সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শক্তিনাথ ভট্টাচার্য্য (পর্ব – ৯)

হোয়াটস্অ্যাপে পরকীয়া – 

[ নেট বন্ধ করে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে লাগল মোহনা। সকালটা যতটা আনন্দ দিয়ে শুরু হয়েছিল, রাতে এসে ততটাই বিস্বাদ লাগছে… কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে… ভদ্রলোককে ওর ভাল লেগেছিল, ভাল মানুষ মনেহয়েছিল, তাঁর চোখ দিয়ে নিজেকেই দেখতে চেয়েছে, আসলে! … নাহলে এত কম সময়ে নিজেকে এতটা উজাড় করে দিয়েছিল সে!!… কেউ দেয়!!… কিন্তু, এখন কেন জানি না মনেহচ্ছে, উনি খুব ধূর্ত!… খুব সন্তর্পণে এমন সব কথা শুরু করলেন!!…  উনি কেন ছবি তোলা নিয়ে কথা তুললেন!? আমি নাহয় বলেছি, ‘ভালবাসলে আদর পেতে ইচ্ছে করে’, তা’বলে উনি আদর করা নিয়ে অত জোরাজুরি করতে চাইছিলেন কেন!?… আমার সহজতার সুযোগ নিতে সেই একই পুরুষালি বাহানা!!
অবশ্য, অতীত মোহনাকে তাড়া করে। ছবি তোলা নিয়ে ওনার ধারণাটি ওর কাছে অস্বস্তিকর লাগছেই। তবু, একেবারে অস্বীকার করা যায় না তো! এর পিছনে ক্যামেরা-দক্ষ ওর এক ফেসবুক বন্ধুর ভূমিকা তো আছেই!! সে কথা না জানানোরও কিছু ছিল না! সময় মত জানাতোই!
ফেসবুকে তার কয়েকবছরের অভিজ্ঞতা ওকে অনেক সচেতন করে দিয়েছে। অনেক পুরুষ ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে…  তাদের সংগে বন্ধু হিসেবে মিশতে গিয়ে ঘনিষ্ঠতার রাস্তাঘাটগুলো ওর চেনা হয়ে গেছে।… কোন শব্দের পথ কোন রাস্তায় নিয়ে যেতে চায়, মনের গুগুল লোকেশনে সেগুলো ও স্পষ্ট দেখতে পায়। ওর মনেহল, অন্যদের সঙ্গে এনার পার্থক্য হল, অন্যেরা তুলনামূলক কমবয়সী বলে কোন রাখঢাক ছাড়াই শরীরী চাহিদার কথাবার্তা বলতে দ্বিধা করে না,… কোন ট্যাবু নেই,… কিন্তু, ইনি অনেক পরিণত বলে কথার মায়ায় ‘তুই তোকারি’র স্নেহ দিয়ে ঢেকে রাখতে পারেন উদ্দেশ্যকে…  সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন কখন আমার কোন দুর্বলতা প্রকাশ পায়!… সাংঘাতিক!!
ওনার লেখা, গান, কথা আমায় মুগ্ধ করত, এটা ঠিক… জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতেন, তাই সহজভাবে এগিয়েছিলাম… আবেগে ভেসেছিলাম… প্রেম ভালবাসা নিয়ে আমার মনের কথা ওনার সঙ্গে শেয়ার করতে চেয়েছিলাম…  কিন্তু, তাই বলে উনি কী ভাবছেন আমাকে!?… নারীবন্ধু মানেই সহজলভ্য!?… বলতে বাধ্য হয়েছি, ‘আপনারা পুরুষরা শুধু শরীরই বোঝেন’ !?
রাতে ঘুম আসতে চাইছিল না।…  বিভু, ওর বর (বৈভব), এখন বাইরে পোষ্টেড। এত রাত্রে আর নেট চালানো যাবে না…  ও বুঝতে পারবে… ওর আপত্তিতে অনেককিছু মেনে নিতে তো বাধ্য হয়েছেই।… সকাল হোক। ওনার শেষ প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব  দেবো। ]
( সকালে মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েই মোহনা নেট খুলল ) :
মোঃ :   আগের দিন আপনি যা জানতে চেয়েছেন :
সেটা শারীরিক আপনাকে কে বললো…!?
আমি নেহাতই মজা করে বলেছি…  কোন গূঢ় উদ্দেশ্য নিয়ে নয়…
শারীরিক অতৃপ্তি নিয়ে পুরুষ খুঁজে বেড়ানোর মতো তুচ্ছ মানুষ আমি নই….  না তো আমার সেই পরিস্থিতি আর না-ই আমার সেই মানসিকতা আছে…
দুদিনের সাক্ষাতে সহবাস মানে যদি ভালোবাসা হয় আমায় ক্ষমা করবেন…  আমি অপারগ…!
আমি আবেগ বুঝি,  হৃদয়মথিত শব্দের ব্যথা বুঝি…  সেই আবেগে ধুয়ে যেতেও পারি…. কিন্তু একরাশ অতৃপ্তি নিয়ে অভিসন্ধি মূলক ভালোবাসার অভিনয় পারি না…!
অঃ :  STOP IT…. I SAY,  STOP IT. 😡
[ নেট বন্ধ করে দিল অর্কপ্রভ। উত্তেজনায় কাঁপছে  ভেতরটা !… কী বলছে মেয়েটা!! ও কি হুঁশে আছে! মাত্র এই ক’দিনে যার কাছে এইভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছে তাকে হঠাৎই এইভাবে বলা যায়!! কী জানি!!…  এ বোধহয় অনলাইনের বন্ধুত্ব বা সম্পর্কেই সম্ভব !… একটি আঙুলের ছোঁয়ায় যা আছে বা নেই! ]
[ সারাটাদিন মোহনার কথাগুলো ধাক্কা মারছিল অর্কপ্রভর কাজের ফাঁকে ফাঁকে। মনে মনে তার মোকাবিলাও চলছিল অবিরত।
চিকিৎসার কারণে বহু নরনারী তাদের মনের কথা ওর কাছে প্রকাশ করে। আর্থিক, সাংসারিক,  পারিবারিক, দাম্পত্য, অনেকের নানবিধ কথা ওকে শুনতে হয়। সহানুভূতি, সহমর্মিতা না থাকলে তাদের ভরসা আসবে কেন! তার ওপর, নিজেকে ও তো শুধুই চিকিৎসকই মনে করে না !!
তাছাড়া, এই বয়সে  স্নেহ আসে, উদারতা আসে, গ্রহণ করার ক্ষমতা যেমন আসে, তুচ্ছ বলে উপেক্ষা করার প্রবণতাও আসে।
মোহনা পরিণত মনস্ক হলেও ওর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে তেমনই কখনো  রসিকতা করেছে, কখনো স্নেহ এসেছে… তখন ‘তুই’ বলে কথা বলেছে।… তবু, ওর প্রেম নিবেদনকে গুরুত্বহীন ভাবাতে  চায়নি… ও তো জানে না, আমার তাতে কোন প্রয়োজন ছিল না ! তবু, ওর উচ্ছ্বাসকে ক্ষুণ্ণ করতে চাইনি।… ভেবে নিয়েছি, হয়তো, ওর তরফে এমন আবেগের কোন কারণ ছিল!…  অন্যতর এ প্রেমকে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান জানিয়েছি। ওর আগ্রাসী কথাবার্তার প্রেক্ষিতে কৌতুকভরেই তো জোর দিয়ে বলে দেখতে চেয়েছিলাম, ও সেটাকে কীভাবে সামলে নিতে পারে! ওর লেখনীতে, বোধে সে ক্ষমতা ছিল, এ তো বিশ্বাস করিই… আমার চেয়েও ভাল পারে। অন্ততঃ, সেই মুহূর্তে আমার ওই কথার যে বাস্তবিকভাবে কোন সম্ভাব্যতা ছিল না, এটা ওর না বোঝার কথা তো নয়!! তবু, কাল রাত থেকে হঠাৎ কেন ও এসব বলতে চাইল!?
লেখাগুলি বার বার পড়তে পড়তে খানিকক্ষণ গুম হয়ে রইল।… হয়তো, মোহনা নিজের সম্বন্ধেই ওসব জবাবদিহি করেছে, কিন্তু তাতে কি আমার দিকেও কিছু তীক্ষ্ণ ইঙ্গিত ছিল না!!… অন্তত, দ্বিতীয় বাক্যটিতে!! খুব অসম্মানিত বোধ হচ্ছে।
আচ্ছা, এমন কি হতে পারে, আগে কখনো, আর কাউকে ও এভাবেই বলেছিল, আর, এই মুহূর্তে তার সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলে সে কথাগুলিই ছুঁড়ে দিয়েছে !… কেননা, সহবাসের কথা এল কোথা থেকে!!…  আমার মনে তো এমন কোন ভাব আসা সম্ভব ছিল না, যা ও ভেবে নিল!!… তার কারণ তো ওর জানা নেই!!… এবার জানবে।
নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। চোখ বন্ধ করে দেখতে পেল, ঝড় উঠেছে… একটা নির্জন পার্কে  গতকালের সকাল আর আজ সকালের দুপ্রান্তে একটা শূন্য দোলনা দুলে চলেছে — “হোয়াটস্এ্যাপে পরকীয়া”  !! ]

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!