ, না কোন ভ্রমণ-বিনোদন! শুধু রাত্রিবেলায়…। এটাই ওর কাছে বিনোদন। শরীর জাগে না, অথচ…। কী কষ্ট যে হয়! এবার থেকে বাধা দেবে, প্রতিবাদ করবে। পরক্ষণেই ভাবে, তাতে যদি খুব রেগে যায়! যদি মারধর করে!
সম্পৃক্তার মনে পড়ে না কোনদিন বাবার হাতে মার খেয়েছে কিনা। খুব ছোটবেলায় কী এক দোষে মা বেলনা দিয়ে ঘা-কতক পিঠে দিয়েছিল। এ ছাড়া আর কেউ কোনদিন গায়ে হাত তোলেনি। কিন্তু ও আজ এমনভাবে গালে চড় মারল! স্বামী হলে কি চড় মারার অধিকার পাওয়া যায়?
সম্পৃক্তার মনটা আবার উত্তপ্ত হতে থাকে। কিছুতেই কাজে মন বসে না। ও রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আবার বাগানের পথে। এ-বাড়িতে ওই মানুষটা ছাড়া আর কেউ তো নেই যে, তার সঙ্গে কথা বলবে, মন হালকা করবে! এভাবে একা একা কি থাকা যায়! তবুও মানুষটা যদি ভালো হতো! সবসময় যেন রেগে রয়েছে! কখনো প্রেমের কথা ভালবাসার কথা মুখ দিয়ে বেরোয় না। ওর কাছে প্রেম মানে তো মুখ বুজে শুধু শরীর ধামসানো।
সম্পৃক্তা আবার প্রিয় গাছের কাছে যায়। অনেক দিন হল, ওর মা গত হয়েছেন। তাই ও গাছটাকে ‘মা’ বলে। ওখানে গেলেই যেন ও মনে একটু শান্তি পায়। গাছটাকে জড়িয়ে ধরতেই গাছ বলে ওঠে — কী রে পাগলি! ঘরে মন বসছে না বুঝি? তবে আয়, আমরা দু’জনে ‘গোপন কথা’ খেলি। তোর গোপন কথা তুই আমাকে বল। আমার কথা আমি বলব। তবে চুপিচুপি, কানে কানে। শোন! মনের দরজা-জানলা কখনো-সখনো খুলে দিতে হয়। তাতে মনে জমে থাকা অন্ধকার সরে যায়। মন ভালো হয়ে ওঠে। মনের মধ্যে তখন নতুন নতুন ভাবনা ফোটে। সে ভাবনাগুলো কুঁড়ি থেকে ফুল হয়। মনের মাঝে সৌরভ ছড়ায়। আয়, আমরা ‘গোপন কথা’ বলি।
সম্পৃক্তা গাছটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে থাকে। গাছের পাতাগুলো ওর গায়ে-মাথায় যেন হাত বুলিয়ে দেয়। ও আবেগে বলে চলে কত কথা। কখনো ওর গলায় বিষাদ, চোখে বাষ্প। আবার কখনো বা ও খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। ও-ই একমাত্র শুনতে পায় মা-গাছের কথা। গাছ ওকে বলে চলে — তুই যদি শান্তি চাস মা, তাহলে অন্য কারো দোষ দেখিস না। দোষ খুঁজবি নিজের। সবাইকে নিজের করে নিতে শেখ। তোর স্বামী, এই আমি, এই গাছ-পাখি-ফুল কেউ তোর পর নয়। এসব মিলেই জগৎ। এ-জগৎ যে তোর রে মা!
সম্পৃক্তা অভিমানী — ওকে নিজেরই তো ভাবি মা। কিন্তু ও কেমন যেন…! ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে সংসার ভেঙে দিয়ে কোথাও পালিয়ে যাই।
গাছের মাথায় এক উজ্জ্বল আলো খেলা করে। গাছ বলতে থাকে — ওরে পাগলি ভাঙতে সবাই জানে। গড়তে পারে ক’জন? সমালোচনা, নিন্দা করতে পারে সবাই। কিন্তু তাকে মনের মতন করে গড়ে নিতে পারে ক’জন? ওকে যে তোর মনের মতন করে নিতে হবে রে মা! পারবি না? চেষ্টা কর, ঠিক পারবি। ওকে বোঝাতে হবে যে, ওই কাপটা যদি না থাকতো, তাহলে তো ভাঙত না। যদি মনের মধ্যে তীব্র বাসনা না থাকে, তাহলে তো তা পূরণ না হওয়ার জন্য হাহাকার করতে হয় না। দেখবি, একদিন ও ঠিক বুঝবে।
সম্পৃক্তা ফুঁপিয়ে ওঠে — ও যে আমার কোন কথাই শোনে না মা।
গাছের পাতাগুলো যেন খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে — শুনবে রে শুনবে। বলার মতো বলতে পারলে ঠিকই শুনবে। যখন যা বলার ইচ্ছা হবে, সাত-পাঁচ না ভেবে বলে ফেলবি। কান রয়েছে, শুনতে তো পাবেই। হয়তো মনে নেবে না। একসময় কান থেকে মনের ঘরে ঠিক পৌঁছবে। তোকে যে আমার মতো গাছ হতে হবে রে মা! ভেবে দ্যাখ, গাছের মালিক গাছকে কত যন্ত্রনা দেয়। ডাল কেটে ফেলে, গাছের গায়ে লোহার তার জড়িয়ে রাখে। গাছের গোঁড়ায় আগুন জ্বালায়। আরও কত কিছু করে। গাছ কি তাতে রাগ করে? সে ঠিক সময়ে ফুল-ফল দেয়। তাতে কি গাছের কোন ক্ষতি হয় রে!
সম্পৃক্তা অনুভব করে, ওর মাথার চুলগুলো যেন লক্ষ পাতা হয়ে হাওয়ায় দুলছে। ও আরও নিবিড় হয়ে গাছের বুকে কান পেতে দেয়।
এভাবেই দিন দিন, প্রতিদিন। একদিন সম্পৃক্তা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করে, সংরাগ যেন আর আগের মতো রাগ করে না। ওকে ভালো কথা বলতে চেষ্টা করে, কিন্তু বলার ভাষা খুঁজে পায় না। ওকে আদর করার চেষ্টা করে, কিন্তু কীভাবে করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।
একদিন সংরাগ সবিস্ময়ে দেখে, সম্পৃক্তা একটা বিশাল গাছ হয়ে গেছে। ওর নিতম্ব থেকে পায়ের পাতা যেন গাছের গুঁড়ি। হাতদুটো যেন দুটো ডাল। গায়ে-মাথায় লক্ষ পাতার বাহার। সে গাছ থেকে এক অদ্ভুত মায়াময় আলো ছড়াচ্ছে সে আলো সংরাগের চোখে-মুখে। ও তখন গাছটাকে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে থাকে।