সাপ্তাহিক কোয়ার্ক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুশোভন কাঞ্জিলাল (পর্ব – ১০৪)

একশাে চার
আর্যৰ্মা ভাবেলেশহীন অদ্ভুত এক মুখ নিয়ে চুপ করে শুনে যাচ্ছে। আমি আবার বলতে শুরু করলাম “আমার আবার হিসাব মিলে গেল ললিয়ার মুখ থেকে গােকুল কুণ্ডুর বিশদ কর্মকাণ্ড শুনে। ওর মুখেই জানতে পারি গােকুল কুণ্ডুর আস্তাবলের কথা। ললিয়ার কাছ থেকে শুনেই আমি বুঝতে পারি সরকারি দপ্তরে বিশেষ করে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ও রাজনীতিতে গােকুল কুণ্ডুর কিছু এজেন্ট ছড়িয়ে আছে। তারা যেমন সরকারের স্বাভাবিক কাজকর্ম করে তেমনি গােকুল কুণ্ডুর স্বার্থ জড়িয়ে আছে তেমন কাজেও গােকুল কুণ্ডুকে অন্তরালে থেকে সাহায্য করে। তাের স্টুডেন্ট লাইফ সম্বন্ধে তাের কাছ থেকে যা শুনেছিলাম সে সব কথা এখনকার ঘটনার সঙ্গে মেলানাের চেষ্টা করলাম। তাের মা বাবা কেউ নেই। দিল্লিতে পেয়িং গেস্ট থাকলেও তুই আসলে কলকাতায় মাসি মেসাের কাছে মানুষ। মাসির বাড়িতেই তুই মানুষ হয়েছিস। মাসি মেসােই তাের গার্জিয়ান। তারাই তাের ভরণ পােষণ করে। কিন্তু আমার মনে আছে আমার বা তাের কোনাে আত্মীয়ই কলেজের কোনাে অনুষ্ঠানে কোনােদিন আসেনি। এমনকি আমাদের কনভােকেশনেও না। এখন সেই তথ্যগুলাের অর্থ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আমার যেমন তিনকুলে কেউ নেই তােরও তেমন কেউ নেই। তাহলে মেসাে বলতে গােকুল কুণ্ডুই বুঝতে হয়। আবার মনে করে দেখ, তাের পাশে বসে তখন অনিকেতকে ফোন করেছিলাম আর গিয়ে দেখলাম অনিকেত উধাও। অনিকেত বেশ কিছুদিন ধরে আমার সঙ্গে যােগাযােগ রাখছিল। নিশ্চয়ই ওর ওপর গােকুলের নজর ছিল। তুই যখন জানতে পারলি যে অনিকেত কিছু একটা উদ্ধার করেছে যা ধাঁধার সমাধানে সাহায্য করবে, তখন নিশ্চয়ই আমার পাশে বসেই কোনাে এক সুযােগে গােকুল কুণ্ডুকে মেসেজ করে দিয়েছিস। আর অনিকেতের উপর নজর রাখা এজেন্টেরা তারপর ওকে তুলে নিয়ে যায় আমরা পৌঁছানাের আগেই”। হঠাৎ দেখি আৰ্যমার চোখ ছল ছল করছে। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলাম। চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তে লাগল। কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু আবেগে গলা বুজে গেছে। আমি ওর একটা হাত দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম “বিশ্বাস কর আর্যমা, তাের ওপর আমার কোনাে মান অভিমান বা অভিযােগ নেই। আমি যখন বুঝলাম তােকে বললেই তা গােকুল কুণ্ডুর কাছে পৌছে যাবে তখন আমি তােকে জানিয়ে দিলাম যে আমি কোয়ার্কো পেয়ে গেছি। আমি মােটামুটি নিশ্চিত যে গােকুলের ভাড়া করা যেসব বুদ্ধিমান লােকেরা আছে তারা অনিকেতের কাছ থেকে ডেটাগুলাে পেয়ে ধাঁধার সবটাই সমাধান করে ফেলেছে। কিন্তু কোয়ার্কোর হদিস পায়নি। কোয়ার্কো না পেলে সবই পণ্ডশ্রম হবে। আমি ছাড়া অন্য কেউ সে যতই বুদ্ধিমান হােক কোয়ার্কোর হদিস দিতে পারবে না। আমার বাবা সেইরকম ব্যবস্থাই করে গেছেন। যাইহােক আমি তােকে শেষ পর্যন্ত জানিয়ে দিলাম ধাঁধার সমাধান হয়ে গেছে এবং কোয়ার্কো এখন আমার হাতে। এ খবর সঙ্গে সঙ্গে গােকুল কুণ্ডুর কাছে। তুই অবশ্যই পৌছে দিয়ে থাকবি। যার ফলে আমাদের এখন এই নৌকো যাত্রা। আমি এটাও জানি যে আমরা এখন সরকারি প্রশাসনিক ভবনে যাচ্ছি না। আমাকে নিয়ে যাচ্ছিস গােকুল কুণ্ডুর কাছে”। এই পর্যন্ত বলে আমি চুপ করলাম। | এবার আর্যৰ্মা মনে মনে নিজেকে এতক্ষণ ধরে প্রস্তুত করছিল। এবার বলল “দেখ অর্ক আমি কলেজে থাকতেই তাের হাত ধরে এই পাপের জগত থেকে নিষ্কৃতি পেতে চেয়েছিলাম। আমি যখন গােকুল কুণ্ডুর লালসার শিকার হয়ে কনসিভ করলাম তখন আত্মহত্যা করে গ্লানির হাত থেকে বাঁচতে চাইলাম। কিন্তু তুই তা হতে দিলি না। তাের ইচ্ছাতেই অ্যাবরশন করালাম। তুই আমার নতুন জন্ম দিলি। তােকে আমার দেবদূত
মনে হত। ধীরে ধীরে তােকে মন প্রাণ সঁপে দিলাম। তােকে নিয়ে বাঁচতে চাইলাম। কিন্তু আমার মনের সেই নীরব ভাষা বুঝলিনা না বুঝতে চাইলি না, আমি ঠিক জানিনা। কেন আমি কনসিভ করেছিলাম তা কোনােদিন জানতেও চাইলি না। যাইহােক আমি পড়াশােনায় ভালাে ছিলাম বলেই আমাকে কলেজে ঢুকিয়েছিল গােকুল কুণ্ডু। তারপর আমার নিজের ক্ষমতায় আই.পি.এস পাশ করি। ইতিমধ্যে গােকুল কুণ্ডু তাের কেসটা হাতে পেল। গােকুলের হাত অনেক লম্বা। তাই আমাকে দিল্লি থেকে কলকাতায় পােস্টিং করিয়ে দিল। বিশ্বাস কর অর্ক, আমি তাের ক্ষতি চাই নি। নিজেকে বাঁচিয়ে যেটুকু না করলে নয় এবং তাের যাতে শারীরিক কোন ক্ষতি না হয় সেইভাবেই কাজ করে গেছি। সঠিকভাবে বললে করতে বাধ্য হয়েছি। আমি বললাম “আর্যৰ্মা, আমি সেটা ভালাে করেই জানি। তুই আমার ক্ষতি চাস না বলেই পুণিতের মতাে বিশ্বাসযােগ্য লােককে আমার ছায়াসঙ্গী ও দেহরক্ষী করে পাঠিয়েছিলি। তুই তাের আসল পরিচয়টা দিতে চাস না বলেই নৌকোতে উঠতে চাস নি। আমি চেয়েছিলাম তাের মনে যেন কোনাে অপরাধ বােধ না থাকে। আর্য হঠাৎ বলে উঠল “অর্ক, তুই পালিয়ে যা। যা হয় হবে আমি বুঝে নেব”। আমি হেসে বললাম “না রে পালাতে আমি জানি না। আমার জন্য কিছু নিরীহ লােক গােকুল শয়তানটার কজায়। আমার যা হয় হবে, ওদের যেন কিছু না হয়। কোয়ার্কো দিয়ে দেব বিনিময়ে ওদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসব। আর একটা কথা আজ সকালে পুণিতকে আমি হাসপাতাল থেকে পালাতে বলেছি। শুধু তাই না বলেছি ললিয়াকে জেল হাসপাতাল থেকে পালাতে যেন সাহায্য করে এবং ওকে যেন কোনাে নিরাপদ স্থানে পৌছে দেয়। এখন আমি প্রস্তুত গােকুল কুণ্ডুর মুখােমুখি হতে”।
হলাম যখন আমাদের বলা হল লঞ্চে না উঠে ওই পন্টুনটায় উঠতে। ব্যবস্থা আগেই করা হয়ে গেছে। একটা পাটাতন ওই পন্টুন ব্রিজ এবং আমাদের নৌকাকে যুক্ত করেছে। একটা মােটা দড়ি বেঁধে দেওয়া হল যাতে দড়ি ধরে আমরা উঠতে পারি। প্রথমে আর্যৰ্মা দড়ি ধরে পন্টুনে উঠে গেল। আৰ্যৰ্ম ওপর থেকে বেতালদাকে দেখিয়ে বল “উনি পারবেন অর্ক?” আমি মুচকি হেসে বললাম “হ্যা আমার থেকে ভালাে পারবেন”। আসলে বেতালদা দীর্ঘ পনেরাে বছর ভারতীয় নৌবাহিনীতে কাজ করে অবসর নেওয়ার পর আবার আমাদের ব্যাঙ্কের সার্ভিসে জয়েন করেছেন। তার থেকেও বড় কথা সেনাবাহিনীর শরীর চর্চার যে রেওয়াজ সেটা এখনও উনি মেনে চলেন। বেতালদাকে আমার সঙ্গে আনার মূল এবং গােপন কারণ এটাই। | বেতালদা আমার আগেই সপ্রতিভভাবে পন্টুনে উঠে গেলেন। পরে আমি উঠলাম এবং বেশ ভয়ে ভয়েই। রানা আর মাঝি কিন্তু পন্টুনে উঠল না। ওরা নৌকোতেই থেকে গেল। পন্টুনের ওপর উঠে দেখলাম লঞ্চের ভেতরেও কয়েকজন লােক ঘােরাফেরা করছে। আমরা আমাকে ফলাে করে পন্টুনের ঘরে ঢুকলাম। আমরা ঢুকতেই দুজন বন্দুকধারী একে একে আমাকে আর বেতালদাকে তাক করল কিন্তু আমাকে নয়। বেতালদার হাত খালিই ছিল। কিন্তু আমার কাঁধে ছিল একটা ঝােলা ব্যাগ। সেটা আমার কাঁধ থেকে প্রায় ছিনিয়েই নিয়ে নিল। আমি কোনাে প্রতিবাদ করলাম না। পন্টুনের ঘরে আরও প্রায় জনা কুড়ি লােক ছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাস খেলছে, কেউ কেউ মদ খাচ্ছে। আবার কয়েকজন বেশ আরামে নাক ডেকে ঘুমােচ্ছে। একটা জিনিস আমার সতর্ক দৃষ্টিতে ধরা পড়ল যে কয়েকজনের হাতে অস্ত্র ধরাই আছে। কিন্তু যারা খালি হাতে আছে তারাও যেন যে কোনাে মুহূর্তে অস্ত্রের নাগাল পায় সেভাবেই ব্যবস্থা করা আছে। তার মানে দাঁড়াল প্রত্যেকেই সশস্ত্র। সবগুলােই যে দাগি আসামি ওদের মুখ চোখ দেখলেই তা বােঝা যায়। তার মানে ওরা সবশুদ্ধ জনা পঁচিশ বনাম আমরা কেবল দুই। মনে মনে এক অসম যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। আমরা দুই বন্দুকধারীর পেছন পেছন ভেতরের ঘরটায় ঢুকলাম। দেখলাম মাঝখানে একটা গােল টেবিল এবং কয়েকটা চেয়ার পাতা। আমি আর্যমা ও বেতালদা সকলে চেয়ারে বসলাম। ঘরে আপাতত আর কেউ নেই। আমরাই এ ঘরে প্রথম ঢুকলাম। আমরা যেই দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেছি তার উল্টোদিকে আর একটি দরজা দিয়ে মিনিট পাঁচেক পরে দুজন লােককে কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা অবস্থায় ধাক্কা মেরে ঢােকানাে হল। দুজনেরই হাত পেছন দিকে বাঁধা। ওদেরকে আমাদের পাশে চেয়ারে বসানাে হল। ঠিক তার পরপরই একটা লােক কড়া আতরের গন্ধ ছড়িয়ে ঘরে ঢুকল। কড়া গন্ধে আমরা দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম। লােকটা আমার দিকে তাকিয়ে হাত তুলে বলল “স্বাগতম, চৌধুরীবাবু। আমিই গােকুল কুণ্ডু”। আমি একেবারে থ। এমন একটা মার্কামারা শয়তানের একি চেহারা? বিশ্বাস করাই শক্ত। উচ্চতা সম্ভবত টেনেটুনে পাঁচফুট। মাথা জুড়ে টাক। মুখের চোয়াল ভাঙা। শরীরটা খুব রােগা। নাকটা শুধু দুই ইঞ্চি লম্বা। আর চোখ দুটো কুতকুতে।