“কি চায় ও” ধারাবাহিক বড়ো গল্পে সায়নী বসু (পর্ব – ৩)

সদ্য ফিজিওলজি তে মাস্টার্স করে উঠেছে সায়নী বসু। ছোটবেলা থেকে নাচ গান আর সব রকম গল্প উপন্যাস নিয়ে চর্চা করতে ভালোবাসে। তবে ভৌতিক সাহিত্যের ওপর ঝোঁক চিরকালই বেশি। কয়েক বছর নিজেও লেখালিখি শুরু করেছে। পাঠক পাঠিকাদের ভালোলাগাই তার প্রেরণার উৎস।
রৌনক আর পিয়ালী ঋক কে নিয়ে হসপিটালে যায়। পিয়ালী র মন কিছুতেই মানতে চায় না, ও স্পষ্ট দেখেছে ঋক চোখ খুলে তাকিয়েছে। অথচ হসপিটালে ডক্টর ইন চার্জ ও বলছেন ঋক সেন্সলেস হয়ে আছে। সমস্ত ঘটনা শুনে উনিও ভীষণ অবাক হলেন, খানিকক্ষণ ফ্রিজের ভিতর থাকলে জ্বর আসতে পারে, কিন্তু একটি বাচ্ছা এতক্ষন সেন্সলেস কেন হয়ে থাকবে এটা ওনার মাথায় আসেনা। সম্ভাব্য সবরকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হতে থাকে ঋক এর উপর, রৌনক্ ও পিয়ালী অধীর ভাবে অপেক্ষা করতে থাকে কোনো সুখবর এর আশায়। কিন্তু বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে হয় সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত, অথচ ঋকের স্বাস্থের কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যায় না। পিয়ালী মানসিক ভাবে ভেঙে পড়তে থাকে, যে ছেলের একটু জ্বর হলেই বাড়ি মাথায় করতো কতক্ষনে ছেলে সুস্থ হবে এই ভেবে সেই ছেলেকে আজ অজ্ঞান অবস্থায় চোখের সামনে এভাবে পড়ে থাকতে দেখেও কিছু করতে পারছেনা সে। হসপিটাল থেকে স্পেশাল পারমিশন করায় রৌনক যাতে রাতে পিয়ালী ছেলের কেবিনে থাকতে পারবে। সে নিজেও থাকবে নিচে ওয়েটিং রুমে যাতে কোনো এমার্জেন্সি তে সাথে সাথে আসতে পারে। এখনো পর্যন্ত গা অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা আর প্রেসার অত্যন্ত কম ছাড়া ঋক এর শরীরে আর কিছু অসুবিধে দেখা যাচ্ছে না, অথচ তার জ্ঞান কেন ফিরছে না এই নিয়ে ডাক্তার নার্স রাও কিছু বলতে পারেন নি।
কতক্ষন পিয়ালী ঋক এর পাশে বসেছিল খেয়াল করেনি, তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল সে, কানে আসে কিছু ফিসফিস করে কথা বলার শব্দ, তাকিয়ে দেখে ঋকের ঠোঁট নড়ছে আর ওর গলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে দু রকমের কণ্ঠস্বর,
– ধপ্পা, এবার তুই চোর ( ঋক)
– আব্বুলিশ আমি আগে তোকে ধ্বপ্পা দিয়েছি ( অন্য কণ্ঠস্বর )
– না হবেনা এবার তুই চোর ( ঋক)
রিকের চোখ বন্ধ অথচ ঋক কথা বলছে দুরকম গলা করে, এটা কি হচ্ছে, কি করে স্বম্ভব হয় এটা! ঘটনার আকস্মিকতায় পিয়ালী কিছুক্ষনের জন্য স্থবির হয়ে গেছিলো, তার গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছিল না। তবে বিহ্বলতা কেটে যেতেই সে চেঁচিয়ে ওঠে। আশেপাশে থাকা নার্স আয়ারা ছুটে আসে। পিয়ালী তাদের কে সব বলতে তারা চেক করে দেখে কিছুই হয় নি, ঋক এর অবস্থা যেমন ছিল তেমনই আছে। পিয়ালী তাদের বারবার বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে যে সে পরিষ্কার শুনেছে ঋক এর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে দু রকমের কণ্ঠস্বর, যেন দুটো বাচ্ছা লুকোচুরি খেলছে। কিন্তু তার কথা কেউ বিশ্বাস করেনা। তাকে বোঝানো হয় যে মানসিক চাপে সে এরকম ভুল শুনেছে বা ভাবছে। কিন্তু কিছুতেই পিয়ালী কে সামলাতে না পেরে তারা রৌনক কে ডেকে পাঠায় ওপরে। রৌনক কেবিনে আসতেই পিয়ালী তাকে সব বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
যদিও মুখে রৌনক বাকিদের মত করে পিয়ালী কে বোঝাতে থাকে যে এসব তার মনের ভুল কিন্তু তার ও যেন কোথাও খটকা লাগে। একবার নয় বারবার পিয়ালী এরকম ভুল কেন বকবে, সত্যিই কি মানসিক চাপ নাকি পিয়ালী এমন কিছু প্রত্যক্ষ করছে যা অন্য কেউ করতে পারছে না! রৌনক ও কিরকম মানসিক দোলাচলে ভুগতে থাকে। বাকিটা রাত সে ও পিয়ালী ঋক এর পাশে বসে কাটিয়ে দেয়। সকাল হলে পিয়ালী কে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে রৌনক বাড়ি নিয়ে আসে। হসপিটাল থেকে ও বলে দেয় যে ঋক এর অবস্থার উন্নতি হলে তাদের খবর দেওয়া হবে সারাক্ষণ পাশে না থাকলেও চলবে। যদিও পিয়ালী ঋক কে নিজের কাছ ছাড়া করতে চাইছিল না তাও তাকে ফ্রেশ হয়ে আবার যাওয়া হবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরিয়ে আনা হয়। পিয়ালী তখনও বলে চলেছে,
– আমি স্পষ্ট শুনেছিলাম দুটো গলা, ওটা আমার মনের ভুল নয়।
পিয়ালী কে বাড়িতে রেখে রৌনক একটু বেরিয়ে যায়। চুপচাপ বসেছিল পিয়ালী, কোনো কাজ করতেই আর তার ইচ্ছে করছেনা। মনে প্রাণে এখন সে একটাই প্রার্থনা করে চলেছে, ছেলেটা যাতে সুস্থ হয়ে যায়, তবে তার মন বলছে যে তার ছেলের সাধারণ কিছু রোগ হয় নি আর এ রোগ সারাতে তাকে অন্য কিছুর সাহায্য নিতে হতে পারে।
নিজের খেয়ালে মগ্ন ছিল পিয়ালী, এমন সময় কলিং বেলের শব্দে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে একজন বয়ষ্কা মহিলা দাঁড়িয়ে,
– তুমি আমায় চিনবেনা মা। আমি পাশের ফ্ল্যাটেই থাকি। তোমরা ব্যস্ত থাকো আর আমরা দুই বুড়ো বুড়ি তেমন বেরোই না তাই আগে আলাপ হয় নি। তোমার ছেলের কথা শুনে খোঁজ নিতে এলাম। কেমন আছে ও?
মহিলা কে দেখে পিয়ালীর নিজের মা এর কথা মনে পড়ে। বিয়ের পর পরই পিয়ালী নিজের মা কে হারায়, আর শাশুড়ির কাছে তেমন স্নেহ পায় ও নি, আশাও করেনি। কিন্তু এই অচেনা মহিলার মধ্যে কি যেন একটা আছে, মায়ের মত, কথা র মধ্যে একটা স্নেহের পরশ আছে। পিয়ালী তাকে যত্ন করে এনে ভিতরে বসিয়ে মনের সব কথা উজাড় করে বলতে থাকে। এতদিন যা যা ঘটলো, ঋক যা যা করতো, তার যা মনে হচ্ছিলো, এমনকি যেসব কথা সে রৌনক বা অন্য কাউকে বলতে পারেনি বিশ্বাস করবেনা কেউ ভেবে সেসব কথাও বললো। সব শুনে মহিলা বললেন,
– এই ফ্ল্যাট টা তোমরা না নিলেই ভালো করতে মা। তোমরা যেদিন এলে সেদিন আমার স্বামী আমায় বলেছিলেন তোমাদের একটু সাবধান করে দিতে, অন্তত যাতে একটু শান্তি সস্তোয়ন করে নাও আর কি। আমি ভাবলাম তোমরা আসার আগে তো এই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক এই ফ্ল্যাটে একটু পুজো করেই জিনিসগুলো সরিয়ে নিয়ে গেল তাই আর তোমাদের খামোখা ভয় দেখানো উচিত নয়, তাই তখন কিছু বলিনি আর। এখন ভীষণ আফসোস হচ্ছে, তোমাদের সাবধান করা উচিত ছিল আমার। আমার উনি তেমন হাঁটতে চলতে পারেন না, নয়তো নিজেই এসে হয়ত সাবধান করে দিতেন।
– কিসের ভয় মাসিমা? কিসের জন্য সাবধান করতেন?
– আসলে এই ফ্ল্যাট টা কেমন যেন অপয়া। তাই না নিলেই ভালো হয়। আর নিয়েই যখন ফেলেছে একটু ভালো করে পুজো আচ্ছা করে নিলে ভালো হত। কখন কোথা থেকে কি যে হয়! তোমার ছেলের কথা শুনে আমার ভীষণ খারাপ লাগছে, ঈশ্বর করুন ও যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায়।
– কেন অপয়া কেন বলছেন? দয়া করে আমায় সব খুলে বলুন মাসিমা। এ যে আমার ছেলের জীবন নিয়ে টানাটানি চলছে।
– না মানে আগে যারা ছিল এখানে তাদের বাচ্ছা ছেলেটাও অমন অপঘাতে.. এখনও মনে পড়ে কি মিশুকে আর বিচ্ছু ছিল বাচ্ছাটা, সবাইকে ডেকে ডেকে কথা বলতো আর সারাদিন শুধু খেলা। ওর মা আমায় বলতো যে এই ফ্ল্যাটের ভিতরেই নাকি এমন এমন জায়গায় গিয়ে লুকোতো যে খুঁজে পেতে ওর মা কে নাস্তানাবুদ হতে হতো। সেই লুকোনো ই তো কাল হল। ফ্রিজের পিছন দিকে ঢুকে লুকোতে গিয়ে কিভাবে যে ইলেকট্রিক শক লাগলো। ওই টুকু শরীর টা নাকি যখন ছিটকে পড়েছিল তখনই হৃদস্পন্দন থেমে গেছিলো। ওর মা বিশ্বাস করে নি, নিয়ে গেছিলো নার্সিং হোমে, সেখানে ওকে মৃত বলে ঘোষণা করে। ওর মা এর সেই বুকফাটা হাহাকার যে এখনও কানে বাজে আমার।
ভদ্রমহিলার কথাগুলো শুনে পিয়ালী ভয়ে কুঁকরে যায়, কোথাও কি তার ছেলের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার মিল রয়েছে এই ঘটনার সাথে? না না এ হতে পারেনা, সে থাকতে তার ছেলের কোনো ক্ষতি সে হতে দেবেনা আর। এমন মর্মান্তিক পরিণতি অন্ততঃ ঋক এর সাথে হতেই পারে না।
– আজ আসি মা। একটু খেয়াল রেখো, আর ছেলের শরীর একটু ভালো হলে আমায় জানিও, আমিও চিন্তায় থাকবো।
এই বলে মহিলা উঠে যাচ্ছিলেন। বেরোনোর সময় হঠাৎ তার চোখ রান্নাঘরের দিকে যেতে তিনি আঁতকে উঠলেন!
– এ তো সেই ফ্রিজটাই!
– কোন ফ্রিজ মাসিমা?
মহিলা আস্তে আস্তে করে এগিয়ে গেলেন ফ্রিজের দিকে,
– তোমার বর এই ফ্রিজটা কোথা থেকে এনেছে? এটা কি তোমরা আগের থেকে নিয়ে এসেছো?
– না এটা তো নতুন এখানে আসার পর কেনা। দোকান থেকেই তো..
বলে থেমে যায় পিয়ালী। রৌনক বলেছিল এটা দোকান থেকে আনা কিন্তু তার আগে একবার বলেছিল, এতটা মিথ্যে কথা নিশ্চই বলবেনা সে, দোকান থেকে কেনা বলে পুরোনো জিনিস!
– একবার ভালো করে জিজ্ঞেস করো তো মা তোমার বর কে, আমার কেমন জানিনা মনে হচ্ছে আগে এটাই, না মানে একই রকম মডেল হতেই পারে। তুমি কিছু মনে কোরো না মা। আমি আসি। পারলে একটু পুজো টুজো করে নিও কেমন?
এই বলে ভদ্রমহিলা চলে যান। রৌনক ফিরতেই পিয়ালী তাকে চেপে ধরে,
– ফ্রিজের বিল টা দেখাও
– মানে? এখন তুমি ফ্রিজ নিয়ে পড়লে কেন?
– বিল টা কোথায়?
চাপের মুখে পড়ে সব সত্যি কথা বলে দেয় এবার রৌনক। রাগে দুঃখে পিয়ালী ক্ষেপে গিয়ে চেঁচাতে থাকে,
– তুমিই তার মানে সবকিছুর জন্য দায়ী। সব অঘটন ঘটেছে তোমার জন্য। বলেছিলাম কখনো উচিৎ নয় পুরোনো জিনিস আবার নিয়ে আসা। কোনো খোঁজ খবর না নিয়ে তুমি আমায় মিথ্যে বলে সেটাই করলে।
অহেতুক নিজের ওপর দোষ চাপছে দেখে রৌনক ও বলে ওঠে,
– আমি দায়ী? তুমি দায়ী নও? ও বাড়ি থেকে চলে আসার জন্য কে হাঁপিয়ে উঠেছিল পিয়ালী? ওই বাড়ির পরিবেশে সবার মাঝে থাকলে ঋক এর এমন হতো কোনোদিন?

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!