রম্যরচনায় সুনৃতা মাইতি

ফস্সা আর লাবলী

নেপুদার চায়ের দোকান আজ বহুকাল পরে আনলকড হয়েছে । এই কদিন” খাবনা চা আমরা! আমরা খাবোনা চা! ” করে গুমরে মরাটাই ভবিতব্য ছিল। চা খাওয়া তো উপলক্ষ্য মাত্র। উদ্দেশ্য তো আড্ডা । আর নেপুদা তো নামেই চায়ের দোকানী, এনসাইক্লোপিডিয়ার চেয়ে কোনও অংশে কম যাননা । সন্দেহ নেই যে করোনার শুরুয়াদী আতান্তরে সবাই কমবেশি ভেবলে গিয়েছিল । ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থালা-বাটি বাজানো হচ্ছিল, পটকা ফাটছিল, মায় রংমশালও জ্বলছিল, রাস্তায় রাস্তায় গোল গোল আঁক কাটা হচ্ছিল, কে বা কারা সবকিছুর পিছনে “রাইনীতির” গন্ধ খুঁজে পাচ্ছিলেন এবং কেউ কেউ বাহাত্তুরে পোতিবাদটাই জারী রেখেছিলেন। ইদানিং সব খুল যা সিমসিম , করোনাও বাড়ছে, তার সাথে বাড়ছে মানুষের মনোবলও। জ্ঞানী পকাই জেঠু ট্রাকসুট পড়ে যথাপূর্বং হাজির। গলার কাছে একটি ফ্যাশনেবল মাস্ক দোলনার মত ঝুলছে; ওদিকে গদাই কাকু মাস্কের ধার ধারছেন না ইদানিং একেবারে । তার মতে করোনা আক্রান্ত লগবগে লোকেরা সব মোটের ওপর কোয়ারান্টিনে চলে গেছে। এখন যারা এদিক ওদিক ঘুরছে তারা হার্ড ইমিউনিটির মাল ।সহজে কাবু হবার নয়! গদাইকাকুদের মত মানুষদের বোঝানোটা খুবই মুশকিল । জামাইদা এ পাড়ার সর্বজনীন জামাই । তার জামাইত্বের সর্বগ্রাসী পরিচয় তার আসল নামটি কে গুল করে দিয়েছে । জামাইদা মাস্কের আড়াল থেকে পরিষ্কার একটি হতাশাগ্রস্ত লুক দিচ্ছিলেন । বোঝাই যাচ্ছে লকডাউনে শ্বশুরবাড়ীর ঘর মুছতে মুছতে আর বাসন মাজতে মাজতে তার নাজেহাল অবস্থা । নেপুদা একটি স্যানিটাইজার এর বোতল নিয়ে নিবিষ্টমনে দোকানের চারিদিকে স্প্রে করছিলেন । চোখে চোখ পরতেই মাস্কের আড়াল থেকে বল্লেন …
বুঝলি সন্তু এই বেশ ভালো হলো! মাস্কই বেশ! মুখ দেখেও কাজ নেই, রংরূপ বুঝেও কাজ নেই ।
তা কিরকম! তা কিরকম!
সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স বজায় রেখেই আমি তড়বড় করে উঠলাম ।
নেপুদা স্যানিটাইজার রেখে চায়ের বাসন রেডি করছিলেন। জল চড়াতে চড়াতে বল্লেন…
ধরে নে বাঙালি ঘরের ছাপোষা এক তরুণী। জীবনে কত স্বপ্ন তার! কিন্তু সে স্বপ্নের পথে ভিলেন হয়ে গেল তার রংরূপ ।
গদাই কাকু আকাশের অবস্থা দেখছিলেন আনমনে। নেপুদার কথা শুনে ভুরু কু্ঁচকে বল্লেন…
কেন! ফস্সা আর লাবলীগুলো আছে কি করতে !
নেপুদা চায়ে চিনি না কি একটা যেন ঢালছিলেন। বলে উঠলেন…
জানি গো জানি… স্কিন হোয়াইটনিং ক্রিম তো! আফ্রিকাতে যার বিপণন ৮০ শতাংশ , এশিয়াতে সার্বিক ৪০ শতাংশ আর এই পোড়া দেশে স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট এর অর্ধেকই তো রং সাদা করার বস্তু । তার চেয়ে এই বেশ! মুখ সাদা করার দরকার নেই। ঢেকেঢুকে রাকো।
গদাই জেঠু পা দুলিয়ে দুলিয়ে শুনছিলেন। বলে উঠলেন..
তা ভালোই । রংরূপ দেখাতে হলে ডিজিটালি দেখানোই ভালো। ফেস আ্যাপগুলো আছে কি করতে! মুড়ি -মুড়কি সবই তো এক করে দেয়। সাদাটে সাদাটে! তা ভাই নেপু এই ফস্সা আর লাবলীর কিছু ইতিহাস আছে নাকি হে!
নেপুদা আদা ছেঁচতে ছেঁচতে মাথা নাড়লেন…
নেই আবার! ক্লিওপেট্রা থেকে শুরু করে এলিজাবেথ … কেইবা আরো ফর্সা হবার উপায় আজমাননি বলেন দেখি কাকা! ইউরোপ থেকেই যে বস্তুটির আমদানি হয়েছে এহ বাহ্য । মানে গোদা বাংলায় গ্রীস আর রোম থেকে ।তারপর চীন, গ্রেট ব্রিটেন ঘুরে জাপান হয়ে খোদ আমেরিকা ও আফ্রিকায়। ব্যাপারটা যেন প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরও আরও দাও সাদা রং । তবে সেকালের সাদাকারী জিনিসটি কিন্তু খুব একটা সিধেসাধা ছিল না। সেই প্রসাধনীতে মার্কারির যথেচ্ছ প্রয়োগ হত বলে নানারকম অসুস্থতার কথাও সামনে আসতে লাগলো। আবার তাতে ব্যবহার করা হতো সীসা! সীসা ভর্তি সাদা শিশি! সে এক ক্যাডাভেরাস কান্ড একেবারে! এশিয়ান দেশগুলোতে ফর্সা হবার ক্রিম এর ব্যাপক চাহিদা বুঝলেন!
জামাইদা মাস্কের আড়াল থেকে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন…
বুঝিনি আবার! সবই হচ্ছে কলোনাইজেশনের চক্রান্ত ! জামাইদা সব কিছুর পেছনে কিছু না কিছু চক্রান্ত খুজে পান।
কথাটাকে মাটিতে পড়তে না দিয়েই ক্যাচ করে নিলেন নেপুদা
একেবারে খাঁটি কথা! কলোনাইজেশনই গায়ের রং নিয়ে প্রথম কড়া নাড়ায় । ফিলিপিন্সের কথাই ধরো। সেখানে ফর্সা গায়ের রঙ হলো গিয়ে আভিজাত্যের চিহ্ন । আর আমাদের এই পোড়া দেশে! ….কি আর বলি বলো… ।
এমন কিন্তু ছিলনা রে! প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে হরিদ্র , লোধ্ররেণু, মাধ্বী কিংবা দুগ্ধ এসব দিয়ে ত্বক উজ্জ্বল করার কথা বলা হয়েছিল বটে; কিন্তু প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে তো শ্যামবর্ণাদেরই জয়জয়কার। শুনিসনি তোরা ওই কালিদাসের “তন্বী শ্যামা শিখরদশনা পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী….”
বলেই জিভ কাটলেন পকাইজেঠু। করোনা ভুলে টুলে কিঞ্চিত টাকেও হাত বুলিয়ে নিলেন ইত্যবসরে । পরের লাইনগুলো বেমালুম ভুলে গিয়ে বললেন..
আহা! দ্রৌপদী কি ফর্সা ছিলেন নাকি! নৈব নৈব চ! গীতগোবিন্দের রাধাও তো শ্যাম বর্ণা । ভানুভট্টের নেপালি রামায়ণ তো আরও মজার! সেখানে সূর্পনখা ফর্সা আর সীতা কালো! আর ওই ইয়ে…বাৎসায়ন সূত্রের নায়িকারা তো সবাই ব্ল্যাক বিউটি ! শ্যামবর্ণম সৌন্দর্যনুভূতিম প্রতিমানহ অস্তি….
বলেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন পকাই জেঠু ।
নেপুদা চা ছাঁকছিলেন। মাথা নেড়ে বল্লেন …
ঠিকই কাকা! তবে ১৯৩০ সালের শুরুর দিকে ট্যানড স্কিন বেশ জনপ্রিয় হয়। ১৯৬০ সালের ব্ল্যাক ইস বিউটিফুল মুভমেন্ট এইসব ফেয়ারনেস প্রোডাক্টগুলির জনপ্রিয়তা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। ততদিনে অবশ্য এইসব প্রসাধনীতে মার্কারি ছাড়াও মেশানো হচ্ছিল অধিক পরিমাণে হাইড্রোকুইনন এবং স্টেরয়েড যেগুলো স্কিনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক ছিল ।
পকাই জেঠুর মাস্ক ততক্ষনে দেখি ধুলোয় গড়াগড়ি যাচ্ছে । নেপুদার তথ্য শুনে তিনি বিচলিত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন…
তবে হালের ফস্সা এন্ড লাবলী জাতীয় বস্তুগুলো?
চা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ট্রেতে কাপ সাজাতে সাজাতে নেপুদা বলে উঠলেন …
এরা দাবি করে ভিটামিন বি থ্রি এর নিয়াসিনামাইড বা নিকোটিনামাইড হল ওদের আসল উপাদান । যা ত্বকের মেলানিন নামের রঞ্জক পদার্থটিকে নিয়ন্ত্রনে রাখে । তবে হ্যাঁ, তুমি যতই ধানাই-পানাই করো না কেন যে রং নিয়ে জন্মেছ;
তার চেয়ে বেশি ফর্সা হতে পারাটা ভারি মুশকিল । তবে তা মুশকিল হলেও নামুমকিন কিন্তু নয়। রং উজ্জ্বল করার বহুমূল্য পদ্ধতি কিন্তু আবিষ্কৃত হয়ে গেছে । আমাদের রুপোলি পর্দার নায়িকারা তো…. ।
ইতিমধ্যে জামাইদা খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলেন ….
বুঝলি.. এই ফস্সার লাবলী জাতীয় অ্যাডগুলো নিয়ে ফেমিনিস্টরা তো কম হুজ্জোতি করেনি এক সময়! বিজ্ঞাপনটা মনে আছে! বাবা আক্ষেপ করছিলেন ছেলে নেই বলে। শ্যামলা মেয়ে নড়েচড়ে উঠে বললে যে সেই ছেলে হয়ে উঠবে। অমনি সে ক্রিম মাখলে,ফর্সা হলে আর ইয়াবড় চাগরি পেয়ে গেলে! তোদের ওই শারুখটাও তো ঢপ মাত্তে কম যায় না! পাতি ছেলে থেকে ক্রিম মেখে মেখে সে নাকি ওয়ান ফাইন মন্নিং ফস্সা আর হ্যান্ডসাম হয়ে গেল! আর ওই আব্রাহাম । সুয্যি কিরণের ডেঞ্জারাস এফেক্ট নিয়ে ভয়ানক চিন্তায় পড়েছিল সে ছেলে; পাছে তার বাইসেপস কেলটে যায় আর কি ! আর ক্লিন ক্লিন পোসকের ক্লিয়ার…সেতো আরও এক কাটী..মুক টুক ছেড়ে সে আর কোন কোন জায়গা ফস্সা কত্তে নেগে পল্লো…
আমি এসব আড্ডায় খুব একটা বেশি কথা কোনদিনই বলে উঠতে পারি না। শুনেটুনে নিজের মনেই ভাবছিলাম..
ফস্সা হতেই হবে নাকি!
আমার তো স্মিতা পাতিল আর নন্দিতা দাস কে বেশ লাগে। হালের রাধিকা আপ্তেকেও। রাধিকা তো হাসলেই আমার কেমন দিল গার্ডেন গার্ডেন হয়ে যায়! ওরা ফস্সা হলে ভারী বিশ্রী লাগত।
তবুও মিনমিন স্বরে বলে উঠলাম
হালের ডার্ক ইস বিউটিফুল ক্যাম্পেইনটার কথা শোনোনি !
আমার মিনমিনে স্বরটা সম্ভবত হাওয়ার তোড়ে উড়েই গেল।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।