সাপ্তাহিক মুড়িমুড়কি -তে সুদীপ ভট্টাচার্য (পর্ব – ৩০)

বল্টুদার ট্রাভেল এজেন্সি – ৩০

সাইট সিনের জার্নিটা বেশ কষ্টের হয়। সেই সকালে বেরিয়ে রাতে হোটেল। তবুও সবাই মিলে দেখবার আনন্দটাই অন্যতকম ছিলো। বাস এসে থামলো মেরিন ড্রাইভে। ওখানে এক এক করে নেমে হোটেলের গেস্ট হাউসের দিকে হেঁটে গেলেন কেউ কেউ, আবার বেশ কিছু জন সমুদ্র পাড়ে গিয়ে বসলেন। হাওয়া দিচ্ছে খুব। আজ ঢেউটাও অনেকটা বেশী।সারাদিনের ক্লান্তি মুছে গেলো দমুদ্রের পাড়ে বসে। বৌদি, নদী, গুহ দা,বৌদি, আরো সবাই সমুদ্র পাড়ে গিয়ে বসলো। কানাই বাস নিয়ে চলে গেছে গ্যারেজে। বাসের হেল্পারও গেছে বাসের সঙ্গে। বল্টুদা গেস্ট হাউসে ফিরে গেছেন। রাতের রান্না চলছে। আজ সন্ধ্যের আর খাবারের ব্যবস্থা করেন নি বল্টুদা। বাসেই যা দেওয়া হয়েছে সকলের পেট ভার সেগুলো খেয়েই। তাই একেবারে রাতের খাওয়া। সমুদ্র পাড়ে চেয়ারে বসে বৌদিরা লেবু চা খাচ্ছেন। গুহ দা ডিমের পাউরুটি টোস্ট নিলেন। বেশ কড়া করে ডিম ভেজে উপরে পাউরুটি দিয়ে তার উপরে বিট লবন, লঙ্কা আর পেঁয়াজ কুচি ছড়িয়ে দেওয়া। স্বাদই আলাদা যেন। লেবু চায়ের সঙ্গে ডিম টোস্ট অপূর্ব লাগে।
পুরীতে থাকার দিন কমে আসছে। আর মাত্র দুদিন। পরশু রাতে ট্রেন। যদিও আগামীকাল চিল্কা বেড়াতে যাবে সকলে। সমুদ্রের পাড়ে দ্বীপ। মটর নৌকায় যেতে হয়। দারুণ যায়গা নাকি সেটা। চিল্কায় ডলফিন আছে, তারা খেলাও করে। প্রচুর পাখি বসে থাকে চারিদিকের গাছে। যারা এর আগে গেছেন তারা এই যাত্রার গল্প বলছেন। আর যারা যাননি, তাদের শুনেই ভালো লাগছে। পরশু দিন রাতে ট্রেন। ওই দিন সকালে মন্দির দর্শন আর খাজা কেনার পালা। শুধু কাকাতুয়া নয়, বেশ কিছু ভালো খাজার দোকানের খোঁজ পেয়েছে তারা। একটা আছে মন্দিরের পাশে। অপূর্ব স্বাদ।
রাত নামছে সমুদ্র পাড়ে। প্রায় দশটা। এত হাওয়ায় কারো উঠতে ইচ্ছে করছিলো না চেয়ার ছেড়ে। সেসময়ে হোটেলের সেই রহস্যময় ছেলেটি এসে উপস্থিত হলো। বৌদির কাছে এসে জানালো, বাবু ডাকছেন। সবাইকে যেতে বলেছেন। ছেলেটিকে দেখে বৌদি একটু চমকে উঠেছিলেন। কিন্তু যত দেখছেন, সন্দেহ যেন তত কমছে। ছেলেটির চোখে মুখে একটা সরলতা আছে। আর আজ উদয়গিরিতে যেটা হয়ে গেলো তারপর সন্দেহের অবকাশ নেই। পুলিশও নিশ্চিত সেই হীরে চোর, ওদের সঙ্গেই পুরীতে এসেছে একই বাসে। তবে একটা ব্যপার কিছুতেই পরিস্কার হচ্ছে না, যে সেই হীরে চোর আর জুতো চোর কি একই লোক?
সমুদ্রতীর থেকে গেস্ট হাউসের দূরত্ব হাঁটা পথে মিনিট দশেক হবে। পুরী হোটেলের পাশ দিয়ে যে গলি গেছে, সেখান থেকে গিয়ে অল্প কিছুটা। ভারী সুন্দর রিসর্টটা। চারিদিকে আলোর মালা। রিসর্টের সব কটা ঘরই ওদের দখলে। ছোট্ট একটা মাঠ। একপাশে রান্না হচ্ছে। মাঠের মধ্যেই টেবিল চেয়ার পেতে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। দারুণ সব মেনুর ব্যবস্থা করেছে বল্টুদা। কেউ কেউ খেতেই পারছে না এতকিছু, আবার কেউ তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাচ্ছে।আদতে বেড়াতে গিয়েও বাঙালি, খাদ্যের স্বাদ আর বৈচিত্রের মধ্যে ঢুবে থাকে। এটাই গড়পরতা বাঙালির বাঙালি সংস্কৃতি।
রাতের মেনু ছিলো খুব ভালো। আজ বিরিয়ানি। সঙ্গে চিকেন চাপ। শুরুর পাতে লোটে মাছের ফ্রাই। স্যালাড আছে। আর শেষ পাতে আইসক্রিম। সব্বাই তো দারুণ খুশী। ভরপেট খাওয়া দাওয়া করে গান শুরু হলো। বৌদি গানের আসরে। বল্ট্যদা সমস্ত গুছিয়ে ঘরে এলেন। একাকী ভাবনার সময় দরকার। আজ দুপুরে যে দুজন কলকাতা থেকে আসা পুলিশ অফিসারের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো, তারা বল্টুদাকে ফোন নাম্বার দিয়ে রাতে ফোন করতে বলে দিয়েছিলেন। বল্টুদা দরজা ভালো করে বন্ধ করে ফোন করলেন। কথা হলো অনেককিছু। ওরাও জাল গুটনো শুরু করে দিয়েছে। আগামীকালের চিল্কা ভ্রমন নিয়ে কিছু পরামর্শ করার ছিলো, তারা সেটা সেরে ফেললেন। বল্টুদাকে আশ্বাস দিলেন ওরা, কাল কিছু একটা হবেই।
সকাল হলো। রান্নার ঠাকুর আর জোগালদার সেই ভোর রাতে উঠে সমস্ত ব্যবস্থা শুরু করে দিয়েছেন। সকালের জলখাবার খেয়ে যাবে সবাই। বাসে হাল্কা কিছু টিফিন। আর দুপুরের খাওয়ার নেওয়া হবে না। সেই দ্বীপের মাঝখানে একটা দারুন হোটেল আছে। সেখানে খাওয়া দাওয়া হবে। বল্টুদা ওখানে পৌঁছে অর্ডার দেবেন। জ্যান্ত কাঁকড়া, চিংড়ি, অন্য মাছ রাখা, সেখান থেকে বেছে দিলে একেবারে লাইভ কিচেনে রান্না শুরু। দারুণ লাগে। যাই হোক, আস্তে আস্তে সবাই ঘুম থেকে উঠে পরলেন। একটা নতুন সকাল। বল্টুদা পুলিশের সঙ্গে যা কথা হচ্ছে, সবটাই নিজের মধ্যে রাখছেন। কারন শুধুমাত্র তিনি আর বৌদি জানেন, কলকাতা থেকে যে টিমটা এসেছে, তার মধ্যেই হীরে চোর লুকিয়ে আছে।
সবাই একএক করে নেমে আসছেন নীচে। বাস প্রস্তুত। কানাই আর খালাসি ছেলেটি চলে এসেছে। ওরাও খাওয়াদাওয়া করে নেবে এখানে। লুচি, বেগুন ভাজা আর কালোজিরে দিয়ে আলুর তরকারি। সুস্বাদু খাবার। সবাই খেয়েদেয়ে আস্তে আস্তে বাসে গিয়ে উঠলেন। হোটেলের সেই রহস্যময় ছেলেটিকে বল্টুদা নিজেই সঙ্গে নিলেন। সবাই কিছুটা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, বিশেষ করে বৌদি। কিন্তু বল্টুদা বেশ জোরের সঙ্গেই ওকে দলে নেওয়ায় বৌদিও কিছু বলতে পারলেন না।
কানাই বাসের ড্রাইভারের সিটে গিয়ে বসলো। চলতে শুরু করলো বাস। যাওয়ার পথে কয়েকটা মন্দির দেখিয়ে মোটামুটি সাড়ে এগারো, বারোটা নাগাদ চিল্কায় গিয়ে পৌঁছবে ওরা। সেখান থেকে বোট নিয়ে সমুদ্রের মোহনার কাছে সেই দ্বীপে গিয়ে পৌঁছাতে হবে। তীর থেকে সেই দ্বীপে যেতেই ঘন্টা খানেক সময় লেগে যায়।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।