Cafe কলামে সংগ্রামী লাহিড়ী – ৭

সংগ্রামী লাহিড়ী নিউ জার্সির বাসিন্দা, বৃহত্তর নিউইয়র্ক বলা যায় | পরিচয় - শিক্ষায় প্রযুক্তিবিদ, পেশায় কন্সাল্ট্যান্ট, নেশায় লেখিকা | শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে বহুকালের সিরিয়াস চর্চা আছে, অল ইন্ডিয়া রেডিওর A গ্রেড শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী | উত্তর আমেরিকায় করোনা ভাইরাসের এপিসেন্টারে বসে বদলে যাওয়া প্রবাস-জীবনের ডায়রী লিখছেন |

করোনা-ধারায় এসো – 7

হুইলচেয়ার

সময়টা দুহাজার বারো সাল | তখন নিউইয়র্ক শহরে আমার নিত্য যাতায়াত | ডেলিপ্যাসেঞ্জারী করে অফিস করি | অন্য আরও পাঁচটা লোকের মতো আমিও ভোরের বাসে চেপে ঘুমোতে ঘুমোতে পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাসে গিয়ে নামি | আর সেখান থেকে বেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এইটথ এভিনিউ ধরে দৌড়োই আমার অফিসের দিকে | সেই পথেই তার সঙ্গে দেখা | নিউইয়র্ক শহরের অগুন্তি হোমলেসের মধ্যে একজন |
ফর্টি ফাইভ আর ফর্টি সিক্সথ স্ট্রিটের মাঝে যেখানে আমোরিনোর বিখ্যাত জেলাতো শপ, তার পাশে ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে বসে থাকে | চেহারার কাঠামোটি ভারী সুন্দর | চওড়া কাঁধ, ছফুটের ওপর লম্বা এক মূর্তি | চট করে দেখলে হোমলেস ভাবতে কষ্ট হয় | একটু নজর করলে বোঝা যায় ওর একটা পা অবিন্যস্ত | ক্রাচ নিয়ে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় | সারাক্ষণের সঙ্গী এক হুইলচেয়ার | তার ওপর থাকে ওর গোটা সংসার | লেপ-কম্বল, জামা, জুতো, জলের বোতল |
অফিসফেরত আমোরিনো থেকে একটা জেলাতো নিয়ে খেতে খেতে পথ হাঁটা আমার প্রিয় অভ্যাস | আমায় দেখলেই ওর চোখে ফুটতো পরিচিতের দৃষ্টি | সামনে রাখা কৌটো তে এক-দু’ডলার রেখে আসতাম | চেনা হাসিটা স্বস্তি দিতো |
তখন অক্টোবর মাসের শেষ | ওক-মেপলের পাতায় লাল-হলুদ রঙের খেলা প্রায় সাঙ্গ | প্রতি হেমন্তের নিয়মমাফিক ক্যারিবিয়ান সমুদ্রে জন্ম নিল ছোট্ট একটি নিম্নচাপ | তফাৎ শুধু এই – দুদিনের মধ্যেই ওয়েদার চ্যানেল খবর দিল সে নাকি ক্যাটেগরি ওয়ান হারিকেন হয়ে উত্তরপূর্বে ধেয়ে আসছে | নিউজার্সির উপকূলে আছড়ে পড়ার বাসনা তার | নাম পেলো সে – স্যান্ডি |
স্যান্ডি যেদিন এসে আঘাত হানবে তার আগের দিন থেকেই আকাশের মুখ ভার | অফিস থেকে ফেরার পথে আমোরিনোর পাশে তাকে দেখলাম না | মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলাম – নিশ্চয়ই কোনো শেল্টারে আছে | যাক, নিশ্চিন্দি |
এর পর শুধুই তান্ডব | অসহায় নিউজার্সি-নিউইয়র্ক-বাসী দেখলো একশো চল্লিশ কিলোমিটার বেগে ছুটে আসা “ফ্রাঙ্কেনস্টর্ম” স্যান্ডি-র ধ্বংসলীলা | সে সব সামলে কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে পৌঁছতে পৌঁছতে আরও দু’সপ্তাহ | আবার যেদিন নিউইয়র্কে অফিস যাওয়া শুরু করলাম, সবার আগে চোখ চলে গিয়েছিলো আমোরিনোর পাশের ল্যাম্পপোস্টে | কিন্তু না, সেই ছফুট কাঠামো, অবিন্যস্ত পা, হুইলচেয়ারের সংসার কোথাও নেই | আর দেখতে পাই নি তাকে | আমোরিনোর জেলাতো বিস্বাদ লেগেছিলো মুখে | আর কোনোদিন যেতে পারি নি সে দোকানে |
তারপর কাজের চাপে কবে যেন তাকে ভুলেই গেছি | অফিসে নতুন দায়িত্বে আমায় অনেক বেশি ট্রাভেল করতে হয় | বাকি সময়টা বাড়ি থেকে কাজ করি | নিউইয়র্কের সঙ্গে যোগসূত্র ক্ষীণ হয়ে আসে |
এক ডিসেম্বরের ছুটিতে কলকাতায় গেছি অনেক বছর পর | আদ্ধেকেরও বেশি জীবন কেটেছে যে শহরে, তার সঙ্গে নাড়ীর টান সাঙ্ঘাতিক | আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব | অল্প কয়েক দিনে তাদের সবার সঙ্গে দেখা করাই হয়ে ওঠে না | তবু এর মধ্যেই ফাঁক খুঁজে ছেলেবেলার স্কুলের বন্ধুর বাড়ীতে জলসা | টালিগঞ্জে তার ফ্ল্যাটবাড়িতে ঢুকতে যাবো, হঠাৎ দেখি রাস্তার ফুটপাথে এক ভিখারী | শতচ্ছিন্ন ময়লা কাপড়, পাশে রাখা একটা হুইলচেয়ার | বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো | আরে, সেই লোকটা না ? পরক্ষণেই মনে মনেই হাসলাম – দূর, তা কি করে হবে ! কি জানি কেন, তার হাতে কিছু বেশি করে টাকা গুঁজে দিলাম | সে বোধহয় অবাক হয়েছিল | একগাল হাসলো | কিছু বললো কি ? ততক্ষণে আমি লিফটে | ওপরে উঠতে উঠতে আমার ভাবনায় তখন প্রথম আর তৃতীয় বিশ্ব কেমন যেন মিলেমিশে একাকার ।
সেবার কলকাতায় থাকার সময় আরো একবার গেছিলাম বন্ধুর বাড়ি | আবারো তাকে দেখেছিলাম | একই জায়গায়, একই ভাবে বসে আছে | পাশে হুইলচেয়ার | এবার আমি তৈরী হয়েই এসেছি | একটা প্যাকেট ধরালাম ওর হাতে | মুখ বাড়িয়ে প্যাকেটের ভেতরটা দেখে পরিচয়ের হাসি হাসলো | ওই হাসিটা আমার বড্ডো চেনা | মুখটা লুকিয়ে ফেললাম | প্যাকেটে ছিল একটা জামা, কিছু টাকা |
এবছরের শুরুতে আবার গেলাম কলকাতায়, মায়ের সার্জারি হবে | সারাদিন কাটে নার্সিংহোমে, ভিজিটিং আওয়ার্স দিনে দুবার | মায়ের অপারেশন হল | বন্ধুর টালিগঞ্জের ফ্ল্যাট নার্সিংহোম থেকে খুব দূরে নয় | প্রায়ই বলে ওর বাড়িতে লাঞ্চ করে যেতে | মা একটু সুস্থ হতে একদিন রওনা হলাম টালিগঞ্জের দিকে |
কিচ্ছু বদলায় নি | সেই একই জায়গা, হুইলচেয়ার, উস্কোখুস্কো চুল, ময়লা জামা | হাতে গুঁজে দিলাম কিছু টাকা | বললাম কেন এসেছি | কেমন যেন মমতা মাখানো গলায় বললো – মা ভালো হয়ে উঠবেন, কোনো চিন্তা নেই দিদি | ওর গলায় কি ছিল জানি না, আমার মনে একটা অদ্ভুত শান্তি এলো |
কাট টু বিশবিশ সালের বিশে মে | কলকাতায় সাইক্লোন আমফানের তাণ্ডব অনেকগুলো বছর পরে আবার মনে করিয়ে দিলো হারিকেন স্যান্ডিকে | কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন | শহর জুড়ে উপড়ে যাওয়া গাছ, ছিন্নভিন্ন ডালপালা, বেঁকে যাওয়া ল্যাম্পপোস্ট | করোনায় নয়, প্রকৃতির মারে মানুষ অসহায় |
নিউজার্সিতে বসে আমাদের মাথা পাগল পাগল | বাড়ির লোকের খোঁজখবর নেই, বন্ধুরাই বা কে কেমন আছে কে জানে | ফোন কাজ করছে না, মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই | কোনোমতে হয়তো কয়েক সেকেন্ডের জন্যে কারোর সঙ্গে যোগাযোগ হয় | এই করেই আস্তে আস্তে পাচ্ছি এক এক জনের খবর | ভালো আছে মা, শাশুড়ি পরিচিত দুই বাড়ির আত্মীয়স্বজন – জেনে আশ্বস্ত হচ্ছি। বন্ধুবান্ধবরাও একে একে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে। একসময় টালিগঞ্জের বন্ধুকেও পেয়ে গেলাম |
বাকিদের মতো সেও জানালো যে এমন ঝড় সে জীবনে দেখেনি।| তার বাড়ীর সামনের পার্কে বিরাট বিরাট গাছ ধরাশায়ী | পার্কের রেলিং ঘেঁষে বস্তি ঝড়ে উড়ে গেছে |
একটু কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, তোর বাড়ীর বারান্দার নিচে যে লোকটা থাকতো, যার একটা হুইলচেয়ার ছিল, সে কেমন আছে রে ?
বন্ধু অবাক – তোর মনে আছে তাকে ? আমফান আছড়ে পড়ার আগে তাকে পাড়ার ছেলেরা আমাদের বিল্ডিঙের নিচে গ্যারাজে গাড়ীর পাশে রেখে গিয়েছিলো | জল, খাবারদাবারও দিয়েছিলো | তবে তার হুইলচেয়ারটা ঢোকানো যায় নি |
আমার দমবন্ধ হয়ে আসে – তারপর ?
বন্ধু বললো, লোকটা ওর হুইলচেয়ারটাকে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে রেখে গিয়েছিলো | কিন্তু ঝড়ের যা দাপট ছিল ! ঝড় থামতে দেখা গেল সে ল্যাম্পপোস্ট বেঁকে গিয়ে রাস্তায় শুয়ে পড়েছে | আর হুইলচেয়ারটা নেই | ঝড়ে উড়ে গিয়ে কারোর বাড়ীতে আছড়ে পড়েছে নিশ্চয়ই |
আমার বুকে হৃৎকম্প – আর লোকটা ? কেমন আছে সে ?
বন্ধু জানালো – লোকটা তো গ্যারাজে ছিল, তাই ঠিকই ছিল | কিন্তু সকাল হতেই বেরিয়ে এসে দেখেছে হুইলচেয়ারটা নেই ! সেই থেকে তার চোখে কেমন একটা শূন্য, অসহায় দৃষ্টি | মনে হচ্ছে ওর যেন একটা অঙ্গই খসে গেছে রে ! হয়তো কত কষ্ট করে জোগাড় করেছিল ওই হুইলচেয়ারটা | আমরা কিছু কিছু খাবার দিয়েছিলাম | কিন্তু সে খাবার পড়েই আছে, খেতে ওর যেন মন নেই |
চোখে কি জানি কেন জল এলো | বন্ধুকে বললাম – তোকে আমি টাকা পাঠিয়ে দেব | সব একটু সামলে ঠিকঠাক হলে ওকে একটা হুইলচেয়ার কিনে দিস ভাই | আর ওকে একটু জানিয়ে দিস যে ওর হুইলচেয়ারের একটা ব্যবস্থা হবে, ও যেন মনখারাপ না করে।
বন্ধু সীমাহীন বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলো – তুই হুইলচেয়ার কিনে দিবি ? ওকে ? কেন রে ?
আস্তে উত্তর দিলাম – এমনিই |
ফোনটা রেখে দিলাম | ওপারের বন্ধুকে কি করে বোঝাবো – আমার চোখের সামনে তখন নিউইয়র্কের ফর্টি সিক্সথ স্ট্রিট আর টালিগঞ্জের কবি নবীন রোড মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে |
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!