গ্রন্থ আলোচনায় সায়ন্তনী দাশ সান্যাল

ব্ল্যাক করিডর ( প্রথম খন্ড)
প্রকাশক- দে’জ

মানুষের মনের মত বিচিত্র জায়গা পৃথিবীতে নেই। আলোকিত জগতের প্রতি তার যে আগ্রহ ,তার চেয়ে বেশি আগ্রহ বোধহয় অন্ধকারাচ্ছন্ন ,তমসাঘন অপরাধ জগতের প্রতি। যে ঘটনাগুলো মানুষকে রোমাঞ্চিত করে তোলে। বিস্ময়ের অভিঘাতে মূক হয়ে যাওয়া কখনো হয়ে যায় মানুষের প্রিয় ব্যসন।
‘বর্তমান’ পত্রিকার দীর্ঘদিনের সাংবাদিক শ্রী সমৃদ্ধ দত্ত তাঁর ‘ব্ল্যাক করিডর’ গ্রন্থে এই অন্ধকার জগতের অনুসন্ধান করেছেন ও তার সঙ্গী হয়েছে পাঠকও। আলোড়িত, চর্চিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঘটনা দিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি।
হর্ষদ মেহতা , নামটা ভারতবর্ষের বোধহয় সবচেয়ে বড় স্ক্যামএর সাথে যুক্ত। সাধারণ শেয়ার বাজারের ব্রোকার থেকে কিভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন নিজে এবং একঝাঁক ব্র্যান্ডনেম সিলিব্রিটিও যে তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেই অধ্যায় বিস্ময় তৈরি করে। ভারতবর্ষের মতন তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ, যে দেশ পা রাখতে চলেছে বিশ্বায়নের স্বাধীন অর্থনীতিতে, সেই দেশে এই স্ক্যাম চমকে দেয় জনগণকে। সেই চমক ভোলা যায়নি বলেই আজ ওয়েব সিরিজ ও চলচ্চিত্র তৈরি হয় হর্ষদ মেহতা কে নিয়ে।
সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, প্রায় নয় বছর ধরে তদন্ত চালানোর পর সিবিআই এর কাছে পরিষ্কার হচ্ছে কয়েকটি প্রভাবশালী মুখ,যারা সাহায্য করেছিল হর্ষদ কে, সেই সময় জেলার মধ্যেই বুকে যন্ত্রণা নিয়ে মারা গেলেন হর্ষদ মেহতা, নামগুলো আর সামনে এলোনা। এই মৃত্যু নিছকই দুর্ঘটনা না অন্তর্ঘাত, তা কোনো দিন কি জানা যাবে?
স্ট্যাম্প পেপার কেলেঙ্কারির কথা মনে আছে কারো?আব্দুল করিম তেলগি, শুধুমাত্র টাকা দিয়ে যে দুর্নীতির পাহাড়ে চড়ে বসা যায় ,সেটা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। মন্ত্রী থেকে সাধারণ নেতা, ডেপুটি মেজিস্ট্রেট হয়ে মুম্বাইয়ের পুলিশ কমিশনার, তেলগির দেওয়া ঘুষের জালে জড়িয়ে পড়েছিলেন তাবড় সব মাথা। জমি বিক্রি থেকে চাকরির নিয়োগ, ডিভোর্স থেকে বিদেশে লগ্নি সব হয়েছিল জাল স্ট্যাম্প পেপারে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চ তেলগি কে গ্রেপ্তার করে। জেরা করতে হটাৎ করে লকআপে হাজির হয় মহারাষ্ট্র স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম। কিন্তু লকআপে নেই তেলগি , সে তখন পুলিশ কনস্টেবলদের নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে মুরগীর হাড় চিবচ্ছে। টাকা ছড়িয়ে নিজের থাকার জায়গারও বদল করেছে তেলগি। আবার ধরা পড়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার জাল স্ট্যাম্প। সিস্টেমকে হাসির খোরাক বানিয়ে দেওয়া তেলগিকে নিয়ে বলিউড বানাতেই পারে একটি ব্লক বাস্টার।
ব্ল্যাক করিডরের ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের অপরাধ প্রবণতার প্রমাণ। মাসুদ আজহার, নামটা শুনলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মুফতি মহম্মদ সাঈদএর কন্যা রুবাইয়া সাঈদ কে অপহরণ করা হয়েছিল জে কে এল এফ এর তিন সুপ্রিমো কে মুক্তির দাবিতে। মুফতি মহম্মদ তখন কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং আর কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ফারুক অবদাল্লা। কিডন্যাপিং করে অপরাধীমুক্তির প্রবণতা তখন শুরু হয়েছে সবে। জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টের সুপ্রিমো দের মুক্তি দেওয়ার পর মুক্তি পেলেন রুবাইয়া সাঈদ, ডাক্তারির ছাত্রী, তার বোন মেহবুবা মুফতি এর অনেক পরে কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হবেন। পণবন্দি রেখে সন্ত্রাসবাদী ছাড়ানোর এই ট্রেন্ডের গুরুত্বপূর্ন সাফল্য হলো মাসুদ আজহারের মুক্তি। তার শুরুয়াদ হলো রুবাইয়াকে অপহরণের মাধ্যমে।
সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর বলিউডে নেপোটিসম নিয়ে যে ঝড় উঠেছে, তারকারা অভিযোগে বিদ্ধ করছে একে অপরকে। প্রখ্যাত গায়ক সোনু নিগম ও টি সিরিজের কর্ণধার ভূষণ কুমার এর চাপানউতোর এর মধ্যেই ভাইরাল। এই ভূষণ কুমারের বাবা গুলশন কুমার কিভাবে পুরোনো দিল্লির দরিয়াগঞ্জ থেকে মুম্বাইয়ের সংগীত সাম্রাজ্যের সম্রাট হয়ে উঠলেন, সেই কাহিনীও সিনেমার চেয়ে কম রঙীন নয়। কারণ গুলশন কুমারের জীবনের শেষ মুহূর্তের চিত্রনাট্য তৈরি করেছে আবু সালেম। ডন আবু সালেম।
আর মুম্বাই তথা ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড ডন, আজও অধরা, সেই ডি কোম্পানির উত্থান । মুম্বাইএর হেড কনস্টেবল ইব্রাহিম কাসকরের ছোটছেলে দাউদ ইব্রাহিম, মুম্বাই ব্লাস্টের মাস্টার মাইন্ড দাউদএর উত্থানের অদ্ভুদ বিবরণ রয়েছে বইটি তে।
এই সময়ের বিভিন্ন ওয়েবসিরিজ ও সিনেমাতে একটি জিনিস খুব পরিষ্কার। একজন মানুষ কখনও অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হবে বলে জন্মায় না, তার পারিপার্শ্বিকতা তাকে টেনে নিয়ে যায় তমসাবলয়ে । আর তার সাথে থাকে ওই যে বললাম, অপরাধপ্রবণতা যা আমাদের মধ্যেই
লুকিয়ে থাকে।
একটা কথা খুব সত্যি, ইন্ডিয়া আর ভারত , দুটো আলাদা। একটায় ঝকঝকে স্বপ্ন, শপিং মল, ই এম আই, সপ্তাহান্তে রেস্তোরাঁয় ভীড় জমানো। আরেকদিকে, অশিক্ষা আর দারিদ্র, ঘুপচি ঘরের মধ্যে অপরাধের পাঠ পড়ানো, মগজ ধোলাই, সাট্টা, চোলাই, পাচার। কোনটা আপনার দেশ? খুঁজতে গেলে গোলকধাঁধা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।হয়তো একটা আছে বলেই অপরটা নিঃশ্বাস ফেলছে।
ইসলামিক স্টেট থেকে বেটিং, সুনন্দা পুষ্করের মৃত্যু রহস্য থেকে ছোটা রাজনের গ্রেপ্তার, ছোটা শাকিল থেকে ২৬/১১ ,কালের মঞ্চে কতই না ঘটনা- দুর্ঘটনা, মুখোশ ঢাকা -মুখোশ খোলা কুশীলব। আর আমরা? আম আদমি রা? লেখকই উত্তর দিয়েছেন, স্রেফ চিয়ার লিডার।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!