সাপ্তাহিক কোয়ার্ক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুশোভন কাঞ্জিলাল (পর্ব – ৮৯)

উননব্বই
লুলিয়া একটু শান্ত হলে, আমি ওকে ধরে শুইয়ে, একটু গরম স্যুপ বানিয়ে নিয়ে এলাম। বুঝলাম যে ও আমাকে কৈফিয়ত দিতে চায়। লুলিয়া যে গল্পটা বলল তার মর্মার্থ হলো – গোকুল কুন্ডু এক শয়তানের অবতার। এমন কোনো কুকাজ নেই যা গোকুল করেনা। ওর পাপের ব্যবসা খুবই সুসংগঠিত। একেবারে কর্পোরেট কায়দায় চলে ওর কাজকর্ম। ওর কাজকর্ম বিভিন্ন রাজ্য আর দেশে ছড়িয়ে আছে। নানা ধরণের ডাইভার্সিফিকেশনও আছে। পাপের দুনিয়ার সকল শাখাতেই ওর বিচরণ। ড্র্যাগ পেডলিং থেকে স্মাগলিং, নারী পাচার থেকে নিজের মধুচক্র, কন্ট্রাক্ট কিলিং এক্সাক্টরশন কিডন্যাপ করে নিজের লোকবল বাড়ানো। পথশিশু থেকে বড়োলোক বাড়ির শিশু যাই হোক সুযোগ বুঝে চুরি করে গোকুলের লোকেরা। আবার কিছু অনাথ আশ্রমের বা সংশোধনাগারের বাচ্ছাও কিনে নেয় টাকার জোরে আর যোগাযোগের মাধ্যমে। তাঁদের কিছুদিন খাইয়ে পরিয়ে রাখে গোকুলের ট্রেন্ড গ্ৰুমারেরা। যাদের মাথা মাথা ভালো তাঁদের পড়াশোনা করে নিজের প্রাইভেট স্কুলে। চলে ওয়ার্ল্ডক্লাস গ্ৰুমিং। তুখোড় শিক্ষিত খিদমদগার বানায় তাঁদের। তারপর শহরের সারা দেশে ছড়িয়ে দেয় তাঁদের। কারো বোঝার সাধ্য নেই যে তারা গোকুলকুন্ডুর” আস্তাবলের” এজেন্ট।তারা সমাজের সঙ্গে অতপ্রোত ভাবে মিশে গিয়ে গোকুল কুন্ডুর কাজ করে চলে। কেউ কেউ সরকারি এমনকি পুলিশেও চাকরি করে। তারা সরকারের মাইনে নেয় কিন্তু কাজ করে গোকুলের হয়ে। এমন সুক্ষ ভাবে সেসব কাজ সম্পন্ন করা হয় যে কারুর বোঝার উপায় নেই। কাউকে বানানো হয় হাই প্রোফাইল কল গার্ল। যাদের শরীর স্বাস্থ্য ভালো তাঁদের বানানো হয় গোকুলের হার্মাদ বাহিনীর সদস্য। সে যাইহোক
গোকুলের বিশ্বস্ত লোকেদের মাধ্যমে তার এজেন্ট দের সর্বদা ব্রেন ওয়াশ চলতে থাকে। কিছু পরিমান ড্র্যাগ এডিক্টও বানিয়ে রাখা হয়। সমাজের যে অংশেই এই লোকেরা থাকুকনা কেন তাঁদের ছবি কাঠি থাকে গোকুলের হাতে। গোকুলের নেটওয়ার্ক এমনি যে পালিয়ে যাবার যদি নেই।এমনই একজন এজেন্ট হলো এই শ্রীজা যাকে আমি লুলিয়া বলে জানি।
এই শ্রীজা বা লুলিয়া জ্ঞান হবার পর থেকেই ও নিজেকে “এই আস্তাবলেই ” দেখে এসেছে।একটু বড়ো হতেই ওর চেহারার মধ্যে লাবণ্য ফুটে ওঠায় ওকে হাই সোসাইটিতে মেশার জন্য জরুরি আদব কায়দা শেখানো হয়েছে। গোকুলের প্রাইভেট স্কুলে পড়েছে বছর আষ্টেক। ফ্লুয়েন্টলি ইংলিশ বলে। বেশ কয়েকটি বিদেশি ভাষাও ওর জানা। নাচ ও গানে ও পারদর্শী। ওকে ক্যারাটে এবং বন্দুকবাজিরো ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। লুলিয়ার মতে ওর জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক দিন হলো সেই দিন যেদিন মাত্র চোদ্দ বছর বয়েসেই ওর কুমারীত্ব বিসর্জন দিতে হয়েছিল ওই গোকুলের নির্দেশে। কোনো এক মন্ত্রীর ভোগের সামগ্রী হতে হয়েছিল তাকে। প্রতিবাদ করতে পারেনি কারণ তার ফল ছিল মৃত্যু। এই ভাবেই তার জীবন ধীরে ধীরে নরক হয়ে যেতে লাগলো। তবু তাকে বছর তাগিদে এই জীবন মেনে নিতে হল। ক্রমশ গোকুলের বিশ্বাস যোগ্য ও কাছের লোক হয়ে উঠলো লুলিয়া। তাই তার ভাগ্যের চাকাও ঘুরতে লাগলো। সামান্য কল গার্ল থেকে হয়ে উঠলো অ্যাসাইনমেন্ট ভিত্তিক এজেন্ট। যেমন আমার কেসে ওকে লুলিয়া বলে প্ল্যান্ট করা হয়েছিল। লুলিয়ার এই স্বীকারোক্তি টা আমার বিশ্বাসযোগ্য লাগলো। আমিই নাকি ওর জীবনে প্রথম মানুষ যার সঙ্গে এতদিন অভিনয় করতে হচ্ছে। এক দুদিনে মেলামেশায় আবেগে বশে রাখা যায় কিন্তু আমার সঙ্গে সময় কাটানো ওর জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন। তাই ও হয়তো আমাকে অভিনয়ের আড়ালে সত্যি করে ভালোবেসে ফেলেছিলো। লুলিয়া বলেছে ও নাকি গোকুলকুন্ডুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বলেছিলো ও আমাকে সব বলে দেবে। ও সব বলে দিলে গোকুলের সব কুকর্ম জানা জানি হয়ে যাবে তাই ওকে মারার জন্য গ্যাসচেম্বারে ঢুকিয়ে দিলো। কিন্তু মিরাকেল তো আজও ঘটে। আর সেই চমৎকারী ঘটলো লুলিয়ার ক্ষেত্রে যার জন্য ওর প্রাণ বেঁচে গেলো। ছোটবেলা থেকেই লুলিয়ার দেখা সবথেকে জাদরেল শয়তান জনার্দন কাকাই নাকি সবার অগোচরে গ্যাসচেম্বার খুলে দেখে লুলিয়া অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। জনার্দন লুলিয়ার জ্ঞান ফিরিয়ে সবার অলক্ষে আমার বাড়ির কাছে রেখে যায়।