গল্পেরা জোনাকি তে শম্পা গুপ্ত (ছোট গল্প সিরিজ)

সহযাত্রী
“ওহ্ আল্লা! এতো জোরে কেউ চেপে ধরে?” কপট রাগ দেখিয়ে নওশিন ঠেলে দেয়।সাম্য হো হো ক’রে হেসে উঠে বলে,”আরে এভাবেই তো শক্ত করে তোমায় ধ’রে রাখবো চিরকাল।কেউ কেড়ে নিতে পারবে না ।” কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে নওশিন।ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলে ,”সত্যিই তুমি এভাবে ধ’রে রাখবে? রাখতে চাও?”
নওশিন আতিয়া।পাঁচ দুই।কোমর ছাড়ানো চুল।সরু চোখ।তামাভ রঙ।
সাম্য দাঁড়াল। একহাত বাড়িয়ে দেয় নওশিনের দিকে। গমগমে গলায় গেয়ে ওঠে “প্রেমের জোয়ারে ভাসাব দোঁহারে বাঁধন খুলে দাও।”
নওশিন এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায়।কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে নেয়।হেঁটে যায় সামনে।সাম্য তখনও গেয়ে যাচ্ছে। “প্রেমের রাজ্য থেকে এবার নেমে আসুন বাস্তবের মাটিতে।আজ গেট মিটিং মনে আছে?” নওশিনের কথায় সাম্য থমকায় , ” তুমি মনে করিয়ে দিচ্ছ!অবাক লাগছে!ভূতের মুখে আল্লার নাম।” দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরতে চায়। গেয়ে ওঠে “we are in the same boat brother.” নওশিন ছিটকে স’রে যায়।
ইউনিভার্সিটির গেটে তখন বেশ ভীড় জমে গেছে। ওরা দ্রুত পা চালায়। নওশিন দ্বারভাঙা বিল্ডিং এর দেয়ালে ঠেস দিয়ে অ্যানিকে খুঁজতে থাকে। একপ্রকার দৌড়ে ঢুকল অনন্যা। হাতে একগাদা ফ্ল্যাগ ফেস্টুন। সব নামিয়ে মাইকের সামনে এগিয়ে গেল। ওর স্লোগানে লোক জমছে। নওশিন ব’সে পড়ে মাটিতে । খাতা খুলে চোখ বুলিয়ে নেয় ইয়েটস্ এর জীবনীর উপর।
অ্যানি অর্থাৎ অনন্যা অধিকারী । ছিপছিপে, লম্বা পাঁচ পাঁচ ,শক্ত কাঁধ, ঘোলা চোখ,ঘাড় অবধি চুল। ডান দিকের ঠোঁটের কোণ থেকে কাটা দাগ নিচের দিকে। নওশিন আর অনন্যা ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে রুমমেট। নওশিন এর বাড়ি মুর্শিদাবাদে,অনন্যা কোচবিহার।
অনেক রাত। টেবিলে ঝুঁকে প্রমিথিউস আনবাউন্ড আবৃত্তি করছিল নওশিন। অনন্যার চোখ জ্বলছিল। “একদিন তুই আমাদের মিটিংএ আবৃত্তি কর। দেখবি কিরকম জমে যাবে।”
নওশিন ভয় পায়। চাচার রোজগারে তার পড়াশোনা।ভালো রেজাল্ট না করলে বিয়ে। “না রে আমার ওসব ভালো লাগে না। সাম্য জোর করে তাই মেম্বার হয়েছি।আমাকে তোরা ছেড়ে দে ভাই।”একটা কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে ওর গলায়।
আজ খুব থমথমে পরিবেশ। সাম্য বেশ কদিন আসছেনা। অ্যানিও রাত করে আজকাল।
নওশিন ক্লাসে ঢুকে সাম্যকে দেখতে পায়। একেবারে সাম্য র পাশে চলে যায়। “একি!তুমি মিছিলে যাও নি? আজ তো তোমাদের প্রতিবাদ মিছিল।অ্যানি কোন সকালে বেরিয়েছে।” সাম্য বলে , “ক্লাসটা করি আগে। পরীক্ষার আর বেশি দেরি নেই।” নওশিন বলে ,”ওহ আল্লা!তুমি যাও আগে। তোমার চিন্তা নেই নোটস সব পেয়ে যাবে।
অ্যানিকে একা ছেড়ে দিলে?”
হঠাৎই সাম্য দাঁত খিঁচিয়ে হিসহিস করে বলে,”সারাক্ষণ আল্লা আল্লা করোনা তো।অসহ্য লাগে। অ্যানির জন্য খুব দরদ দেখছি। আমি আছি সেটা ভালো লাগছে না?”
নওশিনের কান জ্বালা করে,সাম্যর মুখটা ঝুলে পড়া বীভৎস জন্তুর মতো লাগছে।মুখ ফিরিয়ে নেয়। মিছিলের স্লোগানে তখন ভার্সিটির স্তব্ধতা ভাঙছে। ছুটে যায় নওশিন জানলায়। চারিদিকে পুলিশ। বিরোধী দলের ছেলেরা দাঁড়িয়ে ফুঁসছে। “সাম্য তুমি যাও । অ্যানি একদম সামনে।” সাম্য হাসছে।”আমি দল পাল্টেছি। অ্যানি বোকা। ক্যারিয়ার নষ্ট করছে। আমি বিদেশে যাচ্ছি। বাড়িতে তোমাকে মেনে নেবে না ।
রিলিজিওন প্রবলেম।সরি।”
নওশিনের কানে কিছুই
ঢুকছে না।সাম্যকে এক ধাক্কায় ফেলে দিয়ে দৌড়তে থাকে, সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বোমা ফাটার আওয়াজ শুনতে পেল। ঐ তো অ্যানি।আবার বোমা।চারদিকে কালোকুন্ডলী ,নওশিন অন্ধের মতো এগিয়ে যায়।পরপর বোম পড়তে থাকে।
আস্তে আস্তে ধোঁয়া পরিষ্কার হচ্ছে। সাম্য দোতলার জানলা থেকে দেখে অ্যানির বুকের উপর মুখ রেখে পরম শান্তিতে নওশিন শুয়ে আছে।চারদিকে রক্ত। মানুষের গোঙানি ।সাম্য দেখল দূর থেকে ওদের ঠিক দুটো সাদা গোলাপের মতো লাগছে।সাম্য মুখ ঢেকে ব’সে পড়ে।
“We are in the same boat brother.we are in the same boat brother.”