লম্বা বাঁশগুলোকে করাত দিয়ে মাপ মতো কেটে নিচ্ছে সুগানা । অনেকদিন ধরেই মা বলছে ,”ঘরের খুঁটাগুলান ইবারে সারা না কর্যালে কুন্দিন ঝুরঝুর্যা হইয়েঁ ভেইঙ্গে যাব্যাক রে বিটা ।“ একটা খুঁটির গায়ে মা আলতো চাপড় মারতেই ঘূণ ধরা খুঁটি থেকে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়েছিল গুঁড়ো গুঁডো কাঠ । এভাবে থাকলে হাড়গোড় ভাঙা গরুর মতো হাঁটু দুমড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়বে ঘরটা । চমকে মায়ের দিকে তাকিয়েছিল সুগানা । অপুষ্টিতে ক্ষয়ে যাওয়া মা আর ঘুণধরা খুঁটি একাকার হয়ে গিয়েছিল ওর কাছে । কে যে কার প্রতিবিম্ব সেটা আলাদা করতে পারেনি ।
পা দিয়ে এক একটা বাঁশকে চেপে ধরে দুহাতে করাত চালাচ্ছে সুগানা । হাতের পেশি ফুলে ফুলে উঠছে । ঘামের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে কষ্টিপাথরে গড়া শরীর । চোয়ালে ফুটে উঠেছে একাগ্রতা । ঘরের ছাদটা বাঁচাতেই হবে । অবশ্য ঘর ওটাকে বলা যায় না । ছোট্ট ঝোপড়ি একটা । বাড়ির সকলের জায়গাও হয় না সেখানে । বাবা মা বোনদুটোকে নিয়ে ঘরে থাকে । সুগানা , সুনারা আর জগ্না দাওয়াতেই রাত কাটায় । তবু ওই চিলতে ঘরখানাই ওদের সর্বস্ব । ঠাকুরদা সেই কোনকালে নিজের হাতে বানিয়েছিল হোগলাপাতার ছাউনি দেওয়া লাল কাঁকুড়ে মাটির ঘরটা ।
বাঁশগুলো ফরেস্টার সাহেবের কাছ থেকে পেয়েছে সুগানা । সাহেব অবশ্য এমনি দেয়নি । বদলে মাসভর খাটতে হয়েছে সাহেবের বাংলোয় । গৃহস্থালির খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে বাগানের পরিচর্যা , মায় সাহেবের পেয়ারের বাঘা কুত্তার দেখ্ভালও করতে হয়েছে । বদমেজাজি কুকুরটা প্রায়ই ওকে কামড়াতে চাইত । কতোবার ধারালো নখের আঁচড় খেয়েছে সুগানা । মাঝে মাঝে ইচ্ছে হত লাঠি দিয়ে শয়তানটাকে আচ্ছা করে পিটাতে । অনেক কষ্টে মাথার ভিতরের হূলটাকে ঠাণ্ডা রাখত সুগানা । তাছাড়াও প্রতি সন্ধ্যায় সাহেবের হাত পা টেপা । সেটা আবার ছিল সাহেবের মদ্যপানের সময় । কিছুক্ষণের মধ্যেই হুঁশ হারাতো সাহেব । সঙ্গে মেজাজও । ফলে নাগাড়ে চলত অকথ্য গালাগালি আর লাথি-চড় । সুগানা রুখে দাঁড়ালে সাহেবের কুপোকাত হতে সময় লাগত না । কিন্তু বাঁশগুলো যে খুব দরকার ছিল । কাটতে গিয়ে টের পাচ্ছে সুগানা , খুবই উঁচু জাতের বাঁশগুলো অনেক বছর ধরে সুগানার বাবা মা ভাই বোনের মাথার উপরকার ছাতটাকে ধরে রাখতে পারবে ।
ওহ্ , এর জন্য কষ্টও করেছে সুগানা । অন্ধকার থাকতে উঠে , বাসি ঘাটো খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে , ছ-মাইল হেঁটে সাহেবের বাংলোয় পৌঁছোনো । ফিরতে ফিরতে বেশ রাত । এর মধ্যে খাওয়া বলতে , দুপুর গড়ালে দুটো মোটা রুটি আর আধা খুঁচি ডাল । কলের জল এন্তার । ওদের ঘরের মতো মাপা নয় । যত্ত খুশি খাও , গায়ে মাথায় দাও । আর ভালো লাগত সাঁঝের বেলার চা-টা । কালো রঙের গরম জলীয় বস্তুটা ক্লান্তি কাটিয়ে চাঙ্গা করে তুলত শরীরটাকে ।
না খেয়ে কাজ করবার দুঃখ ছিল না সুগানার । সে মুন্ডার ছেলে । ভুখা পেটে গতর খাটানোর অভ্যাস ওর বংশ পরম্পরায় । কিন্তু , ও বুঝেছিল , সূযোগ বুঝে সাহেব বেশি বেশি খাটিয়ে নিচ্ছে । হিসেব মতো সতেরো আঠারো দিনেই ওই কটা বাঁশ কেনার মজুরি উঠে আসে । বুঝেও কিছু করার ছিল না । এই কুরুম্বদা গ্রামে সতেরো আঠারো দিনের কাজই বা কে দেবে ? এখানে কাজ বলতে এক চিলতে জমি চাষ , নয়তো গাইচরি । তাতে রোজ ভরপেট ঘাটোই জোটে না । বাঁশ কেনার টাকা জমাবে কোত্থেকে ? পিঠ টনটন করছে । ধরে গেছে কোমোরও । একটু বিশ্রাম নিতে পারলে ভালো হতো । কিন্তু হাতে সময় নেই একেবারেই । আজকেই শেষ করতে হবে কাজটা । সময়টা যে দুম করে ছোট হয়ে যাবে , আঁচ করতে পারলে কি সুগানা কাজে ঢিলে দিত ? আসলে মাসভর সাহেবের কাজ করে হেদিয়ে পড়েছিল ও । সারা শরীরে বেদনা , শিরায় শিরায় ক্লান্তি । ভেবেছিল কদিন বিশ্রাম নিয়ে ঘর সারাইয়ের কাজে হাত দেবে । কিন্তু কাল রাতা এসে যা বলল , শুনেই হাত থেকে খসে গেল সময়ের লেজটা ।
গেল পূর্ণীমাতেই সিংবোঙ্গার থানে পূজোর সময় ভরমি মুন্ডা রাতার বাবাকে বলেছিল ,”সুন্অ ধানি মুন্ডা , তুমার মেয়্যাকে আমি আরান্দি কইরব ।“ বিনয়ী প্রস্তাব নয় । দস্তুরমতো হুকুমদারি । উপস্থিত সবাই চমকে উঠেছিল । গাঁয়ের সবাই জানে , রাতার বিয়ে হবে সুগানার সঙ্গে । ছোট্টবেলা থেকে ওদের ভালোবাসা । ভরমিও জানে । তবুও বলল কথাটা । সুগানার মা প্রতিবাদ করেছিল , ”তা কি করে হয় ? রাতা আরান্দি কইরবে আমাদিগের সুগানাকে ।“ ভরমি পাত্তাই দেয় নি ওদেরকে । মুখ থেকে মহুয়ার রসের গন্ধ ছড়িয়ে , সবাইকে শুনিয়ে ধানিকে বলেছিল ,”জুগার যন্তর সুরু কর্যা দাওগা মুন্ডা । গাঁয়ের সবাকার নিমনতন্ন । খর্চার ভাবনা তুমাকে ভাইবতে হবেক নাই ।‘
ধানির মুখ তখন শুকিয়ে এতোটুকু । ভয়ে কাঁপছে । শুধু এই কুরুম্বদা গ্রামেই নয় , আশেপাশের গ্রামগুলোতেও কারও ঘাড়ে
দুটো মাথা নেই যে ভরমির কথার প্রতিবাদ করবে । মুন্ডারি সমাজের লোকেদের বিশ্বাস , ভরমির সঙ্গে অপদেবতা নাসানবোঙ্গাদের যোগাযোগ আছে । ঝর্ণা , দহ , বিলের জলে নাদ-ইরা বোঙ্গা থাকলে , সেই জলে স্নান করলেই কুষ্ঠ হবে । কেউ জানে না , কিন্তু ভরমি জানে , কোন জলে কখন নাদ-ইরা আছে , কখন নেই । দুর্ভিক্ষ , অনাবৃষ্টি , অতিবৃষ্টি , গো-মড়ক , মানুষ-মড়ক কোনটা কোন নাসানবোঙ্গার অভিশাপে হচ্ছে , তা-ও বলতে পারে ও । আবার মানুষের বেশ ধরে কে আসলে ডাইন , তা-ও ধরে ফেলতে পারে । এমন কথাও চালু আছে , কারও উপর চটলে , তার পিছনে নাসানবোঙ্গা লেলিয়ে দেয় ভরমি । এমন লোককে চটাবে কে ? ধানি বোঝালো রাতাকে ,”তাই কর বিটি , ভরমিকেই আরান্দি কর । সিংবোঙ্গার দয়াতে অ্যানেক জমিজমা কইর্যাছে । গাই-ছাগ্ আছে ঢের । রোজ ভাত খাবি । ঘাটো খাঁইয়ে বাঁইচতে হব্যাক নাই ।“
এতো প্রলোভনেও ভোলেনি রাতা । ছুটে এসেছিল সুগানার কাছে । সব শুনে হা হা হেসেছিল সুগানা । ভরমিকে ও ভয় পায় না । চাইবাসায় মিশনারিদের ইস্কুলে ছয় বছর পড়েছে সুগানা । মিশনের ফাদাররা ওদের বোঝাতেন , পৃথিবীতে বোঙ্গাও নেই , নাসান বোঙ্গাও নেই । ওসব অশিক্ষার কুয়াশা । মানুষের একমাত্র রক্ষক মঙ্গলময় যীশু ।
“আরে দূর ! মহুয়ার ঝোঁকে কি না কি বইল্যাছে । উ নিয়্যা অত্ত ভাবার কি আছে ?”
সুগানার মা অস্ফুটে বলেছিল ,”যদিক নাসানবুঙ্গা লেলাইয়েঁ দ্যায় ?”
সুগানা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিল ভয়টা ,”মা , ই ভুবনে বোঙ্গাবুঙ্গি কিছুই নাই । মুরা গিজ্জায় যেয়েঁ কিরিশ্চান হইছি । ভগবান যীশু আমাদিগের সক্কল বিপদ ভাগাইয়েঁ দিবেন ।“
কিন্তু কাল রাতা যা বলল ,তাতে সুগানাও আর নিশ্চিন্তে থাকতে পারছে না । ভরমি নাকি ধানিকে এক সের চাল ,তিতিরের মাংস , পাঁচশো টাকা আর রাতার জন্য হ্লুদ রঙে ছোপানো শাড়ি যৌতুক পাঠিয়েছে । জানিয়েছে , পরের পূর্ণীমাতেই সিংবোঙ্গার থানে ওর আর রাতার বিয়ে হবে । অলৌকিক ক্ষমতা না থাকুক , ভরমির বশে কিছু খ্যাপা মুন্ডা আছে । তাদের নিয়ে যখন তখন হাঙ্গামা পাকায় ও । তাই ভরমির মোকাবিলা করা মুশকিল । সুগানা ঠিক করেছে , কালই রাতাকে নিয়ে চাইবাসায় পালিয়ে যাবে । ফাদার ওকে অনেকবার বলেছেন ,”এখানে থেকে যা । তোর একটা কাজের ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে ।“
কিন্তু পঙ্গু বাবা , অসহায় মা , ছোট ভাই বোনদের ফেলে যেতে পারেনি সুগানা । এখন সুনারা আর জগনা জোয়ান হয়েছে । সংসারটা ওরাই সামলে দেবে । ঘরের পুরোনো খুঁটি তো এভাবেই বদলে যায় । খবরটা শুনে গুঞ্জা বাধা দেয়নি । শুধু বলেছে , ”যাবার আগে সিংবোঙ্গার থানে একটা মুরগী বলি দিয়ে যাস বিটা ।“ সুগানা সায় দিয়েছে । ফাদার যা-ই ব্লুন , মায়ের বিশ্বাসের অমর্যাদা ও করবে না ।
দুপুরে খেতে খেতে সুগানা ভাবে ,”মায়ের হাতের রান্না আর কোনোদিন জুটবে কিনা কে জানে ! হঠাৎ পিংরা ছুটতে ছুটতে এসে দুঃসংবাদটা দিল । নিষেধ সত্ত্বেও মুন্ডারা জঙ্গলে ঢুকে গৃহস্থালির জন্য কাঠকুটো , ছোটখাটো প্রাণী মেরে আনে । ফরেস্টবাবুরা দেখতে পেলেই ধরে জেলে ভরে দেয় । আজও সাতজনকে ধরেছে । তাদের মধ্যে সুনারা আর জগনাও আছে । গলায় খাবার আটকে বিষম খেলো সুগানা । জেল থেকে ছাড়া পেতে কম করে ছ’মাস । জামিনে ছাড়াতে গেলে মাথা পিছু পাঁচশো টাকা ।
গরমকালে এই অঞ্চলের সব জলাশয় শুকিয়ে যায় । জঙ্গলের খুব গভীরে একটা দহে জলের খবর পেয়ে সুগানা একবার গিয়েছিল জল আনতে । গিয়েই থমকেছিল । দহের মাঝখানে সামান্য জল । চারপাশে থকথকে কাদা । সেই কাদায় পা আটকে আর্তস্বরে ডাকছে একটা দুবলা বাঘ । বাঘটা বুঝতে পেরেছিল , কাদা থেকে পা আর তুলতে পারবেনা ও । নাগালের মধ্যে জল থাকা সত্ত্বেও তৃষ্ণায় মৃত্যুই ওর নিয়তি ।
নিজেকে ওই বাঘটার মতোই অসহায় মনে হচ্ছে সুগানার । কয়েক ঘণ্টার ওপারেই মুক্ত , আনন্দময় জীবন । রাতার সঙ্গে রঙিলা গৃহস্থালি ।
কিন্তু এই ক’ঘন্টার পথ সে আর পার হতে পারবে না । ভাইরা জেল থেকে না ফেরা পর্যন্ত , অসহায় পরিবারটার চোরাবালিতে আবদ্ধ হয়ে থাকবে তার জীবন ।