T3 সাহিত্য মার্গ || ১৫০ তম উদযাপন || সংখ্যায় শ্রীতন্বী চক্রবর্তী

তাবাকোশি ভ্রমণ: উত্তরবঙ্গের এক সুন্দরী গ্রাম আর চা-বাগানের কথা
আমি যখন এই লেখাটা লিখতে বসেছি, তার আগে তুরজুম চা-বাগানে আর তাবাকোশিতে আমাদের টি-ভিলেজ হোমস্টেতে অঝোর বৃষ্টিতে ভিজেছি। কলকাতার কোলাহল থেকে অনতিদূরেই, উত্তরবঙ্গের মিরিক ছাড়িয়ে একটুখানি গেলেই, কেয়ারী করা চা-বাগান আর রঙ্গভং নদীর কোল ঘেঁষে সুন্দরী গ্রাম তাবাকোশি। যদি শহর থেকে দূরে, কয়েকটা দিন নিরিবিলিতে গাছ, পাখি, প্রজাপতি আর গ্রাম্য হোমস্টের আতিথেয়তা উপভোগ করতে চান, তাহলে তাবাকোশি হতে পারে আপনার কাব্যিক বা শৈল্পিক ভাবনাগুলোকে মেলে ধরার এক আদর্শ জায়গা। আমরা জুলাই মাসের আট তারিখ বাগডোগরা থেকে মজাদার মানুষ মণিভাইয়ের গাড়িতে চড়ে এসে পৌঁছলাম তাবাকোশি। সাথে সাথেই টি-ভিলেজ হোমস্টের মালিক বিজয় সুব্বা-জী আর ওনার স্ত্রীর আন্তরিক অভ্যর্থনায় মন ভরে গেলো।
এই হোমস্টে-তে বিভিন্ন কটেজ রয়েছে, স্টোন কটেজ, পাইন কটেজ, এবং এর ওপরেও আরেকটি সুব্বা-জীর আরেকটি হোমস্টে আছে ‘বনপাখা’ নামক। আমরা টি- ভিলেজের স্টোন কটেজটা নিলাম আমাদের জন্য।চারদিকে শুধু নানারকমের ফুলগাছ, ফার্ন, পাহাড়ি ফলের গাছ, নানারকম ওষধির গাছ, এবং সুব্বাজীর নিজস্ব নার্সারী রয়েছে। আমাদের কটেজের সাথেই অ্যাটাচ বেশ বড় একটা বারান্দা, সামনে থেকে দূরের পাহাড়, ডানদিকে চা-বাগান, কাছেই রঙ্গভং স্রোতস্বীনি কল্লোলিনী হয়ে বয়ে চলেছে, গমগম করছে তার ঘুঙুর পরে পাথর কাঁপিয়ে নেচে বেড়ানোর শব্দ। আশেপাশে বহু রঙিন পাখি উড়ছে, কটেজেই রয়েছে দুটি সুন্দর, ভদ্র পোষ্য যারা একদিনেই আমাদের বন্ধু হয়ে উঠেছে।এখানে বলে রাখা ভালো, যেহেতু আজকাল অনেকেই নিজেদের প্যাকেজ হিসেবে মনের মত বেড়ানোর প্ল্যান করতে চান, সেই অর্থে তাবাকোশি আদর্শ জায়গা। এখানে থাকা এবং ছাড়বেলার খাবার মিলিয়ে প্রতিজনের, প্রতিদিনের প্যাকেজ হয়, এছাড়াও ক্যাম্পিং, রিভারসাইড ওয়াক, স্পেশাল চা-বাগান ভ্রমণ, পূর্ব-নেপাল ভ্রমণ এবং সান্দাকফু বেড়ানোরও ব্যবস্থা করা হয়।
আমরা এর আগেও এখানে ২০২০ সালে এসেছি, কাছেই শিব মন্দির, পাহাড়ের গায়েই বিষ্ণু মন্দির, রঙ্গভং নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়ানো এই সবকিছুই করেছি। তাই এবারে তৃতীয় দিনটি আমরা এইজন্যে রেখেছিলাম, প্রথম দিন হোমস্টেতেই গল্প করে, প্রকৃতির সৌন্দর্য্য দেখে, গ্রাম্য পথের বাঁকে বাঁকে হেঁটে কাটিয়ে দিলাম। জুলাই মাসে ভিড়ভাট্টা কম, নীরবতার এক অমোঘ হাতছানি থাকে, এখানে এলে প্রকৃতির না-বলা কথাগুলোও বড় বাঙময় হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় দিন টি-ভিলেজ হোমস্টের উপাদেয় ব্রেকফাস্ট করে মণিভাইয়ের গাড়িতে আমরা বেরিয়ে পড়লাম মিরিক ক্রস করে নেপাল বর্ডার দিয়ে ঢুকে পশুপতিনাথ মন্দির, মন্দির সংলগ্ন মার্কেট, পূর্ব নেপালের কন্যাম, ইলামের বুদ্ধমূর্তি, ফ্ল্যাগপয়েন্ট, ফটোপয়েন্ট এগুলি দেখতে। যদিও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে নেপাল স্কাইওয়াক এখন কয়েকদিন বন্ধ থাকবে। এই পূর্ব-নেপালের আবার আরেকরকম সৌন্দর্য্য, ছোট ছোট রঙিন ঘরবাড়ি, একদিকে দার্জিলিঙের ঘরগুলো, রাস্তার আরেকদিকে বর্ডারের কারণে পড়ে যাচ্ছে নেপালি ঘরগুলো। যদিও জুলাই মাস, কিছুটা কুয়াশা থাকলেও, বিকেল ছাড়া আমরা বৃষ্টির কোনও দুর্ভোগ পোহাইনি রাস্তায়। কন্যাম জায়গাটি অত্যন্ত সুন্দর, ভিউপয়েন্ট থেকে নেপালের কয়েকটি গ্রাম দেখা যায়, চারপাশে টি-এস্টেটগুলো সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হালকা ঠান্ডা হয় একটা স্টোলই যথেষ্ট।
চারপাশে ঘোড়ায় চড়ার এবং আরও বেশ কিছু স্পোর্টস এক্টিভিটির ব্যবস্থা রয়েছে। রাস্তার দুইদিকে নেপালি পসরা সাজিয়ে দোকানিরা বসে আছে, এবং এখানে কোনোভাবেই ইন্ডিয়ান টাকা চলবে না, কিছু কিনলে আপনাকে নেপালি টাকায় মূল্য দিতে হবে। যদিও পশুপতি মার্কেটে দুইই চলে, ভারতীয় এবং নেপালি মুদ্রা।
তাবাকোশি ফেরার পথে হালকা বৃষ্টি,নামলো, এবং আমরা যখন হোমস্টেতে নামলাম, তখন মুষলধারে পাহাড়ি বৃষ্টির আনন্দ কাকে বলে উপভোগ করা শুরু করলাম। বর্ষায় তাবাকোশি আরো লাস্যময়ী, নদী আরো ভরন্ত, বৃষ্টিস্নাত ভালোবাসায় ধুয়ে যেতে লাগলো পৃথিবীর সমস্ত হিংসা, দ্বেষ, মলিনতা, আবর্জনা। পাহাড় তো সুন্দরী, ভয়ঙ্কর, রূপবতী, কিন্তু পাহাড়-নদীর সংমিশ্রণ এক অনবদ্য, অকল্পনীয় কাব্যিক শৈলীর জন্ম দেয়। টি-ভিলেজ হোমস্টে তখন এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে, একদিকে বৃষ্টির অপাপবিদ্ধ ছুঁয়ে থাকা, অন্যদিকে পাহাড়ের কোলে মনাস্ট্রিগুলো থেকে ভেসে আসছে ঘন্টা আর সিঙ্গার আওয়াজ, স্বপ্ন বোধহয় পাহাড়েই সিঞ্চিত হয়, বড় হয়, শিশু থেকে হয়ে ওঠে উদ্ভিন্নযৌবনা। গাছেরও গন্ধ থাকে, থাকে মাটির গন্ধ, ভেজা সিঁদুরের সাথে লেপ্টে থাকে পাহাড়ি ভালোবাসার আশ্লেষ। না, হাত ছাড়িয়ে নিইনি, নিজেকে মেলে ধরেছিলাম তাবাকোশির বুকের মাঝে, বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা থেকে আহরণ করছিলাম ‘জীবন’।
বৃষ্টিস্নাত বিকেলটা আরো বেশি সুন্দর হয়ে উঠেছিল সুব্বাজীর আনা গরম চা আর উপাদেয় জলযোগ সহকারে। আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম, বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত, বারান্দায় বিকেলের মেঘ এসে উড়িয়ে দিচ্ছে বৃষ্টির অনাবিল আনন্দধ্বজা। তাবাকোশি নিয়ে সুব্বাজীর অনেক স্বপ্ন, যে কয়েকঘর গ্রাম আছে এখানে, তারা পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সবসময় তৈরী। তৃতীয় দিন আমরা স্থানীয় গ্রাম্য রাস্তা, কয়েকটি চা-বাগান, নার্সারী, মন্দির ইত্যাদি দেখে বেরিয়ে পড়লাম দার্জিলিঙের পথে, আমাদের রথচালক সেই মণিভাই, এক সরল, মনখোলা মানুষ যার গল্পের ভান্ডার অফুরন্ত।
দ্রষ্টব্য: রঙ্গভং নদী, চা-বাগান, শিব মন্দির, বিষ্ণু মন্দির, ওয়াকিং ট্রিপ, পাখি, প্রজাপতি, (ঋতু অনুযায়ী স্যালামাণ্ডারও দেখা যায়), বিভিন্ন রকমের উদ্ভিদ, পাহাড়ি পাথর ও ফার্ণ ইত্যাদি।
কোথায় থাকবেন: টি-ভিলেজ হোমস্টে (যোগাযোগ: বিজয় সুব্বা, ফোন নম্বর : ৯০৮৩১১১৫৬৬।) কটেজ, প্যাকেজ, খাবার, আতিথেয়তা এই সবকিছু মিলিয়ে এই হোমস্টেটির হয়তো কোনও বিকল্প নেই।