সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৫০)

সীমানা ছাড়িয়ে

এই মেলায় গঙ্গা এক প্রধান আকর্ষণ। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জন্ম মৃত্যুর অনেক ছবি।
আমার ঈশ্বর,আমার অনুভব,ভালোবাসা একান্তই নিজস্ব অনুভূতি। আমার জ্যান্ত ঈশ্বরের পরম করুণাময়ের সঙ্গে মিলিত হবার শেষ আয়োজনের শুরু হয়েছে। মনে পরছে, আমার সামনে থেকেও রকেটের দাগের মতো মিলিয়ে গেলো বন্ধু। গঙ্গার জলে ডুব দিয়ে আর উঠলো না নীলমণি। রোজ আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে জ্বল জ্বল করে আমার অশ্রু আয়নায়। হাওয়ায় ওড়া আমার বেহিসাবী মন আজও দেখতে পায় অনন্ত আকাশে তার বিচরণ।

দুপুর ঠিক দুটোর সময় মা খাওয়ার জন্য ডাকলেন। মা বললেন,থালাগুলো জল বুলিয়ে নিয়ে এসো সবাই।

তারপর গোল হয়ে সবাই বসে পরলাম খেতে। মাটিতে বসে খেতে শুরু করলাম। আমি কলাপাতায় খেতে ভালোবাসি। এতো খাওয়া নয়,স্বপ্ন জগতে বিচরণ। এই ভালোলাগা বার বার আসে না। অকৃত্রিম আনন্দের জগৎ এই মেলা।

সবার খাওয়া হয়ে গেলে মা ও মানা পিসি বসলেন খেতে। সবাইকে প্রথমে খাইয়ে তারপর নিজের খাওয়া। তাই ভারতমাতার সন্তানরা দেশের দশের জন্য সব ত্যাগ করতেও কুন্ঠিত হয় না। মায়ের কাছে এই শিক্ষা তারা পায় ছোটো থেকেই।

তারপর বাড়ি ফেরার পালা। অনেক মৃতদেহ আসছে শ্মশানে। বলো হরি, হরিবোল ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত। তারা ফিরছে আপন ঘরে। আমরা ফিরছি গ্রীনরুমে। আমি আর পিউ অনেক পুঁথির মালা কিনেছিলাম। সেগুলো সোনার গয়নার কাছে কোনো অংশে কমদামী ছিলো না সেই স্মৃতি আজও বাক্সবন্দী হয়ে আছে। আবার কোনো কিশোরী বন্ধবাক্স খুলে ফেললে মেলার আনন্দ নতুন করে পাবে।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মা চিন্তা করছেন। তামালদাকে বললেন,তাড়াতাড়ি ডাকাও। গোরু দুটোকে তামালদা বলছে,হুট্ হুট্,চ,চ দিগি দিগি। গোরু দুটো ছুটতে শুরু করলো। খুব তাড়াতাড়ি চললাম। টর্চের আলোয় রাস্তা দেখছি সবাই। হঠাৎ রে রে করে দশজন ডাকাত পথ আগলে দাঁড়ালো। দে যা আছে বার কর। হাতে তাদের বড় বড় লাঠি। মা বললেন,বললাম তাড়াতাড়ি করে বাড়ি চলে যায় চ, তোরা শুনলি না আমার কথা।

হঠাৎ তামালদা আর বড়দা নেমে লাঠি কেড়ে নিয়ে বনবন করে ঘোরাতে লাগলো। আমরা গাড়িতে বসেই দেখতে লাগলাম লাঠির ঘায়ে ডাকাতগুলোর মাথা ফেটে রক্ত পরছে। সবগুলো শুয়ে পরে হাত জোড়া করে ক্ষমা চাইছে। মা বললেন,ছেড়ে দে। উচিত শিক্ষা পেয়েছে বাঁদরগুলো। খেটে খাগা যা, পালা।

তারপর তামালদা ও বড়দা লাঠি দুটো নিয়ে সামনে বসলো। বড়দা বলছে,আয় কে আসবি আয়। সেই কেড়ে নেওয়া লাঠি আজও আছে। মা বলতেন,অন্যায় করবি না,আর অন্যায়ের সাথে আপোষও করবি না।এই বলে মা দাদুর গল্প শোনাতে শুরু করলেন। আজও মনে আছে আমার সেইসব কথা।

সেই বান্ধবী বাড়িতে না জানিয়ে এক ভিন্ন জাতির ছেলেকে বিয়ে করবে,এই সত্যিটা সে মেনে নিতে পারছে না। ভাবতে ভাবতে সকাল হয়ে গেলো। আর একটু পরেই বেরোতে হবে পিউ এর সাথে আর ফিরে আসবে একা। পিউয়ের বাবা মাকে কি জবাব দেবো। এই মুখ কি করে দেখাবো। মোবাইল বেজে উঠলো। মা কে বলে রীতা বাইরে নির্দিষ্ট জায়গায় গেলো।
দেখলো সোনা দানা পরে শাড়ি ঢাকা দিয়ে বাবা মা কে না বলে পিউ চিরদিনের মতো চলে এসেছে বাইরে।

গঙ্গার জলে পা ডুবিয়ে দুই বান্ধবী বসে আছে। তির তির করে জল বয়ে যাচ্ছে। স্বচ্ছ জলে বালি দেখা যাচ্ছে। দাঁড়কে মাছগুলো সুন্দরীদের পায়ে চুমু খেয়ে যাচ্ছে। রীতা বললো,বেজাতে বিয়ে সমাজ মানবে না রে। পিউ বললো,রাখ তোর জাতপাত। সমাজের সেনাপতিরা যখন কাজের মেয়ের পা চেটে খায় বিছনায় তখন জাত কোথায় পালায়? সমাজের প্রতি এই রাগ রীতারও আছে।
এবার ওরা জাল কাঁধে নবকুমারকে দেখতে পেলো। পিসীর বাড়ি এলেই সে আসে গঙ্গায়।কাছে এলে পিউ বললো,এই দেখো সব সোনার গয়না পরে পালিয়ে এসেছি। জমিদার গিন্নি দিয়েছেন।তিনি আমার মায়ের মত।

কেমন লাগছে আমাকে। নবকুমার বললো,তোমাকে রাজরাণীর মতো লাগছে। রীতা বললো,তুমি খালি গায়ে কি করে বিয়ে করবে?
সে জাল নামালে। শরীর তার শক্তপোক্ত। তার চেয়ে শক্ত তার মন। সে বললো,আমি একটা কথা বলতে চাই।
পিউ বললো,আবার কি কথা?
নবকুমার বললো,এই নদী সাক্ষী। আপনারা দুজনেই শুনুন। ভুলকুড়ি গ্রামের রাস্তার ধারে মীনা বলে একটা মেয়ের বাড়ি ছিলো। আমরা ছোটোলোক ঘরের। ভালোবেসে ফেললাম মীনাকে। দুদিনের মেলামেশার পরে মীনা গর্ভবতী হলো। আমি তাকে বিয়ে করলাম। মীনা মৃত সন্তান প্রসব করলো। তখন আমি কেমো থেরাপি চালিয়ে যাচ্ছি। গাঁজা,মদ কোনো কিছু বাকি ছিলো না। তারফলে মারণ ব্যাধি বাসা বাধলো শরীরে। গত পরশু পি জি হসপিটালে গেলাম। ওরা আমাকে পাঠালেন চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হসপিটালে। বাড়াবাড়ি দেখে এই ব্যাবস্থা। তারা জানিয়ে দিলেন আমার জীবনের মেয়াদ আর ছয়মাস। এখন আমি কি করি বলুন। আমি পিউকে ভালোবাসি। তাই এই ছয়মাসের মধ্যে আমি পিউ কে বিবাহিতা দেখতে চাই। আর কিছু আমার বলার নেই। পিউ কান্না শুরু করেছে। কিছুতেই রীতা তাকে থামাতে পারছে না। পিউ যখন মুখ তুলে তাকালো ততক্ষণে নবকুমার অনেক দূরে চলে গেছে।

যেতে যেতে নবকুমার ভাবছে, মায়ের দেওয়া মন্ত্রটা ভালোই কাজ দিয়েছে। গিয়ে মাকে একটা প্রণাম করতে হবে। ওই মন্ত্র ছাড়া অসম প্রেমের শক্ত শেকল ছেঁড়া যেতো না….সুনীল বড় হয়েছে বন জঙ্গলের আদর পেয়ে ।ছোটো থেকেই মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে থেকেছে। বাবা থাকলেও তার সঙ্গে ভাব ছিলো না সুনীলের। তাকে এড়িয়ে চলতো সুনীল।তার কারণ বাবা খুব রাগী লোক। সবসময় মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে। মাকে গালাগালি দেয়। মনের মধ্যে সুনীলের বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নেই শৈশব থেকেই। সে তার মায়ের কাছে থাকে। পাড়ার দাদুর কাছে পড়াশোনার শেষে গল্প শুনতে যায়। মা বিভিন্ন সময়ে রকমারি পুজো করেন। ব্রত পালন করেন। নিজেকে এইসবের মধ্যে ব্যস্ত রাখেন তিনি। মা পৌষ মাসের ব্রত পালন করেন। মা ব্রতকথা শোনানোর জন্য সুনীলকে, পাড়ার মাসিকে ডেকে আনতে বললেন। মাসি এলো, কাকিমা এলো। মাসি বলেন, পৌষ মাসে যে মহিলারা এই ব্রত পালন করেন, কথিত আছে, তাঁর পিতৃকুল ও শ্বশুরকুলের কল্যাণ সাধিত হয়।মা বলেন, ঠিক বলেছেন আপনি।কাকিমা বললেন, এবার আপনি বলুন। আমরা শুনি। মা বলতে শুরু করলেন,
নতুন ধানের তুঁষ আর গোবর দিয়ে অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তিতে বড় বড় চারটে নাড়ু পাকানো হয়। সর্ষে ফুল আর নাড়ু ধরে পুজো করা হয়।

১লা পৌষ থেকে প্রতিদিন ছোটো নাড়ু চারটে করে সংক্রান্তির আগের দিন অবধি পূজা করা হয়।সুনীল প্রশ্ন করে মা ক্ষীরের নাড়ু খাবো আমি। মা বলেন, নিশ্চয় খাবি। তবে পাশের বাড়ির কাকিমা, মাসিমাকে ব্রতকথা শোনাই দাঁড়া। কাকিমা বললো,আমাকে ভালো করে শিখিয়ে দাও দিদি। আমার খুব ভালো লাগে এসব।

পাশের বাড়ির কাকিমা এ সব একদম কিছু জানে না। মা তাকে শিখিয়ে দেয় নিয়মাবলী। মা বলেন, শোনো, নিয়ম তো অনেক আছে। তবে যতটা পারা যায় সংক্ষেপে বলি।

মকর সংক্রান্তির দিন ছ’ কুড়ি ছ’গন্ডা অর্থাৎ ১৪৪টি ক্ষীরের নাড়ু আর পরমান্ন তৈরি করে খেতে হয়। খাবার সময় সেঁজুতির দূর্বা ও তুঁষ তুঁষলীর নাড়ুগুলি একটি মালসা বা হাঁড়ির ভিতর রেখে তাতে আগুন দিতে হয়। পিছন দিকে রেখে খাওয়া শেষ হলে ভাসান মন্ত্র পড়ে জলে ভাসিয়ে দিয়ে আঁচিয়ে ঘরে ঢুকতে হয়।

এইভাবে চার বছর পালন করার পর ব্রত উদ্ যাপন করা হয়। সরষে ফুল ওমূলা ফুল দিয়ে মন্ত্র বলা হয়

তুঁষ তুঁষুলী কাঁধে ছাতি
বাপ মার ধন যাচাযাচি
স্বামীর ধন নিজ পতি
পুত্রের ধনে বাঁধা হাতি
ঘর কোরবো নগরে
মরবো গিয়ে সাগরে
জন্মাব উত্তম কুলীন
বামুনের ঘরে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।