ক্যাফে গল্পে সুজিত চট্টোপাধ্যায়

গেট টুগেদার
অভিযান সন্ধ্যের আগে আগেই ফিরে এসেছিলো। একটু কি থমথমে মুখ? না, এখন আর অভিযান পারতপক্ষে ড্রিঙ্ক করে না। তাই এই থমথমে গম্ভীর মুখের আড়ালে কি আছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করেছে ঝুমা অনেকবার, প্রয়োজনের চেয়েও বেশী কথা বলে জানতে চেয়েছে, যে উচ্ছল অভিযান মানুষটা সকালে গিয়েছিলো, সেই মানুষটা এমন মিয়োনো মুড়ির মতো ফিরে এলো কেন? এমনটা তো হবার নয়। অভিযানকে বিয়ের আগের সতেরো বছর ও বিয়ের পরের ছাব্বিশ বছর ধরলে তেতাল্লিশ বছর, তাবাদে হায়ার সেকেন্ডারী পড়ার আরো দুবছর নিলে পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে চেনে। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে আজ ঝুমার বাড়ীতে কান পাতা দায় হয়ে যেতো। তাই ঝুমাও…., নিজেদের মধ্যে ঝগড়ার সময় যদিও” তোমায় আমি হাড়ে হাড়ে চিনি “, কিন্তু সত্যিই অভিযান আর ঝুমার মধ্যে বন্ডিংটা হয়তো অনেকেরই মধ্যে হিংসে তৈরী করে। প্রচুর অভাব অভিযোগও ওদের উভয়কে চেনা ও জানার মধ্যে কোনো অন্তরায় তৈরী করতে পারে নি এতোগুলো বছরেও। ছোটো ছোটো ভালোলাগা, সুখ দুঃখ ওদের একে অন্যকে হিংসুটে বন্ধুদের কথায় ” মেড ফর ইচ আদার ” করে তুলেছে।
ওয়াশরুম ঘুরে এসে চেঞ্জ করে বারান্দায় বসেছিলো অভিযান। দিনের আলো ক্রমশঃ মরে আসতে ঝুমা এসে বারান্দার আলো জ্বালিয়েছিলো। অভিযান একটু ওভার রিআক্ট করেই বলেছিলো…..” আলোটা জ্বালানোর কি আছে? নিভিয়ে দাও আলোটা “।
ঝুমা তার স্বভাব সুলভ চাপল্যে গান গেয়ে উঠেছিলো….. ” আমি অন্ধকারের যাত্রী, প্রভু আলোর দৃষ্টি দাও “… গানের লাইন দুটো শেষ করেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠে মাথার চুলে বিলি কেটে বলেছিলো…..” কি ব্যাপার! বাবুর মুডটা মনে হচ্ছে ঠিক নেই ! কি হোলো ” ? আবার তার চাপল্যে বলে ওঠে…..” কে বকেছে? কে মেরেছে? কে দিয়েছে গাল? “? বলেই হাহা করে হেসে ওঠে। ঝুমার কথায় ও ভাবে ভঙ্গীতে হেসে ওঠে অভিযান নিজেও। কিন্তু কোনোভাবেই ঘরের গুমোটভাবটা কাটতে চায় না।
ঝুমা অভিযানকে বলে…..” এই শোনো! আমি একটু ” ঘরের ভিতর ঘর ” টা দেখে নিই, কেমন? খুব জমে উঠেছে সিরিয়ালটা। অভিযান যেন হাতে চাঁদ পায় ঝুমার কাছ থেকে নিজেকে লুকোতে পারার সময় পেয়ে। কিন্তু এই নিষ্কৃতি যে সাময়িক , সেটাও জানে অভিযান। তবুও….
আট মাস আগের দিনগুলো চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। আট মাস আগে ওদের মাধ্যমিকের ব্যাচের একটা হোয়াটসআপ গ্রুপ তৈরী হয়েছিলো। অনেক খুঁজে পেতে অনেককেই একটা ছাতার তলায় নিয়ে এসেছিলো অভিযান, সুদীপ, তপন , লাল্টুরা। দায়িত্ব নিয়েছিলো তপন ,লাল্টু ও অভিযান। কারণ, মাধ্যমিকের সেই ব্যাচমেটরা অনেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে এতোটাই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে তাদের
” সময় কোথা সময় নষ্ট করবার “? কানাডা থেকে উপল, জার্মানি থেকে শুভ , মুম্বাইয়ের পীযূষ সবার ফোন নম্বর জোগাড় করে গ্রুপে জুড়ে দিয়েছিলো। অনেকেই নেই, চলে গ্যাছে পৃথিবী ছেড়ে ” সময় বলে কিছু হয় না ” কথাটাকে সত্যি করে দিয়ে। চলে গ্যাছে গৌতম, শ্যামল, শান্তনু, মানিকের মতো অনেকেই। ওদের জন্য শোকজ্ঞাপন করেছিলো কানাডায় থাকা উপল, কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ দায়িত্বে দিল্লীর ক্যাবিনেটে থাকা অনুরূপ ওরা সবাই। মাধ্যমিকের ব্যাচের দুটো সেকশন যেন কোনো এক মন্ত্রবলে এক হয়ে গেছিলো, যেমন করে টিচার স্ট্রেন্থ কম থাকার সময়ে দুটো ঘরের দুটো সেকশনকে এক করে মধ্যিখানে চেয়ার পেতে ক্লাস নিতেন শক্তি বাবু, প্রদীপবাবু আর সুব্রতবাবুরা।
বড়ো আনন্দে ছিলো অভিযান। মনে হয়েছিলো যে ভেদভাব সেই ছোটোবেলায় ছিলো ‘এ’ সেকশন আর ‘ বি ‘ সেকশনে , সেটা কিভাবে , কোন যাদুবলে সব উবে গ্যাছে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা যে বন্ধুদের এন্ড্রয়েড ফোন নেই, তাদের স্মার্ট ফোন দেবার পরিকল্পনা, আর্থিক সহায়তা করার পরিকল্পনা, ফান্ড তৈরী করে ব্যাঙ্ক একাউন্ট তৈরী করার ভাবনা, গেট টুগেদার করার চিন্তা, সেই সময়ের স্যারেদের যাঁরা এখনো আছেন তাদের সম্বর্ধনা দেবার কথা ভাবা, চটুল আড্ডা , ভেজ- ননভেজ পোস্ট, ইয়ার্কি মজা সব মিলিয়ে একটা ভীষণ আনন্দময় সময় কাটিয়ে দিয়েছে অভিযানএ এই আটটা মাস। নিজেরই মনে হতে শুরু করেছিলো বয়সটা সত্যিই কিছু নয়, একটা সংখ্যা মাত্র। অনেক পরিকল্পনাই রূপায়িত হয় নি, ভারতবর্ষের ক্ষুদ্রতম সংস্করণ হয়ে। কিন্তু পরিকল্পনার একটা জায়গা রূপায়িত হয়েছিলো….. গেট টুগেদার।
কানাডার উপল , জার্মানির শুভ, মুম্বাইয়ের পীযূষ, দিল্লীর অনুরূপ সবাই এসেছিলো আজ। এসেছিলো বিপিন ওর চকোলেট বিস্কুট সাপ্লাইয়ের ব্যবসা একবেলার জন্য মুলতুবি রেখে। প্রদীপ ওর চায়ের দোকান বন্ধ রেখেছিলো আজকের জন্য। এসেছিলো আরো অনেকে যারা আর্থিক দিক থেকে কোনোদিনই বড়ো হতে পারে নি। কোথায় যেন প্রথমদিকে কুঁকড়ে ছিলো প্রদীপ, বিপিন আর বিপুলেরা। অভিযানের ছিলো সঞ্চালনায় দায়িত্ব। শুধুই কি সঞ্চালনা? হয়তো একটা সেতু তৈরীর দায়িত্বও নিজের অজান্তে নিয়ে নিয়েছিলো শুভ, উপল, অনুরুপের সাথে বিপিন , বিপুল প্রদীপদের। গেস্ট হাউস ভাড়া করা হয়েছে আজ। সাউন্ড সিস্টেমে পুরোনো দিনের গান। বাছাই করা কবিতা। ফুল মালা, উত্তরীয় , শাল , বিভিন্ন বিদেশী উপহারে সাদা চাদরে ঢাকা টেবিল সাজানো। স্যারেরা এসেছিলেন । সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিলো। দামী নামকরা ক্যাটারারের দায়িত্বে আরো দামী সুস্বাদু খাবারে অনুষ্ঠান প্রায় শেষের মুখে পৌঁছেছিলো। দামী ঠান্ডা গাড়ীতে উপহারসহ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিলো স্যারেদের বাড়ীতে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ছিলো তরল আগুনে স্নান। অভিযান ব্যস্ত ছিলো ক্যাটারারের হিসেবপত্র মিটিয়ে দেওয়া, বাসনপত্র মিলিয়ে তুলে দেওয়া, এমন সব কাজে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে শেষ পর্যায়ের বন্দোবস্ত…..একপাশে হুক্কা বার, অন্যপাশে শিক্ষিত বারটেন্ডারদের ব্যবস্থাপনায় টেবিল সেজেছিলো অন্যভাবে। সব কাজ মিটিয়ে অভিযান যখন এইদিকে এসেছিলো , তখন একটা চরম ধাক্কা খেয়েছিলো অভিযান। দেখেছিলো বৈষম্যের বাহার। একদিকে শুভ, পীযূষ , উপল , অনুরূপ এবং ওদের বন্ধু হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া আরো কয়েকজন , যাঁদের টেবিলে শিভাস রিগ্যাল, টিচার্স এবং অন্যদিকে বিপিন, বিপুল প্রদীপদের একটা ছোট্ট জটলা, যারা না ছাড়তে পেরেছে ফরেন লিকার পানের লোভ, না পেয়েছে শিভাস রিগ্যালের স্বাদ। অভিযানকে ডেকেছিলো দুপক্ষই। কিন্তু সেই বৈষম্য অভিযানকে ছিটকে ফেলেছিলো সারাদিনের সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান থেকেই। বাকরুদ্ধ হয়েছিলো অভিযান। আট মাসের তিল তিল করে গড়ে তোলা একটা ইমারত যেন এক লহমায় ভেঙে পড়ছিলো বিদেশী সিনেমায় দেখা ছবির মতো। পা ভেঙে আসছিলো অভিযানের। দুপাশ থেকে ভেসে আসা টুকরো টুকরো কথা……বস, যাই বল ইন্ডিয়াতে কিছু নেই। বেশ আছি রে ওখানে……ওপাশে চাপা গলায়….গুরু, ভাগ্যিস শালা, একসাথে কিছুদিন পড়েছিলাম, তাই এমন একটা মেহফিলে আসতে পারলাম…..কিন্তু অভিযান যে বলেছিলো আমাদের জন্য স্মার্ট ফোন, টাকাপয়সার ব্যবস্থা করেছে ওরা, শালা , অভিযান ঝেড়ে দিলো না তো?…..এ পাশে….দ্যাখ উপল! প্রদীপ , বিপিনরা কিভাবে গিলছে দ্যাখ! শালা বছরের কোটা কমপ্লিট করে নিচ্ছে নাকি রে? বাই দ্য ওয়ে, অভিযানের কাছে হিসেব পত্রটা কিন্তু বুঝে নিতে হবে, হার্ড আর্ন মানি বস! এমনি এমনি কিছু হয় না……পায়ে পায়ে বেরিয়ে এসেছিলো অভিযান কারুকে কিছু না বলেই। বাড়ী এসে মোবাইলের হোয়াটসআপ গ্রুপ থেকে নিজেকে এক্সিট করে মোবাইলটা অফ করে দিয়েছিলো। ওয়াশরুমে গিয়ে স্নান করে শুদ্ধ হতে চেয়েছিলো অভিযান। কতোটা পেরেছিলো , সেটা নিজেও বুঝতে পারে না। শুধু বুকের ভিতর একটা অব্যক্ত যন্ত্রনা বমনোন্দ্রেক হয়ে সাড়া দিয়েছিলো।
ঝুমা ফিরে এসেছে ওর সাধের সিরিয়াল শেষ করে।
” এই কেমন আনন্দ করলে বললে না তো “?
অভিযান কোনো উত্তর না দিয়ে বলে……” ঝুম! আমার মোবাইলটা একটু দাও তো “।
মোবাইল অন করতেই নোটিফিকেশনে ভেসে ওঠে মোটা হরফে সাতাশটা মিসড কল। তারই মধ্যে শুভকে বেছে নিয়ে কল করে…… ওপ্রান্ত থেকে ….কি বে শালা! আমাদের ফেলে রেখে……কথা শেষ করতে দেয় না অভিযান। দাঁতে দাঁত চেপে বলে ……
” কাল হিসেবপত্রগুলো তোর পার্সোনাল হোয়াটসআপ নম্বরে পাঠিয়ে দেবো। তুই তোর একাউন্ট নম্বরটা আমায় পার্সোনালি একটু সেন্ড করে দিস, কিছু টাকা রয়ে গ্যাছে, সেটা পাঠিয়ে দেবো “। বলেই কোনো সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে আবার মোবাইলের সুইচ অফ করে অভিযান।