সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শ্রীরাজ মিত্র (পর্ব – ৮)

ছায়াপথ, গুঁড়ো ছাই

ইতিহাস কালক্রমে ভুলে যায় ইতিহাসকে কিংবা অন্য ভাষায় বললে, ইতিহাস হারিয়ে যায় ইতিহাসের বুকে। এই যেমন হাস্যরসিক গোপাল ভাঁড়ের নাম শুনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সনি আর্ট সম্প্রচারিত কার্টুন অথবা বয়োবৃদ্ধদের মুখে শোনা গল্পগুজবের মাধ্যমে বা কমিকস এর সুবাদে গোপাল ভাঁড়কে কে না চেনে? আবার কেউবা তাঁর অস্তিত্বের সঠিক ইতিহাস ঘেটে তাঁর নামযশ ও “ভাঁড়ামি”( wit, বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা) সম্পর্কে কম বেশি অবগত। প্রচলিত যে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের অধিভুক্ত ঐতিহাসিক কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ ছিলেন। অত্যন্ত রসিক মানুষ ছিলেন বলে তৎকালীন সময়ে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন গোপাল। যাঁরা বিশদে অনুসন্ধান করেন তাঁরা তাঁর কবিসত্বা সম্পর্কে সম্যক অবহিত। মিলনসাগর নামক তার কবিতার বই ছিল বলে শোনা যায়। ভাঁড়ামি আর বুদ্ধির খেল দেখিয়ে তিনি রাজপ্রাসাদের সবার মন জয় করেছিলেন।মোটকথা, কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা ও কৃষ্ণনগরের জনগনের যাবতীয় বিনোদনের আস্ত এক ভান্ডার ছিলেন বুদ্ধিমান গোপাল। কিন্তু এত প্রিয় মানুষ হয়েও এই বাংলাতে তাঁর ঠাঁই হয়নি।
১৭৫৭ সাল । তরুণ নবাব সিরাজ তখন বাংলা প্রেসিডেন্সি (বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ), বিহার ও উড়িষ্যার নবাবি করতেন। মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদরা নবাবকে সিংহাসনচ্যূত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন সিরাজের সিংহাসন লাভ ইস্তক। তারা প্রত্যেকেই তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে শর্তসাপেক্ষে ইংরেজ বণিকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। ঠিক এই সময় কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নবাব বিরোধী এই ভয়ঙ্কর বলয়ে যুক্ত হয়ে পড়েন। কৃষ্ণচন্দ্রের সকল সভাসদ তার যোগদানকে সমর্থন করলেও শুধু একজন ব্যক্তি সমর্থন করলেন না। আর সেই ব্যক্তিটি হল গোপাল ভাঁড়।
গোপাল কৃষ্ণচন্দ্রকে নিজ দেশের নবাবের বিরুদ্ধে গিয়ে ইংরেজদের সাহায্য করতে মানা করলেন। তিনি জানালেন,”ইংরেজরা গায়ে সুঁচ হয়ে ঢুকে কুড়াল হয়ে বের হবে। তাদের স্বার্থ-বিরোধী কাজ করলে আপনার সকল উপকারের কথা ভুলে আপনাকে শূলে চড়াতে পিছপা হবেনা।” সর্বোপরি, গোপাল বাংলা মায়ের এমন সর্বনাশ না করতে কৃষ্ণচন্দ্রকে বার বার অনুরোধ করেন। কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্র তার কথায় কর্ণপাত করলেন না বরং তার সভাসদদের নিয়ে গোপালকে বিদ্রুপ করতে লাগলেন। কৃষ্ণচন্দ্র গোপালকে শর্ত দিলেন,”গোপাল, যদি তুমি নবাবকে মুখ ভেংচে দিয়ে আসতে পারো তবে আমি এমন সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকবো।” গোপাল কৃষ্ণচন্দ্রের রাজদরবার থেকে বিদায় নিয়ে ছুটলেন মুর্শিদাবাদের দিকে। কিন্তু নবাবের হীরাঝিল প্রাসাদ এর (বর্তমানে গঙ্গা গর্ভে বিলীন) রক্ষীরা কিছুতেই ভিতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন না। উপায় খুঁজে না পেয়ে গোপাল এক রক্ষীর হাতে কামড় বসিয়ে দিলেন। ফলশ্রুতিতে, প্রাসাদ-রক্ষী গোপালকে ধরে নিয়ে নবাবের কাছে গেলেন। সব শুনে নবাব বললেন,”কে তুমি? কোথায় থেকে এসেছো? আমাকে কি প্রয়োজন?” গোপাল কোনো কথার উত্তর না দিয়ে নবাবকে মুখ ভেংচি দিলেন। নবাব ভাবলেন, কি ব্যাপার?গোপাল আবারও ভেংচি দিলেন।ফলশ্রুতিতে নবাব সিরাজদৌলা গোপালকে বিচারের জন্য আটক করলেন ।
পূর্বতন নবাব আলিবর্দির উজির মীরজাফর ছিলেন গোপালের পূর্বপরিচিত। তিনি মীরজাফরকে ডেকে বললেন, “আমি এসেছিলাম তোমাদের সকল ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দিতে। কিন্তু আমি কিছু বলবোনা। কারণ এই ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দিলে কৃষ্ণচন্দ্রও ফেঁসে যাবে। নবাব তাকে সরিয়ে অন্যজনকে ক্ষমতায় বসাবেন। আমি চাইনা কৃষ্ণচন্দ্র তার ক্ষমতা হারাক। কারণ তিনি যে আমার অন্নদাতা, পরমান্নদাতা”।
মীরজাফর তার এমন কথা শুনে রীতিমত ঘাবড়ে গেল। সে নবাবকে জানালো যে গোপাল তাকে শয়তান বলে গালি দিয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তার ফাঁসির ব্যবস্থা করা হোক।পরদিন সকালে গোপালের ফাঁসির ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু গোপালের মধ্যে কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। নবাব গোপালের মুখের দিকে তাকাতেই গোপাল আবার ভেংচি কাটল। এবার নবাব রীতিমত ভাবনায় পরে গেল। নবাব ভাবলেন,’এ তো দেখছি বড্ড পাগল। পাগলকে ফাঁসি দেওয়া ঠিক হবেনা।’ নবাব কবিরাজকে ডেকে বললেন,”দেখুন তো, এ পাগল কিনা?”। কবিরাজ রায় দিল, এ এক উন্মাদ। নবাব গোপালকে মুক্ত করে দিলেন।
দেশপ্রেমিক গোপাল তাঁর কথা মতো নবাবকে ভেংচে ফিরে এলেন কৃষ্ণনগরে। কিন্তু বিধি বাম! গোপাল যখন জানতে পারলেন কৃষ্ণচন্দ্র তার সিদ্ধান্তে অটল, গোপাল ঠিক করলেন কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় আর যাবেন না। গোপাল এও ঠিক করলেন যে তিনি এই কৃষ্ণনগরে আর থাকবেন না। অত্যন্ত ব্যথিত মন নিয়ে কাউকে কিছু না বলে রাতের অন্ধকারে সপরিবারে রাজ্য ত্যাগ করলেন গোপাল ভাঁড়।এরপর থেকে সদাহাস্যময় গোপাল ভাঁড়কে বাংলায় আর দেখা মেলেনি।পরবর্তীতে দেশদ্রোহী ও অত্যাচারী রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং বেইমান মীর জাফররা ইংরেজদের পা চাটা গোলামে পরিণত হয়েছিল। দেশের স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হয়েছিল ক্রমশ।
জানলে অবাক হতে হয়, জনশ্রুতিতে গোপাল ভাঁড় বেঁচে থাকলেও বাস্তবে কৃষ্ণনগরের মাটিতে গোপালের কোনো প্রামাণ্য স্মৃতি আজ আর নেই। একটি সংবাদপত্র সংস্থা নানান ঐতিহাসিক নথি ঘেঁটে এই দেশপ্রেমিক গোপালের কথা পুনরালোচনায় নিয়ে আসে।
প্রকাশ ব্যানার্জী একথা ওকথায় একদম অন্যসুরে বাঁধলেন আজকের আড্ডা। প্রকাশ ব্যানার্জী মাস্টারকে জিজ্ঞেস করার ভঙ্গিতে বললেন, আচ্ছা বলতো মাস্টার, সংস্কৃত সাহিত্যে কোন দুটি গ্রন্থকে এপিক বা মহাকাব্য বলা হয়? মাস্টার উত্তরে বলল- কেন? রামায়ণ আর মহাভারত।
‘রামায়ণ’ শব্দটা এসেছে কোথা থেকে বলতে পারবে? আবার প্রশ্ন। মাস্টার কিছু বলার আগেই আমি বলে উঠি- এ আর কি? রামায়ণ অর্থাৎ রাম + অয়ন (আশ্রয়) অর্থাৎ রাম+ষ্ণায়ন+ক্লীবলিঙ্গের একবচনে ‘রামায়ণম’ হয়েছে। অর্থ হল রামকে অধিকার করে কৃত গ্রন্থ। পুরোনো মুখস্থবিদ্যা ঝেড়ে দিয়েছি সুযোগে। প্রকাশ ব্যানার্জী না থেমেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- আচ্ছা, আদিকবি কাকে বলা হয় বলতো? ‘এটা আর কি, সবাই জানে, মহামুণি বাল্মীকি’। উত্তর দিল পরিমল।
রামায়ণে কয়টি কাণ্ড বলতো? আবার প্রকাশ ব্যানার্জী র দুশরা। এবার উত্তর দিলাম আমি। এই তো, বালকাণ্ড, অযোধ্যাকাণ্ড, অরণ্যকাণ্ড, কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড, সুন্দরকাণ্ড, লঙ্কাকাণ্ড বা যুদ্ধকাণ্ড এবং উত্তরকাণ্ড- এই সাতকাণ্ড নিয়েই তো রামায়ণ!
বাহ্! তা বেশ। তা রামায়ণে কতগুলো শ্লোক আছে বলতে পারো? মাস্টার যেন প্রস্তুত হয়েই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল- মোট ২৪০০০ শ্লোক আছে মূল রামায়ণের।
আমি পোঁ ধরলাম মাস্টার এর কথা ফুরোতে না ফুরোতেই। আমি আবৃত্তি করলাম- ” মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ। / যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবকধীঃ কামমোহিতম।।” এই রামায়ণ এর প্রথম শ্লোক। আদিকবি বাল্মীকির রচিত এই শ্লোকটিকে আদি কবিতার মর্যাদা জ্ঞান করা হয়।
প্রকাশ ব্যানার্জী আমাকে লক্ষ্য করে এবার রসিকতার ঢং এ বললেন- আচ্ছা, বলতো রামায়ণের কটি সংস্করণ পাওয়া যায়? আমি আবার মুখস্থবিদ্যার আশ্রয় নিয়ে বললাম- ম্যাকডোনাল্ড এর মতে রামায়ণের তিনটি সংস্করণ পাওয়া যায়। যেমন- পশ্চিম ভারতীয় বা কাশ্মীরী সংস্করণ, বঙ্গদেশীয় সংস্করণ এবং অপরটি দক্ষিণ ভারতীয় সংস্করণ।
বাহ্ তোমরা তো অনেক কিছুই জানো। আচ্ছা রামায়ণ অবলম্বনে ভাসের রচিত নাটকের নাম জানো? পরিমল ইতিহাসে মাস্টার ডিগ্রি ছেলে। চকিতে উত্তর দেয়- ঐ তো… দুটো! ‘প্রতিমা’ আর ‘অভিষেক’।
আচ্ছা, রামায়ণ অবলম্বনে রচিত ভবভূতির নাটকগুলো কি বলতো? প্রকাশ ব্যানার্জীর প্রশ্নের আবার উত্তর দেয় পরিমল। ভবভূতিও দুটো নাটক রচনা করেছিলেন। এক- ‘মহাবীরচরিত’, আর দুই- ‘উত্তররামচরিত’।এছাড়াও রামায়ণের কাহিনী অবলম্বনে সংস্কৃত ভাষায় আরও কয়েকটি মহাকাব্য আছে। এই যেমন, ‘রঘুবংশ’- কালিদাসের লেখা , ‘ভট্টিকাব্য’- ভর্ত্তৃহরির, ‘জানকীহরণ’-কুমারদাসের, ‘রামচরিত’-সন্ধ্যাকর নন্দীর,
এছাড়াও অভিনন্দের লেখা আরেক ‘রামচরিত ‘ আছে। আবার ‘সেতুবন্ধ’-প্রবর সেনের,
‘রামাভ্যুদয়’-নরসিংহের,
‘জানকীজীবন’-ডঃ রাজেন্দ্র মিশ্রের লেখা। শুধু সংস্কৃত কেন
পালি জাতকের কাতক কত্থবন্ননা, এবং সুত্তপিটকের খুদ্দকণিকায় রামায়ণের কাহিনী ফুটে উঠেছে।
এছাড়াও প্রাকৃত ভাষায় বিমলসুরির ‘পউচরিঅ’, গুকণভদ্রের ‘উত্তর পুরাণ’, হেমচন্দ্রের ‘ত্রিষষ্টিসলাকাপুরুষ’ ও ‘সীতারাবণ কথানক’, জিনদাসের ‘রামদেবপুরাণ’, ভীমদাসের ‘রামচরিত’, বিজয় গণির ‘রামচরিত’, সোমপ্রভের ‘লগুত্রিষষ্টিসলাকাপুরুষ’ প্রভৃতি গ্রন্থে রামায়ণের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। আবার থাইল্যাণ্ডের রামায়ণ কাহিনী ‘রাম কিয়েন’ ও মালয়েশিয়ার রামায়ণ কাহিনী ‘হিকাকত শেরিরাম’।
বাল্মীকি রচিত রামায়ণের কয়েকজন প্রসিদ্ধ টীকাকারের মধ্যে রামানুজের- ‘রামানুজীয় টীকা’, বিদ্যানাথ দীক্ষিতের – ‘রামায়ণ দীপিকা’, বেঙ্কট কৃষ্ণাধবরীর- ‘সর্বার্থসার’, ঈশ্বর দীক্ষিতের- ‘বৃহদ্বিবরণ’ ও ‘লঘুবিবরণ’, গোবিন্দরাজের- ‘রামায়ণভূষণ’, মাধবযোগীর- ‘রামায়ণ কথক’ উল্লেখযোগ্য।
বাল্মীকির রামায়ণ অবলম্বনে রচিত আরও চারটি রামায়ণ- অধ্যাত্ম রামায়ণ, অদ্ভুত রামায়ণ,যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ ও আনন্দ রামায়ণ উল্লেখ্য।
এতক্ষণ চুপ করে আমরা সবাই শুনছিলাম পরিমলের কথা। এবার প্রকাশ ব্যানার্জী বললেন আচ্ছা, রামায়ণে কোন বংশীয় রাজাদের কাহিনী বর্ণিত আছে বলতো? মাস্টার উত্তর দেয়- ঐ তো, ইক্ষ্বাকু বংশের।
মাস্টার আরও বলতে থাকে- কথিত আছে দেবর্ষি নারদ অনুষ্টুপ ছন্দে বাল্মীকিকে নাকি রামায়ণ রচনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ব্রহ্মাণ্ডপুরাণে রামায়ণ সম্পর্কে যে আলোচনা রয়েছে তা অধ্যাত্ম রামায়ণ নামে পরিচিত।
প্রকাশ ব্যানার্জী রামায়ণ অবলম্বনে রচিত চম্পূকাব্যের প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে যাচ্ছিলেন, মাস্টার থামিয়ে দিয়ে বলল- হুমম্,ভোজরাজের চম্পূরামায়ণ, চক্রকবির লেখা জানকীপরিণয় রামায়ণের আদলে রচিত চম্পূ কাব্যগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
শুধু তাই কি? বাংলা ভাষাতেও কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’, অদ্ভুত আচার্যের ‘অদ্ভুত রামায়ণ’, রামশঙ্করের ‘রামায়ণ’, চন্দ্রাবতীর ‘রামায়ণ’, গিরিশ্চন্দ্রের ‘সীতাহরণ’, ‘রাবণবধ’, ‘লক্ষ্মণবর্জন’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘পাষাণী ও সীতা’, মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাথবধ’ কাব্য, রবীন্দ্রনাথের ‘কালমৃগয়া’, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘সীতার বনবাস’ প্রভৃতি উল্লেখ্য সৃষ্টি রামায়ণ আস্বাদনে অন্যতম ভূমিকা পালন করে।
এবার মাস্টার আমাকে বলল- আচ্ছা বলতো নারদ শব্দের অর্থ কী? তারপর নিজেই উত্তর দেয়।নারদ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল যিনি অজ্ঞান (নার) দূর করে জ্ঞান দান করেন। আমি সত্যিই জানতাম না। কত কি যে জানিনা এই সংসারের! আবার মাস্টার প্রশ্ন করার ঢং-এ আমাকে জিজ্ঞেস করল- আচ্ছা বলতো শ্রীরাজ, মহর্ষি বাল্মীকি কে?
আমি বললাম- কবি প্রথম জীবনে দস্যু রত্নাকর ছিলেন। ব্রহ্মার কঠিন তপস্যা করার সময় তার সমস্ত শরীর বল্মীক বা উইঢিবিতে ঢেকে যায় তাই তিনি বাল্মীকি নামে পরিচিত হন। মাস্টার আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে উঠল, আসলে বাল্মীকি হল প্রচেতার দশম পুত্র।ব্রহ্মাণ্ড পুরাণের মতে তিনি ঋষি চ্যবনের পুত্র। তিনি জগতের আদিকবি এবং রামায়ণের রচয়িতা।
জানিস,তিলক টীকায় বলা হয়েছে যোগীরা যাতে আনন্দ পায় তিনিই রাম। ভূষণ টীকায় বলা হয়েছে গুণরাজির দ্বারা যিনি সকলকে আনন্দ দেন তিনিই রাম। আবার শিরোমণি টীকায় বলা হয়েছে অপরিমিত দান অথবা কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞানযোগীরা যেখানে প্রীতি লাভ করেন তিনিই রাম। পৌরাণিক কাহিনী রোহিণীর (নক্ষত্রের) সঙ্গে স্বামী চন্দ্রের কাহিনীই রামায়ণে রাম সীতার আখ্যানের মূল উপজীব্য।
প্রকাশ ব্যানার্জী আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন- আচ্ছা, তোমরা কি জানো, রামচন্দ্র দণ্ডকারণ্যে কোন কোন ঋষির সঙ্গে দেখা করে কী কী মূল্যবান অস্ত্র লাভ করেন?
মাস্টার উত্তর দেয় – কেন; ঐ তো শরভঙ্গ, সুতীক্ষন, অগস্ত্য ভ্রাতা ইধ্মবাহ এবং পূজ্য অগস্ত্যের সঙ্গে দেখা করে অগস্ত্যের আদেশে ঐন্দ্রধনু, খড়্গ, অক্ষয়বাণ ও দুটি তূণীর গ্রহণ করেন এবং এই দণ্ডকারণ্যেই শূর্পনখার নাক কেটে বিকৃত করে দেন ,এবং বিভিন্ন রাক্ষস যেমন খর, ত্রিশরা, দূষণ সহ মোট ১৪০০০ রাক্ষস বধ করেন। আমরা সকলেই কম বেশি উপভোগ করছিলাম আড্ডা। এতক্ষণ প্রায় চুপ করে বসেছিল পরিমল। এবার তার মৌনতা ভেঙে পরিমল বলল, আচ্ছা বলতো হনুমান কার কথায় লঙ্কায় পাড়ি দিয়েছিল? মাস্টার কিছু বলার আগেই আমি বলে উঠি- শকুনি সম্পাতির পরামর্শে হনুমান লঙ্কায় পাড়ি দিয়েছিলেন। এটা পড়েছিলাম, মনে আছে।
ঐ যে আগেই বলেছিলাম না, আমাদের সাযুজ্য ঐ একটাই। আমরা সকলেই ভীষণ কথা বলতে ভালোবাসি। সাধারণত যে প্রসঙ্গই উত্থাপিত হোক না কেন, আমাদের সকলের সর্বান্তকরণ উপস্থিতিতে প্রতিটা আড্ডাই হয়ে ওঠে তথ্য সমৃদ্ধ বৈঠক। এবার আমি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই- আচ্ছা প্রকাশ বাবু বলুন তো,রামচন্দ্র ঠিক কত বছর রাজত্ব করেন?
প্রকাশ ব্যানার্জী একটা সুন্দর কথা বললেন। দেখো, যদি রামায়ণের রচনাকাল নিয়ে ভাবো তাহলে এটা তো নিশ্চয়ই তোমরা জানো পরমপুরুষ রামচন্দ্র জন্মানোর প্রায় চারশো বছর আগে রামায়ণ রচিত হয় বলে কথিত আছে। ঋষি নারদের মতে ভগবান রামচন্দ্র ১০ হাজার ১০ শত বছর অর্থাৎ ১১০০০ হাজার বছর রাজত্ব করে ব্রহ্মলোকে যাত্রা করবেন।
এরপর হাসতে হাসতে বললেন- জানো মহর্ষি বাল্মীকি একদিন স্নানে এসে তমসা নদীর তীরে নির্ভীকভাবে ঘুরে বেড়ানো নয়নাভিরাম দুটি ক্রৌঞ্চ পাখির যুগ্মরূপ দর্শন করে রামায়ণ রচনা শুরু করেন। স্ত্রীর সঙ্গে সম্ভোগরত অবস্থায় ক্রৌঞ্চকে হত্যা করা এবং ক্রৌঞ্চীর করুণ বিলাপ শুনে শোকে কাতর মহর্ষি ব্যাধকে অভিশাপ দেন সে কখনো প্রতিষ্টা লাভ করতে পারবে না ( মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ)। কথিত আছে ব্রহ্মা বর দেন যতদিন ধরাতলে পর্বতরাজি ও নদীসমূহ থাকবে ততদিন রামায়ণ কথা প্রচলিত থাকবে।

ক্রমশ

(কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের জাত্যাভিমানে আঘাত বা আরোপ- এ লেখনীর বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য নয়। যে কোনো প্রকার সাযুজ্য আকস্মিক কিংবা দৃশ্যপট নির্মাণে সংবন্ধিত।)
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!